আত্মার রহস্যে জাগা মৃত্যুঞ্জয়ী নাচ: গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সুরাইয়া

সাবেরা তাবাসসুম

“তোমার নাচের শব্দ শুনি আমি আত্মার কান্নায়
জন্মের কাননে শুনি নৃত্যময় মৃত্যুর বোধন, শুনি জন্ম!”

সুরাইয়া খানম আমার ফিরে পাওয়া কবি। হারিয়ে ফেলেছিলাম তাঁকে। কোলাহলে, নীরবতায়, শলায়, গুঞ্জনে। সময় একই সাথে তাঁকে রেখেছিল নীরব, করেছিল প্রশ্নবাণে জর্জর। মাতাল ঘণ্টা বাজিয়ে, প্রেমের অমল ধনুকে টান টান সাহস রেখে হেঁটে গেছে তাঁর কবিতার শিরদাঁড়া। নির্মম সময়ের সমাধি ফুঁড়ে নিশ্চিত ছিল তাঁর পুনরুত্থান।

কবি সুরাইয়া খানমের কবিতার পাঠক হওয়ার আগে শুনেছি তাঁকে অনুষঙ্গ করে তোলা রঙচঙে গল্পের সংযুক্তি। কবিতা ও সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক পরিচয়ে যারা নারী, তারা যে ভীষণ রকমের বৈষম্যের শিকার সেটা খুব নতুন কিছু নয়। কেচ্ছা কাহিনীতে মুড়ে নারীর অবস্থান, প্রচেষ্টা ও অর্জনকে মুখরোচক চানাচুর বা বারোভাজার তকমা’র জায়গায় নিতে পারায় অধিকাংশ পুরুষ লেখক যতটা শক্তি ও মেধা খরচ করেন, তার সিকি ভাগ মানবসভ্যতার ক্রমবিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাস পাঠে ব্যয় করলে উপকৃত হতে পারতেন। যাই হোক, কবিতাকে কেবল অনুভব করার বাইরেও যে লিঙ্গ ও বহুস্তর বিশিষ্ট শ্রেণিগত রাজনীতি দিয়ে বোঝা জরুরি সেটা বুঝতে শিখে এক ধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছি বলেই বোধ হচ্ছে। জেনেছি কী করে অগুরুত্বপূর্ণ আলাপকে সরিয়ে রাখতে হয়। তখন থেকে উপলব্ধি করেছি সুরাইয়া খানম বিদুষী, কবি। তবে আফসোস জাগে, এত দেরি করে জানলাম কেন তাঁকে!

সুরাইয়ার একমাত্র কবিতাগ্রন্থ ‘নাচের শব্দ’ পাঠ করে বিস্মিত হয়েছি। হয়েছি রীতি মতো মুগ্ধ। একজন কবিকে আবিষ্কার করার কাজটিতে ভারী আনন্দ পাই আমি। তবে তাঁকে পাঠ করার সাথে সাথে কোথায় যেন একটা শূন্যতা অনুভব করেছি। ভেবেছি, তাঁর এত বছরের কবিতাজীবনে আরও বর্ণিল পালক যুক্ত হয়েছে নিশ্চয়ই। অথচ সেসব আমাদের মতো অনেক পাঠকেরই নাগালের বাইরে থেকে গেল। এরকম একটি সময়ে হাতে এলো মননশীল লেখক গবেষক ইসরাইল খান সম্পাদিত বই গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সুরাইয়া। পাঠকের কাছে যত্ন করে এই বইটি পৌঁছে দিয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা জার্নিম্যান বুকস। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লৈঙ্গিক পরিচয়ে নারী কবিকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করার উদাহরণ বিরল। এক্ষেত্রে ইসরাইল খান সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখেন। তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন ও নিরলস গবেষণাকর্মের কারণেই আমরা এমন একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ হাতে পেয়েছি। নিশ্চিত ভাবেই এটি কবি সুরাইয়ার বর্ণাঢ্য জীবন ও কবিতার নানা স্তরকে বুঝতে পাঠককে সহায়তা করবে।

সুরাইয়া খানমের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিকন্যা জর্জ সাঁদের কথা মনে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক নারীবাদের বহু আগেই সাঁদ বুঝে গেছিলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্ধকার রাজনীতি। উনিশ শতকের ফরাসি সমাজ যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না তাঁর তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, ক্ষুরধার লেখনীর জন্যে। সমাজের কালিমাকে প্রত্যাখ্যান করার মতো আত্মাভিমান নিয়ে নিজের শর্তে বেঁচেছেন সাঁদ। সুরাইয়ার মননের স্বরটিও তেমনি ধারালো,ঝাঁ চকচকে। তাঁর কবিতা তেজদীপ্ত। দুঃখ লতিয়ে ওঠে না, বিষাদ নুয়ে থাকে না সেখানে। বোঝাপড়া আর মানভঞ্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আত্মমর্যাদা বোধ, এগিয়ে চলার দৃপ্ত পদক্ষেপ। সভ্যতার প্রতিটি বাঁকে নারীর স্পষ্ট ভূমিকার জোরালো দাবীদার তিনি। একচোখা ইতিহাসবিদের কলমে উল্লেখিত না হওয়া নিয়ে আক্ষেপ নেই সুরাইয়ার। দখল নিতে জানেন নিজ স্বপ্নভূমের। সাঁদ বলেছিলেন, বাস্তবের পাঠ নয়, এক আদর্শ বাস্তবের অনুসন্ধানই শিল্পের উদ্দেশ্য। সুরাইয়া নারীর আত্মপরিচয়ের সংকটকে চিহ্নিত করে নতুন সত্তা নির্মাণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রেখেছেন কবিতায়। কেবল লিঙ্গ ভেদে নয়, শ্রেণি বিভাজনের নানা স্তরকে বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি। এই অনুসন্ধান, পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী যুগস্রোতের ধারায় মিশিয়ে দিয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমকে।

মর্যাদা ও মানবিকবোধের কবি সুরাইয়া তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত বঞ্চিত নেতৃত্বহীন মানুষের কথা বলেছেন কালো মানুষের আর্তনাদে। কেবল একটি কবিতা মাতৃবন্দনার ভাঁজে ভাঁজে পাঠক উপলব্ধি করতে পারেন সুরাইয়ার শক্তি—

আমার থাবায় ফোটে সভ্যতার নতুন অক্ষর
বসত খামার নারী নদী ও মমতা—
আমার আত্মায় নাচে অমর কবিতা;
বীতশ্রদ্ধ বিবেকে টালমাটাল দেউলে জাহাজ
আমি দিই সমৃদ্ধ বন্দরে এনে,— ভরে দিই প্রাণের সম্ভার

কখনও ভীষণ রাগী আর ধারালো তাঁর কবিতা। পাষণ্ড প্রেমিককে গাছে বেঁধে মারতে চান। কখন তাঁর কুসুমকোমল হৃদয় প্রেমিকের শুশ্রূষার আলোয়ান যেন। তবু এসব সরিয়ে টের পাওয়া যায় মজবুত মেরুদণ্ডটি—
প্রশ্ন করো, অন্ধকার সময়ের জারজ সন্তান!
প্রশ্ন করো, মরুচারী পিপাসার্ত অমৃতের প্রাণ!
আমার দু’হাত আজ সরল কৃপাণ
মরচে পড়া কোনো গান গাইতে আমি এখানে আসিনি।
আমাকে গড়তে হবে নতুন সম্মান।
মানুষের হৃতরাজ্য ফিরে পেতে এসেছি এখানে
আমি,ধসে পড়া লোকালয়ে নতুন খিলান।

কবি সুরাইয়া খানমের আবির্ভাব ষাটের দশকের শেষদিকে। সত্তর দশক জুড়ে চলে তাঁর লেখার দাপট। শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সময়ে নিয়মিত কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে সাহিত্যপত্রিকাগুলোয়। প্রেম ও মৃত্যুর তীব্রতা গভীর ক্ষত দিয়ে গেলেও কবিকণ্ঠে ধারণ করেছেন অশ্রুত নীল। আশির দশকের শুরুতে বেছে নেন প্রবাসজীবন। জীবনকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বের পথে-প্রান্তরে। সেখানে কবিতায় অনেকটাই সক্রিয় ছিলেন সুরাইয়া। বন্ধুহীনতা ও স্থানান্তরের কিছু অপ্রাপ্তি, কিছু শূন্যতার গল্প কখনও সাময়িক স্থবিরতা দিলেও কবির সহজাত শক্তি ও সামর্থে তিনি বলীয়ান থেকেছেন সবসময়—

টাপুর টুপুর শব্দে যত জল পড়ে, যত রক্তপাত হয়
আমার আত্মায় তত বৃক্ষ বাড়ে, বোধিদ্রুম বেড়ে ওঠে
তত পাতা নড়ে—
আমি তত আদিম অহং নিয়ে জেগে উঠি সমতট জুড়ে

তৎকালীন পূর্ববাংলার বাইরে তাঁর অবস্থান ও শিক্ষা লাভের অভিজ্ঞতা সুরাইয়ার বিশ্ববীক্ষাকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা। যে কারণে ষাটের দশক জুড়ে পশ্চিমাবিশ্বে যে প্রতিষ্ঠান বিরোধী উন্মাতাল শিল্পচর্যার তরঙ্গ বইতে শুরু করেছিল, সেটি স্পর্শ করেছে তাঁর মননকেও। দুনিয়া জুড়ে লেখকেরা তখন প্রশ্ন করছেন, বর্জন করছেন প্রতিষ্ঠিত সামাজিক-রাজনৈতিক ও শৈল্পিক মতবাদ ও বয়ানগুলোকে। নারীবাদের বিকাশ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে সোচ্চার হচ্ছেন তারা। সুরাইয়া খানমের কবিতার দিকে তাকালে আমরা প্রতিবাদের, সাহসের সেই ঋজু স্বর পাই। তাঁর কবিতা যেমন খানিকটা নিভৃতে গুনগুন করার, তেমনি কণ্ঠ ছেড়ে উন্মুক্ত পাঠের দাবীও রাখে। স্পষ্ট এবং আধুনিক।
প্রিয় সুরাইয়া, আপনার লেখা কবিতা থেকে আমার হৃদয়ের কাছাকাছি বেশ কয়েকটি কবিতা দিয়ে শেষ করছি এই নাতিদীর্ঘ লেখা। আপনাকে ভালোবাসা।

 

হারিকিরি শপথ

মাতাল ঘণ্টা বাজুক, ভাঙুক অমর খিলান
আমার তো আছে অমোঘ ওষুধ
হারিকিরি শুধু হারিকিরি কোরে মরবার।
যে পারে পারুক, সর্ববেভা, আমার কী তাতে?
যে পারে গড়ুক অমর সমাধি, আমার কী আসে!
আমি কি বলেছি জনক জননী!— জন্মাতে চাই?
আমি কি বলেছি খুদকুড়ো খাব, খুঁটে খুঁটে খাব?
আমি কি বলেছি ভাইয়ের রক্তে আলতা পরব?
আমি কি বলেছি বোনের শরমে শরীর ঢাকব?
আমার তো আছে অমর মুক্তি,
হারিকিরি শুধু হারিকিরি কোরে মরবার।
যে পারে পারুক, নিক পেতে বুক
দাসত্বের ঐ ছররা,
যে পারে করুক, গ্লানি ভুলবার হল্লা,
যে পারে তুলুক মুখোশ ও দাড়িপাল্লা,
আমার তো আছে অমল ধনুক, অনড় শপথ,
হারিকিরি শুধু হারিকিরি কোরে মরবার।

নাচের শব্দ
জোড়া শালিখ নাচে যখন
খয়েরি হলুদ শব্দ হয়
মানুষ পাখি মারে যখন
লাল কালো সব শব্দ হয়
মানুষ মানুষ নাচে যখন
লাল গোলাপি শব্দ হয়
মানুষ মানুষ মারে যখন
তখন নাচের কোন্ সময়!

সোনালি মাছ
ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে
মাথার ভিতর ঘুমের দোলা লাগছে
সোনালি মাছ সাঁতার কাটছে
চক্রাকারে কেবল ঘুরছে,
কেন ঘুরছে সোনালি মাছ?
আমার মাথায় আলোর দেহ ঐ মাছটি কেন ঘুরছে।
ঘুম আসছে, ঐ মাছটি কেন অস্থির ঘুরছে
ছলাৎ ছলাৎ
হঠাৎ হঠাৎ?
রক্তদোলায় নাচের নেশা জাগছে
মাছ নাচছে, একলা একলা
দারুণ বেগে সোনালি মাছ যাচ্ছে।

তৃতীয় বিশ্ব
একটি কালো মানুষের আর্তনাদ
কেউ শুনল না,
কেউ জানল না;
অন্য কালো মানুষের দল
শিকল গলায় পরে ঘেউ ঘেউ তেড়ে এলো!
একটি কালো মানুষের আর্তনাদ
কেউ জানল না,
চাবুকের আঘাতে সে দুমড়ে পড়ল
অন্য কালো মানুষেরা
হাড় চুষতে চুষতে ঘুমিয়ে গেল।
কালো মানুষের আর্তনাদ
তখনও চিৎকার করে অন্ধকার রাতে
নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশনের মতো ফেটে পড়ে
তার আত্মার অমর রশ্মি
কিন্তু আফিম খেয়ে পর্যুদস্ত
কালো মানুষের কলোনিতে
সে প্রতিবাদ পৌঁছল না।
আর্তনাদ! আর্তনাদ! আর্তনাদ!
মা এলো না—
বাবা এলো না—
ভাই, বোন— কেউ না!

প্রশ্ন
মথ পোকা এসে গায়ে বসে কেন,
আমি কি রেশম?
আশা
সোনালি আঙুল মুছে দ্যায় যত মৃত্যুর খতিয়ান
অভিধানে লেখে মানবিক ভাষা আশা
এই তো জেনেছি চিরকাল যুগে যুগে
প্রেমনির্ভর জীবন। জীবন দেখেছি, পেয়েছি অঢেল।
তবু কেন দানবেরা জয়ী? জয়ী হয় যুগে যুগে?
ভয়ে কেন পরাজিত সব ভাষা?
আহামরি কত সেয়ানা শয়তানি
উলটে পালটে তছনছ জনপদ।
এখনো শুনছি আহাজারি করে মরে
পৃথিবী জুড়েই কত বুকভাঙা মাতা
ন্যায়-অন্যায় এ-ও কি এখনো আছে?
প্রেমনির্ভর জীবন কি হলো একেবারে বঞ্চিত?
কোথায় সে সব সোনালি গোলাপি আশা,
মায়ের কোলের অমলিন গানগুলো?
মশালের মতো জ্বলে না কেন যে মানুষের পরিত্রাণ?

হিসাব
হাতে কী আছে?
বয়স? না?
হাতে কী আছে?
প্রেম? না!
হাতে কী আছে?
অর্থ? না!
হাতে কী আছে?
জ্ঞান? না!
হাতে কী আছে?
রূপ? না!
হাতে কী আছে?
প্রতাপ? না!
হাতে কী আছে?
মৃত্যু? না!
হাতে কী আছে?

মায়া কানন
তোমরাও আমাকে ছেঁড়ো
আমিও আমাকে ছিঁড়ি
ডাইনির চাতুরি থেকে
এই মায়াবন থেকে ফিরে যেতে হলে
এসো ছিঁড়ি, ছিঁড়ে টুকরো করি
এই যে শরীরটুকু, কুটিকুটি করি,
গহিন বনের পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাই।
এইভাবে চিহ্ন রেখে যাই তবে।
তবে হয়তো ফিরতে পারব তোমরা ও আমি,
আমি তোমরা ফিরব সেই স্বর্গীয় শহরে,
যেখানে আমার বৃদ্ধ পিতা অন্ধ হয়ে আছেন স্নেহে।
এখন শুধু হাওয়া, বিরোধী বৈরী বাতাস তড়পাচ্ছে আমাকে
এখন শুধু ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে ডাইনির জাদু
ঐখানে
ঐখানে
আমাকে পুষ্ট করা হবে, সেদ্ধ করা হবে
ডাইনির জিভ এখন লোভে টকটকে লাল
আমাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ডাকছে…
এখন কী উপায়
আমি টুকরো টুকরো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
পথে বিছাই, ফেরার ঠিকানা
আবার ফিরব সেই স্বর্গীয় শহরে, সেখানে
সাদরে নেবেন ডেকে ঘরের ছায়ায় বৃদ্ধ পিতা,
গায়ে হাত বুলিয়ে দেবেন, ক্ষতে পটি বেঁধে বলবেনঃ
আয়, আয়, ফিরে আয়, বুকে আ—
হারিয়ে যাওয়া পাতকী আমার সন্তান।
এই স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের মাঝে
আমাদের শুধু বয়ে যাওয়া। বয়ে যাওয়া।

পোড়া রুটি
এরকম ছল কেন, ছলাকলা, ছদ্মবেশ কেন
এ সবে কী প্রয়োজন, সামাজিক হে রাজন, কী প্রয়োজন?
তন্দুরের পোড়া রুটি আমি, দাঁতে ফেলে চিবুলেও গন্ধ পাওয়া যায়—
কতকাল অন্ধ আমি, কাসান্দ্রা আমি, আমি জেদি মেয়ে
এন্টিগোনি, মিডিয়া আমি।
আমি রক্ত দেখতে পাই, জাল দেখতে পাই, একরোখা
অনিবার দেখতে পাই, দেখতে পাই
আমাকে ভুলাতে এই ছল কেন কেন আয়োজন?
লগ্ন আসছে কপাল পোড়ার, তোমারও তো ভেঙে গেছে
কলকব্জা যন্ত্ররথ হাল
ফসকে গেছে তূণ থেকে তির ;
তবু তুমি এই সব কেন আনো, কেন আনো
ভিনদেশি তারাবাতি ফুলঝুরি কেন তোলো? কেন?
আৃার চোখের অন্ধমণি একটুও কাঁপবে না।
আমাকে চিবাও! এসো,
স্বাদ পাবে, অ্যাসিডের স্বাদ পাবে
ছল কেন? ছলাকলা কেন?
কেন প্রেম, প্রেমভাব?
আমাকে চিবাও! এসো!
খুলে যাক পোকাধরা দাঁতের চোয়াল।

বার্টার
কঙ্কালের হাত ধরতে গেলি কেন তুই
তোর কি ছিল না কোনো চলবার বসবার ঠাঁই?
আজকে জবাই হয়ে কাঁদলে লাভ কিছু?
খুঁজে খুঁজে বাজারের কসাইখানায় গেলি, এই তো জবাব।
: কত করে সের ভাই ঐ টকটকে লাল গোস্ত, ঐ কলজেটা?
দাও, দাও, মেধাজ্ঞান বিবেক অমৃত ধ্যান, বদলাবদলি নাও!

মোহক্ষরণ
গাছে বেঁধে মারব তোকে পাষণ্ড প্রেমিক
আমাকে না বলে তুই অন্য পথে গেলি?
আমাকে দাঁড়াতে বলে, জল আনছি বলে
গেলি তুই অন্য কলসি ভরে দিতে, কেন?
চলে যা তাহলে তুই, কোনোদিন এই পথে পা বাড়াবিনে!
আমার দেখানো পথে চলে গেলি
সঙ্গে নিয়ে গেলি মেরে সব জল, সমস্ত আহার!
ফিরেও তাকাস না তবে, কোনোদিন ফিরাব না চোখ,
ধিক্কারও দেব না, ছি ছি তুই তো নির্বোধ।
অনায়াসে ভুলে গেলি কতখানি নিলি,
অভিশাপে তোরও ঝুলি হয়ে যাবে খালি!
তুইও থামবি ক্লান্ত একা, এ জ্বরে পুড়ে যাবি!
পাবি না কাকেও খুঁজে, যেদিকে তাকাবি!
ধুধু করবে, নাচবে সবে জোড়ায় জোড়ায়!
তুই একা পড়ে থাকবি, চেয়ে দেখবি চিতা জ্বলে,
তোরও বুকে কেমব অনল!
সমস্ত অমৃত করে গরল, গরল চলে গেলি?
চলে যা আসিস না আর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি
এই তো এখনি!

দরোজাটা কোথায়
অন্ধ হয়ে গেছি আমি খুঁজে পাচ্ছি না তাই
দরোজাটা কোথায় আমি ধাক্কা দিতে চাই!
ভিতরে কেউ বসে আছে গায়ে রঙিন শাল
গুটিগুটি বসে আছে শীতের সকালবেলা
বুঝতে পারছি আরাম পাচ্ছে, সঙ্গে আছে কেউ।
তবু একলা অন্ধ আমি আঘাত দিতে চাই।
সুখে আছে, ওর দরোজায় কড়া নাড়তে চাই
দরোজাটা কোথায়?— আমি ধাক্কা দিতে চাই।

ইনটেরোগেশন
সাতটা অন্ধ বামন, আমাকে হাতড়ে হাতড়ে দেখল
সাতজন সাত রকম করে দেখল
রেগে গিয়ে গেঁথে দিল
বুকের মধ্যে বিষাক্ত সাতটা সুঁচ
সাতটা লাথি মারল আমাকে
এবং আমাকে দিল সাতবার চুমু
সাতটা অন্ধ বামন।
অন্ধের মতো জিগ্যেস করছিলঃ
এই বল্, বল তুই কে, কে তুই?
আমি তখন আকাশে মাথা রেখে শুয়ে আছি
আমার চুলে খেলা করছে সাতটা তারা।

বিলুপ্ত নক্ষত্র
চাঁদ চাতালের ধারে
বিদ্যুতের লতা ঘেরা কালো ও বাগানে
ঘুরতে ঘুরতে সহসা একদা
পিয়ের কুরীর মতো আমিও সহসা
রেডিয়াম খুঁজতে খুঁজতে গাড়িচাপা পড়ব তো নিশ্চয়ই।
তবু যদি আর কেউ
প্রাপ্তি পায়, সম্মানিত হয়
তবে কি উল্লাসে তৃপ্ত নয়
খসে পড়া
বিমোহিত
বিলুপ্ত
নক্ষত্র?

বাগান
বাগানে নাচছে ওরা
বাগানের বাজুতে মালতীঃ
বাগানের বুকে পদ্ম;
বাগানের শিয়রে কদম!
বাগান যে ধ্যানমগ্ন
ভুলে গেছে পুষ্পলগ্ন
ভুলেছে বসন্তক্ষণ;
ভুলেছে কুসুম তনু
ভুলেছে বিন্যাস!
সে কথা জানে না ওরা
নাচছে বাগানে!

 

 

সাবেরা তাবাসসুম

পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার হাত ধরেই কবিতার সাথে আজন্ম সখ্য। কবিতা, অনুবাদ,
প্রবন্ধ/নিবন্ধ, সংগীত, সিনেমা ও চিত্রকলা নিয়েই তার সৃষ্টিশীল জগৎ। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের
সংখ্যা সতের। চৌদ্দটি মৌলিক কবিতাগ্রন্থ এবং তিনটি অনুবাদগ্রন্থ।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top