আফরোজা সোমার একগুচ্ছ কবিতা

হিয়ার পরশ লাগি

তোমার যৌনতা চাই না মরদ—
আশ্বিনের এই তুমুল তপ্ত দুপুরে
এমন কথা কী করে বলি!

চাই—
তোমার ঘোরলাগা চোখ
উঠানের ওপার দেখে আমাকে দেখুক;
ঘুঘুর ডাক পড়ে থাক আম গাছের ছায়ায়
তুমি রোদে পোড়া তণুর তৃষ্ণা নিয়ে
বিড়ালের মতন আমার পায়ে-পায়ে থাকো।

এ কথা মিথ্যে নয়, জ্ঞানদাসের চরণের মতন
তোমার ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’,
তারও চেয়ে সত্য মরদ এই কথা জেনো
‘হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে,
পরাণ পিরিতি মোর থির নাহি বান্ধে’।

উত্তুঙ্গ-সুখ

যেভাবে বৃন্তে জাগে শিহরন
সেভাবে নিয়েছো আমার দখল, প্রভু হে!

তুমি, দুপুরের সঘন রোদ,
এমন করে লেপ্টে আছ
ভবনের গায়ে, গাছের পাতায়
যেনো মধু কেউ
দিয়েছে মেখে পরম দরদ ভরে।

আহার শেষে তুষ্ট ধার্মিক
যেভাবে চেটে-চুষে খায়
আঙুল ও হাতের চেটো
সেভাবে তোমাকে দমে দমে নিই;
অঙ্গে অঙ্গে তোমাকে আমি মাখি
নিবিড় পুলকে জাগে হিয়া
চামড়া ও হাড়ের দেয়াল মুছে
তুমি-আমি যাই মিশে
ঘোর পুলকে জাগে প্রাণ,
জাগে আরো তৃষ্ণা গভীর।

এ জীবন পুলক-তৃষ্ণা এক, জেনেছি শেষে
প্রভু হে, দুপুরের মায়া রোদ,
তোমার নামে আজ লিখে রাখি
এ জনম উত্তুঙ্গ-সুখ।

আমার পুরুষ

তার ভ্রু ধনুকের মত বাঁকা নয়। তার বাহু পাকানো দড়ির মতন নয় গ্রন্থিল। তার ঊরু নয় গজ শূঁড়ের মতন সুগঠিত সুন্দর। কিন্তু আমি ভালোবাসি তার উদোম বুক। তার নগ্ন বুক লাউয়ের কচি ডগার মতন মায়াময়। তার বুকের মধ্যিখানে কচি-কচি মায়াবী পশমে গড়া তিন পাপড়ির ফুলের মতন একখানি অলৌকিক পুষ্প। সেই পুষ্পের দিকে চেয়ে আমি ভেঙে চুরমার হয়ে যাই।

হায়! জানে না তা আমার পুরুষ।

 

বানিয়াশান্তা

নাভি:মূলের কাছে উন্মুল রাত
আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে
নুয়ে পড়া ঘাসের মতন কাঁপছে।

বৃন্ত থেকে ঝরে যাওয়া রক্তজবা
মাখামাখি হয়ে আছে জল ও কাদায়
সে কখনো হয় না পুজোর ফুল।

‘ভোর হলো, দোর খোলো’
বারবধূ ওঠো রে
ধুয়ে-মুছে রক্তজবা
তারে তুমি পুজো দিতে বসো রে।

এপোকেলিপ্সের প্রাক্কালে

লুন্যাটিক শহরে তবু কবিতা ঘনায়

তাড়ি খাওয়া চাঁদ
তাক করে থাকে বন্দুক।

তাড়া খাওয়া ইঁদুর
ঠাঁই খুঁজে মরে;
তার হয়ে রাস্তায়
কেউ দেয় না স্লোগান।

মাংসের দলা মেলে
শুয়ে থাকে সানজানা
ঝুলে থাকা প্ল্যানেটে সে
প্রপেলারে কাটা পড়া
হাওরের বুকে ভাসা
লাল শাপলা।

মাতালে ও পতিতায় প্রেম হয়ে গেলে
চাঁদে ও শাপলায় মিলন ঘটে যায়।

মিলনের এই যামিনীতে
তুমি ঢুলো না নিদ্রায়
আঁখিতে রাখো আঁখি
অধরে মিলে অধর
স্বর্গ নামুক।

এ পৃথিবী সাম্যের নয়
এ পৃথিবী নয় কবিতার
কবিতা একটা মেয়ে মানুষ
পুরুষেরা তাকে করবে বলাৎকার
আর সাম্যের দিন সমাগত ভেবে
চাপড়ে দেবে নিজেদের পিঠ;

শহরে কবিতা ঘনানোর দায়ে
কবিকে দেওয়া হবে ক্রসফায়ারে।

নিজের কাছে নিজেকে
আড়াল করে যত সং
তাদের সমস্ত বসন খুলে
আশ্বিনের পূর্ণিমা রাতে
সার বেঁধে বসিয়ে দেয়া হবে
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে;
ঢেউয়ের কল্লোলে তাদের ভেতর
কান্না ও মুক্তির বাসনা এলে
হিম মাঘের পূর্ণিমা রাতে
বন্দুক তাক করে থাকা
তাড়ি খাওয়া চাঁদটার কানে
আস্তে করে বলা হবে:
গুরু!এইবার ট্রিগারটা চেপে দিন!

প্রেম: জল্লাদের রেশমি সুতা

সে আমাকে কবিতা পাঠায়।
কয়েক দিন হলো;
রোজ।
কয়েক লাইন।
নিজেই লেখে।

ছবিও পাঠায়;
বারান্দার ফুল
ভোরের আকাশ
পড়শীর ব্যালকনিতে বসা
ডোরাকাটা বেড়াল;
জানলার পাশে
ডুমুর গাছে বসা
একটা দোয়েল;
ড্রয়িংরুমের ফ্লোরে
তেরছা হয়ে পড়ে থাকা
অপরাহ্নের আলো।

কফির আমন্ত্রণও পাঠিয়েছে
আজ দু’দিন।
আমন্ত্রণের জায়গায় বরং
আবেদন পড়া ভালো।

কিন্তু আবেদনে সাড়া দেবে না কর্তৃপক্ষ
ফেসবুক ও ফোনে তাকে ব্লক করা হবে।

প্রকৃত প্রেমে পড়া মানুষ এক অপ্রতিরোধ্য বালাই
প্রেমে পড়া মানুষের চোখের চেয়ে তীব্র নয়
জল্লাদের রেশমি সুতা।

 

আফরোজা সোমা

কবি ও প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখালেখির জগৎ বিস্তৃত। কবিতার পাশাপাশি তিনি লেখেন প্রবন্ধ, গদ্য ও কলাম। গল্পও লেখেন, অনিয়মিতভাবে। তাঁর প্রকাশিত কবিতার বই পাঁচটি। প্রথম কবিতার বই ‘অন্ধঘড়ি’ (২০১০)। এরপর যথাক্রমে প্রকাশ হয় ‘হারমোনিকা’ (২০১৪), ‘ডাহুক’ (২০১৫) ‘পরমের সাথে কথোপকথন’ (২০১৯) ও ‘রোদে ঘোর লাগা একলা শালিক’ (২০২১)।

আফরোজা সোমা পেশাগত জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন অ্যামেরিকান ইন্টারনশেনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি)-এর মিডিয়া এন্ড ম্যাস কমিউনিকেশান বিভাগে। ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে দেশি-বিদেশি রেডিওতে সাংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘ দিন। কাজ করেছেন ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি নিউজ বাংলা, জার্মানীর প্রধান বেতার ‘ডয়চে ভেলে’ রেডিওর বাংলা বিভাগ এবং রেডিও টুডেতে। এছাড়া কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশনে।

আফরোজা সোমার জন্ম ১৯৮৪-সালের ২রা অক্টোবর, কিশোরগঞ্জে। বেড়ে উঠেছেন নরসুন্দা নদীর পাড়ে। পড়ালেখা করেছেন কিশোরগঞ্জের সরকারী আদর্শ শিশু বিদ্যালয়, এসভি সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গুরুদয়াল সরকারি মহাবিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। ইমেল: [email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।