মাশুক শাহী: ‘প্রমা’র নেপথ্যকথা- স্মৃতির আলোয় কবি আজীজুল হক

[মাশুক শাহীর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সংকলনটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন মাসুদুল আলম। এতে মুর্তজা বশিরের আঁকা কবির প্রতিকৃতি ছাড়াও স্থান পেয়েছে সেখ সালাউদ্দিন ও সমীকরণের স্কেচ এবং মোহাম্মদ শফি, নাসির আলী মামুন, ফখরে আলম, শীতল মিত্র, কবির পরিবার ও সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমীর সংগৃহীত আলোকচিত্র। সংকলনটিতে রয়েছে ৮টি প্রবন্ধ, ৭টি স্মৃতিচারণ এবং ৬টি নিবেদিত কবিতা। এছাড়াও সম্পাদকের সংকলনে স্থান পেয়েছে কবির নিজস্ব ২টি গদ্য, ২টি কবিতা, স্বরলিপিসহ ২টি গান, ৯টি আলোকচিত্র ও ১১টি স্কেচ। গ্রন্থটির অন্যতম আকর্ষণ ৮১ পৃষ্ঠাব্যাপী বিস্তৃত একটি দীর্ঘ আলাপচারিতা, যেখানে ৩ দিন ধরে অংশ নিয়েছিলেন যশোরের ২৬ জন সৃজনশীল তরুণ-তরুণী। এর পাশাপাশি সংযোজিত হয়েছে ৬টি ইংরেজি অনুবাদ, ১ পৃষ্ঠার কবি পরিচিতি, ১ পৃষ্ঠার লেখক পরিচিতি এবং শেষাংশের ৫ পাতার বিজ্ঞাপন। — আবদুর রব]

অনার্সে ভর্তি হয়েছি। অনিয়মিত ক্লাস করি, তাও সহপাঠী শাহনাজ বেগম মিতার অনুপ্রেরণায়। কিন্তু কলেজ ও কলেজের বাইরে স্কুল-কলেজ-রাজপথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং যশোর সাহিত্য পরিষদে দুই বেলা আড্ডা নিয়মিত চলতে থাকে।

আশি-নব্বই দশকে যশোরের সব তারকা কবি-সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ-সংস্কৃতিজনদের আরণ্যক আড্ডা ও সৃষ্টির সূতিকাগার ছিল যশোর সাহিত্য পরিষদ। এখান থেকেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ হতো কপোতাক্ষী, শালপ্রাংশু, প্রমা, চর্যা, দোঁহে, চোখ, বিভাবনা, একান্তর, পদ্যপত্র ও খসড়া কাগজ।

এখানে এসে-বসে যারা শিল্প-সাহিত্য চর্চা করতেন, মননে-মেজাজে-দর্শনে তাঁরা ছিলেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং প্রচারবিমুখ। সে ছিল এক সৃষ্টিশীলতার স্বর্ণালী সময়কাল।

এমন সময় একদিন কলম-বিপ্লবী সাংবাদিক-ঔপন্যাসিক শামছুর রহমান কেবল ভাইয়ের ‘জনকণ্ঠ’ কার্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছিল। কথায় কথায় ভাই হঠাৎ করে বলে উঠলেন:

দেখো তো চেষ্টা করে, স্যারের উপর কিছু করতে পারো কিনা! আমরা তাঁর কাছে অনেকবার বিভিন্নভাবে অনুমতি চেয়েছি। কিন্তু কাউকে অনুমতি দেননি বা নির্ভর করতে পারেননি। তুমি দেখো, যদি সম্মতি নিতে পারো, প্রাথমিক অর্থের ব্যবস্থা করবো।

তখন স্যার অবসরে থাকায়, সুস্থ থাকলে নিয়মিত দুই বেলা পরিষদে আসতেন। সেই আড্ডায় সাহিত্য-অনুরাগীরা ছাড়াও শহরের বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত গুণীজনেরা একটু উদার বাতাসে উড়তে ঠাঁই নিতেন।

আড্ডায় রশিদের দোকানের আট আনার সিঙাড়া, চা ও গুড়ের সন্দেশ কর্পূরের মতো উড়ে যেতো! কে বিল দিতো, কত বিল হতো, তার খবর হতো না। শহরের সব পথ ও সব মতের মিলনস্থল ছিল এই বহুমাত্রিক প্রেরণাময় হৃদয়প্লাবী আড্ডা!

এই আড্ডায় নিবিড়ভাবে থেকেও সাহস করে উঠতে পারতাম না কাঙ্ক্ষিত প্রস্তাবটি দিতে—যদি ভরা আড্ডায় ক্লিন বোল্ড করে দেন! তাঁকে প্রায় বাসায় পৌঁছে দিতাম, কখনো পদব্রজে, কখনো রিকশায়। কখনো বাসায় বসতাম, কখনো বসতাম না।

এই ধারাবাহিক হৃদ্যতাপূর্ণ অভিযাত্রায় একদিন আচমকা প্রস্তাব দিয়ে ফেললাম। স্যার নিজেকে সামলে নিয়ে স্মিত হাসলেন। ডান হাতে কানের কাছের শুভ্র কেশ পেছনের দিকে সরিয়ে বললেন:

তুমি এখন কোন ইয়ারে? আমার কবিতা পড়েছো? কতটুকু ধরতে পারো, কতটুকু পারো না!”

চমকে উঠলাম, দিশেহারা অবস্থা! স্যার কেন ‘বুঝতে’ শব্দের স্থলে ‘ধরতে’ শব্দটি ব্যবহার করলেন?

“চর্যাপদ পড়েছো? ধরতে পারো? মধ্যের কথা—মধ্যের ব্যথা!”

সারা দেহে যেন চর্যাপদের সময়ের মধ্যের কথা ও মধ্যের ব্যথা শিশিরের মতো ঝরতে থাকে! সেই শিহরণেই স্যারের ‘একাত্তরের অনুভব থেকে’ আবৃত্তি করতে থাকি:

ইচ্ছে করলেই তুমি কেড়ে নিতে পারো না আমার সবকিছুকে

না, পারো না।

আমার পাজামা, শার্ট, মানিব্যাগ, ঘড়ি

তুমি খুলে নিয়েছো আমার অনামিকার আংটি

কলমের নিব।
রিকশা বাসার সামনে না থামিয়ে তালতলার একটি হোটেলের সামনে থামালেন। চায়ের কথা বললেন। চায়ে চুমুক দেন, অপেক্ষা করেন, তারপর ঠান্ডা চায়ে আবার চুমুক দেন। স্বগতোক্তি করলেন:

“তুমি প্রচণ্ড আবেগী ছেলে, কিন্তু অসম্ভবভাবে নিয়ন্ত্রণ করো। কোনো কিছুই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ইতিবাচক নয়।”
একদিন সময় নিয়ে বাসায় যেতে বললেন। এক শীতের সন্ধ্যায় মিছিল করে, ঘর্মাক্ত শরীরে বাসায় গেলাম। শীতে কষ্ট পাচ্ছিলেন, শোয়া থেকে উঠে বসলেন। ভাবি শরবত দিলেন। ক্লান্ত শরবতের মাজেজা সেদিন ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেছিলাম।

“তুমি কি স্থির করেছো, আমার সাহিত্যকর্ম নিয়ে ‘প্রমা’ বিশেষ সংখ্যা করবে?”
জানালাম, কোনো পথ খোলা নেই, করতেই হবে।

“অনেকের শত্রু হবে কিন্তু, টাকার চাপ সামলাবে কীভাবে? লেখকের তালিকা করেছো? কে কে স্মৃতিচারণ করবে? কে কে বিশ্লেষণাত্মক লিখবে?”
সম্মতি পেলেই সবকিছু সামলে নেবো জানালে বললেন:

“লেখার ব্যাপারে তোমার ভাই, তোমার বাবারও ছাত্র, পরে আমারও অত্যন্ত প্রিয়ভাজন যোগ্য ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ও জনপ্রিয় শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেনের সাথে দেখা করো—কথা বলো।”
সম্মতি পেলাম, ইশারাও বুঝলাম। পরের দিন ফুরফুরে মেজাজে ভেসে বেড়ালাম। সাহিত্য পরিষদের অনেককে কোণ আইসক্রিম খাওয়ালাম, তবে কারণ জানালাম না। উত্তেজনায় আড্ডায় মন বসলো না।

কেবল ভাইয়ের কাছে গেলাম। মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন:

“লিখিত নেবে নাকি!”
জড়িয়ে ধরলেন, বসালেন। বাইরের হোটেল থেকে এক প্লেট ভাত আনালেন। জয়ের আনন্দে পরিকল্পনা করতে করতে ভাবীর রান্নার সুস্বাদে একসাথে তৃপ্তির সাথে খেলাম। বাৎসল্যরসের আলো দেখেছিলাম তাঁর অভিব্যক্তিতে।

“তুমি পারলে! শোনো, একমাত্র কাপুরুষের কোনো শত্রু থাকে না। ভালো হলো, তুমি মানুষ চিনতে পারবা। কাল বিকেলের পরে সন্ধ্যার আগে এসো।”
পরের দিন সময়মতো ভাইয়ের কাছে গেলে প্রথম শ্রেণির একটি বিজ্ঞাপনের ডিজাইন ও একটি খাম ধরিয়ে দিলেন। পরিষদে ফিরে আসলাম। আড্ডা শেষে সৌখিন পরিবহনে গিয়ে শ্যাম দাদাকে বললাম ঢাকায় যাবো। দাদা ব্যবস্থা করে দিলে ভোরে ঢাকায় পৌঁছাই।

অদ্ভুত সমীকরণ! আমার প্রধান অফিস, বড় ভাইয়ের ফ্ল্যাট ও স্যারের বোনের বাড়ি আদাবরে একই রোডে একই সমান্তরালে ছিল। ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়ে, অফিসে মুখ দেখিয়ে চলে গেলাম আকরম ভাইয়ের বাসায়।

ভাই ছিলেন না, ভাবি ছিলেন। পরিচয় দিতেই বসালেন:

“তুমি আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়। তোমাদের গল্প শুনি ওর কাছ থেকে। তোমাদের কথা খুব বলে। অনেক আগে সাকী একবার এসেছিল মেডিকেলে পরীক্ষা দিতে, কয়েকদিন ছিল।”
তারপর আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাঁর সহজ আন্তরিকতায় ভক্ত হয়ে গেলাম। এরমধ্যে ভাই আসলেন। এই ভাইয়ের কত কিংবদন্তি মায়ের কাছে শুনেছি, তিনিও দেখছেন আমাকে।

বললাম, স্যার পাঠিয়েছেন। শুনে ঘরের মধ্যে গেলেন। কিছু সময় পর ফিরে এসে সামনে বসে বললেন:

“তোমার জন্ম কোন সালে?”

“১৯৬৯ সাল।”

“আমি যখন যশোর ছেড়েছি তখন তোমার জন্ম হয়নি। আমি সাথী পর্যন্ত দেখে এসেছি। স্যার সম্মতি দিলেন!”
বললাম, অর্ধেক দিয়েছেন। শুনে হাসলেন। তারপর স্মৃতিচারণে ডুবে গেলেন। আব্বা-আম্মার বৃত্তান্ত, বংশলতিকা সুললিত ও সহজ ভাষায় বলে যাচ্ছেন, আর আমি যেন পরিব্রাজক হয়ে মুগ্ধতায় আব্বা-আম্মার সাথে তাঁদের পূর্বপুরুষের পথে ভ্রমণ করছি!

ভ্রমণের মধ্যেই শুনলাম:

“আমাদের দুই ভাইয়ের আজকের এই অবস্থানের জন্য খালাম্মার অনেক অনেক অবদান।”
ঢাকার লেখা সংগ্রহের চিন্তামুক্ত থাকতে বললেন। একসাথে দুপুরের খাবার খেয়ে, ভাই-ভাবির শুভাশিস নিয়ে আইন অনুষদে গেলাম বন্ধু মোস্তফা সোহেলের খোঁজে। পেয়ে গেলাম।

স্বভাবসুলভ হৃদ্যতায় হৈ হৈ করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বললো:

“তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছিস, দোস্ত!”
সে ছিল মেধাবী ছাত্র, প্রেমের কবিতায় আশ্চর্য রকমের সিদ্ধহস্ত, তারপরও নিবিষ্ট ছিল উপন্যাসে। এই বন্ধু বন্ধুদের সামান্য সাফল্যেই অসামান্য আনন্দ পেতো, আলোড়িত হতো! ঔপন্যাসিক হিসেবে যখন পাঠকপ্রিয়তা পেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় যুক্ত হওয়ার অভিযাত্রী, তখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়। অনুভবে-স্মৃতিতে সোহেল আজও অম্লান আমাদের কাছে।

সব লেখা সংগ্রহের পর দীর্ঘদিন আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে পরিশীলিত ও ঋদ্ধ হতে থাকে বিষয়সূচি, প্রচ্ছদ ও অলঙ্কারিক পরিকল্পনা। সব বিষয় চূড়ান্ত করে স্যারের সাথে বসলে তিনটি বিষয়ে তাঁর মনোভাব বুঝতে পারি।

একজন কবির একটি নিবেদিত কবিতা এবং আরেকজন কবির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হোক, তিনি চাচ্ছিলেন না। সাক্ষাৎকারের পরিবর্তে ‘আলাপচারিতা’ বা ‘কথোপকথন’ জাতীয় কিছু চাইছিলেন।

স্যারের সাথে বসার অনেক আগেই একজন চিত্রশিল্পী ও অলঙ্কারিক দেখেই বলেছিলেন:

“এই দুটি ছেপো না। স্যার রাজি হবেন না। এগুলো না রাখলে দুইজনের মন খারাপ হবে, কিন্তু রাখলে পত্রিকা বিতর্কিত হবে এবং অসংখ্য শত্রু বাড়বে।”
গণমতকে গ্রহণ করি। আমরা তথাকথিত ধারায় স্যারের সাক্ষাৎকার নিতে চাইনি, উনিও একঘেয়ে ধরনের সাক্ষাৎকার দিতে কিছুতেই সম্মত হচ্ছিলেন না। ফলে আলাপচারিতার সামগ্রিকতাকে গ্রহণ করি।

এরপর শুরু হয় বিজ্ঞাপন সংগ্রহ অভিযান। প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল পত্রিকা ৭ ফর্মার, সেটা ১৩ ফর্মায় রূপ নেয়। ১৯৯৫ সালেই প্রকাশ করার প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু নগদ অর্থসংকট ও আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ায় প্রকাশ বিলম্বিত হয়।

রাজশাহী থেকে ফিরে এসে আবার পূর্ণোদ্যমে শুরু হয় ‘প্রমা: আজীজুল হক সংখ্যা’ প্রকাশ অভিযান। অলৌকিকভাবে অর্থের সংকট অনেকাংশে কেটে যায়।

একদিন দুপুরে পরিষদের আড্ডায় আছি, নিচ থেকে কারো ডাক শুনে জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। দেখি সাংবাদিক তৈরির কারখানা ও স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী দৃঢ় অবস্থান ও সত্যনিষ্ঠ খবর প্রকাশের জন্য দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয় ও সমাদৃত ‘দৈনিক রানার’ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মুকুল ভাই।

রিকশায় বসেই নিচে যেতে ইশারা দিলেন। নেমে কাছে গেলে সাদা একটা খাম দিয়ে বললেন:

“আমাকে বলোনি, আমি জেনেছি।”
এটুকু বলেই ওই রিকশাতেই চলে গেলেন। এই বিস্ময়কর ঘটনায় আত্মস্থ হতে না হতেই, সন্ধ্যায় পরিষদে গেলে আবিদ জানালো, বাঁধন আমাকে কয়েকবার খুঁজে গেছে। এবার আমি ওর খোঁজে বের হলাম।

বেশিদূর যাওয়া লাগলো না, টাউন হল মাঠেই পাওয়া গেল। চাচা বলে জড়িয়ে ধরে টাকা দিয়ে বললো:

“রাখেন। কাজটা শেষ করতেই হবে।”
ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু সময় হতভম্ব হয়ে গেলাম। স্বাভাবিক হয়ে চাচা-ভাইপো মিলে হলের প্রধান গেটের চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে থাকি। একে একে আবিদ, জনপ্রভুদান, রাজিব, রকিব, সঞ্জয়, সেলিম, সিজার এসে আড্ডাকে সেমিনার করে তোলে। ‘প্রমা’র প্রকাশ নিয়ে ওদের হৃদয়াবেগাপ্লুত উচ্ছ্বাসে অনুপ্রাণিত হই।

পরের দিন অত্যন্ত স্নেহভাজন তানভিরুল ইসলাম সোহান বিজ্ঞাপনের অগ্রিম সম্মানী দিলে প্রকাশ কার্যক্রম আরো গতি পায়। অবশেষে ১৯৯৭ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর, ৪র্থ সংখ্যা হিসেবে ‘প্রমা: আজীজুল হক সংখ্যা’ প্রকাশিত হয়!

দিন-মাস মনে নেই, এইটুকু মনে করতে পারি; আম্মা মৃত্যুবরণ করেন ৬ অক্টোবর, ১৯৯৭ সালে। তারপরের কোনো এক মাসের রাতে এটি পৃথিবীর জ্ঞান-আলোয় যুক্ত হয়। তখন মাতৃশোক কাটিয়ে উঠতে ‘প্রমা’ প্রকাশ করার আয়োজন ছিল আমার কাছে আরাধনা!

সেই সময় ঘরে-বাইরে মুরুব্বিজন-শুভার্থীজন-বন্ধুজন সঙ্গে থেকে সাহস-প্রেরণা-উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, সহমর্মিতার স্পর্শ দিয়েছিলেন। তাঁদের ভুলিনি, ভুলবো না।

পরের দিন সকালবেলা জনপ্রভুদানকে সাথে নিয়ে স্যারের বাসায় ছুটলাম। দুই কপি অর্পণ করি। হাতে নিয়ে স্যার কিছুক্ষণ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন।

“আমার জন্য পাঁচ কপি রেখো, আমি টাকা দিয়ে নেবো।”
ভাবিকে ডাকলেন, দেখালেন।

“বিজ্ঞাপন তো খারাপ পাওনি! বিজ্ঞাপন পাওয়া সহজ, কিন্তু বিজ্ঞাপনের টাকা তোলা ক্লান্তিকর।”
এরমধ্যে ভাবি নাস্তা দিয়ে বললেন:

“তোমরা কাল দুপুরে আসবা।”
নাস্তা খেতে খেতে স্যার হঠাৎ বলে উঠলেন:

“তুমি যশোরে থাকবে, নাকি ঢাকায় যাবে! আজ থেকে তুমি অন্য যশোর দেখবে। এতো ছটফট করছো কেন? ছটফটানি তো হবে আমার!”
তিনজনই একসাথে হেসে উঠলাম। কেবল ভাইয়ের কাছে যাবো বলতেই বললেন:

“ওহ্ যাও, তাড়াতাড়ি যাও। আমার পরে পত্রিকা পাওয়া ওরই প্রাপ্য। যাও, আর ঠেকাবো না।”
‘প্রমা’ আবারো হাতে নিলেন। সেই ঐশ্বরিক দৃশ্য ধারণ করে এখনো বারবার জেগে উঠি।

ভাইয়ের অফিসে গেলাম।

“অবশেষে হলো। এখন নিজের বাবাকে নিয়ে একটা করো।”
দুই কপি দিলে বুকশেলফে প্রচ্ছদ মেলে রাখলেন। ৫ কপির অগ্রিম দিলেন এবং কয়েকটি ঠিকানা দিলেন। প্রথম দিন রাত পর্যন্ত ২২ কপি চলে যায়, ১০টির সম্মানী পাই।

রাতেই ঢাকার গাড়িতে উঠে পড়লাম। বড় ভাইয়ের বাসায় উঠলাম। বিশ্রাম নিয়ে, নাস্তা করে, তৈরি হয়ে দুই ভাই একসাথে অফিসে গেলাম। অফিসে বড় ভাই স্টাফদের সামনে খুব প্রশংসা করলেন। ২ কপি দিলে ১০০০ টাকা সম্মানী দিলেন এবং পত্রিকার বড় ব্যাগ দেখে একটা মাইক্রোবাস দিলেন।

শাহবাগে ‘সিলভানা’র সামনের ফুটপাতে একটা বইয়ের দোকানে লিটিল ম্যাগাজিন রাখতো, সেই দোকানে দুই কপি রেখে সোজা আকরম ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারের বাসায় উঠলাম।

তাঁর দুই কপি ও লেখকদের ৮ কপিসহ ১০ কপি অর্পণ করি। খুব আনন্দিত হলেন। সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন, তারপর একসময় চোখ তুললেন:

“স্যারের উপর এবার আরো বেশি কাজ হবে। প্রয়োজনও। ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে ‘প্রমা’।”
এরমধ্যে স্যার আবারও একদিন বাসায় ডেকে নিলেন। অন্তরালের অনেক অজানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন। একসময় স্পষ্ট করে বললেন:

“এইসব কথা তুমি আমি মারা গেলে বলতে পারো। এর আগে বললে, তুমিও মরবে, আমাকেও মারবে। কি ঠিক করলে? যশোর থাকবে, না ঢাকায় যাবে?”
আমি তখন ‘প্রমা’র প্রকাশনা উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তাঁর উদ্বিগ্নতা দেখে গতি বাড়ালাম।

সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করে, আগের দিন রাজশাহী গেলাম উৎসবের প্রধান অতিথি বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে আনতে। সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারের স্যারের বাসায় উঠলাম এবং ‘প্রমা: আজীজুল হক সংখ্যা’ হাতে দিলাম।

প্রচ্ছদের উপর হাত বুলাতে বুলাতে বললেন:

“একই নাম, সামান্য পার্থক্য। কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে ওনার ও আমার দর্শন-আদর্শ ও পথ একই। আমি ওনার লেখার অনুরক্ত। এবার একসাথে হবো। তুমি খেতে বসো, তোমার জন্য আমিও একটু দেরিতে বসছি।”
তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোটগল্প, কবিতা, রাজনীতি ও দেশভাগের অভিঘাত নিয়ে আলোচনা চললো। আমি তাঁর ‘শোণিত সেতু’ গল্পের প্রসঙ্গ তুললে বলে উঠলেন:

“কে বলে পাঠক নেই, কারা বলে আমাদের কেউ মনে রাখে না! কত আগে পড়েছো?”
“৮৭-তে”—বলতেই উনি বললেন:

“আমি লিখেছি ৬৯-এ। বিপ্লব কি তাড়াতাড়ি আসে! হোসাইন আল মামুনের লেখা পড়বে। ও এখন বেশ ভালো লিখছে।”
তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি’ দিলেন।

“ভোরবেলা রিকশা নিয়ে সরাসরি এখানে চলে আসবে। গেটে বলে রাখবো।”
আমি শহরে বড়বু’র বাসায় চলে আসলাম। ভোরে হাড়কাঁপা শীতে স্যারের বাসায় গেলাম, তৈরি হয়েই ছিলেন। নিচে রিকশা ছেড়ে দিতে বললেন। ড্রাইভারকে ডেকে নিলেন, কিন্তু নিজেই ড্রাইভ করে স্টেশনে আনলেন।

যশোর পৌঁছেই গল্পকার অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী ভাইয়ের বাসায় স্যারকে রেখে সাহিত্য পরিষদে আসলাম। তখন দুপুর। দেখি প্রকাশনা উৎসব আয়োজনের কোনো তোড়জোড় নেই, কোনো লোকজন নেই!

পরে সাধারণ সম্পাদক নেমে এসে জানালো:

“ভাই, এখানে অনুষ্ঠান করা যাবে না।”
কারণ হিসেবে বললো, এই পত্রিকা সাহিত্য পরিষদের নয়। আমাদের মধ্যে কথাবার্তা চলাকালেই চোখ পড়লো পরিষদের জানালায়। দেখলাম—একজন বনসাইপ্রেমী কবি, আরেকজন বৃক্ষপ্রেমী কবি আমাদের কথোপকথন উপভোগ করছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, “অনুষ্ঠানে তোমরা থাকছো তো?” সময়ক্ষেপণ না করে কয়েকজনকে নিয়ে প্রকাশনা উৎসবের ব্যবস্থা করে ফেলি।

সেই দিন যশোর ইনস্টিটিউট পাঠাগার কর্তৃপক্ষের অকপট সমর্থন না পেলে যশোরের বুকে সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হতো। এই ঐকান্তিক সহযোগিতার জন্য তাঁদের আমরণ কৃতজ্ঞতা জানাব।

অনুষ্ঠান যথাসময়ে শুরু হয় এবং প্রাণবন্তভাবে শেষ হয়। যাঁরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের কেউ আলোচক ছিলেন, কেউ কবিতা আবৃত্তি করেন!

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসান আজিজুল হক স্যার বলেছিলেন:

“‘প্রমা’র এই সংখ্যা একসাথে কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।

প্রথমত, আমরা যাঁরা মফস্বলে থেকে শিল্প-সাহিত্য চর্চা করি, এই কাজের মাধ্যমে প্রমাণ হলো তাঁরা মূল্যায়নের যোগ্য এবং তাঁদের মূল্যায়নের জন্য মহানগরের কর্পোরেট মহাজন ও বোধহীন-রুচিহীন রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই। তাঁদের জন্য যথেষ্ট যোগ্য তরুণ অরুণ মফস্বলেই আছে।

দ্বিতীয়ত, এই প্রকাশনা উৎসব প্রথম কবি আজীজুল ও গল্পকার আজিজুল দুইজনকে একমঞ্চে আনতে পারলো।

তৃতীয়ত, ‘প্রমা: আজীজুল হক সংখ্যা’ ‘আলাপচারিতা’র মাধ্যমে অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো; সৃষ্টিশীলদের সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিক ইতিহাস কীভাবে দৃশ্যায়ন করতে হয়। আমি আশা করবো এবং আয়োজনের স্নিগ্ধতা ও বিদগ্ধ সমাবেশের মুগ্ধতায় বিশ্বাস রাখছি মাশুক শাহী গংয়ের সবাই তাদের সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর স্থায়ী করবে।”
দুইজনই আমার শিক্ষক—একজন কলেজের, আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাঁরা অনন্তলোকে আছেন। তারপরও বলতে চাই, আমরা যাঁরা ছিলাম এখনও আছি, অধিকাংশ দেশে-বিদেশে তাঁদের স্বাক্ষর স্থায়ী করে চলেছে। আমি চাইনি কিছুই, সেই স্বাক্ষরগুলোর সাথে অভিযাত্রী হতে চেয়েছি।

এরপর নামমাত্র ঢাকাবাসী হই। কয়েক মাস ভেসে বেড়াই। যার সাথে দেখা হয়, বাহবা দেয়, অভিনন্দন জানায়।

আমি বন্ধু স্বপনকে নিয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের বুক স্টলে খবর নিই। বলে, চলছে ভালো। টাকা চাইলে, একসাথে দেবো বলে ডজ দেয়। একটা মাত্র স্টল একদিন সন্ধ্যায় একসাথে ২০ কপির টাকা দেয়। তা পকেটে ঢোকার আগেই বন্ধুদের উদরে ঢুকে যায়।

অসম্ভব প্রচার পায়। সেই সময়ের প্রায় সব দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রচ্ছদসহ পরিচিতি ছাপা হয়। একমাত্র ‘দৈনিক জনকণ্ঠে’ কবি নাসির আহমেদ ভাই একটা অসাধারণ সমালোচনা করেন। তেমন আলোচনা-সমালোচনা চোখে পড়েনি।

একটু এদিক-ওদিক তত্ত্বতালাশ করে দেখি একটা গ্রুপ নিভৃতে নৃশংসভাবে প্রচার চালাচ্ছে ‘প্রমা’ লিটিল ম্যাগাজিন নয়। যুক্তি: এখানে বেশিরভাগ লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের। লিটিল ম্যাগের এই গোষ্ঠী এখন রীতিমতো একটা সিন্ডিকেটে রূপ নিয়েছে।

অনেকের ফর্মালিনমুক্ত স্বরূপ উন্মোচিত হতে দেখি প্রমাকে কেন্দ্র করে। একজনের নামের সাথে সাযুজ্য থাকায় প্রচার করতে থাকেন—তিনিই সম্পাদক। বিষয়টা আগে ছিল রবাহূত।

কিন্তু একদিন কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের সাথে আরেক কবির মাধ্যমে পরিচিত হলে বলেন:

“আরে, আপনি মাশুক শাহী! এতো বয়স কম। আমি ভেবে এসেছি আপনি মাঝবয়সি লোক হবেন। আমি জানতাম প্রমার সম্পাদক পাবলো শাহী। আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করে এক বাসায় পেয়ে হাতে নিয়ে দেখি সম্পাদক তুমি! দারুণ কাজ করছো। ২৬ জন মিলে তিন দিন ধরে পাঁচ ফর্মার ‘আলাপচারিতা’। ভাবা যায়! এই ধরনের কাজ এই দেশে এর আগে হয়নি। অন্তত কোনো কবির ক্ষেত্রে…। জানো, পত্রিকাটা আমি খুব ভদ্রভাবে চুরি করেছিলাম।”
তিনি আতিশয্যে পিজি হাসপাতালের পুরাতন গেটের সামনে জনারণ্যে আলিঙ্গন করেন। পেশাসূত্রে সারা দেশ ঘুরি, একেকবার ভ্রমণ শেষে ফিরে আসলে একেক ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই।

একদিন আজিজে সুমনের ‘সূঁইসুতোই’ আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ ‘লোক’ সম্পাদক অনিকেত শামীম মুখ বাড়িয়ে বলেন:

“এখানে বসে আছেন, ওদিকে লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলনে আপনার ‘প্রমা’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যান, ওখানে যান।”
আমি বললাম, “‘লোক’ বিনয় মজুমদার সংখ্যা অসাধারণ হয়েছে। ভাই, ভালো কাজের সুগন্ধ ছড়াবেই।” শুনে অসাধারণ একটা হাসি দিয়ে চলে গেলেন।

জাদুঘরে একটা সাহিত্যভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখে বের হতেই মইনুল হোসেন সাবের ভাই কাছে এসে কিছুটা অনুযোগের সুরে বললেন:

“আমি কি ‘প্রমা’ পেতে পারি না? সংগ্রহে রাখার মতো একটা কাজ। আমার বাবার একটা সুন্দর ছবি ব্যবহার করেছেন।”
ঢাকায় সেইভাবে না থাকায় এবং পত্রিকা সময়মতো বের না হওয়ায় কবির হোসেন তাপস ভাই বড় মানের যে দুটো বিজ্ঞাপনের অর্ডার দিয়েছিলেন, তার সম্মানী আর পাইনি। আবার কুরিয়ারে ভাইয়ের কাছে ‘প্রমা’ পাঠালেও একসময় জানতে পারি ভাই তা পাননি; ভাই সেই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেছিলেন।

এরপর আমি এপ্রিল, ১৯৯৯ – এপ্রিল, ২০০১ পর্যন্ত রংপুরে থাকি। প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, মাসে একবার আসা হয়।

একবার এক সন্ধ্যায় পিজির গেটে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ খেয়াল করলাম নাসির আলী মামুন ভাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন। এসেই আমাকে বলতে থাকেন:

“কোথায় থাকেন বলুন তো? সবাই আপনাকে চিনে-জানে। যেই ঠিকানা, ফোন নম্বর চাই, দিতে পারে না। চলেন, আপনাদের খাওয়াই। বলেন তো, আমার ছবিগুলো কার কাছ থেকে পেয়েছেন? আমার খুব উপকার করেছেন। এগুলো আমার সংগ্রহে নেই। এখন পাওয়া যাবে। কাণ্ডটা ভালো হয়েছে, প্রয়োজন ছিল! আমি নিয়েছি। সাড়া ফেলেছে। নাড়িয়ে দিয়ে-কাঁপিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।”
আমি তাকিয়ে থাকলাম। একটা আটপৌরে ভালো লাগা নিয়ে রংপুরের গাড়িতে উঠলাম।

 

মাশুক শাহী

জন্ম: ১৬ এপ্রিল, ১৯৬৯। সাহিত্য-সংস্কৃতিমনস্ক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন কবি। মূলত কবি হলেও গল্প ও প্রবন্ধেও পারদর্শী। তাঁর কিছু কবিতা ইংরেজি ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর বাবা সৈয়দ লাল মুহাম্মদ ছিলেন যশোরের সুপরিচিত কবি, শিক্ষক ও সমাজচিন্তক। কবিতা, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ ও সম্পাদনার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘রাজকন্যা ‍ও যাদুর বাক্স, ঘুমকন্যা ও ফিনিক্স হৃদয়, খামবন্দী বায়োডাটা এবং শিশুতোষ বইসহ রয়েছে নানা সৃজনশীল কাজ।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top