মারুফ বরকতের গুচ্ছ কবিতা

চিঠি ৪১

কুয়ার ডুবুরি শুধু নই আমি আরো ভালো জানি মাটি কাটা
প্রতিবার ডুবে আমি দমে দমে পাতাল সুরঙ্গ আসি কেটে
উপরে সাজানো থাকে গ্রাম, সিথানে- পাতালে আমি
একে একে ফাঁদ পেতে গেছি- নিমগাছে এসে গেছে ফুল
জানি আমি একদিন শেষ হবে উপরের ঘুরখোপ, প্রথা
ট্রেন দেবে হুইসেল, বাতাসে উড়বে কাচপোকা
তোমাকে যে কথা দিয়েছিল, ভুল ট্রেনে চলে গেছে সেও
যেখানে দেখবে দেবদারু, হাত দিয়ে ধরে দেখো
ভেতরে মানুষ বেঁচে আছে। তখন বুঝবে আমি
কথা দিলে কথা রাখি- যদিও আমার চুলে ধূপ
ঘরামির দেশ ছেড়ে আমি এক ধরকাটা কূপ

 

চিঠি ৩

পাথরে পাথর ঘষি, মুখে ঘষি নীল জবাফুল
আমার পকেটে আছে সূতাবাঁধা সন্ধি লাটিম,
ডুমুরের কষ। মৃদু ভাপ ওঠা চাকা চাকা দম।
যে পথ নগরমুখী তার বুকে টায়ারের দাগ
আমারে কি নিয়ে যাবে ঝুলগাড়ি, ধূলার কোঁচড়?
তবে তো মিথ্যা নয়, সেই যে দিছিলা ওমশীত,
বাবু বাবু কথা। আহ, চিকণ সে জানের পোড়ন।
দেখেছি মানুষ যায়, ডুবে ডুবে নিঠুর শহরে
দিগন্ত চিরে ডাকে ছুরিধরা হরিণশাবক
নিয়ে যাও যত আছে, হলুদ সরিষা, সাদা বক
আমার জন্য থাক নিংড়ানো শীতল চালাকি
দূরে যেতে সাথে নিও বাদাম খোসায় গড়া পাখি
জোয়ারের দেশে থাকে হাতে হাতে আশার পিদিম,
রাজহাঁস, দেবদারু আর কিছু কাছিমের ডিম।

 

চিঠি ৫৮

ঘুরে ফিরে আসে মৃত্যুর সংবাদ
তবুও সারস ঠোঁটে করে আনে মাছ
তুমি কী নীরব! যেন সুচিত্রা সেন
আমের বাগানে ইঁদারার জলে শীত
একেকটা দিন নিস্তরঙ্গে যায়
আর সব রাত নোনা, তরঙ্গহীন
অভাব এখন নাইই ও সংসারে
বরং ভাতের শব্দ ও সংশয়
কিছু কথা থাকে- বলা অপরাধসম
ঘরামির নাই জানালায় কভু খিল
বোতাম কিংবা হুক কিছু শ্রেয়তর
শুধু প্রতীক্ষা দূরতম সাঁতারের
অনীহা/ আদর গত বসন্তে শেষ
কুঠার দেখেছ, বাকিটা অলীক, নাকচ
কে জানে কোথায় ছাই বেচা নারী থাকে
নিযুতে মেশে যে, রৌমারি তার ঘর
কতবা দীর্ঘ নিম শরীরের ছায়া
একটা মানুষে কতদিন থাকে মায়া

 

চিঠি ৫৯

কিছুটা সময় দিলে
জলের উপরিতল থিতু হয়ে আসে
জুড়ায়গো তরকারি, ঘন হয় স্বাদ
শুকায়, শক্ত হয় মাটির দেয়াল
পড়ে আসে রাগ, বাবু
মনের পুড়ানি কমে মায়া জেগে ওঠে
ভুলে ভরা জীবনের আফসোস মৃদু হয়ে আসে
আমাকে দাওনি মেঘ, ফিরে যাব, সেই অবসর
তুলেছ শুষনি শাক
বরইয়ের চাটনি দুপুরে
দুধ আর খেজুর পাটালি
সব ছিল, কমতির লোক তুমি নও
কোথা তবে আমার সুযোগ
আমারও ব্যাখ্যা আছে, কথা কিছু আছেও বলার
শনি বলো, মঙ্গল, হলোই বা সোম
ঘুঘু ডাকে, হাঁড়িচাচা, কথা বলে বউ কথা কও
পাড়ায় শব্দ করে ডেকে যায় বেদেদের নারী
খসাবে দাঁতের পোকা, বেচবে চুলের ফিতা, চুড়ি
কেবল নীরব তুমি, পাথরের মতো তার ভার
ফাগুন তো যায় যায়, পাটালির স্বাদ গেছে কমে
ডালেও লবণ নাই- কী বা আসে যায়
বুকের ভেতর কেন, এত ঢেউ, এত কথামালা
আমি তবে চলে যাই, বেদের নারীর সাথে
অথবা সওদাগর
দূর দেশে কাঁদে তারা তোমাদের কথা ভেবে
আর কেনে গোপন ঝিনুক
মনের বজরা গেলে তার মাঝে ভরে দেয়
দামী এক আকিক পাথর।

 

চিঠি ৪৪

অনিকেত পাখি ভুলে গেছে জনশ্রুতি
দিনের দৈর্ঘ্য কমে আসে শীতকালে
তবু নিষেকের দাগে গুমরানো পুঁতি
বুক ব্যথা করে মুখ তুলে চমকালে

তপ্ত মেঘেরও জ্বলনাঙ্কের রেখা
থাকে। আমি সে তো সামান্য টুনটুনি
পোকা বলে ডাকো, ঢেউয়ে ঢেউয়ে হয় দেখা
প্রতিদিন আমি কত শত দিন গুনি

কৎবেল গাছে রোজ যে পোকাটা ডাকে
শুনেও শোনোনি মুগডাল ফোটা গান
আমার পালক রেখে দিছ উঁচু তাকে
মোহময় রোদে এঁকে রাখা অঘ্রাণ

আমার নামের যে রেখা এঁকেছ বুকে
আমাকেও রেখো তারপাশে তবে আজ
অনন্ত প্রেমে জানালায় মাথা ঠুকে
গুণে নেব রাই তোমার শাড়ির ভাঁজ

মারুফ বরকত

কবিতা, গল্প ও উপন্যাসও লিখে থাকেন।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ একটি, “শৈশবের দাগ” ২০০৮।
প্রকাশিতব্য পাণ্ডুলিপি, “রেন্ডিকড়ই” (উপন্যাস), “রাধানাম” (কবিতা), “কৃ” (কবিতা), “চিঠি” (কবিতা), “নির্বাপিত মুখ” (ছোটগল্প)।
চিত্রনাট্য রচয়িতা। যেসব চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন- “প্রিয়তমেষু”, “আমার বন্ধু রাশেদ”, “আঁখি ও তার বন্ধুরা”।
কাজ করেন এনজিও-তে গবেষক হিসেবে। উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু মানবাধিকার, শরণার্থী ও ন্যায্যতাভিত্তিক বিশ্ববাণিজ্য সংক্রান্ত কয়েকটি নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে নিয়মিতভিত্তিক বেসরকারি পর্যবেক্ষক।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।