“প্লেনের আছে কতক্ষণ?”
উতলা হওয়ার কিছু নাই। আরও ৫০/৫৫ মিনিট আছে। চল যাই ঐ গেটের কাছেই গিয়ে বসি?
“চিয়াংমাইয়ে কী কী করব, তা কি ঠিক করছো?”
মোটামুটি একটা প্ল্যান আছে মাথায়। আগামীকাল চিয়াংমাই শহরেই ঘুরব। তারপরের দিন কোনো একটা ট্যুর নিয়ে যাব বাইরে?
“বলছিলা না, ওটা পাহাড়ি এলাকা? ট্যুরে গিয়ে পাহাড়ে-টাহারে চড়তে পারব না কিন্তু।”
চলেই এসেছিল কথাটা মুখে। কপাল ভালো, জোর ব্রেক কষে থামিয়েছিলাম ওটা গলার মধ্যেই। মানে, বলেই ফেলেছিলাম, এই ভ্রমণের পরিকল্পনার সময় যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, সমুদ্র না পাহাড়? তখন তোমার কথামতোই ফুকেটের বীচ বাদ দিয়ে, এই পাহাড়ি এলাকায় আসব ঠিক করেছিলাম। বললেই চিয়াংমাইয়ের বিসমিল্লাহতেই হতো গলদ!
হুম, তা তো জানিই। তদুপরি তোমার পায়ের চিকিৎসা করার জন্যই তো আসা। পাহাড়ে চড়তে হয় না এমন ট্যুরই নেব।
“এয়ারপোর্ট থেকে কতক্ষণ লাগবে হোটেলে পৌঁছাইতে?”
অনলাইনে ঘাঁটাঘাঁটি করে বুঝেছি কাছেই হোটেলটা। ৪/৫ কি.মি. মাত্র। জ্যাম যে কেমন? জ্যাম না থাকলে দশ মিনিটেই পৌঁছাইয়া যাওয়ার কথা।
“আরও সামনে গিয়ে কী লাভ? ঐদিকে তো কোনো সিটই ফাঁকা নাই। এখানেই ফাঁকা সিট পাওয়া গেছে যখন, বসে পড়ি না কেন?”
কথা যৌক্তিক! অতএব নিজেদের গেটের মুখে না গিয়ে, খানিকটা দূরেই নিলাম দখল খালি চেয়ারের তিনজনে। পরিষ্কার চোখ রাখা যাচ্ছে এখান থেকেই চিয়াংমাইগামী ফ্লাইটের গেটের গতিবিধি।
নাহ, কোনো গড়বড় হয়নি ফ্লাইটের সময়ে। কাটায় কাটায় সাড়ে সাতটাতেই থাই এয়ারের এয়ারবাস এ ৩৩০-৩০০, রেশমি ডানা মেলার তোড়জোড় শুরু করল। একেবারে ভরা পেট নিয়ে পাখা মেলা এই ফ্লাইটে, আন্দাজ, শ তিনেক যাত্রী।
আমরা তিন বাঙালি বাদে, বাকি সবাই সাদা নয়তো হলুদ। তবে সাদাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিমিষেই করল ঘোষণা, কতটা জনপ্রিয় এই রুট ইউরোপিয়ান-আমেরিকানদের কাছে। ব্যাংককে কী জন্য তাদের তুমুল পদচারণা, এটা জানি। চিয়াংমাইয়েও কি যাচ্ছে এরা সেই একই মধুর সন্ধানে?
এইই হয়ে থাকে স্বল্প সময়ের ফ্লাইটে। মানে উপরে উঠে থিতু হয়ে উড়তে শুরু করতেই, যেই না বিমানবালারা যাত্রীদেরকে হালকা স্ন্যাক্স বিতরণ শেষ করে, ঠিক তখনই হয়ে যায় নিম্নগমনের পালা।
কাটায় কাটায় পৌনে নয়টায়, ডানা গুটিয়ে নামল থাই, চিয়াংমাইয়ের মাটিতে। সিট যেহেতু পড়েছে ফ্লাইটের মাঝামাঝিরও বেশ ক-সিট পেছনে, অপেক্ষায় থাকলাম সামনের সকলের নেমে যাওয়ার।
এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির আকার, ব্যস্ততা ও সাজসজ্জা বলছে, ঢের ঢের বড় এটি আমাদের দ্বিতীয় বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানতের চেয়ে। সুবর্ণভূমিতে অপেক্ষায় থাকার সময় গুগলিং করে জেনেছিলাম, বছরে লাখ বিশেক ভ্রমণার্থীর আগমন-নির্গমন ঘটে এই বিমানবন্দরকে ঘিরে।
ব্যাংককে ইমিগ্রেশন করে ফেলায়, নাই সেই হ্যাপা। গোটা বিকেল সুবিশাল সুবর্ণভূমিতে কাটিয়ে এখন এখানে নামার পর মনে হচ্ছে, সবকিছুই আছে হাতের নাগালে। ধরতে পারি সবই হাতের মুঠোয়। বেশ চুপচাপ, শুনশান আবহ। দ্রুতই চলে আসলাম তিনজনে ব্যাগেজ সংগ্রহের বেল্টের কাছে।
ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতাও চমৎকার এদের। ফলে গিয়েই ব্যাগ না পেলেও, ধৈর্যচ্যুতি ঘটার মতো দেরি হয়নি মোটেও। হৃষ্টচিত্তে দুই ট্রলিতে ব্যাগ-সুটকেস বোঝাই করে, হেলেন আর আমি ও দুটোকে ঠেলে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে যাওয়ার পথেই মিলল দেখা, এখানকার স্বাগতম স্ট্যান্ডের।
ইংরেজিতে লেখা এয়ারপোর্টস অব থাইল্যান্ড পাবলিক কোম্পানির লোগো ঘোষণা দিল, স্ট্যান্ডটি তাদের সৌজন্যে বানানো। মাঝে নানান আকারের সাদা ও ঘিয়া রঙের ছাতা দেয়ালে সাঁটিয়ে, দুই পাশে রংবেরঙের কাপড়ের তৈরি লাইটশেড ঝুলিয়ে, মেঝেতে প্লাস্টিকের সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে, সেটির ওপর প্লাস্টিকের নানান রঙের ফুলের টব দিয়ে সাজানো আয়তাকার এই স্ট্যান্ডটিতে প্রাকৃতিকভাব আনার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে।
দেয়ালে বড় বড় থাই বর্ণে কী যে লেখা আছে? ধরে নিয়েছি লেখা, সোয়াজদিকা/সোয়াজদিকাপ জাতীয় কিছু। নাহ, মুগ্ধ হওয়ার মতো কিছুই না স্ট্যান্ডটা। কিন্তু এরই মধ্যে শক্তিশালী সহযাত্রীদ্বয় জানাল, ছবি তুলতে হবে ঐ স্ট্যান্ডে।
বিনাবাক্যব্যয়ে তাই খিঁচে ফেলালাম তিনজনেই, দুজন দুজন পারমুটেশন-কম্বিনেশনের কয়েকটা ছবি। স্ট্যান্ডটি শিল্প হিসেবে উত্তীর্ণ না হলেও, ডকুমেন্টেশনের জন্য অবশ্যই পারফেক্ট। মাছিমারা কেরানির ডকুমেন্টে খুঁজেছে, কে কবে শিল্প বা সাহিত্য?
দ্রুতই চলে এসেছি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। সাদা শার্ট, নীল প্যান্ট পরা, ওয়াকিটকি নিয়ে মোটাসোটা এক প্রৌঢ়া এসে, কী যে বলল জানি না! তবে আমাদের ট্রলির দিকে তাকিয়ে যখন বললেন,
“নো ট্যাক্সি! ভ্যান, ভ্যান!”
বুঝেছি তাতে, আফায় সমজদার।
দ্রুত তাকে, “ইয়েস, ভ্যান,” বলেই যোগ করলাম, হ, ভইন, ঠিকই ধরছো, ভ্যানই লাগব। এই নাও ঠিকানা—বলে বুকিং ডটকম থেকে পাওয়া হোটেল রিজার্ভেশনের ডকুমেন্টটা করলাম হস্তান্তর।
একনজরে কাগজটা দেখে, “ওকে, ওকে,” বলে ফিরিয়ে দিতে দিতে ওয়াকিটকিতে ডাকলেন আফায় কাউকে, মাতৃভাষায়। এরপর পকেট থেকে একটা থাই ভাষায় লেখা রসিদ বের করে, তার ওপর বলপেনে খসখস করে ৫০০ লিখে দিলেন আমায়।
অনলাইনে আগেই খোঁজ নিয়েছিলাম। জানি তাতে ৪০০/৪৫০ বাথ হওয়ার কথা ভাড়া। আচ্ছা, একটু দরদাম করব নাকি?
কিন্তু সেই ফুরসত কই? আফায় তো ব্যস্ত হয়ে গেছে আরেক যাত্রীর সঙ্গে। আর কোনো অপশনও তো দেখছি না। হুম, ফোনে তো উবার আছে। উহ! ওয়াই-ফাই তো নাই!
তাও কপাল ভালো যে ঢাকার ট্যাক্সিওয়ালাদের মতো মওকা পেয়ে, এই রাতে তিন বা চার গুণ ভাড়া যে চায় নাই। অবশ্য শুধু যে তা আমাদের দেশেই হয়, তা তো নয়। একই রকম বদ অভিজ্ঞতা বেশ কয়েকবারই হয়েছে, বিশেষত কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে।
এরই মধ্যে পার্কিং লটের ডান দিকের অন্ধকার ফুঁড়ে, হুঁশ করে হাজির হয়েছে, উঁচু কপালের সাদা একটা মাইক্রোবাস। থমথমে মুখের মধ্যবয়সী এক পুরুষ, ড্রাইভিং সিট থেকে লাফিয়ে নেমে, হেলেনের হাত থেকে ট্রলিটি নিয়ে ভ্যানের পেছন দিকে চলে যেতেই, অনুসরণ করলাম ট্রলি ঠেলে আমিও।
দুজন মিলে ঝটপট করে সুটকেস-ব্যাগ তুলে দিয়ে, সামনে এসে পাশের দরজা খুলে দিতেই, হেলেন আর লাজুকে বললাম, উঠো তোমরা পেছনে। আমি বসব ড্রাইভারের পাশে।
ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে, ফের হোটেলের ঠিকানা লেখা কাগজটা ড্রাইভার ভাইজানের দিকে এগিয়ে ধরতেই, একনজর দেখে “ওকে! ওকে!” বলতেই বুঝলাম, নাহ, তারকা সংখ্যা যাই হোক, একদম অখ্যাত নয় হোটেলটা।
বেশ সস্তায় না, বলা চলে অভাবিত রকমের সস্তায় পেয়েছিলাম হোটেলটা। বুকিং ডটকমের বেশ পুরোনো মেম্বার বলে কি না জানি না, ৭০% ডিসকাউন্ট দিচ্ছে বলে জানিয়েছিল সিস্টেম, বুকিংয়ের সময়। সেসময় জিতে গেছি মনে হলেও, এখানে নামার পর থেকেই, লাগছে সন্দেহ। মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই হবে ওটা কোনো অখ্যাত হোটেল। পায় না কাস্টমার। তাই ডিসকাউন্টের টোপ ফেলে।
সাধে কি আর ব্র্যান্ডেড কোম্পানির ঝানু বিপণনবিদরা দাম কমিয়ে পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টায় বিরত থাকে? কথা তো আছেই, প্রাইস ইটসেলফ কমিউনিকেটস কোয়ালিটি। অবশ্য ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের আফার ও ড্রাইভার ভাইজানের দেহভঙ্গি বলছে না, অখ্যাত কোনো হোটেল, হোটেল টেন।
একই সঙ্গে পড়ল মনে। নাহ, শুধু কম দাম দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়িনি তো বুকিং দিতে গিয়ে। সময় নিয়ে পড়েছি হোটেলটি সম্পর্কে লেখা কাস্টমার রিভিউ ও রেটিং। দশে আটের নিচের রেটিং যেসব হোটেলের, ওগুলো ধর্তব্যেই আনিনি। শুধু রেটিং না, পড়েছি মন্তব্যও। তদুপরি বুকিং ডটকম তো কোনো অখ্যাত সাইটও না। নাহ, ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা কমই।
এয়ারপোর্ট এলাকা ছেড়ে, শহরমুখী রাস্তায় উঠতেই মনে হলো, নাহ, আমাদের পাহাড়ি শহর চট্টগ্রামের বিমানবন্দরের চেয়ে ঢের বড় ও ব্যস্ত বিমানবন্দর থাকলেও, এই শহর বন্দরনগরীর তুলনায় অনেক শান্ত ও সুবোধ। সে দিক থেকে এর তুলনা চলে বাংলার আরেক পাহাড়িকন্যা, সিলেটের সঙ্গেই। রাতের বেলায় ওসমানী বিমানবন্দর থেকে মালনীছড়া চা বাগানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়, চমৎকার যে নীরবতার দেখা মেলে, লাগছে ঐরকমই কিছুটা। তবে অবশ্যই চা বাগান পড়ছে না চোখে।
মিনিট ৫ কি ৭-এর মধ্যে, গাড়ি শহরের এমন এক শুনশান এলাকায় ঢুকল, মনে হলো গোটা এলাকাটা ঢুলুঢুলু করছে ঘুমঘুম চোখে! চারদিকে সবুজের কমতি নাই। রাস্তার লাইটগুলো জ্বলছে টিমটিম। লোকজনও দেখছি না। গাড়িও নাই তেমন। নাহ, এ তো সিলেট না! বলা চলে বরং এ হলো চাঁদপুর বা ঠাকুরগাঁও শহরের রাতের বেলার কোনো আবাসিক পাড়া।
পড়ল চোখে এসময়, বাঁ পাশে, মানে বসেছি আমি যে দিকে, সেদিকের একটা গলির মুখে হোটেলটির নাম লেখা ছোট সাইনবোর্ডটি। তীরচিহ্নও আছে দেওয়া। দেখতে দেখতেই হুঁশ করে গাড়িটি পেরিয়ে গেল ওটা। হাহাকার করে ড্রাইভার ভাইজানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পেছনের দিকে করলাম অঙ্গুলি নির্দেশ।
“ওকে, ওকে,” বলে ততক্ষণে ড্রাইভার এর পরের গলিতে ঢুকিয়ে দিল গাড়ির নাক। বুঝলাম, মোটেও করেনি ভুল ড্রাইভার। এই এলাকার নানান পথ ও গলির আঁতিপাঁতি জানেন ভাইজান ভালোই।
দেড় গাড়ি যাওয়ার মতো সরু রাস্তা ধরে, কয়েকটা গলি পেরুতে পেরুতে মনে হলো, এ আসলে পুরোপুরি আবাসিক পাড়াই। গাছগাছালিসমৃদ্ধ পাড়াটির বেশির ভাগ বাড়িই মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা চলছে তাদের ঘুমানোর তোড়জোড়।
ততক্ষণে গাড়ি এসে থেমেছে, আধুনিক স্থাপত্যের চমৎকার একটা সাদা দালানের সামনে। কোথাও কেউ নেই এখানে। দালানটিতে ঢোকার জন্য, দুদিকে আছে দুটো হাঁটার পথ। বাকি চত্বরটায় ছোট ছোট পাথর বিছানো। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে দিচ্ছে উঁকি, হাঁটুসমান উঁচু নানান ধরনের ফুলগাছ। ছোট ছোট কাঠের গোল টুলের মতোও আছে গাছের ফাঁকে ফাঁকে।
দেয়ালের গায়ে মাঝারি একটা সাইনবোর্ডে অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে সাদা জমিনের ওপর সরল সোজা ইংরেজি অক্ষরে লেখা “হোটেল টেন”। তিন দিক থেকে গলি এদিকে গড়িয়ে এসে, এই চত্বরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ায়, এই পাড়ার একটা ত্রিমোহনায় আছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে হোটেলটা। নরম আলো জ্বলছে চত্বরটায়। বাইরের মূল রাস্তার শান্ত সমাহিত ভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানকার আলোগুলোও জ্বলছে টিমটিম।
নাহ, এক দেখায় পছন্দ হয়ে গেল বুটিক বুটিক ভাবের হোটেলটি। এরই মধ্যে ড্রাইভার ভাইজান, গাড়ির পেছনে গিয়ে নামাতে শুরু করেছে ব্যাগ-সুটকেস। অতএব তাকে সাহায্য করার সঙ্গে, নিজেদের জিনিস বুঝে নেওয়ার খাতিরে যোগ দিলাম আমিও। যাওয়ার সময় গাড়ির মাঝামাঝিতে থাকা দরজাটি খুলতেই, দ্বৈতকণ্ঠের প্রশ্ন এলো—
“চলে আসছি নাকি?”
হ্যাঁ বলে তাদেরকে নামার জন্য তাড়া দিয়ে, ড্রাইভার ভাইজানের কাজে হাত লাগানোর সঙ্গে বুঝে নিলাম মালসামান। রাখা হয়েছে সবগুলোকে বাঁ দিকে হোটেলে ঢোকার যে হাঁটার পথ আছে, তারই মুখে।
ভাড়া নিয়ে ড্রাইভার চলে যাওয়ার পরও থাকলাম মিনিট দুয়েক অপেক্ষায়। নাহ, ভেতর থেকে কোনো বেলবয় বা পোর্টার এলো না। অতএব লাজু ও হেলেনকে পাহারায় রেখে হাঁটার পথ ধরে এগুতে এগুতে ভাবছি, সামনে তো দেখছি স্টিলফ্রেমে বাঁধানো কাঁচের দেয়াল, দরজা কোথায়?
ভাবতে ভাবতে সেই কাঁচের দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়াতেই, আলিবাবার চোখের সামনে পাহাড়ের গায়ে মিশে থাকা গায়েবি দরজার মতো সরে গেল দুদিকে দুটি পাল্লা স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তবে আউড়াতে হয়নি আমাকে চিচিং ফাঁক বা খুল যা সিম সিম!
আশ্বস্ত হয়ে ভেতরে পা রেখে বাঁয়ে চোখ দিতেই লম্বা টানা রুমটার মাঝামাঝি থেকে শুরু করে শেষ মাথা পর্যন্ত দেখলাম পরিপাটি করে সাজানো, তিন সারি চেয়ার-টেবিল। প্রতিটিতে বসতে পারে চারজন। আর এই অংশের উল্টোদিকের দেয়ালের গায়ে দরজা ও কাঁচঘেরা কাউন্টার দেখে আন্দাজ করলাম ওটাই রিসেপশন। কিন্তু গোটা রুমটাই করেছে খাঁ খাঁ! আলো না থাকলে তো মনে হতো, হয়েছি হাজির শুনশান ভূতুড়ে দালানে।
এর মানে কী? জানি নিজের কাজ নিজে করিতে শরম নাই। সেই নিয়মেই না হয় নিয়ে আসলাম ব্যাগ-সুটকেস সব, কিন্তু রুমের চাবি পাব কোথায়? আচ্ছা গলা উঁচিয়ে বলব নাকি,
“হ্যালো, এনিবডি দেয়ার?”
নাহ থাক, শব্দ করে শান্ত সমাহিত ভাবটির কোনো বিঘ্ন ঘটানোর দরকার নাই। আগে তো নিয়ে আসি ব্যাগ-সুটকেস সব।
দ্রুত বাইরে এসে সবচেয়ে ভোমা দুটো সুটকেস টেনে এগুতে এগুতে বললাম দুজনকে, যদি পারো ছোট ব্যাগগুলো নিয়ে আসো। লোক নাই এখানে কোনো। সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই ছোট সুটকেস দুটো টেনে এগুতে শুরু করতেই, চার সুটকেসের চাকার খরখর আওয়াজে ভঙ্গ হলো নীরবতা।
কাউন্টারের সামনের ফাঁকা জায়গায় সুটকেস দুটো রেখে, পিছু পিছু আসা লাজু-হেলেনকে সুটকেস রেখে, কাউন্টারের উল্টো দিকের দেয়ালের সঙ্গে বসানো অ্যান্টিক চেহারার লম্বা হাতলওয়ালা টুলে বসতে বলে, গেলাম ফিরে, বাকি বড় সুটকেস ও পিঠব্যাগ দুটো আনতে।
“কেউ নাই এখানে! কে দেবে আমাদের রুম?”
ফিরতেই মুখোমুখি হলাম অনিবার্য এ প্রশ্নের। আছে তা আমারও মনে।
অতএব কিছু না বলে চারদিকে তাকিয়ে ফের যখন ভাবছি, “এনিবডি দেয়ার” নিনাদে ভঙ্গ করি নীরবতা, তখনই দেখতে পেলাম, কাঁচের কাউন্টারের সামনের তাকে লাগানো, দুটো হলুদ রঙের পোস্ট-ইট স্লিপ হাসছে এদিকে তাকিয়ে।
বলপেনের কালিতে স্মাইলি ইমোজি আঁকা। বাঁ দিকের স্লিপটাতে একটু বড় অক্ষরে লেখা—
“ওয়েলকাম, মি. সেলিম!”
নিচে অপেক্ষাকৃত ছোট অক্ষরে লেখা, “হিয়ার ইজ ইউর রুম কি। এনজয় ইউর স্টে। সি ইউ টুমরো মর্নিং।”
একই সঙ্গে স্লিপটার নিচে মুখবন্ধ খাম দেখে, মনে মনে ইউরেকা বলে খামটি হাতে নিতেই ওজনে বুঝলাম, অন্তরে তার আছে রুমের চাবি। তার মানে হিজ হিজ হুজ হুজ মার্কা এই হোটেলে, সবই করতে হবে নিজে নিজেই।
সঙ্গে সঙ্গেই রুমের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন দুজনকে, চাবি দুটো বের করে দেখিয়ে করলাম আশ্বস্ত। সমস্যা হলো, লিফট আছে কোনদিকে? ভাবতে ভাবতে ঐ পাশে বিছিয়ে রাখা টেবিল, ফ্রিজ, আর চা-কফির সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা অংশটার দিকে এগুতেই, বাঁ পাশের কাঁচের দেয়ালটা খুলে গেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
দেখা পেলাম তাতে আরেকটা করিডোরের। দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকা করিডোরটি এই রুমের দরজায় ঠেকা খেয়ে থামায়, নিচের তলাটা মনে হচ্ছে ইংরেজি “টি” বর্ণের আকারের। এইমাত্র খুলে যাওয়া দরজা পেরিয়ে এগুতেই মিলল দেখা ওপরে ওঠার সিঁড়ির। নাহ, লিফটের চিহ্নমাত্র নাই!
হুম! উঠতে হবে তবে সিঁড়ি ভেঙেই! লাজুর আছে পায়ে সমস্যা! সঙ্গে আছে তিন তিনটা ভোমা সুটকেস। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, চাবির সঙ্গে লাগানো রুম নম্বর বলছে, উঠতে হবে কমপক্ষে ৪ তলা। কপাল খারাপ হলে পাঁচ তলা।
এটা একটা কথা হলো! ভাবে, ভঙ্গিতে, চেহারায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিমছাম এই দালানটিকে একদম আনকোড়া নতুন না মনে হলেও, বয়স হতে পারে এর খুব জোর দুই কি তিন বছর! এই সময়ে লিফট ছাড়া চার-পাঁচ তলা বানায় নাকি কেউ?
কোন ডিজাইনারের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়েছে এই প্ল্যান? ঢাকায় আমাদের ফ্ল্যাট তো দোতলায়। তাতেই ওঠে লাজু লিফটে, হাঁটু আর পায়ের সমস্যার কারণে। এখন যদি ও বলে বসে, উঠতে পারব না সিঁড়ি বেয়ে অত ওপরে, করবটা কী?
মগজের নিউরনে চলছে সুকুমার রায়ের “বিষম চিন্তা”র আবৃত্তি।
“মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার।”
হ্যাঁ, শূন্য এই ঘরের দেয়াল, টেবিল, চেয়ার, রেক—এদের কাছে উত্তর চেয়ে তো লাভ নাই। মেজাজ তাই খারাপ হলো বুকিং ডটকমের রিভিউয়ারদের মধ্যে, যারা কমেন্ট লিখেছে তাদের ওপর। একজনও লিখেনি যে এই হোটেলের সবই ভালো হলেও, সমস্যা একটাই! তা হলো লিফট নাই! হায়রে, এই রাতে চেক-ইন করতে এসে জনশূন্য এই হোটেলে পড়লাম এ কোন বিড়ম্বনায়?
অবশ্যই চটকাতে পারি এখন কমেন্টকারীদের পিণ্ডি। গোষ্ঠীও উদ্ধার করতে পারি এই দালানের স্থপতির। ছিঁড়তে পারি এরই মধ্যে প্রশস্ত হয়ে ওঠা কপালের ওপাশে, আছে যে ক’টা চুল, তাও। অবশ্য ঐ চুলগুলো যে রকম ছোট, ছিঁড়তেও যে কষ্ট হবে, আর সময় যা লাগবে, সেই সময়ে, তার চেয়ে কম কষ্টে সম্ভবত ওঠা যাবে ওপরে। তারচেয়ে বরং তেতো এই সংবাদকে ভালো মতো সুগার কোটিং করে গেলাই গিয়ে ওদেরকে!
যাবতীয় রাগ, হতাশা, বিরক্তি চুপচাপ গিলে ফেলে, ফিরে এসে হাসতে হাসতে বলি—
চমৎকার না হোটেলটা? বেশ ছিমছাম, আধুনিক ডিজাইন! এগুলির নাম বুটিক হোটেল। আজকাল এই জাতের হোটেলগুলো বেশ জনপ্রিয়। রিভিউতে দেখেছি ইউরোপিয়ানরা তুমুল প্রশংসা করেছে এটার। দেখলে না, ড্রাইভার কী সহজে পেয়ে গেছে! বিরাট ডিসকাউন্টও দিয়েছে। পয়সা বেঁচেছে ভালোই।
অযাচিতভাবে একটানা আমাকে এসব বলতে শুনে, কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে দুজন। নাহ, আর ঘোরে ফেলার দরকার নাই। বলেই ফেলি আসল কথা এবার। কাঁচুমাচু করে বললাম, এখন যে তোমাদের হেল্প দরকার, আমার?
“কী কী করতে হবে? কী হেল্প? সমস্যা কী?”
না মানে, বুঝতে পারি নাই বুকিং দেওয়ার সময় যে, এইরকম একটা নতুন হোটেলে লিফট থাকবে না! সেই জন্য বলছি, লাজু তুমি আস্তে আস্তে উঠে যাও ওপরে। হেলেন যদি পারিস, তুই শুধু পিঠব্যাগগুলো নিয়ে ওঠ। বড় বড় ব্যাগ-সুটকেস সব আমিই তুলব। তাতে লাগে লাগুক যতক্ষণ।
“ওহ! তাই নাকি? কয় তলায় উঠতে হবে। চাবিতে তো দেখতেছি লেখা, ৪০১ আর ৪০৩।” আর্তনাদ লাজুর কণ্ঠে।
“হায় আল্লাহ! কস কি? থাক, কী আর করা। দেখি, আমিও তোকে হেল্প করব। ভাবীর পায়ের সমস্যা, তার কোনো কিছু নেওয়ার দরকার নাই!” বলল হেলেন।
আচ্ছা, আরেকটা ব্যাপার হতে পারে। এখনই তোদের ওপরে যাওয়ার দরকার নাই। আমিই গিয়ে রেখে আসি ব্যাগগুলো ওপরে। দুজনেই তোমরা এখানেই থাকো। খাওয়ার জন্য তো যেতে হবে রেস্টুরেন্ট খুঁজতে। খালি খালি দুইবার ওঠানামার দরকার নাই।
“না, না, তা হবে না। একটু ফ্রেশ হতে হবে না? সমস্যা নাই। ওপরে যেতেই হবে। তারপর না হয় নামব ফের।” একাট্টা, একমত, এককণ্ঠ উত্তর এলো দুজনের কাছ থেকেই, থাকুক যতই না নিজেদের মধ্যে সামাজিক নিয়ম মেনে সম্পর্কগত কারণে ঠান্ডা যুদ্ধ।
ঝাড়া চল্লিশ মিনিট ব্যয় হলো! ঘেমে-নেয়ে হাঁফিয়ে, কেশে, ককিয়ে, তিনটা ভোমা সুটকেস তুলতে। ভাগ্যের একটু সহায়তা পেলাম এই যে, পাঁচ তলায় নয়, চারেই পেলাম রুমগুলো।
লাজুও ধীরেসুস্থে মিনিট দশ কি পনের খরচ করে, ওপরে উঠে ঢুকল রুমে। অভাবিতভাবে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার পর, সবচেয়ে ভালো খবর হলো, রুম, টয়লেট, রুমের সঙ্গে চমৎকার একটা ঝুলবারান্দা, ধবধবে সাদা টানটান করে চাদর বিছানো বিছানার পাশের মজুত পানির বোতল, দেয়ালজুড়ে লাগানো বিশাল এলইডি টিভি, নিঃশব্দে চলমান এয়ার কুলার দেখে, মুগ্ধ দুজনেই।
বিছানায় বসে হাঁফানো শেষ করে, দম ফিরে পেতেই, মনে হলো নাহ, নিচে গিয়ে একটু সিগারেট টেনে আসা যাক।
নাহ, শুধু সিগারেট টেনেই ফেরার দরকার কী? ওরা দুজন যেহেতু ঠিক করেছে গোসল-টোসল করেই বেরুবে খেতে, এই ফাঁকে একটু চক্কর দিয়ে আসি না মূল রাস্তায়। একদম পাড়ার ভেতরে হওয়ায় এখানে নিশ্চয়ই কোনো রেস্টুরেন্ট নাই।
বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে, লাজুকে উঁচু গলায় এ সিদ্ধান্ত জানাই। এরপর দ্রুত নিচে নেমে, বাইরের পাথুরে বাগানের চত্বরে বসানো একটা টুলে বসে, সিগারেট ধরাতেই, চিয়াংমাইয়ের মৃদুমন্দ শীতল দক্ষিণা হাওয়া বলে উঠল ফিসফিস—
“সোয়াজদিকাপ!”
সেলিম সোলায়মান

সেলিম সোলায়মান একজন সমকালীন ভ্রমণলেখক। ঝরঝরে গদ্যশৈলী এবং আড্ডার মেজাজে দেশ-বিদেশের ভ্রমণ, মানুষ ও জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তুলে ধরাই তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে চীনভ্রমণ তাঁর লেখালেখিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে আছে।
চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া সেলিম সোলায়মানের লেখালেখির সূচনা স্কুলজীবন ও পাড়ার ক্লাবের দেয়ালপত্রিকায়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর লেখালেখি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কর্মজীবনের প্রয়োজনে ও ব্যক্তিগত আগ্রহে তিনি দেশ-বিদেশের নানা স্থান ভ্রমণ করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে রাতের বেইজিং এবং, পিকিং মানবের দেশে, তিয়েন আন মেনে পথ হারিয়ে, ডটার অব স্টোন ফরেস্ট, কুনমিং থেকে কুমিল্লা, ফরাসি সৌরভের দেশে দিয়াঞ্চির তীরে, নি হাও মেইড ইন চায়না এবং প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত।
