মুহসীন মোসাদ্দেকের অণুগল্প: লাশ

পৃথিবীর সর্বশেষ জীবিত মানুষটি শহরের গলিপথে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছে! এই একজন ছাড়া পৃথিবীর সব মানুষ মরে গেল, কারণটা জানার আগেই! এমনকি পশুপাখি গাছপালাগুলোও মরে শেষ! কেবল কীটপতঙ্গ জাতীয় কিছু প্রাণী বেঁচে আছে! হঠাৎ করেই পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে মরা শুরু হলো! এবং খুব অল্প সময়ে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব মরে গেল!

যে মানুষটি বেঁচে আছে, উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছে সে কীভাবে এখনও বেঁচে আছে কে জানে! হয়তো সে-ও বেঁচে থাকবে না! হয়তো মাত্র কিছুক্ষণের জন্য, অথবা আগামীকাল পর্যন্ত কিংবা দুই-একদিন সে বেঁচে থাকবে! তারপর হয়তো পৃথিবীটা কীটপতঙ্গের হবে! পচনশীল আর কিছু অবশিষ্ট না থাকলে হয়তো কীটপতঙ্গগুলোর আয়ুও ক্ষীণ! এরপর পৃথিবীটা শূন্যতার দখলে যাবে!

এইটুকু সময়ে তার পক্ষে বের করা কি সম্ভব ঠিক কী কারণে এমন হলো! কিংবা সে যদি আরও কয়টা দিন বেঁচে থাকতে পারে তবুও কি সে কোনো আগ্রহ দেখাবে বা সে মানসিক অবস্থা কি তার থাকবে! এমন মৃতের স্তূপে দুর্গন্ধের মধ্যে জীবন কাটিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখার বাইরে কোনো কিছু কি ভাবা বা করা যায়!

সন্ধ্যা নেমেছে মাত্র। অন্ধকার এখনও ঘন হয় নি। আবছা আলোয় হেঁটে যেতে যেতে মানুষটা চারপাশে শুধু লাশ দেখে! যারা বেশ কিছুদিন আগে মারা গেছে তারা কঙ্কাল! যারা তারপরে মরেছে তাদের শরীর পচে গলে পড়ছে, কিলবিল করছে পোকারদল! আর যারা দু-একদিনের ভেতরে মরেছে তাদের শরীরে মাছি বসতে শুরু করেছে! শ্যামল-সুগন্ধময় পৃথিবীটা এখন বিবর্ণ-দুর্গন্ধময়!

মানুষটা কোনো অনুভূতি টের পায় না! তার অনেক ভয় লাগার কথা, দুর্গন্ধে বমি আসার কথা, অনেক কান্না করার কথা, কিংবা কোনো এক কোণায় ঘাপটি মেরে বসে কাঁপতে থাকার কথা! অথচ সে হাঁটছে, হাঁটছে সে লাশের উপর দিয়ে! পৃথিবীর কোথাও এখন কোনো জায়গা ফাঁকা নেই! পুরোটা লাশে ভর্তি! যে গলিপথে সে হাঁটছে তার দুপাশের বাড়িগুলো এখন লাশের বাড়ি! দোকানগুলো লাশের গুদাম! শহরের কোথাও কোনো আলো নেই! কোথাও কোনো শব্দ নেই—মানুষটার হৃৎপিণ্ড ও মাছির ভনভন শব্দ ছাড়া!
পরিবারের কথা মনে পড়ে মানুষটার! শেষ কদিন তারা বিচ্ছিন্ন ছিল! কে কোথায় মরে পড়ে আছে কে জানে!

মানুষটা এখনও জানে না, সে-ই শেষ জীবিত মানুষ! তাই সে লাশের ভেতরে জীবিত মানুষ খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে চলে! চলতে চলতে অনেকটা পেরিয়ে যাবার পর সে হাল ছেড়ে দেয়! ধরে নেয় জীবিত আর কেউ নেই! ঠিক এ অবস্থায় প্রথম সে অনুভূতি টের পায়! তার শরীর শিরশির করে ওঠে!

অনুভূতি টের পাবার পর সে বুঝতে পারে, তার পেটের ভেতর মোচর দিচ্ছে! গত কয়দিন আতঙ্কে ও বেঁচে থাকার জন্য লুকানোর ঠাঁই খুঁজতে ছুটে বেরিয়েছে সে! খুঁজেছে এমন কোনো আশ্রয়, এমন কোনো আড়াল যেখানে মৃত্যুদূত পৌঁছাতে পারবে না! নেই! তার ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে কোথাও এমন আশ্রয় নেই! কোনো আড়াল, কোনো সুরঙ্গ কিছু নেই—মৃত্যুর কাছে দুর্গম কোনো ঠিকানা নেই! মৃত্যুর কাছে সব উন্মুক্ত! যেখানেই সে আড়াল হতে চেয়েছে সেখানেই তার চোখের সামনে একের পর এক মানুষ লাশে পরিণত হয়েছে! এর মাঝে কোনো খাবার খাওয়া বা সংরক্ষণ করা তার সম্ভব হয়ে ওঠে নি!

সে টের পায় ক্ষুধায় তার পেটের ভেতরে আগুন জ্বলছে! সে আগুনে পেটের চামড়া পুড়তে শুরু করেছে! অথচ এখন খাওয়ার মতো কোথাও কোনো খাবার নেই! চারপাশে লাশের ফাঁকে ফাঁকে কিছু যে টুকরো টুকরো খাবার দেখা যাচ্ছে সেগুলোতে পোকাগুলো এমন নিমজ্জিত হয়ে আছে যে তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠা সম্ভব হবে না!
পেটের পর টের পায় তার গলা বা মুখে কোনো আর্দ্রতা নেই! শুকিয়ে শুটকি হয়ে গেছে! এক ফোটা পানির জন্য সে ছটফট শুরু করল। কিন্তু দৃষ্টিসীমার মধ্যে পানির কোনো উৎস নেই!

এখন খেতে হলে লাশ খেতে হবে! পানি পান করতে হলে লাশ গলে যে তরল বের হচ্ছে তা পান করতে হবে! অথবা প্রোটিন ভেবে পোকাগুলো খেতে হবে! আর কিছু নেই কোথাও! মানুষটার বমি আসে! বমি করেও ফেলে! কিন্তু পেট থেকে কিছু বের হয় না! কেবল মনে হয় নাড়ি-ভুড়িগুলো গলার কাছে এসে ধাক্কা দেয়! মানুষটা চলার আর শক্তি পায় না!
যতক্ষণ কোনো অনুভূতি ছিল না, হতবিহ্বল অবস্থায় ছিল, ততক্ষণ কোনো ক্ষুধা-তৃষ্ণা ছিল না মানুষটার! শক্তি বা সাহসের কোনো ঘাটতি ছিল না, দিব্বি চলাচল করছিল! অনুভূতি ফিরে আসার পরই সে শক্তি হারিয়ে ফেলে! ভয় চেপে বসে! মানুষটার মনে হতে থাকে অনুভূতিহীন থাকতে পারলে সে হয়তো বেঁচে থাকতে পারত! এই অনুভূতিই মৃত্যুর কাছে তার ঠিকানা পৌঁছে দিল!

এত মানুষ মরে গেছে, সে-ও যে বাঁচবে না, বুঝে যায় সে! এ মুহূর্তে তার আপন কোনো স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে খুব! হতে পারে কোনো হাতের নয়তো ঠোঁটের কিংবা বুকের অথবা সব মিলিয়েই আপন কেউ যদি এ মুহূর্তে জাপটে ধরে রাখত! তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়ের মুখ! মৃত্যুকালে সে তার মায়ের বুকে মরতে চেয়েছিল! এখন তো আর তা সম্ভব নয়! এত লাশের ভেতরে তার মা কিংবা অন্য কোনো মা আছে কিনা তা নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়!

চোখ বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার পর তাকাতেই সে দেখে সামনে একটা কঙ্কাল! কঙ্কালটার পেটের কাছে আরও একটা কঙ্কাল! খুব ছোট ছোট হাড়গোড় আর ছোট মাথার খুলি! ব্যাপারটা এমন হতে পারে, মারা যাবার আগে সে গর্ভবতী ছিল, হয়তো কিছুদিনের ভেতরেই বাচ্চাটি পৃথিবীর বাতাসে শ্বাস নিত!

মানুষটা কঙ্কালটাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে! এবং ঠিক করে মারা যাবার আগ পর্যন্ত সে এভাবেই থাকবে!

পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো জীবিত মানুষ থাকলে কঙ্কাল জড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে নিশ্চয় লাশ ভেবে চলে যেত!

মুহসীন মোসাদ্দেক
জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮; রাজশাহী। ২০১০ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ঘন অন্ধকারের খোঁজে’ এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘ঘি দেয়া গরম ভাত আর চিতল মাছের পেটি’। মাঝে ২০১৩ সালে কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘মগডাল বাহাদুর’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে কিশোর উপন্যাস ‘লাবুদের দস্যিপনা’। প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্নের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন ব্যবস্থাপনা শিক্ষায়। বর্তমানে দিনমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট অফিসের মানবসম্পদ বিভাগে কর্মরত।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।