ঘোড়াউত্রার পূর্ণিমায়
একদিন ঘোড়াউত্রার গায়ে
ডুবে গিয়েছিলো পূর্ণিমার চাঁদ–
তৃষ্ণার্ত চাঁদ ডুবে ডুবে আকন্ঠ পান করে
নদী থেকে আকাশ, আকাশ থেকে নদী
পান করে জোৎস্না, অন্ধকার, চরাচর।
জোৎস্না লুটে খায় দীর্ঘশ্বাস, লুকানো শাপ
অন্ধপাপ, জন্মঋণ, মৃতপ্রেম, নষ্টতাপ
নদীতে চাঁদ ডুবে থাকে ঘোর মাতাল
রুপালি রুপের নেশায় কাঁপে নদী উত্তাল।
মগ্ন চাঁদ জেগে থাকে নদীর বুকের ভেতর
বাতাসে কাঁপন উঠে জোয়ারের ডাকে
গোল চাঁদ ভেঙ্গে ভেঙ্গে ঢেউয়ে ঢেউয়ে
একাকার হয় জলের কাঁচে, উদ্দাম নাচে
দেহের খোল থেকে বেরিয়ে আসে
পূর্ণিমার জোৎস্নার মতো জীবন্ত আত্মা ।
সেই পূর্ণিমার রাতে টুকরো টুকরো আমি–
আমার বিদীর্ণ হৃদয় ফেলে আসি
ঘোড়াউত্রার গহীন কালো জলে।
একটা যৌথ সন্ধ্যা
একটা যৌথ সন্ধ্যা নিয়ে
দুজন বসেছিলাম টেবলেন এপারে—ওপারে।
আমাদের মধ্যে একজন পুরাণের মতো বলে
কবেকার সেই শব্দÑ‘ ভালোবাসি’ ।
দেয়ালে আমাদের ছায়া ছাড়া
আর কোনো ছায়া ছিলো না।
মাঝখানে একটা টেবিল
শুধ কি টেবিল? নাকি একটা দেশ
পাসপোর্ট, সীমান্ত, ভিসা, বর্ণ, শ্রেণি, ধর্ম
দেশভাগ, আরো আরো কিছু…
দুজন বসেছিলাম
ধুমোট সন্ধ্যা নিশিন্দা পাতার গন্ধ নিয়ে
থেমে ছিলো আলোকবর্ষের মতো।
তোমার হাত ধরে আছি
তোমার হাত ধরে আছি। ফুসফুস ভরা নাগরিক ধূলা
শ্বাসকষ্ট রোগীর মতো টেনে নিচ্ছি শেষ বিশুদ্ধ বাতাস।
আলপথে হারিয়েছি আমার শৈশব। কিশোরীর দুই বেণী
এক টুকরো মায়াবী চাঁদ, রূপোর কাঁটা, আলতার শিশি
আলগোছে বেঁধে রাখা বিস্ময়, নিমগ্ন শরৎ, কাশফুল
পুড়ে গেছে চৈত্রের খরতাপে। রৌদ্র ছায়ায় দেখি
দীর্ঘ প্রতিবিম্বের সারি কেউ বাম, কেউ ইশ্বরবাদী,
কেউ প্রেমিক, কেউ প্রতারিত বংশীবাদক।
ঘাস ফুলে লেগে আছে বিষাক্ত কীটের নখরের ছাপ,
গোলাপে লোবানের ঘ্রাণ। আয়নায় শকুনের মুখ
স্বপ্নেরা হেঁটে যায় গোধূলির মৃত উদ্যানে।
মৌসুমের ট্রেন চলে গেলে থাকে না আর কিছুই
তবু অসময়ের ট্রেন থেমে আছে উঠোনে আমার,
ধূলোওড়া শূন্য স্টেশনে জ্যোৎস্নার মরীচিকা
তোমার হাত ধরে আছি, অনন্তের যাত্রী হবো বলে।
দৃষ্টি
শৈশবে হারিকেন
বৈদ্যুতিক বাতির মতো
উজ্জ্বল ছিলো না।
অধুনা এলইডি, সিএফএল—এর মতো তো নয়ই।
হারিকেনের নিভুনিভু আলোয় উজ্জ্বল দেখতাম
পাঠ্যবইয়ের পড়া, প্রিয় বর্ণমালা,
মায়ের কপালের চিকন ঘাম।
তখন মনের চোখ ছিলো, ছিলো দৃষ্টি।
এখন চোখ ধাঁধানো আলোয় নিভুনিভু
আমার বর্ণমালা, ঝাপসা মায়ের মুখ।
এখন অন্ধ চোখ কৃত্রিম আলোয়
হারায়েছে দৃষ্টি।
সব মাংসের ক্রেতা
দোকানের হুকে ঝোলানো মাংস।
হরেক রকম ক্রেতা। কেউ কিনে পাঁচ কেজি,
দশ কেজি, কেউ আড়ইশ গ্রাম।
কেউ বুকের, কেউ সিনা, কেউ রান, কেউ কিমা ।
দোকানের হুকে ঝোলানো কলিজা।
গরু, খাসি, ভেড়া, হরেকরকম।
কেউ কেউ কলিজা কেনে,
এখানে কেউ মাংসের ক্রেতা, কেউ কলিজার ।
আমিও মাংস বিক্রেতা।
ক্রেতা হরেকরকমÑশিল্পী, কবি, ব্যর্থপ্রেমিক,
পুলিশ, টোকাই, ভিআইপি, মাস্তান।
এখানেও মাংস বিক্রি হয় দিন, রাত, রাতভর।
বহুদিন অপেক্ষায় আছি কলিজা বিক্রির।
এখানে কেউ কলিজা কেনে না, সব মাংসের ক্রেতা।
কেন আমাকে ডাকো মেঘনা
কেন আমাকে ডাকো মেঘনা
তুমি কি জানো না, কোনদিন আর ফিরবো না
কাকচক্ষু জলে। পাড় ভাঙ্গা পাড়ে।
যেখানে নরম পলি, ভিজে মাঠ, উঠোনের কাদায়
আমার পদচিহ্ন নক্ষত্রের মতো ফুটে উঠে।
এখানে এ জন্মশহরে এই পিচের রা¯তায়
আমার পায়ের কোনো ছাপ আঁকা নেই।
দখলী সত্ত্বে নেই কোনো কংক্রিটের ছাদ।
তবু এখানেই আমি বন্ধক রেখেছি
আমার যৌবন, স্বপ্ন, চিকন ভাতের চাল।
কেন ফেরাতে চাও উৎসমুখে? আমার পূর্ব পুরুষেরা
কাঁধের জোয়াল, গাইগরু, সোদামাটির গন্ধ ছেড়ে
গোলামীর জোয়াল নিয়েছিলো কাঁধে ।
স্বপ্ন ভিড়েছিলো মিহি ধুতি, নগরপতি, বিজলিবাতি
কৃত্রিম হাওয়া, যান্ত্রিকযান, কেরোলিন শাের্ট।
পুরনো প্রেমিকের মতো কেন ডাকো নদী ?
বৃক্ষ, আকাশ, সবুজ, দিগন্তের মাঠ, শিশিরের ভোর
সরষের ক্ষেত, কামিনীর ঘ্রাণ, মেড্ডার ছায়া
জোনাকি জ্বলা রাত, পাড় ছুঁই ছুঁই বিল,
কিছুই আমাকে আর ফেরাতে পারবে না ।
শহুরে অন্ধ উইপোকা আমার রক্তের প্রতি কোষে।

