সোনালী চক্রবর্তী সিরিজ: ‘প্র-অতি-পরা’ লৌকিক

পয়লা বৈশাখ, ১৪২৭

প্রাচীন নগরীর চবুতরায় তিনি কুম্ভকে বহুদিন,
চাঁদ ভাসে, সূর্য ডোবে নির্লিপ্ত পরিক্রমায়,
আশ্চর্য মহামুদ্রা তার, যেমত প্রস্তর, উদাসীন।
নির্বাসিত সেই ছায়ার ভারে ইদানিং গোধূলির চোখ
অতিরিক্ত কাজল টেনে ফ্যলে।
ছেঁড়া প্রদীপের পদ্ম ভেসে এলে
পিঙ্গল সমুদ্রের আড়ালে শীতল আগুন প্রসারিত হয়ে নিমেষে মুছে যায়,
সেই নূপুর ছুঁয়ে আসা দল এত ফ্যাকাশে নয়।

মুকুট থেকে শিখীপাখা খুলে রেখে
ভিজে যেতে যেতে দংশন খোঁজেন আজও সেই প্রতারক।
সোনার অঙ্গখানির স্থান জুটেছে কুল কুণ্ডলিণী,
অথচ বিষাদনামায় দাসখত লিখেও
কেউ বুঝল না আজও,
কোন যাতনায় তার শরীরে রোহিনীর সওগাত রাই এরই নীলাম্বরি।

কথা এখানে শেষ নয়,
দুই শূন্যতার মাঝে এক রহস্য ঘাত আছে,
মিথিক্যাল মানচিত্রে এশিয়া সামান্য অঞ্চল মাত্র, কাল নিছক আপেক্ষিক,
অর্ধ মায়া আর অর্ধ শক্তির এনড্রোজেনাস যে কীর্তনটি পুরাণে নেই,
গর্ভস্থিত মহাকাব্যটি সেই প্রলয়ের সম্ভবনায় এখন সহস্র অক্ষৌহিনী রুদ্রাক্ষের সাজে।

 

শূন্যতা ফুরোলে

শ্বেতপাথরকে জড়িয়ে থাক আগুনের সাপ, দেখ নাভি থেকে কিছু ব্যথা ফ্লেমিংগো হয়ে উড়ে যাচ্ছে শেষ সন্তের খোঁজে। আদরের মত গেঁথে আছে কাদায় ব্রাহ্ম মুহুর্তে নিভে যাওয়া চিতার সোহাগিনী খই। যে তিল থেকে অপেক্ষা ধুয়ে গেছে তাকে ছত্রাক ভালবাসছে খুব, যে বৃষ্টিতে চাঁদ ভিজছেনা, তাকে বরং তুমি রক্তের ঝরোখাটুকু দাও। নিরাসক্তির বিপুল এক ঘোরে আছ জানি, নি:স্ব হতে হতে আমিও তো ভুলে গেছি কবে, যদি সব কিছুরই শেষ থাকে তবে শূন্যতারও আছে।

 

ভেসক্

কিছু মদালসা তাপ একটু আগেও আঁকড়ে ছিল রোদের শরীর সামান্য গণিকা স্বভাবে। ছায়ার অধিকার ঘনাল এমন, জেতবন মনে পড়ে। এ মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘিঞ্জি জনপদে এখন তন্ত্র গুম্ফার অগম্য রহস্যের খেলা। অনাবিষ্কৃত লিপির অনন্ত নির্জনতাই কি তবে চক্র বিলাসে চেয়েছিলে ? যখন মনে পড়ে, তোমার বিধ্বংসী শান্তি সাম্রাজ্যের অন্তরালে, অন্ধকার চালচিত্রটিতে, জন্মান্তরের প্রেম সুমিধা, অভিশপ্ত যশোধরা যাপন ছুঁয়ে ভিক্ষুণী বদ্দকাচন্নায় অর্হৎ এঁকেছিল, সহস্র বিকৃতি, বিপর্যয়েও ঐ স্মিত মৌনতা আর বিষণ্ণ কীভাবে করে? অবতার মাত্রেই সম্যক জেনে ধরায় আসে, বোধির অর্থ বধিরতা, মানুষ কোনোদিন উচ্চারণ করবে না পাপের ভয়ে। সংঘের ঘণ্টা নিনাদে, আস্ফালন আজও তোমার আয়ত পাথর থেকে ভাসিয়ে দেওয়া শীতল উচ্চারণ সমূহের। অনুসারী রাজন্যেরা অতএব রাষ্ট্র নির্বিশেষে সংহত রাখে স্নায়ু ও দ্রোহ কৌশল। পায়েসভুক সিংহের উচ্চকিত হতে নেই লৌকিক রমণ অথবা রাজকীয় সন্ন্যাস, তারা দীক্ষিত এই নির্বানে। দেখ আজও আলোকে গনিমত করে কী প্রখর চাঁদ উঠেই গেল ভার্জিন আকাশে। তোমার নামের মন্ত্রে মূর্খ মানবেরা সহিংস তাড়নায় হাতড়ে ফিরল অহিংস ওয়ালপেপার বহুজাতিক বিলাসে। এরপর তো মেনে নিতেই হয় পৃথিবীর প্রগাঢ় প্রেমের কবিতাগুলো চিরকাল শ্রেষ্ঠ প্রতারকেরাই লেখে।

 

পুনরাবৃত্তি

সারসের নগ্নতা থেকে যে আলো ঠিকরালো দগ্ধ পাঁজরের মত ঘাতক হলোনা। আটটি কুনকি পথ ছেড়ে দিলে অরণ্যের পায়েস অধিকারে আসত করীটির, মুঠোর মাছরাঙা বিহ্বল করায় দাবানলকে তার পাত্রে সহাস্যে অঙ্গার উৎকোচ দিতে দেখা গেল। যে বৃক্ষের পাখিকে আকাশ নীলাভ শৈত্য উপহার দিল, জেনে রাখা ভাল তার শিকড়ে সর্পের অধিবাস ছিল না। বড় ফাগ উড়ল হে বৃহন্নলা বসন্তে আর পুইঁয়ে লেগে অনাঘ্রাত থেকে গেল বর্ষা বিদ্ধস্ত কমলা রঙের বেস্ট ফটোজেনিক ফুলটি। শ্বাস তো প্রবল বইলোই কোথাও, খোঁয়াড় মানুক আর নাই বা মানুক, যে আসন ‘এক’ তশরিফ চিনে নিদ্রিত ছিল এতদিন, তার প্রত্যেক আঁশ অজপা হলো। ১৪১ তম মেহফিলে ব্যবসায়ী ঝাড়বাতিরা সিজোফ্রেনিক মস্তিস্কে শখের ঝুুুলন নামিয়ে এঁকে দিল কারফিউ রাতের হাড়কাটা গলি। একটাই আফসোস, এই অঘোরেও গতের অধিক কোন অনুর সরণ ঘটল না। নিষ্ঠার মত পিচ্ছিল ইতিহাস যে নৌকা উল্টোতে বোড়েদের সাজাল, তার হালেও চারটি অক্ষর খোদিত ছিল, পুঁতে যাওয়া চাকার দাগে মুছেই গেল যাবতীয় মন্ত্রগুপ্তি।

 

সংকেত

দেখো, পৃথিবীর শেষ চরে অলীক ও অসম্ভব ঝড়ের নাভি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, যে বাঁক থেকে চাঁদ মুছে যায় মাঘী কুয়াশায়, না ওঠা সূর্য শালুকে ডুবে থাকে আনপ্রেডিক্টেড বর্ষায়, কোন এক আদি প্রবাহের উৎপাটিত প্রস্তরের মত নির্জন হয়ে আছি বিলুপ্ত অহমিকায় । ধীবর আতঙ্ক গাঁথা পঙ্গু মৎস্যকন্যাদের মৃত নিয়তিময়, এই উপকূলের নির্লিপ্তি শেখায় কীভাবে উপেক্ষার প্রস্তররাজিতে চৈতন্যছায়া ঘনায় । পাঁজরমধ্য যে বিন্দুতে নিদ্রিত শ্বাস ভাসমান আবর্তিত আলেয়ায়, কখনই সেই দিব্য স্বরূপের ভূমিকা মহীয়ান হয়না জাগতিক তুলায় । তবু এই গর্ভগৃহে নিত্য শৃঙ্গার, যদি কোন একদিন বোঝে ভূমিপুত্র, নাল বিচ্যুত হলে পদ্ম শুধু আর্দ্রতা নয়, উৎসর্গের অধিকারও হারায় ।

 

সোনালী চক্রবর্তী

কবি , প্রাবন্ধিক , সম্পাদক ও অনুবাদক । জন্ম বারাণসীর পীতাম্বর পুরায় । বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি , দার্জিলিং ও কার্শিয়াং মিলিয়ে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ২০১৬ সালের ২৫ শে জানুয়ারী বাংলাদেশের ‘প্রথম আলো’র মাধ্যমে প্রত্যক্ষ লেখালিখির জগতে যুক্ত হওয়ার আগে পরিচয় ছিলো ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী । বর্তমানে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে গবেষণারত ।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ “জামার নীচে অলীক মানুষ” (২০১৭) ও “পদ্মব্যূহে নিম অন্নপূর্ণা” (২০১৯) । সম্পাদিত গ্রন্থ “ষটচক্র” (ভারত বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগ, ২০১৯) ও “সম্পাদিত বাক্” (২০১৯)।

কবিতার সঙ্গে নিয়মিত অনুবাদ করছেন বিশ্বসাহিত্যের নানা প্রান্তর। সাহিত্য পত্রিকা ‘বাক্’ পত্রিকার সম্পাদক ।
যোগাযোগ- [email protected]

Facebook Comments

2 Comments

  1. Shuvodeep Nayak

    মারাত্মক সিরিজটা লিখছ । গুচ্ছকবিতার সিরিজ যদিও । কবিতাগুলো ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভাল । আমি যদি এই কবিতাগুলো হাতে পেতাম, নিজের কবিতা সরিয়ে এগুলো ছাপতে দিতাম । কারণ, এই মুহূর্তে আমি এতভাল কবিতা লিখতে পারব না যা তুমি লিখে ফেলেছ । অসামান্য লেখা । এই কবিতাগুলোর সঙ্গে যাপন করতে চাই । একদিন তোমার সামনে এই লেখাগুলো নিয়ে আলোচনা করব ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।