পাখির তসবির
তুমি আর আমি
পাখির তসবির নিয়ে বসে আছি
ঐ যে অদূরে।
আমরা আমাদের ছবি তুলছি
অন্য দালানে বসে বসে।
যাদের ছবি তুলছি
তারা আছে অন্য দালানে।
তুমি আর আমি
পাখির তসবির নিয়ে বসে আছি
বারান্দার পাড় ঘেঁষে প্রবাহিত
আকাশনদীর পরপারে—
বৃষ্টিভেজা দালানের রেলিঙের ধারে।
অনিত্যের রূপ
মহাসত্তা চুমু খেলো কপালে আমার। বলল সে, যে-নক্ষত্র বিস্ফোরিত হলো মহাকাশে, ও তেমন ঘটনা কিছু নয়। রূপ যার আছে, তার রূপান্তর আছে।
নক্ষত্রকে এতটা নিকটবর্তী মনে হয়নি আগে।
এরই মধ্যে আসলো ইমেইল। টাকার দেয়ালে ঘেরা ছিল বলে অধিবিদ্যা বিষয়ক যে-নিবন্ধ পাগলের মতো খুঁজে পাচ্ছিলে না কাল, অথর নিজেই সেটা পাঠিয়েছেন তোমার সকাশে। লিখেছেন, সবকিছু মাঙ্গলিক হোক।
মঙ্গলকে এত কাছের মনে হয়নি আগে।
নির্গুণ, নিরঞ্জন চোখ
পর্দা সরাও, মিনাজেল। শান্ত চোখে দ্যাখো তারপর। স্থিরতার দৃষ্টি দিয়ে দৃশ্য ভেদ করো। যেখানে পর্দা নাই, সেখানেও পর্দা আছে— দেখার অপেক্ষা মাত্র। তারপর দেখবে সরে গেছে। একটু আগেও যে-দৃশ্য ছিল না— ফুটে উঠবে। দেখবে অচেনা আলো রেটিনায় সয়ে গেছে— একটি সবুর শুধু।
পর্দায় আসক্ত হয়ো না, মিনাজেল। পর্দাহীনতার ঝোঁক উদ্দেশ্যের পতাকা হয়ে না উড়ুক চোখে। হেন কোনো দৃশ্য নাই যেখানে পর্দা ছিল না। এমন কোনো দৃশ্যরূপ নাই, এখনও যাকে ঢেকে নাই দৃশ্যহীন অরূপ ঝালর। আগে থেকে নির্ধারিত কোনো রূপ প্রত্যাশা কোরো না। আগাম আন্দাজ দিয়ে ধাঁধায়ো না নির্গুণ, নিরঞ্জন চোখ। অতিক্রান্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে রচনা কোরো না দৃশ্যকে। অথবা তাকাও শুধু— দেখার উদ্দেশ্য ভুলে যাও।
জলবোড়া সাপ
জবরদস্ত উপলব্ধির জলজ আগুন জ্বলে উঠল অবশেষে। অন্তর্গত সফরের গহীনে নিমজ্জিত থাক চোখ। ভেসে যাক দৃশ্য দূরদেশে। অল্পস্বল্প দোলা নিয়ে এখানেই জলবোড়া সাপ হয়ে শুয়ে থাকুক ঢেউ। তার নাড়ির টানের মতো স্মৃতি বলতে দেহ, আর নানাবিধ সবুজ সমাজ।
মাঝদরিয়ায়
মাঝদরিয়ায় বসে আছি— হাল-ভাঙা নৌকা, যার মাস্তুল ধ্বসেছে আগেই। এখন সমুদ্র ছাড়া অন্য কিছু ভরসা করি না। অথচ কিছুরই প্রতি অবিশ্বাস আসে না আমার। আকাশে বদলাচ্ছে রঙ দুশ্চিন্তার মেঘ, আর জলস্রোতে আনন্দ-হিল্লোল।
মোরাকাবা
নিজের আসনে বসে বসে
সাতটা ঘরের খালি একটা বাসায়
প্রত্যেক ঘরে আমি তোমাকে দেখতে থাকি
প্রত্যেক দিন, প্রতি রাত;
আর ভাবি, ঈশ্বর আমাকে পথ দেখান—
সহজ-সরল পথ।
অলৌকিক স্টুডিয়োতে
আলোক-লতার মতো উদ্ভাসিত স্মৃতিময় সত্তা এসে, তোমার সরল মুখ এসে, আর্দ্র করে মন। অস্তিত্বের নোনা জলে অভিষিক্ত হতে চায় চোখ। আত্মরক্ষা দায় করে শুকনা হয়ে থাকব বলে সূর্য খুঁজি, সূর্যমুখী খুঁজি। নিরাকার ভবিষ্যতে চোখ মুছে মন শান্ত করে বসে থাকি। মনে পড়ে, প্রেক্ষাপটে গান ছিল। অলৌকিক স্টুডিয়োতে নরম আলোয় ভরা সুর ছিল। অতিক্রান্ত ক্রন্দনের বীজ থেকে অঙ্কুরিত শূন্যলতা ছিল। এখন কিছুই নাই— উদ্ভাসিত উপলব্ধির স্বর্ণলতা ছাড়া।
এখন, এখানে
সরণে-প্রতিসরণে আমি শুধু সরে সরে গেছি। অচেনা দাগগুলো অচেনাই থেকে গেছে। চেনাজানা হয়ে গেছে, জ্ঞান এসে মস্তিষ্কের মেদের তলায় জমে গেছে, এরকম অর্জন হয় নি কখনো— ভাগ্যিস। বাক্য লিখতে লিখতে আজও ভুলে যাই কী যেন লিখতে এসেছিলাম! দাঁড়ি-কমা ভিড় করে ঘিরে ধরে কুকুরের পালের মতন। ইদানীং সংশয় হয়— অতিক্রান্ত অভিজ্ঞতা আরএনএ-ডিএনএ ছাড়া লিপিবদ্ধ হয় কি কোথাও? কে লেখে, কোথায় লেখে, আমি তার খবর জানি না। লিপিবদ্ধ চিহ্নগুলো, অতীতের অ্যানালগ লিপি, আমাকে টার্গেট করে আদালতে সাক্ষ্য দিতে কাজে লাগবে বলে কিছু উকিলের অপেক্ষায় থাকে। শোনো, আমি গতকাল পেরিয়ে এসেছি, আর আগামীকাল অতিরিক্ত দূরে সরে গেছে।
ঘননীল ইলেকট্রিক ট্রেন
বাগানে বেড়াতে এসেছিলাম। এখানে তোমার চোখে আমি নীল প্রেমের কাজল। বাগানে এতেক ফুল, বিষাক্ত সাপ। সবকিছু মায়া দিয়ে, ভয় দিয়ে, ব্যথা দিয়ে মোড়ানো সুন্দর। ভালবেসে ফেললাম সব। সবকিছু সহ্য হয়ে এলো। সবকিছু সত্য হয়ে এলো।
তারই মধ্যে কখন যে বেলা চলে গেল। এখন সন্ধ্যায় দেখি ফেরেশতারা বাগানের গেটে। পরবর্তী স্টেশনের অপেক্ষায় ঘননীল ইলেকট্রিক ট্রেন।
সেখানে তোমার পথ চেয়ে আমি বসে আছি— দ্যাখো!
চুয়াংজু’র প্রজাপতি
তোমরা খুব বাস্তবপরায়ণ। তোমাদের ক্যালেন্ডার আছে; মতাদর্শ ও পরিকল্পনা আছে। অথচ আমি শুধু স্বপ্নেরই মধ্যে শুয়ে থাকি। ঘুমাই। জেগে উঠি। অতিথির মতো।
স্বপ্নের ভেতরে আমি সাদা পোশাকের অস্ত্রধারী পুলিশের মুখোমুখি হই, বিপ্লবপ্রবাহের চলমান ইশতেহার লিখি, এবং উদ্বিগ্ন মনে প্রস্তুতি নিতে থাকি ক্লাসে যাবো বলে।
আমাকে যখন কেউ প্ল্যানমাফিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে, হোঁচট খায় আমার স্বপ্ন-কল্পনা রোদমাখা জঙ্গলের কিনারে অবস্থানরত পুকুরের পাড়ে। ক্লাসরুমে অন্য কেউ ঘুমায় না স্বপ্নের ভেতরে।
তোমরা বরং বেড়াতে এসো। স্বপ্নের ভেতরে আমি তোমাদের হাত ধরে ঘুরতে যাবো বাস্তবের অবকাশ-বনে। কত কিছু দেখব সেখানে। জানি বহু কিছু দেখা বাকি আছে। দেখব প্রজাপতির মসলিনে আঁকানো ডানায় চুয়াংজুর নীল চোখে আমার স্বপ্ন জেগে আছে।
সেলিম রেজা নিউটন

জন্ম:১৯৬৮ সালের জানুয়ারীতে, নিলফামারির সৈয়দপুরে । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করছেন ১৯৯৪ সাল থেকে। আশির দশকে সামরিক-শাসন-বিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিসহ প্রতিগতিশীল বিভিন্ন আনন্দোলনের সাথে যুক্ত শিক্ষক, কবি , লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক সেলিম রেজা নিউটনের প্রকাশিত গ্রন্থ:
অমার মতো ট্রমার মতো; অভ্যাসের অন্ধকার (প্রেম বিয়ে পরিবার ও সম্পর্ক – জিজ্ঞাসা); নয়া মানবতাবাদ ও নৈরাজ্য; গণমাধ্যম পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তুক;অচেনা দাগ (সম্পর্ক স্বাধীনতা সংগঠন );নিউটনের ছেলেবেলা; পরিস্থিতির বিবরণ; ভবিষ্যতের সরকার (মার্কিন ভাষাবিদ, দার্শনিক নোম চমস্কির ‘গভর্নমেন্ট ইন দ্য ফিউচার’ গ্রন্থের ভাষান্তর )।
মানুষ ও প্রকৃতি বিষয়ক ছোটকাগজ মানুষ সম্পাদনা করেন।
