জরিনা আখতারের একগুচ্ছ কবিতা

অশ্রু

তোমার দুচোখ থেকে ঝরে পড়ছে
খণ্ড খণ্ড মেঘের পাথর —
তাবৎ শুষ্কতা তোমার দুচোখে ঝুলে আছে
আর দেখ
বিদীর্ণ মৃত্তিকায় খড়-কুটোর অস্তিত্বও নেই কোথাও ,
সবুজের অস্তিত্ব বিবর্ণ সময়ের চোরাবালিতে ডুবে গেছে ,
অথচ আমাদের পূর্বসুরিরা তো সবুজেরই আরাধনা করেছেন —
আমরা চাই সেই সুবর্ণ সময়ের প্রত্যাবর্তন
সবুজের উত্থান—
জল দাও জল দাও
অশ্রুমতি হও তুমি |

 

আগুন

বুকের ভেতরে চিতার আগুন জ্বেলে
কারা যেন রেখে গেছে তাকে—
প্রতিটি রক্তকণিকায় টগবগ করে ফুটছে সে
জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে তার হৃদয় ;
সময়ের পেন্ডুলাম দুলে দুলে কতটা যুগ পাড়ি দিয়েছে
তার হিসেব কষেনি কেউ ,
কল্লোলিত জলের ঢেউ নির্বাপিত করতে পারেনি সে আগুন
বনভূমির উদাত্ত হাওয়ায় নেভেনি সে আগুন
আগুনের আর এক নাম তবে অনির্বান !

 

সম্রাটের বাঁশি

এক ক্লান্ত মধ্যাহ্নে কাজের অবসরে
সম্রাট বাঁশি বাজাচ্ছেন —
নদীতে ঢেউ জাগল
গাছের পাতারা মর্মরিত হলো
ঝাঁক বেঁধে পাখিরা আকাশে উড়ে উড়ে উল্লাস করলো ,
শুধু শুনলো না ঐ দূর নদীতে ধনুকের মতো বাঁকা শরীর নিয়ে
গুণ টানা পরিশ্রান্ত মাঝিরা ,
আরও দূরে শস্যখেতে নিড়ানিরত হত-দরিদ্র কৃষকেরা ,
পিঠে বস্তা নিয়ে পথ থেকে প্লাস্টিকের বাতিল বোতল
সংগ্রহরত খুদে বালকেরা ,
আর দোচালা টিনের ঘরে গুঁড়ো মাছের চচ্চরি ও ভাত নিয়ে অভুক্ত
স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষায় এক আটপৌরে রমণী জানলো না
আজ এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে যেতে চলেছে ;
শুধু দরবারে নিজেদের আর্জি পেশ করার জন্য অপেক্ষমাণ অসহায় প্রজারা
বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে যেতে শুনতে পেল
সম্রাট বাঁশি বাজাচ্ছেন |

 

সোনার পাথর বাটি

আমি যখন জ্যোৎস্নাস্নাত ঝুলবারান্দায় বেঙ্গল প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেছিলাম
এই সময়ের প্রতিভাবান কবি অনন্ত শোভন তখন হেঁটে যাচ্ছিলো সামনের পথ দিয়ে —
তার সারা শরীরে রোদ-বৃষ্টির মাখামাখি
আমি তার নাম ধরে ডাকলাম কয়েকবার
সে কোনো ভ্রুক্ষেপই করলো না,
হনহন করে হেঁটে চলে গেল নাক বরাবর ;
যাও শোভন, এভাবেই হেঁটে হেঁটে বাড়ি যাও
রোদে ভিজে বৃষ্টিতে পুড়ে—
এটাই তোমার ভবিতব্য |

ফেরামানুষ মূলত ফেরে না —
অস্তগামী সূর্যের মতো একবার চলে গেলে
তার আর ফেরার সম্ভাবনা থাকে না ,
যদিও আগামী ভোরে সূর্য ফিরে আসে দিগবিজয়ী বীরের বেশে ,
মানুষ ফেরে না— মানুষকে ফিরে আসতে নেই ;
ফিরে না আসাতেই তার জন্মের সার্থকতা —
ফিরে আসলে তো মৃত্যুর কোনো অস্তিত্বই থাকে না ।

 

জরিনা আখতার 

জন্ম: ১৫ মে ১৯৫১, ঢাকা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কামরুন্নেসা স্কুলে পড়ার সময় ইংরেজি শিক্ষককে নিয়ে অপ্রকাশিত ছড়া দিয়ে তাঁর লেখালেখির সূচনা। প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘আগামী দিনের নাগরিক’ (১৯৬৪, নবাবগঞ্জ সাময়িকী)।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর (১৯৭৪) অর্জন করে লালমাটিয়া মহিলা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন (১৯৭৭)। ২০১১ সালে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ:

কাব্যগ্রন্থ: কালো ময়ূরের ডাক (১৯৮৬, প্রথম), এই ছুরিই আরশি (১৯৮৯), সেগুন মেহগনি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৩), এই আমি নিজস্ব আমি (২০০২), জলের আরশিতে নির্নিমেষ চেয়ে থাকা একটি হিজল গাছ (২০১৭), মৎস্যকুমারী (২০২১), ভালো থেকো ঘুঘু পাখি (২০২৫), আমি মির্জা গালিব নই (২০২৬)।

প্রবন্ধগ্রন্থ: প্রসঙ্গঃ সাহিত্য ও জীবন (২০০৪)।

ছড়াগ্রন্থ: কনিনীকা (২০২১)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top