মঈনুস সুলতানের কয়েকটি কবিতা

মাটোপাস পাহাড়ের বোল্ডারে

মাটোপাসের বোল্ডারে বিকীর্ণ বনানীতে
পড়ে আছে মরচে রঙের নুড়ি সুপ্রচুর,
তুলে নিয়ে ঘষে ঘষে বের করে আনি
দ্যুতির ছন্দসুর,
ঝলসে ওঠে ফিরোজা নীল,
পাথর ফাটিয়ে নেমে আসা ঝর্ণা থেকে
মশকে ভরে নিয়ে আসি রুপালি সলিল।

ক্যাম্পকটে পড়ে আছে কাচভাঙ্গা বাইনোকুলার
ফিল্ডনোট লিখতে গিয়ে দেখি,
পৃষ্টার ধূসরে জড়ো হয়েছে পিঁপড়া-
যবদানার পরিসরে ছড়াচ্ছে… হৃদয়সন্ধানী হাহাকার।

দূর দিগন্তে জিরাপের গ্রীবা ছুঁয়ে বয়ে যায়
লিলুয়া বাতাস- কাঁপে ছত্রফার্ণের পত্রালী,
মরমী এ বৃক্ষ-ভুবন
মুহূর্তে হয়ে যায় শূন্য- নিষ্পত্র খালি।

তাঁবুর দড়ি বাঁধা পাথরে বসে জিকিরে একাকী
ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরে কিশোর সিংহের ধূপছায়া
দেখা গেলে… নিসর্গের মজমা দারুণ হতো কি?

দিনের সিঁথি থেকে মুছে যায় আলোর সিঁদুর
সাফারি টেন্টে নেমে আসে নিকষ শামিয়ানা,
হরিণের খুরে ঝুরঝুরে নুড়িতে বাজে নূপুর
নিশীথের নৌকায় ক্রমাগত ভোরের গুনটানা।

 

অপরাজিতার নীল রোদে

আমার পৃথিবী জুড়ে ফুটেছিলো একদিন
অজস্র অপরাজিতা.. থোকা থোকা নিখাদ নীল,
শিরদাঁড়া সোজা করে ব্যারিকেড দিয়েছিলাম
বেঈনসাফের পথ পরিক্রমায়
অসহিষ্ণু শদ্দাদের হুকুম করিনি তামিল।

ছেড়েছি ঘর একদিন, খুঁজেছি নীলিমা
স্নোরক্যাল পরে করোটিতে-
জলতলে ছুঁয়েছি সমুদ্রের প্রবাল,
আমাজনের বহতা তীর বিছারি খুঁড়েছি মাটি
বেরিয়ে এসেছে পুর্তগীজ পাইরেটদের গড়া ক্যাথিড্রাল।

পরিযায়ী হওয়া হরিণের পিছু পিছু গিয়েছি হেঁটে
মুস প্রজাতির বিপুল শিংগাল মুখ ডুবিয়েছে ঝিলে,
পিঁপড়ার সামনে রেখেছি শর্করা মেশানো কোকোর প্রলোভন
সৃজন করেছি সহমর্মী রহম… এ দগ্ধদিলে।

বসেছি রেলগাড়ির জানালায়
জলমগ্ন ধানের ক্ষেত…আলে শাদা বক
ব্যাঙাচির সাঁতারে কেঁপেছে তালগাছের স্থির ছায়া,
ভেবেছি একদিন তর্জমা করতে শিখবো
নিসর্গের মরমি তসবির ধরে রাখে… কী যে মায়া।

মন্দিরের আঙিনায় শিশির ভেজা শিউলি কুড়িয়ে
উঠে দাঁড়িয়েছে কিশোরী… হাতে তার নৈবদ্যের থালি,
আমার হৃদয় সায়রে মেঘনা কুলকার্নি একদিন
গেয়ে উঠেছিলো বিধুর তানপুরায় রাগ ভূপালি।

 

কাগজের দিলখোলা জাহাজ

সময়ের ঊর্মিজল রাশিচক্র ভাসিয়ে বয়ে যায় ভাটিতে
বার্ডবাথে তিলাঘুঘুটি রুপালি নীরে দেখে নেয় তার স্বরূপ
আমি কেন মেকি রঙ মেশাই নিখাদ খাঁটিতে,
বয়ামে পোষা ঝিঁঝি পোকাটিও সুরধ্বনি ভুলে হয়েছে নিশ্চুপ;
চার্চের বেদিতে ক্যোরা ম্যুজিকের ধুনে কাঁদে কে
দেখি- বাঁশরীতে তার স্ফুরিত ঠোঁটের রেখা,
শার্সির বাবেল লিপিতে ঝলসে আলো
কতকাল এভাবে থাকবো বসে… অনাহুত একা;

তোমার সাথে ফের দেখা হয়ে ভালো যে লাগলো
টিশার্টে উপচে ওঠে সাভানার আধডোবা জোড়া রন্ডাবেল,
চরাচরে গোধূলির সিডাকটিভ আলো
দ্বিচক্রযানে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছো…
শিলাচিত্রের জ্যামিতিতে গড়া বাইসিকেল;
যাচ্ছো কী কোথাও রেণুকা
মনে আছে… অপেরার মেহগিনি মসনদে জোড়া ঘুনপোকা?
প্যাডেলে পা রাখো –
না, দাঁড়াবার তেমন কোন প্রয়োজন নেই… আজ,
ঘূর্ণিত চক্রে দূরত্বের মাপঝোঁক আঁকো,
সময়ের ঊর্মিজলে আমি না হয় ভাসাই-
কাগজের দিলখোলা এক জাহাজ।

 

জলরঙে আঁকা অন্তর

জোহানেসবার্গের শহরতলীতে হেঁটেছি বিস্তর
খুঁজেছি অনেক তন্দ্রাহরিণ…সূর্যবৃক্ষ…চারদিকে সারাবেলা,
দেখেছি চরাচর জুড়ে জলরঙে আঁকা বিপুল অন্তর
হেলিপ্যাডে হাতির শুঁড়ের মতো উড়েছে উইন্ড সক্স,
বনানীর দীঘল ঘাসে… চোরকাঁটায় রোদের বাঘবন্দি খেলা,
সোনার সৈনিকেরা হেঁটেছে—
কুচকাওয়াজে মানুষ হয়েছে… নীরবে অবিনশ্বর।

প্রান্তর গড়িয়ে উঠেছে পাহাড়ে
বুয়ার সম্প্রদায়ের বিপুল বৈভবে গড়া কেল্লা,
আমব্রেলা ফার্নের ছায়ায় বাতাসের ঝিরিঝিরি… অনিমিখ,
জেব্রা ছড়িয়েছে বিপুল নির্জনে ডোরাকাটা জেল্লা,
স্প্রিংবক হরিণের খুরে বেজেছে ব্লুগ্রাস মিউজিক;
কামানের নলে পাখির ডিম… ঝলসে গেছে নীলাভ রোদ
কোমল হীরার খোয়াবে জ্বলেছে রূপালি ঝিকমিক,
সোনার সৈনিক…
মেহনতে তার কয়লায় ফুঁসে উঠেছে ক্রোধ,
দেখেছি- ঝিমাচ্ছে সারি সারি কুচকুচে কালো কাক
চরাচরে ছত্রখান হয়েছে- চারটি কথার চারু চারবাক।

অচল ঘড়ি! স্পন্দন রহিত হয়ে আছে জলরঙের বিপুল হৃদয়
খনিজ কনকচাঁপার ধাতব সৌরভে বিভোর কনে এক
পাপড়ি ছোঁয়া অনামিকায় তার পেয়েছে আশরাফ পরিচয়,
দেখেছি আমি রঙিন হৃৎপিণ্ডে কিংবদন্তীর কাননপ্লাবী রূপ
ছড়িয়েছে সে বর্ণের রাতকানা বিভা—
আসেনি কাছে… হয়নি অভিষেক,
জ্বালেনি অন্তরঙ্গতার জায়নামাজে ইশকের নিবিড় ধূপ।

 

মঈনুস সুলতান

জন্ম সিলেট জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে ডক্টরেট করেন। বছর পাঁচেক কাজ করেন লাওসে-একটি উন্নয়ন সংস্থার কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে।

খণ্ড-কালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেস এর। কনসালটেন্ট হিসাবে জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক, মেসিডোনিয়া ও কিরগিজস্তান প্রভৃতি দেশে কাজ করেন অনেক বছর।

ইবোলা সংকটের সময় লেখক ডেমোক্রেসি এন্ড হিউম্যান রাইটস নামে একটি ফান্ডিং কর্মসূচির সমন্বয়কারী হিসাবে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাভানা শহরে বাস করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরানো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।