ছোটগল্প: মালতি


মহি মুহাম্মদ

 

মালতির খবরে উন্মাতাল হলো রতনপুর।

অন্যপ্রতিযোগিরা এখন কানাইর ঘরে। চোলাইর রসে বেভুল হবে।  রতনপুর চা বাগানের যাত্রাপালা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মালতির অনেক ডিমান্ড বেড়ে গিয়েছিল যুবকদের মধ্যে। শুধু যে যুবকদের মধ্যে তাই নয়, ওর চাহিদা  তৈরি হয়েছিল বিবাহিত পুরুষদের মধ্যেও। হঠাৎ চোখের সামনে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ে রাতারাতি এমন পরিবর্তন হয়ে গেল তা যেন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। আর বিশ্বাস করার সময় যখন উপস্থিত হলো তখন তাকে লাভ করার জন্য সবাই উঠে পড়ে লাগল। আর মালতিও সবার সঙ্গে প্রাণগোপালের ভাষায় ঢলে ঢলে কথা কইতে লাগলো। কিন্তু দেখা গেল সবার বাড়া ভাতে ছাই ছিটিয়ে মালতি একদিন বাবুলালকে বিয়ে করে নিল।

মালতির বিয়েতে যে সব পুরুষরা নিজেদের নিঃস্ব ভাবলো তাদের কাতারে ব্যতিক্রম আরেকজন এসে যুক্ত হলো।

মালতির মা।

মালতির বিয়ে হওয়ার পর শুক্কুবালা একেবারে নিঃস্ব নয়, একাকী, নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। যে ঘরে মালতি আর তার মা থাকত সে ঘরটি এখন শুক্কুবালার কাছে মৃত প্রেতপুরী বলে বিভ্রম হতে লাগল। ঘরের পাশে জির গাছটিকে কোনদিন ভয় লাগেনি বলে তিনি বর্ণনা করলেও এখন তিনি এই গাছটিকেই কি কারণে ভয় পাচ্ছেন তা বোঝাতে সক্ষম তিনি নন বলে বিবৃতি দেন। কয়েকজন সমবয়েসি এসে সংশয় প্রকাশ করেন এ অবস্থায় শুক্কুবালা কি করে বসবাস করবে। অনেকেই বলা -কওয়া করতে থাকে যে এ অবস্থায় শুক্কুবালা হয়ত একা ঘরের ভেতর মরে পড়ে থাকবে। যা হোক এই কথাগুলো আরো পড়ে উঠে এসেছিল।

মন্দিরে যখন ঢোলের দুম দুমা দুম বাদন চলছিল আর বাবুলালের পেছনে মালতি দাঁড়িয়ে ছিল সে অনুভূতির সময় কিছুতেই মালতির মনে তার মা শুক্কুবালার কথা উদয় হয়নি। অদ্ভুতভাবে মালতি খেয়াল করলো তার হলো কি। যে মায়ের সঙ্গে সে এতদিন থেকে এলো আর আজ তাকে একা ফেলে যাবে এর জন্য তার একটুও চিমত্মা হচ্ছিল না। ব্যাপারটা অদ্ভুত কিনা তা ভাবারও মালতির সময় ছিল না। তার ভাবনায় তখন চা বাগানের তার অনুরক্ত অন্যান্য যুবকদের কথা আর তাদের জন্য মনের কোণে চিনচিনে একটা অনুভব  মৃদু খোঁচা দিচ্ছিল। কেন জানি অন্য যুবকদের মন খারাপ হবে ভেবে তারও মন খারাপ হতে চেয়েছিল কিংবা এও সে ভাবতে বসেছিল যে বিয়েটা না করলেই তো সবার চোখের মণি হয়ে থাকা যেত। অবশ্য এ চিমত্মা সে বেশিক্ষণ মনে পোষণ করেনি। মন্ডপের কৃত্তাদি সম্পন্ন হওয়ার পর যখন সে বাবুলালের ঘরে এসে পৌঁছল তখন তার হঠাৎ কান্না পেয়েছিল। কেন এ অহেতুক কান্নার আগমন সে সম্পর্কে কোন সদুত্তর মেলেনি। নিজের ওপর কিছুটা ক্ষেপে  ওঠার জন্য চেয়েও কেন ক্ষেপতে পারলো না তা ভাবতে ভাবতে তার মাথা ধরে গিয়েছিল। বাবুলালের মা ভাত তরকারি রেধে রেখেছিল আর তা ছাড়া আশেপাশের ছেলে বুড়ো ঘরটুকুতে গমগম করছিল। সবাই বিদায় নিতে নিতে রাত আটটা নটা বেজে গিয়েছিল। সবাই চলে গেলে তারা একসঙ্গে খেতে বসেছিল।

বাবুলাল ওর বাবা মাধব বুড়া মালতি আর বাবুলালের মা কামিনীবালা। মাছ তরকারি লইট্ট্যা শুটকী আর ভাত রেধেছিল বাবুলালের মা। সেই সব খাবার অমৃতের মত মনে হয়েছিল তার কাছে। সেই খাবারের সাধ আর কোনদিন এ সংসারে পায়নি মালতি। পাশের রুমে বুড়াবুড়ি আর এইরুমে বাবুলাল আর মালতি। ভোরের দিকে একটা বৃষ্টি এলো বুঝি।  সোঁদা মাটির গন্ধ পেল মালতি। অনেকদিন পর বৃষ্টি এলে মাটি থেকে এমন গন্ধ বের হয়। নতুন ঘরে এসে মালতির ঘুমটা তত গাঢ় হয় না। তবে বাবুলালটা জোরসে ঘুমাচ্ছে। ঠিক সকালের দিকেই মালতির ওর মায়ের কথা মনে পড়ল। আহারে বুড়িটা একলা একলা কি কইরছে! এতোদিন উয়ে ছিল এখন তো উয়ার আর কেউ নাই কেমনে থাইকবে উয়ে। কাইল সকালে কামে যাবার আগে উয়াকে একবার দেইখে যাবে। এই সিদ্ধামেত্ম মালতি ঘুমানোর জন্য বাবুলালের কাছে এলো। আর বাবুলাল নেকড়ে হয়ে অপেক্ষা করছিল কখন মালতি তার কাছে আসবে। জিভায় উঠে আসে শরীরের লবণ। কোনদিকে যেন মৃদঙ্গ বাজছে। মৃদু মৃদু বোল বুকের ভিতর ঘাঁই মারে। সেই সুরে মাতাল হয়ে উঠলো মহুয়ার বন। মাতাল মাতাল খেলাটাই জমে উঠলো। লম্বা গর্জন গাছে হাওয়া বয়ে যাওয়ার হিস হিস শব্দ কানে এলো। তারপরে সুনসান নীরবতা নেমে এলো। আর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলে মেঘের গুরু গুরু একটা ডাক ভেসে এলো। সারা ঘরে একটা ভ্যাপসা গরম পড়েছিল। সেই সঙ্গে দু’জনের গা ঘেঁষাঘেষিতে গরমটা আরো বাড়ছিল। মালতির তখন ইচ্ছে করছিল ঢ্যাবা থেকে দুটো ডুব দিয়ে আসতে। চা বাগানের ঘণ্টা যখন ঢ্যাং ঢ্যাং করে দুটো বাজল তখন মালতির প্রচন্ড প্রস্রা্বের বেগ পেল। ঝাঁপ খুলে  সে একাই বেরিয়ে এলো। আকাশে অনেক মেঘের আনাগোনা। তার ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটা তারা দেখো যাচ্ছে। একটু উঠোনের কোণে গিয়ে কাজ সেরে সে আবারও আকাশের দিকে তাকালো। অদ্ভুত ধরনের একটা ভালো লাগা পা থেকে মাথা পর্যমত্ম শিহরণ খেলে গেল। পৃথিবীটা কত বড়, আর সব মানুষ এখন কী করছে,কোথাও কী কোন জীবনের ছন্দপতন ঘটলো কিংবা যারা যারা তাকে কামনা করেছিল ওরা কী ওদের দুঃখ ভুলে এখন ঘুমোতে পারছে? এসব কথা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে। শুধু তাই নয় দূরের রাতের তারাভরা আকাশ দেখে মনে হয় তার গমত্মব্য আরো বহু দূরে। এসব পাত্তা না দিয়ে মালতি আবার নিজের জায়গায় গিয়ে শুলো। সারারাত তার চোখে ছিটেফোঁটাও ঘুম এলো না। হয়ত নতুন জায়গা, নতুন ঘর তাই। শুধু শুধু এ ওর কথা মনে এলো।

 

২.
ভোর রাতে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। সকালে মাটিতে তারই ঘ্রাণ। হালকা শীত শীত লাগছিল, তবুও মালতিকে গোসল করতে হলো। অবশ্য গোসলের আগে তাকে উঠোন ঝাট দিতে হলো, রাতের হাঁড়ি পাতিলগুলো মাজতে হলো। তারপর গোসল করে ঝটাপট রুটি বানাল। নিজে খেয়ে বাকীদেরগুলো তুলে রাখল। একটা রুটি সে পুটলায় বেঁধে নিল যাতে দুপুরে খেয়ে নিতে পারে। বাবুলাল উঠে পড়েছে। আস্তে আস্তে সবাই উঠে পড়েছে। যখন  বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন বাবুলাল বলল, খালি? মালতি হঁ বলে বেরিয়ে গেল। গর্জন টিলা ঘুরে তারপর সে এক নম্বর লাইনে এলো। জির গাছটার গোড়ায় শুক্কুবালা একটা পাতিল ঘষছে। মালতিকে দেখে দৌড়ে উঠে এলো।

ভালা আছিস?

নাই থাইকবে?

সকালে কি খালি?

রুটি বানাইলাম, তুই কিছু খালি কি?

শুক্কুবালা চুপ করে থাকে। চোখের কোণটি বুঝি জলে ভরে ওঠে। মালতি বুঝতে পারে এখন প্রশ্রয় পেলে বুড়িটা কাঁদতে বসবে। কাজেই মালতির কথায় উষ্মা প্রকাশ পায়। ‘কিল্লাই না খালি? কামে যাবি নাই? চ খায়ে লিয়ে কামে যাবি।’ ঘরের ভেতর ঢুকে মালতি দেখল একটা  এলুমিনিয়ামের বাসনে কিছু রং চা। আর চুলার ওপর কুচকুচে দুমড়ানো একটা হাঁড়িতে আটা ভাজা। তারমানে এগুলো খাওয়ার জন্য তৈরি করেছে শুক্কুবালা। মালতি তাড়া লাগাল, ‘লে লে খেয়ে লে।’
মালতির তাড়া পেয়ে শুক্কুবালা হর্ষৎফুল্ল চিত্তে খাবারগুলো সাবাড় করলো। অবশ্য বেশ কয়েকবার মালতিকে সাধল। কিন্তু মালতি বার বার ফিরিয়ে দিল।এরপর মা ঝি দুজনেই কামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। অটলবুড়া তখন সাতটার ঘণ্টা পেটাল।

দুপুরের গরম ঝাজটা খুব লাগে। চারপাশের গাছগুলো কেমন ঝিম মেরে থাকে।  হাওয়াটা গরম অনুভূত হয়। একটার আগেই  ওজন শুরু হবে। তারপর খাবার জন্য একটু বিরতি। এরপর আবার পাতিতোলা শুরু। রামরু সর্দার পাতা ওজন দিচ্ছে আর আনোয়ার বাবু লিখছে। মেয়েরা সবাই  পাতা ভর্তি খাচা মাথায় নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সবার শরীর ঘামে জবজব করছে। কপাল চুইয়ে ঘামের নহর অনেকের চোখে ঢুকে চোখ জালা ধরাচ্ছে। কিমত্মু সে ক্ষেত্রে শুধু একহাত দিয়ে কোনোরকমে কপালটা মুছে নিয়ে  অনড় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ধাক্কা এলো মনে হয়। ধাক্কা সামলাতে না পেরে তারামণি পড়ে গেল মহুয়ার উপরে। সঙ্গে সঙ্গে লেগে গেল ঝগড়া। তুমূল ঝগড়া। দুপুরের বাতাস আরো খরতপ্ত হয়ে উঠলো এক একজনের অশ্লীল বাক্যে। আনোযার বাবু হুংকার ছাড়লেন। কাজ হচ্ছে না দেখে দুজনকে দুদিকে সড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। আবার শুরু হলো ওজন। সবশেষে তারামণি আর মহুয়ার পাতার ওজন হলো। ওজন শেষে ওরা সবাই বড় একটা চাক্কা গাছের নিচে বসল। শুক্কুবালা বহুদূর ঝর্ণা থেকে কলসি ভরে পানি নিয়ে এসেছে। যে যা এনেছে তা বের করছে, আর কথা বার্তা সমানে  চলছে। তারামণি চায়ের কচিপাতা হাতে ঢলে একটা চাটনি বানাল। সঙ্গে কাচামরিচ আর লবণ দিয়েছে। ঐ দিয়ে সে রুটি দিয়ে খাচ্ছে। মালতি তারামণির কাছ থেকে একটু চাটনি নিয়ে রুটিটা চিবিয়ে নিল। ক্ষুধার রাক্ষসটা পেটের ভিতর খাই খাই করে উঠলো। কিন্তু করার কিচ্ছু নাই, এরপরে করার যা থাকে তা হলো শুক্কুবালার আনা ঝর্ণার  ঠান্ডা পানি ঢখ ঢখ করে খেয়ে নেয়া। খেয়ে উঠেই সবাই আবার নব উদ্যমে কাজে ঝাপিয়ে পড়ে।  কাজ চলতে থাকে একটানা বিকেল পর্যমত্ম। তারপর বিধ্বসত্ম  চেহারা নিয়ে ওরা যার যার ঘরে ফিরে আসে। সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর আরো কুচকুচে হয়ে ওঠে। চামড়া কারো কারো হয়ে ওঠে আরো কালো। পাতা তোলার ফাঁকে মালতি এক বোঝা লাকড়িও কুড়িয়েছে। তাই ওজন শেষ হলে সে ওগুলো মাথায় নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়। পথে শুবনিপিসি বলে, হেরে মালতি আইজকে কাম নাই কইরলে কি হইতো?

কি বইলছিস পিসি কাম নাই কইরলে উয়ে বসাই বসাই খাওয়াবে লাকিন!

না, বইলছিরাম কি আইজকে না কইরলেও পারতিস।

ভালা লাগে নাই পিসি!

আর কথা বাড়ায় না মালতি। লাকড়ির বোঝা মাথায় নিয়ে জোর কদমে হাঁটতে থাকে। বাসার কাছে  এসে মালতি ঘরের ডোওয়ায় তার শাশুড়িকে দেখতে পেল। বুড়িটা বসে বসে ঝিমুচ্ছে। উঠানে একটা নেড়ি কুকুর অদূরে বসে আছে। লাকড়ির বোঝাটা মাথা  থেকে ঝপ করে ফেলে ঘরের ডোওয়ার এক কিনারে মালতিও বসে পড়ে। কাপড়ের প্রামত্ম দিয়ে কপালের চুঁইয়ে পড়া ঘামগুলো মুছতে থাকে। হঠাৎ করে সে খেয়াল করে নতুন কাপড়ের রং তার চোখে মুখে লাগতে শুরু করেছে। কিন্তু পেটের ভিতর কামড়ে ধরেছে খিদের রাক্ষস। বুড়িটাকে জিজ্ঞেস করা দরকার সে রান্না চড়িয়েছে কিনা!

কখন আলি?

দেরি হইলো।

চুলায় কিছু দিলি?

না।

ত, না দিয়ে কনে চুপচাপ বইসে রইলি যে?

কামিনীবালার মাথা ধা করে গরম হয়ে ওঠে। নতুন বউ কালকে আসতে না আসতেই তার ওপর পোদ্দারি ফলাচ্ছে!

আমি তোর চাকর লাগি নাকি! রাইন্দে খা গই।

গজ গজ করতে করতে চলে যায় মালতি। কামিনী বুঝতে পারে ঝগরার সূত্রপাত হলো। মালতি কাপড় নিয়ে ঢ্যাবার দিকে নেমে যায়। ঢ্যাবার ঢালু পাড়ের ছোট্ট একটা নাম না জানা গাছের ডালে কাপড়চোপড় রেখে মালতি ঘাটলায় বসে। ঘাটলা মানে লম্বা একটা চাক্কা গাছের কর্দা।  ওটার ওপর বসে মালতি হাত পা ডলতে থাকে। গলা মুখ ডলতে ডলতে মালতি পাশের ঘাটের দিকে চোখ ফেরায়। দেখে হডিয়া তার দিকে তৃষিত নয়ন দিয়ে তাকিয়ে  আছে। সেই দৃষ্টিতে কামের বহ্নি আছে তা মালতিকে একটা ঝাকুনি দিয়ে গেল।

কি রকম আছিস? মালতিই প্রথম কথা শুরু করে।

কেরকুম আর থাইকব! আছি আর কি কুনোরকম।

হডিয়া, তুই একটা বিয়া কর।

মাইয়্যা কুথায় পাব?

আমি খুঁইজে দিব।

লাইগবে নাই।

ওমা কি বলিসরে লাইগবে নাই কিল্লাই?

আমি তুকে ছাড়া বিয়া কইরব নাই।

ঠিক আছে তবে আমকে আবার বিয়া কর। এই বলে মালতি হাসতে হাসতে জলের ভিতর গড়িয়ে পড়ে। ওপাশে হডিয়া মালতির রঙ্গ বুঝতে পেরে জল থেকে আসেত্ম আসেত্ম উঠে চলে যায়।

এরপরে মালতির জীবন আস্তে আস্তে শূন্যতায় ভরে ওঠে। কেন তার হদিস করতে গিয়ে মালতি  ফাগুমাঝির মেয়ে ছায়ার কথায় চমকে ওঠে।

মালতিদি  তুই টুসু পূজার দিন মহুয়া খাইয়েছিলি।

মহুয়া খাইলে কী হয়রে?

হে ভগবান, তুই নাই জানিস?

না তো!

মহুয়া খাইলে সংসারে মন নাই বসে।

বাজে কথা, কত্তুন শুনলি?

মহুয়া খাইলে নাকিন, ভাইগে যায়।

কী বইলছিস রে!

হ ত, বিশ্বাস নাই কইরছিস?

আজগুবি কথা বইলছিস কেলা!

মালতির মনটা খুচুমুচু করতে থাকে। বার বার একই কথা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। বহুরাত পর্যন্ত  সে জেগে থাকে। ঘুম আসতে চায় না। বাবুলালের সঙ্গে বনিবনা কেমন যেন মিলছে না। খিটিমিটি লেগেই যাচ্ছে। আবার অনেকই বাবুলালকে নিয়ে বাজে কথা বলছে। সব মিলিয়ে কেন জানি মালতিকে আরো বেশি হডিয়ার দিকে ধাবিত করে দিল। একদিন কামিনীবালার সাথে তুমূল ঝগড়া লেগে গেল। প্রায় কাজ কাম নিয়ে ঝগড়া লাগে। সেদিন মাত্রাটা একটু বেশি হওয়াতে বাবুলালের হাতে ধরা পড়ে গেল। বিশ্রি গালি গালাজ  করলো। মালতির মুখ তো নয় যেন অগ্নিমুখ। লোকে শুধু আগুন বেরুতে দেখলো। তাই এটা সেটা নিয়ে যখন বাবুলালকেও বকতে শুরু করলো তখন বাবুলাল আর রাগ সামলে রাখতে পারলো না। চিকন একটা ঠেইল্লা দিয়ে এমন পিটুনি দিল  যে অনেকেই তখন মালতির জন্য ‘আহা, ইস্’ শব্দ করেছিল। সেদিন  মালতি মনে মনে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা আবার অচিরেই দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে বলে মনে হলো না। মালতি এরপর হডিয়ার সাথে ঘন ঘন কথা বলতে শুরু করলো। বাগানের সব মানুষই নয়, বাবুলালের মা পর্যন্ত ছেলেকে সতর্ক সংকেত দিল, এই বাবুলাল তোর বউ দেখিস বেশি ফুসুর ফাসুর কইরছে। ভাইগলে আমি  কিন্তুক নাই জানি।

বাবুলাল মায়ের কথার জবাবে বলেছিল, যে ভাইগবার সে ভাইগবেই, উয়াকে কিছু দিয়ে আটকাইতে নাই পাইরবি। এরই মধ্যে  দোকানে বেশ বাকি নিয়েছে মালতি। আর কারণে অকারণে ঝগড়া তো আছেই। যে ভালোবাসার ইন্দ্রজালে আটকেছিল বাবুলাল তা আর ছিটেফোঁটাও নেই। কানাইর ঘরে চোলাই দিয়ে প্রায় রাতেই পেট পুরিয়ে আসে। কাজেও ফাঁকি মারতে লাগলো। মাঝে মধ্যে ফ্যাক্টরির ডায়ারের চিমনির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। কিছুই ভালো লাগে না। তবে হঠাৎ সেদিন ভালো লাগলো মহুয়ার সঙ্গে কথা বলে। মহুয়া যেন কেমন একটা ইশারা দিল। বুঝতে দেরি হলেও বাবুলাল মহুয়াতেই মজার জন্য অপেক্ষায় থাকলো। আর মালতি দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠতে শুরু করলো। হডিয়াকে একটা ধোলাই দেবে কিনা ভাবলো বাবুলাল। কেন জানি আবার ঝামেলা বাঁধাতে মন চাইলো না। হডিয়ার দোষ কোথায়। উয়ে তো পুরুষ মানুষ, মাইয়াছেইলা খাওয়াইতে গেলে উয়ে কী কইরবে। ঘরে খাবার দাবার তো কিছু নাই। মা টা বুড়া মানুষ আর কতো কইরবে। ধুৎ কিচ্ছু ভালা লাগে নাই। প্রায় কাজে না গিয়ে বেন্দ্রের দোকানে বসে থাকে বাবুলাল।

মালতির ভরা যৌবন আরো উছলে  ওঠে যখন সে পাতিতোলা শেষ করে লাকড়ির বোঝাটা মাথায় নিয়ে দুলতে দুলতে করোলি টিলা পার হয়। বাঁকের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে হডিয়া। তারপর দু’জন কথা বলতে বলতে এগিয়ে যায় যতক্ষণ পর্যন্ত গর্জনটিলা দেখা না যায়। সন্ধ্যেয় মালতি বাবুলালের মুখোমুখি হলো। মুখে যা আসলো তাই বলে গেল মালতি। বাবুলাল কী ভেবে যেন চুপ মেরে থাকলো। রাতে মান ভাঙাতে বাবুলাল মালতির শরীরে চড়াও হয়। তারপর  ভাবলো সকালে হয়ত ওদের মনোমালিন্য দূর হয়ে  যাবে। কিন্তু সকালে উঠে মালতিকে কোথাও পাওয়া গেল না। রতনপুরে আরেকজনকে পাওয়া  গেল না সে হডিয়া। আর কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা রতনপুরে চাউর হয়ে যাবে মালতি বাবুলালের বউ হডিয়ার সঙ্গে ভেগেছে। আর ফাগু মাঝির মেয়ে ছায়া মনে মনে বলবে, আমি জাইনতাম উয়ে মহুয়া খাইলো।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *