মালেক মুস্তাকিমের দীর্ঘকবিতা: ‘আমি হাঁটতে গেলে পথ জড়িয়ে যায় পায়ে’

এইসব ধূলির নথিপত্রে ঘৃণার পোস্টার, সিক্রেট মুখপঞ্জি,
ঘুমখচিত রাত্রির প্রলোভন, আমাকে টেনে নিয়ে যায়
দূরে, তোমার ঘুমঘরে, নিদ্রাহীন পাখিদের ফুলশয্যায়-
এখানে নিস্তব্ধতা, জলসিড়ি, ডানায় মানুষের রক্তবীজ,
পাখিদের নাশতার টেবিলে বেদনার নাশপাতি, ঘুমের বড়া,
রেড ওয়াইন। নর্তকীর নাভীর নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে শহরের
বাজপাখি, মাছেদের পাঠশালা, ঘরে ঘরে পোষানদী, তৃষ্ণার্ত-
স্মৃতির বৈঠকে আমাদের স্মরণসভা, এসো প্রার্থনায়, এসো।
ছুঁয়েছি পাথরের ঘুম, জমাট মুখ, তলদেশের উষ্ণরেখা-
যাচ্ছি তোমার দিকে, হাওয়ায় হাওয়ায় সাতার কেটে, একা;
অথচ তুমি ঘরে নেই, ঘরভর্তি তোমার ছায়া, প্রতিধ্বনি-
মুখোমুখি চেয়ে থাকা, অনর্থক উড়াউড়ি, ঝরা পত্রপল্লবে।

 

মৃত্যুর পর আমার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াবে তোমার
অনিবার্য উঠানে, তোমার শরীর ঘেষে বসে থাকবে
তোমারই ছায়া, তবু তুমি বুঝতে পারবে না সে ছায়ার
গোপন রহস্য, বোটায় লেগে থাকবে বৃষ্টির ফোটার
মত বীজপত্র, কলমিলতার জ্বরায়ু, হীমশীতল ঠান্ডায়
চায়ের ধোয়ায় স্নান সেরে মহল্লার দরজা খুলে
দাড়িয়ে থাকবে বৃক্ষের পতন, বৃষ্টির ফোটা, কুসুম
কুসুম চুম্বন, জানালায় উপুড় হয়ে কেন ডাকে
গন্ধম রাত্রি, হাওয়ায় ভেসে আসে মৃত্যুর সুর, বাশি
বাজে না, বাজে না। আরেকটু কাছে আসো, বুকের
বোতামগুলি গুজে দাও সিন্ধুকে, তাবুতে, হাতে হাত
রেখে উড়িয়ে দাও আমার আংগুল, ঘামঘুড়ি, তন্দ্রা।

 

এই আধাআধি কাছে আসা, পাওয়া কিংবা না পাওয়া, বড়
বিষন্ন লাগে, বিবশস্বরে অন্তরঙ্গ ছায়া ঘোরে, পিছে পিছে
মিছে মিছে- ঘুরে ঘুরে শুয়ে পড়ে তার নিরাকার শরীর,
কল্পনায় যে এসেছিল পরিপূর্ণ, তাকে চাই মুষ্ঠিভরে,
মৃত্যুর সমান। আসো, এইখানে, বসো, কিন্নরী কাজল
ঊঠাও সমস্ত ভারবাহী অযুত শুন্যতায়, দিঘীর জলে
বর্ষার হাতল, তোমার উজ্জ্বল প্রকোষ্ঠ জুড়ে বিপন্ন
বিন্দুসমষ্টির ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ- যেন কেউ মৃদুস্বরে ডেকে
যাচ্ছে রাত্রির নিজস্ব স্তবগান । আমাদের ফেলে আসা
ডানার চিতকার উঠানে পেয়ারাবাগান, দুয়ারে ঘনিভুত
মুখমণ্ডল, আংগুলে আংগুলে অবরোধ, চৌকাঠ জুড়ে
ধর্মঘট, মিছিল- অসহ্য এক সন্ধ্যা ঘুরেফিরে তোলে
বিপুল ফেনা, আড়ালে আবডালে দহনের সিন্ড্রো্মে।

বুকের ভেতর কান্না জমে জমে পাথরের ক্ষীর, নিশ্বাসে
অগ্রন্থিত দীর্ঘতার পর্যটন, পায়ে পায়ে ফেনাপাঠ, মুখে
মুখে সাতারের বর্নমালা যেন এক বিষন্ন বিকেলের নুড়িপাথরে
একে যাচ্ছি সুর্যমুখীর রন্ধনচিত্র, হন্তারকের শোকসভা,
অন্তহীন স্মৃতিগুচ্ছে একাকী হেটে যাই, আয়নার সামনে
দাড়াই, একজন ব্যর্থ ও সফল, সফল ও ব্যর্থ মানুষকে
মুখোমুখি হতে দেখি, ধনুক আর বল্লমের প্রয়ান উতসবে
মৃদুস্বরে বাজে দুফলা অনুচ্ছেদ, বৃক্ষপত্রে জাগে গাছ
হতে না পারার চুড়ান্ত বেদনা। নোনাজলে উতলে ওঠে
বিমুখতার প্রোজ্জ্বল অন্ধতা, তোমার হাতের মতো নরম
ও মন্থর, স্লো মোশনের বুদবুদ, ভাতের ফেনার মতো
ভেসে আসে আমাদের ফিসফাস, কলকাকলি- কতটুকু
কাছে আসা যায় মুহুর্মুহু দুরত্বে? মিউ মিউ করে চলে
যাচ্ছে আমাদের ঘনিষ্ঠতায় গুঞ্জরিত উদ্বেল ইশারা,
দূরে যেতে যেতে আর কতদূর উড়ে যাবে, মৌমাছি?

 

আকাশ যত বড়ই হোক, আমাদের সীমাবদ্ধ ডানায়
সে কেবল একগুচ্ছ পাখনা কিংবা চোখের পাপড়ির
উঠানামা, কেবল মিহিন সুতোয় বোনা আমাদের নিঃশ্বাস,
দীর্ঘস্বর কিংবা পারষ্পারিক বিচ্ছিন্নতা। বুকের ভেতর
দিয়ে সিড়ি বয়ে গেছে তোমার দিকে, যেন সোমেশ্বরী,
এক নদী কিংবা নারী, যেন পাহাড়- তোমার মুখের দিকে
তাকাই, সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে সহস্র সিড়িমুখ, অজস্র
নদী আর নারীর বয়ান, সিড়িতে বসে আছি, হয়ত বসেও
নেই, হয়তো ঘুমে। আমি দেখছি কিংবা দেখছি না, নদী
এসে মিশে যাচ্ছে সিড়ির সাথে, সিড়ি চলে যাচ্ছে
পাহাড়ের গা বেয়ে তোমার আশটে শরীরে, শয্যায়।
বহুদিন ধরেই সেলাই করছি আমাদের মৃতমুখ, মুখের
মতো বিস্মিত আধার কিংবা কাচ, পিতলের সংসারে
ইউনিভার্সাল ঘুরপাক, সন্যাস ও বিবর্তন। এসো, তুলে
রাখি কাচের সংযম, বর্ষণমুখর রাত্রির এইসব অন্ধ কৌতুক।

 

আমার চোখের পাতায় কাঠঠোকরার ঘরদোর, বিছানাপত্র-

তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো ভাটফুলে, করবীপাতায়- আমি ঘুমহীন,
একবার চোখ খুলে আর বন্ধ করতে পারছি না। চোখ খুলেই
ঘুমিয়ে পড়েছি, চোখ বন্ধ করে জেগে আছি, বহুবিধ বন্যতায়।
আমার শরীরে তোমার রক্ত, মমিফুলের স্নিগ্ধতা, শিরায় শিরায়
তোমার উতকন্ঠা, কেমন করে বেচে আছি অন্তরিত ভ্রমনের
নিথর গৃহপত্রে! ঘরের কোনাকাঞ্চিতে তোমার দৌড়ঝাপ,
হাটাহাটি, আমার বাহুবন্ধনীর শেষ পৃষ্ঠায় নরম ঘাসের মতো
তোমার ছলাত ছলাত, যেন জলের পৃষ্ঠায় ঘুড়ি উড়ছে মাছের
কানকার। তুমি আটকে আছো আমার ঠোটে, নখে, পাপড়িতে,
চিবুকে, ঘামে, ঘুমে, জলে, বৃষ্টিতে। আমি তোমাকে পারি না
ছাড়াতে। খিলান হাতে নিয়ে বসে আছি, তীক্ষ্ণগন্ধা। তবু আমি
তোমাকে ছাড়াতে পারিনা রক্তের অধিক, হে আত্মীয় আমার।

 

খুব শখ করে এই জীবন আমি কামড়ে খেয়েছি, গিলে
ফেলেছি পানের বোঁটার মত দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার, এরকম
অনেক জোছনাসমেত রাত্রি আমি গিলে খেয়েছি নির্বিঘ্নে।
আমাদের মুহুর্তগুলো চুরি করে নিয়ে গেছে বিষাদের রাত্রি,
ভিমবারে খেয়ে গেছে বাসনকোসন, সান্নিধ্যের কাচারিঘরে
সবুজ অরন্যের দ্বিধান্বিত শোকসভা, ঝরাপাতায় লিখে
দিলাম সমস্ত কুর্নিশ, বাগানে বাগানে আজ একান্নবর্তী সাকো,
প্রিয় প্রহর। আমাদের প্রেম যেন রুপকথার শ্লোকে অংকিত
শহরের ধুলিপত্র, উড়োচিঠির মতো আকস্মিক শিহরিত
সমাবেশ, পল্টন ময়দানে। আমরা না বুঝেই শ্লোগান দিচ্ছি
ফেরারি প্রেমের, পতিতার শরীরের ঘ্রানে মিশে গেছে
নাগরিক কোলাহল, বিচ্যুত পদ ও পদবী, ভাংতে ভাংতে
নদী কখন ঢুকে পড়েছে আমাদের বেডরুমে, আমরা জানিনা।

 

এখন ঘরভর্তি জল, আমরা ভেসে যাচ্ছি উজানে, ডুবে যাচ্ছি
জলে, স্থলে, ছায়াপথে। আমরা যেন ঢেউ, ফেনায় ফেনায়
প্রোজ্জ্বল আমাদের বহুগামিতা ও অন্ধকার। ঘরের ভেতরেই
আমরা যাযাবর, পরষ্পরের চিবুক থেকে বয়ে গেছে ধুলির সন্তাপ,
বেদনার আলতা। আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছি তোমার নাম,
শার্টের কলারে, হাতায়, ভাজে ভাজে। একদিন বৃষ্টির ছাট এসে
ভিজিয়ে যাবে অস্তিত্বের প্রগাঢ় ছিটিকিনি, আমাদের ঢেকিছাটা
ধানের চিমনি, ধোয়া ওঠা দ্বিখন্ডিত ভুরু, ল্যান্ডিং স্টেশনের
অনেক নিচে প্রথম দেখার চোখ নিয়ে দাড়িয়ে আছি, সেই চোখ,
সেই দুরুদুরু আশ্বিনের আবছায়া সংকোচন, কুকড়ে থাকা পল্লবিত
কসমিক দুপুরের শুন্যতা! এইভাবেই ঝুলে আছি তোমাকে পাওয়া
থেকে না পাওয়া অবধি। তুমি যেন বিরাট এক শুন্যতা, পরিপুর্ন
হবার পরও যা কেবলি শুন্য দেখায়। বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে
পড়েছে খাটের পায়া, বালিশের ঘুম নেই। শিমুল তুলোর মতো
তার হৃদয়জুড়ে সাদা মেঘের বল্লম, উপদ্রুত পায়ের আওয়াজ।

 

তোমার আসা যাওয়ার পথে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে আমাদের
নিরবতার ক্যাকটাস, পদচিহ্নে যতিহীন সারগাম,
পায়ের পাতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে সাংকেতিক
উপদ্রব, সংঘবদ্ধ করোটির তুমুল সন্ত্রাসে ভুলে
গেছি নিজের পরিচয়পত্র, ঠোটে করে নিয়ে গেছি
মৌসুমি প্ররোচনা, ফুলের সংসারে বীজতলার ফটক
ও পানঘর, তোমার শরীরে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি, দেখি-
পারষ্পারিক চন্দ্রবিন্দুর যৌথ শিশিরে মদ আর মাংসের
রেস্তোরাঁ। এইসব সমাবর্তনের পরিপত্রে লুকিয়ে
রাখি প্রিয়তম মুখের সদৃশ করতল, দ্রাঘিমান্তরে
ঘুরে ঘুরে বেরিয়ে আসে কয়েকটি কাচের প্রতিমা,
দাড়িয়ে আছি নিজের ধ্যান ভেংগে, কান্নার জলপাই
বীজ বুনে, ছড়িয়ে দেবো গোধুলির চাতালে, আয় বৃষ্টি,
আয় মেঘ, এই পলিমাটি হৃদয়ে, কাঠের মাস্তলে, আয়, আয়।

 

১০

এক নারী বুকের ধারে রেখে গেছে রজস্বলা পটভূমি, পায়ে
তার গোপন ব্যাধির ধানক্ষেত, আয় একবার তুলে রাখি
ভাংগনের এইসব সুদুরতা, আয়, আয় সখি আয়, তুলে
রাখি মহোতসবের নামে জীবনের এই ব্যকুল বিদ্রুপ।
আমাকে পেছনে ফেলে আমি চলে যাই সামনে। আমার
সামনে চলে যায় আরেক আমি। অথচ আমাকে কোথাও
খুজে পাইনা। পুষ্পিত আধারে আমাদের ছায়ায় ঘোরে
কুয়াশার ফসিল,চুম্বনের তফসিলে জমা পড়েছে অবিমিশ্র
ধুপের খতিয়ান। হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে নেই সবটুকু অবসাদ,
ডালে ডালে ছড়িয়ে দেই সার্জিক্যাল রোদ্দুর, পাতাবাহারের
ঘুম ভেংগে গেলে তোমার উরুতে উরুতে আমার গুঞ্জন,
জলতরঙ্গ, মিছেমিছি এইসব কাছে আসা, আনত শরীরে?
মুখিয়ে আছে যন্ত্রনার কস্টিউম, ভাড়ামির উচু নাকে জীবনের
গন্ধহীনতা ওত পেতে আছে সিরামিকের দোলনায়। আমরা
বুনে যাচ্ছি আমাদের ফেলে আসা দিনের স্বপ্নবীজ ও ঘাস,
ঘনিষ্ঠতায় মর্মরিত উদ্বেল রাত্রির বিজন শস্যখেত, শুন্যতা।

 

মালেক মুস্তাকিম

তরুণ কবি। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলায় জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সরকারী চাকুরে। নেশা লেখালেখি। শব্দ, বাক্য আর ব্যতিক্রমী ভাবনা নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। সাহিত্য সাময়িকী ও ছোট কাগজে নিয়মিত লিখছেন।

প্রকাশিত কবিতার বইঃ ভুলের ভূগোল, ২০১৩; বিষণ্ণতাবিরোধী চুম্বনগুলি, ২০১৬; তোমার সাথে হাঁটে আমার ছায়া, ২০১৮; একান্ত পাপগুচ্ছ, ২০২১, আমি হাঁটতে গেলে পথ জড়িয়ে যায় পায়ে, ২০২২।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top