সম্ভবত ১৯৮৮ সাল। যশোর এমএম কলেজের মাঠে দাঁড়িয়ে আছি আমার সহপাঠী পলাশের সঙ্গে। হঠাৎ পলাশ বলল— দোস্ত, সামনে হেঁটে যাচ্ছেন, চিনিস ওনাকে? দেখলাম, লম্বা চুলের এক তীক্ষ্ণদেহী মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন। পলাশ বলল— তুই চিনিস না? তুই তো কবিতা লিখিস। উনি একজন বড় কবি। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হলাম। উনি কবি আজীজুল হক— বিরাট বড় কবি। আমি তাঁর গমনপথের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলাম। এমএম কলেজের প্রশস্ত রাস্তার এক কিনারা ধরে তিনি দক্ষিণ গেটের দিকে ধীরলয়ে, অথচ এক অনন্য দীপ্ত ভঙ্গিমায় হেঁটে চলেছেন।
এর কিছুদিন পর একদিন হঠাৎ মনে হলো, আমার কিছু লেখা যদি কবি আজীজুল হক স্যারকে দেখাতে পারতাম! এই ভেবে একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে দুপুর বেলা তাঁর বাসায় গেলাম। স্যার তখন কারবালার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। পথেই বৃষ্টি শুরু হলো। বাইসাইকেল চালাচ্ছিলাম। খানিকটা ভিজে বাসার দরজায় নক করলাম। কিছুক্ষণ পর কবি আজীজুল হক দরজা খুললেন। আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আমি একটু নার্ভাস হয়ে সালাম দিয়ে বললাম— স্যার, আমার নাম কাজী মাজেদ নওয়াজ। কয়েকটা কবিতা দেখাতে এসেছিলাম। স্যার কয়েক মুহূর্ত থমকে থেকে বললেন— ভেতরে আসো। আমি ভেতরে গিয়ে বসলাম। স্যার আমাকে বসিয়ে ভেতরের ঘরে গেলেন। খানিকক্ষণ পর ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন— কবি কাজী কাদের নওয়াজ তোমার কী হন? বললাম— উনি আমার বড় চাচা। এরপর তিনি আমার নানাবাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেন। দেখলাম, তিনি আমার মামাদের চেনেন। তিনি বললেন— তোমার নানাকে আমি প্রথমবার দেখেছিলাম আমাদের গ্রামের পথ দিয়ে পালকি চড়ে যাওয়ার সময়। পথে তিনি থেমেছিলেন। তখন আমি স্কুলে পড়ি। এরপর তোমার নানার কাছেও বেশ কয়েকবার গিয়েছি। ঢাকায় তোমাদের সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতেও আমি গিয়েছিলাম, ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। এই প্রসঙ্গ ধরে স্যার কথা বলতে লাগলেন মাগুরার শ্রীপুর, মুজদিয়া, তারাউজল আর দ্বারিয়াপুর গ্রামের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। আমি ধীরে ধীরে আশ্বস্ত হচ্ছিলাম। মনে মনে শুধু ভাবছিলাম— কখন লেখাগুলো দেখাব, কখন কবিতা শোনাব! একসময় স্যার বললেন— তোমার কবিতা শোনাও। আমি তিন-চারটে কবিতা পাঠ করলাম। স্যার এক অন্যরকম মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, স্যার হয়তো আমার কবিতা ভালো হয়েছে বলবেন, অথবা কোথাও সংশোধন করার কথা বলবেন কেননা আমি বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম— সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব জাতীয় পত্র পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর স্যার জিজ্ঞেস করলেন— ‘কবিতা কেন লেখ?’ আমি এ প্রশ্নের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। খানিকটা আমতা-আমতা করে বলেছিলাম— লিখতে ভালো লাগে, লেখা ছাপা হলে খুব আনন্দ হয়। আরও কী বলেছিলাম, আজ আর মনে নেই। স্যার আমার কবিতা ভালো হয়েছে কি না, সে প্রসঙ্গে কিছু না বলে কবিতার ছন্দের কথা বললেন, পর্বের কথা বললেন, পাঠক কীভাবে কবিতাটি পাঠ করবে, সে বিষয়েও ভাবতে বললেন। তিনি বলেছিলেন— তোমার হাতে একটি আলো আছে। এই আলো তুমি ঠিক কোথায় ফোকাস করতে চাও? একটু থেমে বলেছিলেন— একজন মৃত মানুষের নিষ্পলক চোখে, নাকি কোনো এক নারীর অপূর্ব মায়াবী চোখে? নাকি অন্য কোথাও? সেদিন তাঁর কথার সবটা হয়তো বুঝিনি। কিন্তু সেই প্রশ্নটি আমার ভেতরে আজও রয়ে গেছে। এরপর স্যার অনেক কথা বললেন, বিভিন্ন কবির কথা বললেন। বললেন, যশোরে এক সাহিত্য সম্মেলনে তিনি কবি কাজী কাদের নওয়াজকে অতিথি করে এনেছিলেন। তাঁর অনন্য ও সমৃদ্ধ ভাষণের কথা বললেন। বললেন কবি আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমানের কথা। স্যারের ভেতরের ঘর থেকে চা আর বিস্কুট এল। একপর্যায়ে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম।
ধীরে ধীরে আমি সাহিত্য পরিষদের একজন নিয়মিত সভ্য হয়ে উঠলাম। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সাহিত্য সম্মেলনের দিন ঘোষণা করা হলো। ভীষণ উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে আমরা রিহার্সাল ও সাজসজ্জার কাজ শুরু করলাম। প্রধান অতিথি হিসেবে আসার কথা ছিল কবি শামসুর রাহমানের। সম্ভবত অনুষ্ঠানের আগের দিন জানা গেল— কবি শামসুর রাহমান আসছেন না। আমরা যারা তখন তরুণ, হতাশায় আমাদের মন ভেঙে গেল। কবি দারা মাহমুদ, আবদুর রব, ফখরে আলম— সবাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। তাঁরা কবি আজীজুল হকের কাছে গেলেন। স্যার বললেন— এক্ষুণি নড়াইল যাও। চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সঙ্গে কথা বলো। যেভাবেই হোক, তাঁকে রাজি করিয়ে প্রধান অতিথি করো। কয়েকজন ছুটে গেলেন নড়াইলে। এস এম সুলতান রাজি হলেন। তিনি এলেন। আর তাঁর উপস্থিতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আমাদের সেই সাহিত্য সম্মেলন। সেই সাহিত্য সম্মেলন চলাকালীন কবি আজীজুল হক গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে এসে সামনের সারিতে বসলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বময়, তীক্ষ্ণ চেহারাটি যেন হলভর্তি দর্শক এবং ঢাকা থেকে আগত কবি-লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতর দেখাচ্ছিল। তিনি তখন ভীষণ অসুস্থ। বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। আমরা তাঁর কথা শুনলাম। তিনি নিজের জায়গায় বসেই কিছু কথা বললেন। আমরা অনেকেই কবিতা পাঠ করলাম। মুগ্ধ হয়ে শুনলাম ঢাকা থেকে আসা কবি-লেখকদের কবিতা, কথা ও আবৃত্তি।
পরবর্তীতে কবি আজীজুল হক কিছুটা সুস্থ হলে তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়। তিনি প্রায়ই যশোর সাহিত্য পরিষদে আসতেন এবং দীর্ঘ সময় তরুণদের সঙ্গে কথা বলতেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর কথা শুনতাম। প্রসঙ্গ শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। কখনো কথা উঠত যশোরকে নিয়ে, যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নিয়ে, কখনো বিভিন্ন গুণীজনের কথা উঠত। আলোচনায় আসত মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, সমাজ ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গও। স্যার সবসময় তরুণদের সঙ্গে মিশতেন। সম্ভাবনাময় তরুণদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এগিয়ে রাখতেন। আড্ডার সময় বলতেন— তোমাদের ব্যক্তিগত মতাদর্শ ও রাজনৈতিক মতাদর্শ জুতার মতো খুলে রেখে আড্ডায় যোগ দাও। এই কথার মধ্যে তাঁর আড্ডার দর্শন যেমন ছিল, তেমনি ছিল ভিন্নমতকে গ্রহণ করার এক অসাধারণ মানসিক উদারতা।
তিনি প্রায়ই বলতেন— আমরা পুরস্কৃত করি, তিরস্কৃত করি; কিন্তু মূল্যায়ন করতে চাই না। তিনি প্রশংসা বা নিন্দার চেয়ে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের কাজকে বোঝার চেষ্টা করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। আড্ডায় স্যার যেকোনো বিষয়ে সাবলীলভাবে কথা বলে যেতেন। আমরা মাঝখানে ভুলে যেতাম, স্যার আসলে কী প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্যার ভুলতেন না। দীর্ঘ কথার ভেতর দিয়ে ঘুরে-ফিরে ঠিক সেই জায়গাতেই এসে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করতেন। স্যার যখন সাহিত্য পরিষদে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, তখন প্রায়ই বলতেন, আড্ডায় মেয়েদেরও থাকা উচিত। তাঁর যুক্তিটা ছিল খুব সহজ অথচ গভীর— একজন মেয়েও যদি আড্ডায় থাকে, তাহলে আমরা হয়তো কোনো অশোভন বাক্য ব্যবহার করব না, নিজেদের কথাবার্তায়ও এক ধরনের সংযম থাকবে। তিনি মনে করতেন, একটি সুস্থ ও সৃষ্টিশীল আড্ডার পরিবেশ এমন হওয়া উচিত, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকে।
স্যারের বাসায় যাতায়াত, সাহিত্য পরিষদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে দেখা— এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে স্যার হয়ে উঠলেন আমার একান্ত অভিভাবক। স্যারের সামনে বা স্যারের উপস্থিতিতে কবিতা পাঠ করার সময় আমি ভীষন সতর্ক থাকতাম। ভালো প্রস্তুতি নিতাম এমনকি নিজের লেখা কবিতা পাঠ করার ক্ষেত্রেও।
কবি আজীজুল হক— তিনি শুধু একজন বড় কবি হিসেবেই আমার স্মৃতিতে রয়ে যাননি; তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন নির্মোহ পথপ্রদর্শক। তাঁর সঙ্গে কাটানো সেইসব মুহূর্ত, তাঁর বলা অল্প কয়েকটি বাক্য, এমনকি তাঁর নীরব অসন্তোষও আমার রুচি ও মনন তৈরিতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। শুধু আমার নয়, তাঁর সংস্পর্শে আসা প্রত্যেকের মধ্যেই আমি এ অনুভূতির ছাপ লক্ষ্য করেছি।
আজ ফিরে তাকালে আরও একটি বিষয় গভীরভাবে অনুভব করি— একটি শহরের সাংস্কৃতিক মননে একজন কবির এমন উজ্জ্বল উপস্থিতি খুব বিরল। যশোর শহরের নানা আড্ডায়, সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা অনুষ্ঠানে আজও কবি আজীজুল হক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি নাম। তাঁকে ছাড়া যশোরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্যার প্রায় চল্লিশ বছর, কিংবা তারও বেশি সময় যশোর শহরে ছিলেন। তাঁকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, সম্পাদক, এমনকি সাধারণ সদস্য পর্যন্ত হননি। অথচ যশোর শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি নীরবে একজন অদৃশ্য মহীরুহের মতো শিক্ষক ও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের নতুন করে নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তাঁর কথায়, তাঁর দৃষ্টিতে, তাঁর নীরবতায় এবং কখনো কখনো তাঁর কঠোর সমালোচনায় আমরা নিজের ভেতরের ঘাটতিগুলো চিনতে শিখেছিলাম। আমরা স্যারকে যেমন ভালোবাসতাম, শ্রদ্ধা করতাম, তেমনই এক ধরনের ভয়ও পেতাম। তবে সেই ভয় ছিল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় মিশে থাকা এক নীরব অনুপ্রেরণা— যা আমাদের নিজেদের আরও সতর্ক, আরও পরিশীলিত করে তুলতে উৎসাহিত করত। আজ এত বছর পর মনে হয়, কবি আজীজুল হকের সবচেয়ে বড় প্রভাব হয়তো তাঁর কবিতার বাইরেও ছড়িয়ে আছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন— শিল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের আলোটি কোথায় ফেলতে চাই, তা জানা।
আর সেই প্রথম দেখা— ১৯৮৮ সালের এমএম কলেজের মাঠে, দূর থেকে দেখা লম্বা চুলের তীক্ষ্ণদেহী মানুষটি— আজও উজ্জ্বল হয়ে আছেন আমাদের মননে।
…………………………….
যশোর, ২২ আগস্ট ২০২৬
কাজী মাজেদ নওয়াজ
জন্ম: ৩০ ডিসেম্বর ১৯৬৯, মাগুরা জেলার দ্বারিয়াপুর গ্রামে নানাবাড়িতে। পৈত্রিক নিবাস মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মুজদিয়া গ্রামে। দর্শনশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর।
তাঁর কবিতার সুর হলো মূলত হৃদয়গ্রাহী, ইন্দ্রিয় চেতন ও কাব্যিক শব্দচয়নে উত্তাপ ছড়ানো এক স্বপ্নময় আখ্যান। আর এই নিবিড় সুরের মূর্ছনা থেকেই জেগে ওঠে তার কবিতার অনুরণন। মাজেদের কবিতা কখনও স্নিগ্ধ রাতের মতোই রহস্যময় আবার কখনও প্রকৃতই রোদ্দুরে সবুজ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: বলো, জলদ্যুতি
