কামাল মাহমুদ-এর একগুচ্ছ কবিতা


নিদ্রাস্তুতি

 

আমার একটা চোখ নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে
অন্য চোখটা নেহাৎ অনিচ্ছায় জেগে আছে

ঘুমিয়ে পড়া চোখটা সুখে স্বপ্ন দেখছে–
সবুজ মাঠের মধ্যে একজোড়া শাদা খরগোশ ছুটছে
কোনো রাক্ষুসে শিয়াল-কুকুর তাদের তাড়া করছে না
সবুজে-শিশিরে মহানন্দে খেলা করছে ওরা
বৃক্ষেরা ছায়া দিচ্ছে, পাখিরা সাঁতার কাটছে
ডুব সাঁতার, চিৎ সাঁতার
‘আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে’…

জেগে থাকা চোখে অন্য দৃশ্য–
মাঠে পোড়া ঘাস, মাটিতে ফাটল
গাছে পাতা নেই, পাখপাখালির নামগন্ধও নেই
ভীত ইঁদুরের গর্তের মুখে ক্ষুধার্ত সাপের পাহারা
– চোখের শান্তি হয় সেরকম কিছু নেই

ঘুমানো চোখকে ডেকে এই বাস্তব বর্ণনা দিল জাগা চোখ
সে বললো, কেন মিছে জেগে মরছিস, জোর করে ঘুমিয়ে পড়
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখ
এরচে’ সুখ আর কিচ্ছুতে নয়
না হলে অন্তত মটকা মেরে পড়ে থাক, তাও কিছু নির্ভার

জাগা চোখ একা পুড়তে থাকলো তার রাজ্যের দাহে…

 

কবন্ধকাল

কবন্ধ তার মুণ্ডুটা খুঁজে পাচ্ছে না
হাতড়ে হাতড়ে আর কতটুকু যাওয়া যায়
চোখ দুটো থেকে গেল ওই হারানো অংশে!

আরো কি কি যেন নিয়ে গেছে সেই কাটা মস্তক
সামান্য কিছু সুখস্মৃতি ছিল শৈশবে-যৌবনে
ঘুড়ি উড়াবার বালক-বেলায়
সেগুলোও নেই। স্মৃতি কি মাথায় থাকে
ঘিয়ে মাখা শাদা থকথকে মগজে?

হৃৎপিণ্ডটা সাথে আছে তবু ঠিকমতো কাজ করছে না
শুধু ঘড়িঘর, টিক টিক টিক টিক…
হৃদয় তাহলে কোন কাজে লাগে কবন্ধের!

জিরাফের মতো মাথা তোলা তার উচ্চাকাক্সক্ষা
চেপে খাটো করে স্বপ্নপ্রহরী
এই পর্যায়ে পাশ ফিরে শোয়–
পেছনে পড়ে থাকে শত অকৃত কর্মের ভারে ন্যুব্জ
একটি বিক্ষত সমকাল।

 

সত্য সমাচার

‘সত্যমেব জয়তে’ মানে সত্যেরই জয় নাকি চিরকাল
সত্য শিব সুন্দর শুনেছি,
সদা সত্য কথা বলিব যে মহাশয়–
কিভাবে?
বেদ-বাইবেল-কোরানের সার
সত্য এখন হুমকির মুখে, বিপন্ন অতিশয়

শোকে নীল, ক্ষোভে বিবর্ণ আর সঙ্গত ক্রোধে তপ্ত শলাকা
সত্য যে কারো গায়ে লাগলেই ফোস্কা পড়ছে
তেড়ে আসছে সকলে।
সত্যবাবুর বড়ই বিপদ, ধর্মরক্ষা দায়…

তলোয়ার ভেঙে গেছে তার, ঢাল জমা জাদুঘরে
সত্যের কোনো বর্ম নেই যে গায়ে পরে নিয়ে
বুক ফুলিয়ে ছুটতে থাকবে বিশ্বজোড়া বধ্যভূমিতে
রণক্ষেত্রময়…

তাকে একটা বুলেটপ্র“ফ জ্যাকেট পরিয়ে দাও।

 

সকাল চমকালো

সাগরের জলশয্যা ছেড়ে উঠে আসছে আলো
আকাশ থেকে পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে ভোর
গাছের অলস ছায়া তখনো শুয়ে
ঘাসেরা কেবল শিশিরভেজা চুল খুলে বসেছে
বাতাস বইছে নগর-পার্কে প্রাতঃভ্রমণের ঢঙে…

অভাবে মোড়ানো ঘনবসতির ঘরে রাত্রের কালো
ছেলেটি ঘুমায়; মায়ের জন্য সেই ছিল বেশ ভালো
কিন্তু শব্দ, তাকে কে ঠেকায়!

কলপাড়ে লঘু কোলাহল, থেকে থেকে কটু কলহ
খালি কলসিরা বাজে বেশি, ঝনঝন…

ক্ষুধার্ত শিশু শুকনো ঠোঁটে চোখ মেলে তাকালো
হাঁড়ি-উপুড় মায়ের ঘরে সকাল চমকালো!

 

জলের ধর্ম

পৃথিবীর তিন ভাগ জল, বাতাসের আর্দ্রতা জল
শিশির তুষার জল, বৃষ্টির সুন্দর জল
তৃণ-তমালের কাণ্ডে পত্রে জল
মনুষ্য প্রাণীদের রক্তমাংসে জল
পঞ্চভূতে এক তুমি জলই জীবন
– এ সবই তো ধ্র“ব লোকশ্র“তির মোহন কথা

সরোবর, নদী বা দূর সাগরের সৈকতে
গোড়ালি ডুবিয়ে বসে থাকা, হাঁটুজলে হাঁটা
অবগাহনের অপার্থিব পাওয়া–
কত না প্রার্থিত, প্রিয়…

কিন্তু তুমি তো নাকের উপরে উঠে আসছো ক্রমশ
শ্বাসরোধ করে ফেলছো যে তরল অষ্টভুজে

ফুলশিশুদল ভেসে যাচ্ছে ক্ষুধার্ত জলস্রোতে
পুরনারীদের লাবণ্য ধুয়ে যাচ্ছে ঘোলা জলের লবণে
অপুষ্ট শস্য তুমি ঢেকে দিচ্ছো পচনের চাদরে-এ কী

এটা কোনো সুশীল সুনীল জলের ধর্ম হলো কি!

 

গল্প

ঘাসে ঘাসে বাতাসের হাসি, গল্প ফুটেছে কাশফুলে
সাতশ’ রঙের ভেলা ভাসছিল প্রেমে জরোজরো উন্মন মেঘদলে
অল্প অল্প সকাল হাঁটছে লাল মোরামের পথে
লুকনো স্বপ্নের ভারে রোগা বুক দুরুদুরু দ্বন্দ্বের দ্বৈরথে।

মোলায়েম শব্দের গীততরঙ্গ শেষ শরতের প্রান্তরে –
প্রকৃতির পোশাকে মেকি মুক্তোরা ঝলমল করে
উষ্ণীষে ঝুটো হিরে
চাঁদবদনী মেয়ে এ সময় প্রাতঃভ্রমণে সূর্য পূজার ছলে
যাকে খোঁজে, সেও চোরাচোখে প্রেম পাঠ করে কিশোরীর খোলা চুলে।

শিশির জমেছে ঘাসে, শিউলিয়া ঝরে আছে, পাতায় পাতায় কবিতা–
লতার কলম লেখে লাল পাতা নীল পাতা প্রণয়ের কথকতা
রমণী খাতার শাদা পৃষ্ঠারা ভরে ওঠে পুরুষ রেখায়
বিজনে সৃজনে কত ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ গল্প এগিয়ে যায়

গল্পের উদ্যানে শত ফুল ফোটে ভুল ফোটে মোহন মায়ায়।

 

কবি

যখন সে চোখ মেলে তাকায় পূর্ণপ্রাণ
ঘুম ভেঙে সূর্য ওঠে
কমলা কামিজে ভোর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তার ঘরে।
যখন সে মুখ তোলে
জোড়া খাট উঠে বসে, ক্ষুধা লাগে নেভানো চুলোর
সকাল সংবাদ দেয়
ঘরে-পরে প্রয়োজন আনাজগুলোর।

এখন বাজারে যাও
চাল আনো ডাল আনো, নুন তেল তরকারি…
খুনসুটি পরে হবে
চুমুটুমু ওই বেলা
এই এক রোগ লোকটার–
বোঝে না যে কখন কি দরকারি!
সকালে দুপুরের ক্ষুধা
কামনা-বাসনা যত
রাতে ষোলকলা  আলো-আঁধারের তরলে-গরলে
কি প্রকারে চার ষোল হয়ে ওঠে
তার বিশারদ হতে সে জানে না।

সাদা পৃষ্ঠায় স্বপ্ন আঁকে
সুনীল শূন্যে স্বপ্ন দেখে
স্বপ্ন বোনে সুবজ মাঠে–
জলস্থলে অন্তরীক্ষে স্বপ্ন ভাঙে তিন ভুবনে
মণিমুক্তার হাটে।

চুলো নিভে থাকে
বাসনকোসন বাজে ঝনঝন ঝনঝন
জোড়া খাট আগুনের দোলনা দোলে

সে তার স্বপ্নের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়োতে থাকে…

 

মেঘ-রৌদ্রের প্রাঙ্গণ

পুকুরের আয়নায় মুখে বিষাদের নীল দেখে উড়ে যায় মেঘের আকাশ
চাঁদের কিরণ আর বৃষ্টিমাখা স্বপ্ন তাকে বৃক্ষের মিছিলে এনে দাঁড় করে
চুম্বনে চুমুক শেখায়; কানেকানে বলে দেয় আরো সব গাঢ়তর অমৃতের সন্ধান
সুপার-ডুপার বলে এই দৃশ্যে তালি দেয় ফাগুন বাতাস।

ঘাসদল প্রণয়ের সবুজ শয্যা হয়ে ওঠে
মেঘ বসে, রৌদ্রে বসে, বৃক্ষ বলে এসো কোনো আনন্দসঙ্গীত শুরু করি–
নৈশব্দের গান বাজে প্রকৃতিতে।  শ্রবণাতীত সেই স্বর্গীয় সুরে কাঁপে
মেঘ-রৌদ্রের প্রাঙ্গণে জ্বালা অদৃশ্য দীপশিখা
বিরলপত্র সব শাখাতেও অজস্র ফুল ফোটে
মেঘ কেটে যায়, বিরহের নীল মুছে দীঘির দর্পণে হাসে শাপলা সবুজ।

কিভাবে- সে প্রশ্ন করো না ক্ষণে ক্ষণে
কবির উঠোনে ভোরে জ্যোৎস্নার ঢল নামে, রাতে তার ঘরে চাঁদমুখ সূর্য ওঠে
ধুলো ঝাড়লো সে রাশি রাশি গোলাপের পাঁপড়ি ঝরে পড়ে
কিভাবে তা কি সেও ষোলআনা জানে!

 

অন্তর্ধান

ক্ষুধা মেখে বসে আছে হা-মুখ সকাল
বিষনীল শার্টটাই পরেছে আকাশ
আর আগুনের গাঁদা ফুল ফুটেছে উঠোনে
শুধু চুলোটা কাল থেকে নিভে আছে হেঁসেলে

দিগন্তে সবুজের গা-ছুঁয়ে বসেছে সুনীল
সেখানে মুখোমুখি পুরুষ প্রকৃতি আর প্রাকৃত রমণী

নারী বললেন, নরবর, ওই লাল সূর্য
আঁধার বিনাশী, তিনি অগ্নির উৎস
তাকে ডেকে এনে উনুন জ্বালুন–
পুরুষ নিজেই রোদ-অগ্নির রসায়নে
নিয়ত জ্বলছে তার নেভানো চুলোর হিম দাহে
সূর্যের স্তব তাতে দেশলাই ঠুকে দেয়

সকাল শব্দে বাজে, রোদে ক্রোধে দুপুর ঝিমায়
মেঘের আড়াল খোঁজে মরা বিকেলের মুখ
যখন সন্ধ্যা নামে আঁধারের মুখোশ পরে
অনন্ত কালোতে যেন জ্বলে ওঠে যুযুধান জীবনের অভিমান
বুকে-পিঠে শুয়ে থাকে প্রণয় আর প্রত্যাখ্যান

বউটা বঙ্কিম তন্দ্রায়; দেবশিশু নিদ্রিত, ম্লানমুখ–
তার গায়ে স্নেহ টেনে দিয়ে
দাম্পত্যের দরজা ভেজিয়ে
অযুত আতান্তরে গলদঘর্ম মর্দ
গাড়ি-ঘোড়া-গার্হস্থ্যের পাশ কেটে
একদিকে হাঁটিয়া গেলেন…

 

চেয়েছিল নির্মেঘ জ্যোৎস্নার রাত

সদানন্দের মন ভালো নেই, চিত্তে দ্বন্দ্বদাহ
এ কোন নরকে এসে পড়েছে সে, হাবিয়া না রৌরব!

উঠোনে তার দত্যিদানোর নিত্যযজ্ঞ, প্রেত-পেত্নীর নাচ
শ্মশানবেদী  হেঁসেলে রোজ চুলায় চিতা জ্বলে।
বৃক্ষসকল ন্যাড়াখাড়া
পক্ষীকুলের মৌনব্রত
কেবল দু’দল কাঠঠোকরার পাতানো কোন্দল
কেউটে-গোখরো লোভের লালা ঝরিয়ে চলেছে…
নাড়াখাগড়ায় ভরা ভূঁ-ভাগ, সবুজ নিরুদ্দেশ।

ভূতের ভেঁপু হঠাৎ হঠাৎ বাজছে দশ দিকে
অশ্বেরা টানে নরকের ঘানি, নিকৃষ্ট বর্জ্যরে–
নাকি সুরে ডাকিনীরা ডাকে নাগরিক নানা রঙ্গে।

সদানন্দের মন ভালো নেই, চিত্তে দ্বন্দ্বদাহ
এ কোন নরকে এসে পড়েছে সে, হাবিয়া না রৌরব!

বিহ্বল বিস্ময় তাকে তাড়া করে আকাশ-পাতাল
নিরানন্দ গুহাকোণে সে কবে কবে হয়ে গেল
এলেবেলে একজন হরিদাস পাল–
শেকড়বাকড় সব কেটে দিচ্ছে যে কলির লেদমেশিন!

চেয়েছিল আলো-বায়ু, এক কেজি নির্মেঘ জ্যোৎস্নার রাত
কে তাকে শুনিয়ে যায় জংধরা শব্দের জগজঞ্জাল
কে তাকে শুনিয়ে যায় হাইতোলা দিনশেষে
দমশেষ ঘুমরাত্রির অমোঘ মহিমা!

 

ভাস্কর্য

লাইব্রেরির সিঁড়িতে হঠাৎ দমকা বাতাসে তুমি
বিব্রত, বেসামাল–
কনেসুন্দরী আলোর ক্যানভাসে
তোমার মেঘবরণ চুল উড়ছে এমন তরঙ্গে
যা কেবল পৃথিবীর কত কোটি বর্ষ বয়সে
এই একবারই সম্ভব হলো

তোমার বঙ্কিম গ্রীবার চন্দন ছুঁয়ে গোলাপের ওড়না উড়ছে
যেন পরী-রাজকন্যার দুই সোনালি ডানা
আলোর ঝরনায় বুনো বাতাসে ভাসছে
আর উষ্ণ রেশমের মুগ্ধ বস্ত্রগণ
শরীরে সান্দ্রতর নিবিড় আলিঙ্গনে
আবরণ ও উন্মোচনের দ্বিভাষী ব্যাকরণে
প্রকাশ করেছে মহা অপার্থিব
বিভঙ্গ, ব্যঞ্জনা

এবং তোমার চোখে-মুখে যে স্বর্গীয় বিস্ময় আর
প্রকৃত বিপন্নতার ক্লাসিক কোলাজ
সুচিত্রা সেন, সোফিয়া লরেন কারো পক্ষে তা
ফুটিয়ে তোলা কখনোই খুব সহজ হতো না–

শুধু এক পলকই মাত্র
লাইব্রেরির সিঁড়িতে তুমি মনোহর ভাস্কর্য

 

রাধা আজ আসবে বলে

ঘাসের গালিচা কাল ধুয়ে দিয়ে গেছে বৃষ্টি
মরা পাতা ঝরিয়ে দিয়েছে রাতে ঝড়
বটমূলে বাঁধানো বেদীতে বয়ে গেছে জলধারা
এখন রোদ এসে শুকিয়ে দিচ্ছে ঘাসে জল
বটবেদীর আর্দ্রতা

ফুলপুর থেকে একটা কোকিল এসে পৌঁছেছে ভোর ভোর
সে এখন মহড়া দিচ্ছে মুহুর্মুহু কোমল কুহুর
দখিন বাতাস ঝালিয়ে নিচ্ছে পাতার শানাই
পালক-পাঁপড়ি ঝরাতে তৈরি তিনটি শালিক

আর দুটি স্বপ্নমুগ্ধ চোখে রাতজাগা লাল
আর একটা দ্বিধাজর্জর হৃৎপিণ্ডে সামান্য বেতাল
আর শুধু সঙ্গতুষ্ট ভীত কামনারা
প্রণত প্রণয়ে ভিজে অপেক্ষা করছে নাগরিক কদমতলায়

রাধা আজ আসবে বলে।
তার চুল বাঁধা চলছে এখন…

 

ফাগুনের ফুল

ক্লাস শেষ হতেই তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে গেলে
স্নান সেরে খেলে, দুপুরে বিবিধ ভারতী বাজিয়ে সারা বিছানায় খানিক গড়ালে
বিকেলের চা, ছাদে হাঁটচলা সব হলো ঠিকঠাক–
সন্ধ্যার আগে দাঁতে লাল ফিতে কামড়ে চুলের গোড়াও সজোরে কষে বাঁধলে
পড়লে, খেলে কি খেলে না, ঘুমালে
কতো রাত তুমি ঘুমিয়ে থাকলে…

এখন এই সাত সক্কালে শিশুকন্যাকে  নিয়ে স্কুলে চলেছ–
সেখানে অন্য নবীন মা’দের আসন বিছানো মিথ্যের তেতো চিরতা গিলবে
সেলাই দেখবে, রাঁধার নতুন রেসিপি শিখবে
কারোবা মোবাইলে চাপা পরকীয়া সংলাপ শুনবে–
ক্যান্টিনে বসে সমুচার পরে কফি খাবে এক কাপ…

সে যে সেই থেকে লাইব্রেরি গেটে
কৃষ্ণচূড়ার বাঁধানো বেদীতে মূর্তিটি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে
মনে পড়লো না?

তার গায়ে পাখি এসে বসে, কখনো বা প্রজাপতি
তার গায়ে পাতা ঝরে পড়ে
দু’পাঁচটা ফুলওবা, ফাল্গুনে…

 

বালিকাচক্র

আলোমুখী গলি হয়ে একেবেকে উঠে গেছে সিঁড়ি
ছাদে রোদ-গোধূলির নিত্য দীপাবলি
সন্ধ্যার আকাশে বন-জ্যোৎস্নার আরতি চিলেকোঠার চিলতে ঘরে খেলা ভেঙে উঠেপড়া বালিকার পৃথিবী
সেখানেই বাসনাকে ভাঁজ করে গুঁজে রাখে ম্লানমুখ কিশোরী

তরুণীর চরাচরে মরুঝড়ে উন্মাদপ্রায় বানজারানের নাচ
শ্বাপদ বন্ধন তাকে বিষনীল শীতঘুমে মুড়ে রমণী সাজায়–
স্বপ্নঘরের খিল এঁটে দিয়ে নিচে নেমে আসে নারী
তার জন্যে শয্যা রচেন পুরুষোত্তম প্রকৃতি
উষ্ণ মুগ্ধ শব্দমালার শ্লোক বুনে মহাব্যস্ত কৃষক
মাঠে চলে যায়; ফসলের দিনক্ষণ গুনতে থাকে…

কান্নার কাছাকাছি হাসি রাশি রাশি ছড়িয়ে পড়ে
ভাঙা আয়নার সহস্র  টুকরোয়–
শতখণ্ড আরশির চোখে এক ফোঁটা জল একটিতে
আর চোখে ক্রন্দসী জুঁইফুল যেন
বর্ণনা করে বেদনার বৃত্তান্ত

বালিকাচক্র শেষে বনের আগুনে একা হরিণীর
কস্তুরি সুগন্ধ পুড়ে যায়।

 

পরকীয়া

বিকেলগুলো লুডুর চৌকো ঢাল
ছাদে চিলেকোঠার ছায়ায় একটু ছোঁয়া
কী মহার্ঘ, গুটি চালার জন্যে নোয়া
যুগল ধবল উষ্ণ আঁধারে
কামনা টালমাটাল!

তখন ছক্কা চাই, ঘুরে পড়ে ফুটো এক
তাতে পাকা নীল কাটা পড়ে যায়
রাগে লুডু ভাসে ব্যাকুল হাওয়ায়
খেলা ভাঙে গাঢ় গভীর চুমুতে
বিষ ঢালে মৌচাক।

বিকেল গড়ালে নেমে আসে নদী একা
লুডু পড়ে থাকে জঞ্জালে, কার্নিশে–
খেয়াটি পা মোছে অন্য লনের ঘাসে
সন্ধ্যায়, রাতে ব্যস্ত সকালে
বিকেল-স্বপ্ন আঁকা।

 

পূর্ণদাহ

রামদা চাপাতি রড, ছুরি লাঠি ঘিরে আছে ওকে
খেলছে ছেলেটির সাথে ভয়ঙ্কর খেলা
রক্তে ভিজে লাল তার শাদা শার্ট, নীল জিন্স
বাদামী বুক-পিঠ, কব্জির জন্ম জরুল
উষ্ণ নোনা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে গোড়ালি
পায়ের পাতা, কালো রাজপথে আঁকা হচ্ছে
পদছাপ আল্পনা …

আমাদের ছেলেটা ছুটে জীবনের কোটে ফিরতে চাচ্ছে
লবডুব লবডুব বলে একবার এদিক একবার ওদিক করছে
রামদা চাপাতি রড ততই ক্ষিপ্র, নিষ্ঠুর বিক্রমে–

দশ দিকে ক্যামেরা চলছে
আঘাতে আঘাতে লেখা হচ্ছে জখমের স্কোর
টিভি চ্যানেলগুলো সরাসরি দেখাচ্ছে এই সর্বনাশের খেলা
রেডিওতে রোমহর্ষক ধারাভাষ্য…

আঁচলে চোখ ঢেকে, ডুকরে … অজ্ঞান হয়ে
আপাত বেঁচে যাচ্ছেন মায়েরা–
বাবারা রুদ্ধশ্বাস, দম নিতে ভুলে গিয়ে
কেউবা মরে ঢলে …থুবড়ে পড়ছেন
পরাজিত পুত্রের লাশের মতই

পূর্ণদাহ চিতায় জ্বলছে লাল-সবুজের প্রাণ …

 

খালিশপুর

এক যুগ ধরে পুড়ছে রোদে
বৃষ্টিতে শিশিরে ভিজছে
কুরে কুরে খাচ্ছে উঁইয়ে
সারি বাঁধা গোটাকয় গর্জন কেওড়া ও গরাণের গুঁড়ি

ভোরে বাজছে না ঘুম ভাঙা সাইরেন
সকালে ডাকছে না কাজের বাঁশি
ছুটির ঘন্টাও নেই–
ভেতরে ধুলো, জঞ্জাল, ঢেলে দেয়া অন্ধকারে
সাপ-বেজি ভূত-পেত্নীর মচ্ছব …
বন্ধ ফটকের গায়ে জংধরা মরা লাল
পড়ে আছে কতগুলো শিল্পের কঙ্কাল

বাইরে রাস্তার পাশে
ওদিকে নদীর ঘাটে
মলিন, বল্কলহীন
দলছুট গুঁড়িগুলো
আসলে ঘাড় গুঁজে বসে থাকা
অসংখ্য অগণন
কেউবা মৃত, কেউ আধমরা
অভুক্ত, বেকার শ্রমিক …

লাগাতার এই সব লাশ আর কঙ্কালে
বেচারা খালিশপুর দিনে দিনে হয়ে গেল
জীবাশ্ম জাদুঘর !

 

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *