সৌমনা দাশগুপ্তের কবিতা

রামধনু 

সমস্ত করমর্দনের মাঝখানে একটি অন্ধকার থাকে
করমর্দন করতে গিয়ে তুমি আসলে একটি
অন্ধকার ছুঁয়ে ফেলছ। বিনিময়ের আগে
এবং পরেও রামধনু। অন্ধকার
বিলি হয়ে যাবার পর পড়ে থাকে
শুধু একটা রামধনু

 

বরাহ-অবতার

ভাঙো জরা ভাঙো জন্ম এই সুড়ঙ্গ আদিমাতৃকা
গভীর টানেল জুড়ে স্ট্যালাকটাইট, নুন-গাছ
নামিয়ে রেখেছে ঝুরি প্রেত আর প্রেতিনীর মেটিং সিজন

ধুনি জ্বেলে অপেক্ষার পরপারে লব্ধ জন্মসূত্র

গুঁড়ি মেরে আসে চিতাবাঘ
ধায় শব্দ ধায় বজ্র জেগে উঠছেন বরাহবতার

 

তন্দুরি রাত

কে যেন এইমাত্র হাততালি দিল
কে
কে ও
সেকি আমি
মাদারির খেল থেকে খুঁটে তুলি
রং
কে সে
সেকি আমি
এ যে এক মহারসের কূপ। ঘাই মারো, মারো ঘাই। লেখা হোক ফণার বিস্তার। সে তো আধবোজা কুঁড়ি এক, জাগাও তাহারে। রসরতি-কাব্য ছলে ডেকে নাও চূড়ান্ত কুহেলি ভেঙে রৌদ্রের দিনে। যেমন সূতিকাগারের মাঝে একলা মানবী চিক্কুর পাইরা কাঁদে গভীর ব্যথায়, তেমনি যাতনার মাঝে তোমার নামটি লেখা হল, স্মরণীয় তোমার কথার থেকে চৈ-চৈ ধ্বনি। ভিয়েনে চড়াও এ দেহের বাগান, ও চাঁদ, মৃদু আঁচে সেঁকে নাও তন্দুরি রাত। তুমি কি খবর রাখো জাতি ও যুঁথিসম পুষ্পসকল তোমার বারান্দায় এসে কোনও এক আশ্চর্য সকালে বলেছিল, ঠাঁই দাও! ভীরু এ জাহাজ কোনও জলকে নামেনি।

 

হাড়ের নির্যাস

মহতী ঝরনাজলে ফেলে রেখে আসি আদি নাভি

দেখছি আলোকরেখা, তার ক্ষীণ অনুপ্রাস
ভোরবর্ণ শালগাছ একটু একটু করে ফুটে ওঠে

ঐশী ধ্বনির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ডানার বিস্তার
জন্মছক খুলে বসে আঁক কষছেন মেঘের ঈশ্বর

কাত হয়ে পড়ে আছে ছবি
ছবির মেয়েটি শুয়ে, লাল

এখানে সমাসবদ্ধ জল, এইখানে অঙ্গার শীতল
রক্তাক্ত হয়েছে ছায়া, হাতে তার নিবিড় আয়না
আর্শিতে বসত করে রূহদার এক

আত্মঅভিলাষী আমি ময়নাতদন্ত করে দেখে নিই
অগ্নিমন্থনের শেষে পড়ে আছে সোরা ও গন্ধক
হাড়ের নির্যাস আর ঝুঁকে পড়া বিশেষণগুলি

জংধরা দেহের কপাট

বেহশত দোজক কাঁপে, জ্বলে ওঠে

 

জিন পরিদের দেশ 

ধর্মকাঁটায় মাপা দিন। দৃশ্যকে ঢেকে দিচ্ছে দৃশ্য
আর দৃষ্টির অতীত যা থাকে, তার থেকে অবিরত লালা ঝরে যায়

শেকল ও কুকুরের মধ্যে আমি তো বেছে নিয়েছি এই বাঁধ দেওয়া নদী আর উত্তুঙ্গ মরুবাতাস

ঘাম আর শ্রাবণ ঝরাতে ঝরাতে যে লবণ হারিয়ে ফেলছে তার কম্পাস
তার খসে যাওয়া দ্যাখো, দ্যাখো সেই বিপন্ন ঘড়িটিকে, কত শত বছরের আগে যার
কাঁটা গিলে ফেলে আজও সে মুগ্ধ সারস তার ব্যথা খুলে ধরে মৃত এই সাগরের কাছে
যেন সে-ও সামুদ্রিক ছিল কোনও এক অতিলৌকিক কালে পুরোনো নক্ষত্রের জল
ডানায় জমিয়ে রেখে বসে আছে অপেক্ষার পরপারে সেইখানে জিন পরিদের দেশ
সেইখানে বসে আছে দগ্ধ সারেং তার প্রচেতার থেকে বহুদূরে তার মাস্তুলখানি
টাঙানো রয়েছে কোন বাজেপোড়া শালগাছে, তার দেহে লেগে থাকা ফসফরাসের
ঐ জ্বলে ওঠাটুকু দ্যাখো, দ্যাখো তার লাল ও বর্তুল নাক, ক্লাউনের পোশাকে ঢাকা
তার শরীরের থেকে জেগে ওঠে আরেক শরীর। সেও এক নকলনবীশ
আমাদের আখের খেতে, আমাদের পচাই মদের পাত্রে ধীরে ধীরে মিশিয়ে দিয়েছে
কোনও এক প্রাজ্ঞ টিকিটিকি আর পতঙ্গদের কয়েক ফোঁটা রক্ত এবং বিষ

একে রূপকথা বলো আর স্বপ্নই বলো, একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি হচ্ছে বলে ইস্তেহারে
বিজ্ঞাপনে ছড়িয়ে যাচ্ছে দিন, আর সেই ভ্রান্ত ইঁদুর এসে বসে পড়ে কাগজের স্তূপে

 

অলিখিত জ্যোৎস্নায়

জলাভূমির ভেতর যাকে পুঁতে রেখে এসে নিশ্চিন্তে খেয়ে ধুয়ে আঁচিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, সে কে কে, কে ছিল বলো
সে কি আমি

আমার আরশিখানা সেদিন থেকেই শুধু ঘুরে ঘুরে আমাকেই খোঁজে

দারুণ শীতের রাত ছিল, ছিল এক অন্ধচাঁদের রাত
আগুনের চারপাশে কত কত নাচ হল, মাংসাশী গাছ সেই খুলে ধরেছিল তার ফুল

আর এক যখ এসে আমার মাথার পাশে বসে পড়ে

দুঃখের ভাইবোন পাড়াপড়শিরা সব
তাদেরও গল্প আছে
তারাও তো টুকটাক একথা ওকথার ছলে
খুলে দিল ঘিলুর ছিদ্রমুখ

সেই থেকে এই ঘরে বাস্তুসাপের বাস
সেই থেকে এই ঘরে খলখল করে
এক কাটাজিভ
তার উলুধ্বনি
দেয়ালে দেয়ালে লেখা ঋতুফসলের দাগ

গভীর আখায় জ্বলে জোনাকিপতনের শব্দ
অস্থি মজ্জাগুলি অলিখিত জ্যোৎস্নায় ফেটে যায়

 

অন্ধ আমার আলোপোকা 


তুমি কি ধরতে পার এই হাত
জোনাকি ছানতে গিয়ে এই হাতে
ধাতুর প্রলাপ লেগে আছে

চাঁদের ঘোড়সওয়ার তুমি পক্ষীরাজ এমতো শেখালে, যেন সারফেসে অতর্কিতে ভেঙে পড়ছে অ্যাক্রেলিক রঙের পিচকারি, যেন হোরিখেলা ছায়ারঙে আলোরঙে, যেন কফির কাপের থেকে শেষ তলানিটুকুও তুমি টেনে নেবে পরিত্যক্ত হুকাবারে নিশ্বাসের অধিক এক গভীর ইমপেটাস ফেলে রেখে চলে গেছ বহুযুগ আগে, তার ধকধক শব্দটুকু এযাবৎ কাল ধরে পড়ে আছে, একা, অভঙ্গুর


স্বপ্নে বাজার কর
বাজারে স্বপ্ন কর
ঘুমের ব্যাপারি তুমি

এভাবে স্বাগত জানাই, সে আমার জন্মকালীন অন্ধকার, ঢেলে নিই নিজস্ব প্যালেটে। উলটানো কাছিম যেন ব্র‍্যাকেট নামিয়ে রেখে খুলে দিচ্ছে আত্মকোহলের ধারা, এ তরলে আদি অন্তহীন এক নিমগ্ন শাওয়ার নেওয়া সেরে তুমিও ফিরতে পার ফসিলের দেশে, নোনা বালি, ক্ষার ও গন্ধক ছুঁয়ে এসো প্রথম আপেলে, এসো দাঁত ও জিভের এই সেরিব্রাল ব্যবহার খুলে রেখে, এসো শ্বদন্তের দিকে নেকড়ে মানুষ হয়ে আরও একবার চাঁদের অন্ধকার প্রদেশে আজ শুরু হোক খেলা


এই ত্রিধার তলোয়ার
এই যাপনসর্বস্ব বেঁচে থাকার
বৈভব অতিতর স্পার্ক সচেতন

ছলনার ইন্ধন নিয়ে আর কতবার আলোকিত হতে পারে এই অ্যারোমা-ক্যান্ডেল! এই সুবাসে হৃদয় আমোদিত হয়ে উঠতে উঠতেও একদিন এন্ডোমেট্রিয়াম ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে লাল জল, কান্নাও বলা যেতে পারে তাকে, তুমি কী নামে ডাকবে, যার কৃষ্ণসম অষ্টোত্তর শত নাম ফুটে আছে বেদনার বাগিচায় ক্রিসানথামাম হয়ে থোকা থোকা চকোলেট-সিস্ট, যন্ত্রণাবহ অথবা এই আঁধার আলোয় সম্প্রীতির গান গেয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎই আবিষ্কার করে বসবে স্বরভঙ্গ

 

আয়না লেখা ঘর

আলমারির এই চাবিনিরপেক্ষ দেরাজে আলো নেই, অন্ধকারও নেই।
এই মারফতি গান, এই ফকিরালি, আমার আর যাওয়া হল না। আত্মনিরোধের এক দেওয়াল বসিয়ে দিই সুরের উঠোনে।
শুধু ধাঁধা মশকরা, বাদামি ইয়ার্কিতে ঢেকে যাচ্ছে চোখ।
আর খোলা ভেঙে শাঁস বের করে আনতে আনতে কে যেন ঘেমে উঠল। সে-ই কি আমি? আমি নই, আমি নই, তীব্র ওপেক কোনও ছায়ার চাবুক কাঁথাস্টিচের ফোঁড়ে সুর তোলে। আমি তো কফিনের কাছে বন্ধক রেখেছি মাত্র আমার গলার স্বর।
বিজ্ঞাপনের পাতায় কেন যে পিয়ানোর সন্ধানে এত ছানবিন, এত পুঁছতাছ! বরং ছেড়ে দাও একটা বেড়াল। বরং সে-ই খুবলে তুলুক দু-চারটে আঁশ। ছবির থেকে পিছলে যাচ্ছে হাত, আর দেওয়াল খুঁড়তে খুঁড়তে পিছলে যাচ্ছে আলো। শুধু ঘুমের ভেতর এক হাওয়া ঢুকে যায়। অতিজাগরণের এই গুগলি খেলতে গিয়ে তোমার ব্যাট শূন্য থেকে টেনে নামাচ্ছে শুধু অম্লবৃষ্টি, অথচ তুমি টেরও পাওনি, এতদিন তোমার গায়ের সঙ্গে সেঁটে যে দঁড়িয়েছিল, যাকে খুলতে খুলতে তুমি গুঁড়োগুঁড়ো করে ফেলছ পিলসুজ থেকে পিকদানি অব্দি, সেও সম্ভবত তুমিই ছিলে

 

গতজন্মের লেখা  

গড়িয়ে যাচ্ছে ধারাবাহিক হাততালি।
চামড়ার ভেতর হেসে উঠল ভ্রান্ত বাদুড়।
ফেড আউট হয়ে যাচ্ছে পাখি। এইমাত্র চোয়াল বুজিয়ে ফেলল খয়েরি একটা লোকগল্পের ঠোঁট।
আর আলজিভ খুলে রাখা কয়েকটা স্বপ্ন এখন প্রার্থনাসংগীত শুরু করবে বলে সি মেজরে চিৎকার করে উঠছে একটা অর্গ্যান।
নীল শাদা জামা পরা একটা স্বপ্ন লাইন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
জেলেনৌকার থেকে একদলা আগুন ভাটিয়ালি গাইতে গাইতে দ্যাখো এসে বসে পড়ল এই বিছানায়, ঠিক তোমার মাথার রিমে।
এই ঘরে দেয়াল দেবে কি দেবে না, সেটা অবশ্যই তোমার অতিব্যক্তিগত ব্যাপার। শুধু যবনিকা টাঙিয়ে দিতে দিতে তোমার হাত ভিজে যাচ্ছে, আর ঘটমান বর্তমানের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে একটা শীতকাল। যদিও শীতকাল আমাদের অল্পই, তবুও এই বালির কার্পেটে তাকে বিছিয়ে দিতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছ, ফ্লোরস্পেসও আমাদের অল্পই। ভবিষ্যকাল আর এনলার্জড হৃদয় নিয়ে একটা ইস্তেহার আকাশের দিকে চলে গেল। তুমি আর ছেড়ে রেখে আসা পৃষ্ঠায় ফিরতে পারছ না

 

হড়কা বান

প্রত্নযাজকেরা আসে। তার সব পেঁচার অংশে জাত। আসলে কাছিমের এই এত বছর বেঁচে থাকা এও এক ভাস্কর্য্য। ধরে নিতে পারো এ-ও কোনও ঘরবাড়ি, তুমিও যে তোমার খোলসের ভেতরে জাগিয়ে রাখছ বিস্তৃত সাপের কাহিনি, এও কি আরেকটা ভাস্কর্য্য নয়! এই অ্যাসিটিলিন ভর্তি মগজ আর ধুলো ওড়াবার রেওয়াজ নিয়ে কয়েকটা ইনিংস খেলে দেওয়াই যেতে পারে, শুধু ছেনি ও বাটালির এই ধাক্কায় তোমার ঘুমের মধ্যে বেমক্কা ঢুকে যাচ্ছে একটা স্পটলাগা আয়না, একটা অস্থির রাস্তা আর কিছু ডাংগুলি।
আর জানলা ভেঙে যাচ্ছে, অথবা এই সিনে কোনও জানলা নাই থাকেতে পারে। শুধু লংশটে ক্যামেরা প্যান করা হচ্ছে তোমার আগের জন্মের হাসিগুলোর ওপর।
ক্লোজশট। একটা চোখ। টকটকে লাল একটা কর্ণিয়া। সাদা একটা পাখি চোখের থেকে বেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে……হাত-পা দুমড়ে পড়ে যাচ্ছে একটা ল্যাম্পপোস্ট। নেপথ্যে হড়কা বানের তোড়ে ভেসে যাওয়া গাছেদের চিৎকার

 

সৌমনা দাশগুপ্ত


জন্মতারিখ ও স্থান – ১৯৬৭ সালের ১৬ই জুন, ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি জেলায়।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা – উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক।
পেশা – লেখালিখি
প্রকাশিত বই –

কবিতাবই
বেদ পয়স্বিনী (কৃত্তিবাস প্রকাশন ২০০৬); খেলাহাট (সপ্তর্ষি প্রকাশন ২০০৮); দ্রাক্ষাফলের গান (যাপনচিত্র প্রকাশন ২০০৮); ঢেউ এবং সংকেত (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন ২০১৮); জিপার টানা থাকবে (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন ২০১৯); অন্ধ আমার আলোপোকা (ধানসিড়ি প্রকাশন ২০২০)

প্রথম কবিতাবই ‘বেদ পয়স্বিনী’-র জন্য কৃত্তিবাস পুরস্কার(২০০৮ সালে)

উপন্যাস
মাশান রহস্য (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন ২০২০)

ই-মেইল – [email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।