মাহমুদ হাফিজ-এর ভ্রমণগদ্য: প্রশান্ত পশ্চিমে পুনর্বার

তার্কিশ এয়ারে টি কে সেভেন টু থ্রি ফ্লাইট ঢাকা ছাড়বে রাত দশটা পাঁচে। চেক ইন শেষ সাড়ে নয়টায়। আমি আকাশসমান উদ্বেগ নিয়ে বসে আছি খিলক্ষেত ফ্লাইওভারের দশচক্করের জ্যামে। জীবনের এন্তার উড়ালে জাহাজ ফেল হওয়ার ঘটনা মনে পড়ে না। তা আজ কপালে জুটছে— ভাবনার মধ্যে বিশাল ঝঞ্ঝাটময় নগর ও পৃথিবীতে মাথা শান্ত রাখতে কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন এর ‘আড়িয়াল খাঁ’র গল্পের ভেতরে ঢুকে যেতে চাচ্ছি। এক দৈনিকের ঈদসখ্যা থেকে বিশেষ কেতায় স্ট্যাপল করে হাতবাগে নিয়েছি এই উপন্যাস। ভিন্নগাড়িতে লাগেজ এয়ারপোর্টে পৌঁছেছে। এয়ারপোর্টের গেট থেকে ‘দ্রুত আসুন’ বলে বার বার ফোন আসছে। ফোনের তাড়া কানে না তুলে এ্যাবাউট টার্নে বাড়ির পথ ধরার কথা ভেবে রেখে ‘আড়িয়াল খাঁ’ নিয়েই মেতে আছি। কিছুক্ষণ পর যার দূরগামী ফ্লাইট ছেড়ে যাবে, সেই লোক গাড়িতে বসে উপন্যাস পড়ছে— এর চেয়ে শান্তমাথার চিত্রকল্প বোধ হয় পৃথিবীতে নেই।

কিছুক্ষণ পর নিজেকে আবিষ্কার করি জলি আর তুসুর সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছি ১১ নম্বর বোর্ডিং গেট—অভিমুখে। বোর্ডিংয়ের ঘন ঘন অ্যানাউন্সে এতোটা উতলা আছি যে পকেটে মেম্বারশিপের কার্ড থাকতেও বিমানবন্দরে সেবায় উন্মুখ লাউঞ্জগুলোর আতিথ্য নিতে পারিনি। যারা তিন চার ঘণ্টা আগে এসে বিমানবন্দরের সব প্রক্রিয়া সাঙ্গ করেছে, তাদের সঙ্গেই প্লেনে উঠতে পারার শেষ হাসি হাসছি।

কিছুক্ষণ আগে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেখি নিকটাত্মীয়গণ লাগেজ নামিয়ে ‘মিট এ্যান্ড গ্রিট’ এর ইউনিফর্মধারী দুই কর্মীর কাছে তুলে দিয়ে অপেক্ষমান। ওয়াকিটকি হাতে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা আমার নাম ধরে খুঁজে নিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। বিজনেস ক্লাসের কাউন্টার তখনও খোলা। ইকোনমির গরিব যাত্রী হয়েও উঁচুশ্রেণীর কাউন্টারে চেক ইন হলো চোখের পলকে। বোর্ডিং পাসের প্রিন্ট হাতে আসতে না আসতেই মিটগ্রিট কর্মীরা তিনজনের ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করে ফেলেছে। কোভিড টেস্টের সনদ ভেরিফাই করে নিয়ে এসেছে এয়ারপোর্ট হেলথ অফিসারের কাছ থেকে। ইমিগ্রেশনস্তরে ঢুকিয়ে দিয়ে বিদায় হয়েছে আর্মড পুলিশের এসআই। পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে পাচ্ছি এই জামাই আদর। ভাবি; কোন দুর্মুখ বলে পুলিশ জনগণের বন্ধু না !
পৃথিবীর সব প্রান্তে চলাফেরা করি মায়ের দোয়াকে সঙ্গী করে। টেকঅফের আগে ডিভাইস বন্ধ করার ঘোষণা দিচ্ছে যখন টার্কিশ এয়ারের লাস্যময়ী তুর্কি সুন্দরী বিমানবালিকা, কাউকে তোয়াক্কা না করে আমি তখন কানে মোবাইল চেপে উচ্চস্বরে বলে যাচ্ছি—
— ‘হ্যালো, হ্যালো, মা, মা, জেগে আছো?’
ভোর সাড়ে তিনটায় পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে দশহাজারে নেমে প্লেন দুই চক্কর দিতেই উইন্ডো সিটে বসা জলি স্বচ্ছ জানালায় আঙুল ঠেকিয়ে ইশারা করলো— ‘ইস্তাম্বুল’।
বললাম, হুমম, ‘সিটি অব ফ্রেগ্রেন্স’। সুগন্ধিনগরী।

মনে ভেসে উঠলো ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের সৌন্দর্যমুগ্ধ দিগ্বিজয়ী সুলতান সোলায়মান আর তাঁর স্ত্রী হুররম সুলতানের কথা। অর্ধসহস্র বছর আগের সুলতান সোলায়মান ও হুরমমকে দেখিনি বলে তাঁদের চেহারা মনে এলো না। টিভি সিরিজ ‘সুলতান সোলায়মান’ এর নায়ক খালিদ এরগেঞ্চ ও নায়িকা মারিয়াম উজারলি’র সুন্দর মুখশ্রী যখন মনের পর্দায় ভাসছে, তখন চোখের পর্দায় উদ্ভাসিত রাতের ইস্তাম্বুল, এর হৃদয় এফোঁড় ওফোঁড় করা বসফরাসপ্রণালী আর সবকিছুকে ছাপিয়ে বসফরাসের আভরণ আলোকসজ্জিত তিনটি সেতু। কৃষ্ণসমুদ্র আর মারমারাসাগরের বিচ্ছিন্নতার বেদনা থেকে মুক্তি দিয়ে মিলনের আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছে বসফরাস। মিলনের সেতুবন্ধন হয়েছে যুগলসমুদ্রের। এই সাগরদুহিতার ওপর নির্মিত সেতু কাঠামোয় উদ্ভাসিত বহুবর্ণিল আলোকমারা। সেদিকে চোখ পড়তেই জানালার দিকে ইশারা করে আবারও জলির উচ্ছ্বাস—‘ওই ওই’।
ভেতরের আলোআঁধারি পরিবেশে আয়েল আসনে গা এলিয়ে বসেছি। হাঁটুতে বার বার গুতো দিয়ে যাওয়া আসা করছে দীর্ঘাঙ্গিণী তুর্কিবালা— মধ্যরাতের আগে যে পরম যত্নে খানাপিনায় উদর আর লাবণ্যময় নজরকাড়া চেহারায় ভরে দিয়েছে চোখ। এখন বসফরাসের আলোর সেতুতে অভিভূত চোখ রাখতে গিয়ে আমি জলির দিকে বেশিই ঝুঁকে পড়ি। পরিচিতস্পর্শ মনে মাদকতা আনে।

টিভি সিরিজের লাস্যময়ী হুররমের রূপমাধুর্য, দীর্ঘাঙ্গিনী তুর্কিবালার সুগন্ধিময় যাতায়াত, দুষ্টুমনের গুতো আর বাসে বসা জলির পরিচিতস্পর্শে আমি মুগ্ধতার আবেশে জড়াই। কৈশোরউত্তীর্ণ পুত্র তুসু অন্য আসনে ঘুমঘোরে, রাতের প্রান্তবেলায় জোৎস্নার আলো ম্রিয়মান, আমাদের নির্ঘুম রাত্রির ভ্রমণক্লান্তিকে এ সময় আনন্দে ভরে দিচ্ছে ইস্তাম্বুলের সেতুসমূহের উজ্জ্বল উদ্ভাসন। চোখের পর্দায় বর্ণিল প্রশান্তি ঢালছে বসফরাস।

দুই.
ইস্তাম্বুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিশালত্ব দেখে আমার চোখ ছানাবড়া। নবনির্মিত, ঝকঝকে, তকতকে। মুহূর্তে সহস্র যাত্রী একজায়গায় মিলিত হয়ে দূরগ্রামী হচ্ছে। বছরে এই বিমানবন্দরের ধারণক্ষমতা ২০ কোটি বলে শুনেছি। ইউরোপের বহু হাওয়াই জাহাজ কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার কেন্দ্র এখন এই বন্দর।

চলন্ত সিঁড়িতে ট্রান্সফার টার্মিনালের দিকে এগিয়ে যাই। এ যাত্রায় ইস্তাম্বুল আমাদের গন্তব্য না। চারঘণ্টা লেওভার শেষে উড়াল দেবো মার্কিন মুলুক মুখো। চলন্ত সিঁড়ির শেষ মাথায় লিফট ও সিঁড়ি। দোতলা থেকে তিনতলায় উঠতেই বৃত্তাকার বিশাল প্রাঙ্গণ। এখানে বিশাল আকারের ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে ঘাড় ঘুরিয়ে ট্রান্সফারযাত্রী পরবর্তী ফ্লাইটের গেট নম্বর জেনে নিচ্ছে। চত্বর ঘিরে চারপাশে আলো ঝলমল বিপনী। তাতে বহুবর্ণিল পোশাক, সুগন্ধী, গহনা আর সৌখিন সামগ্রীর বিপুল সম্ভার পকেট উজাড়ের হাতছানি দিচ্ছে। সেসব হাতছানিকে উপেক্ষা করে আমি বরং পকেটে হাতড়ে ফিরছি প্রায়োরিটি পাস কার্ড।
তুসুকে বললাম, এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই সুবিধা নিয়ে লাউঞ্জ কোন দিকে তার হদিস করতে। তাতে সুবিধা করতে না পেরে সামনে দাঁড়ানো ইউনিফর্মধারী ফর্সা দীর্ঘাঙ্গিনীর কাছে জিজ্ঞেস করি। সে দেখিয়ে দেয়— সামনে এগিয়ে বাঁ দিকে এসকেলেটর। ওপরে উঠলেই ডানে ইস্তাম্বুল গ্রান্ড এয়ারপোর্ট—আইজিএ লাউঞ্জ।

লাউঞ্জে যেতে যেতে আমার স্মরণঅলিন্দে জাবর কাটে পূর্বরাতে হাওয়াই জাহাজে ভেসে আসার সম্পূর্ণরঙিন উড়ালচিত্র। ঢাকা থেকে টেকঅফ করেই টার্কিশএয়ারের সুপরিসর এয়ারবাসটি চলে যায় পশ্চিমবঙ্গের আকাশে। জলি উইন্ডো আসনে। আমি তার দিকে ঝুঁকে পড়ে নিচের আলোকমালায় উদ্ভাসিত কলকাতা, হলদিয়া, বকখালি দেখি। মনে ভেসে ওঠে বিশ্বপর্যটক অমরেন্দ্র চক্রবর্তী, বৃক্ষবন্ধু কমল চক্রবর্তী, ‘তুই লালপাহাড়ের দেশে যা’খ্যাত অরুণ চক্রবর্তী, কবি বন্ধু সৌমিত বসুসহ অংসখ্য বন্ধুসুহৃদের মুখ। যে আকাশ দিয়ে উড়ছি, এর নিচে বসবাসরত এই বন্ধুস্বজনরা কি এখন ঘুমিয়ে? আসনলাগোয়া মনিটরে স্ক্রিনটাচ বাটন চেপে যাত্রাপথের মানচিত্র বের করি। দেখি কানপুরের ওপর দিয়ে জয়পুরকে বাঁয়ে আর অমৃতসরকে ডানে রাখছে উড়োজাহাজ। মাটি থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ফুট বিচ্ছিন্ন থাকলেও যেন অপূর্ব যোগাযোগ মৃত্তিকার সঙ্গে। যে মৃত্তিকা একদা মাতৃগর্ভ থেকে আশ্রয় দিয়েছিল নিজবুকে।

ছুটে চলেছি ইসলামবাদ হয়ে কাবুলের দিকে। সৈয়দ মুজতবা আলী, মঈনুস সুলতানের প্রিয় কাবুল। তালেবানরা কি অলরেডি ক্ষমতায়? সেখানে এখন যে অস্থিরতা, এর অবসান হবে কবে? তালেবানের উত্থান দুনিয়াকে কোন বার্তা দিচ্ছে? এসব জিজ্ঞাসা মনে এই জন্য এলো যে, টার্কিশ এয়ালাইন্সে তুরস্ক হয়ে যাচ্ছি আমেরিকায়। আমেরিকা আর তুরস্ক অশান্ত কাবুলে বড় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র কাবুল ছাড়ছে, কাবুলের সহযোগিতায় এগুচ্ছে তুরস্ক। আমার মতো নিরেট ভ্রামণিকের মাথায় রাজনীতি— ভূরাজনীতি ঢোকে না। এতোটুকু বুঝি, এই পৃথিবী বড় জটিল এক জায়গা।

পাখিচোখ সোজা নিচে ছাড়াও দূরের শহরকে চোখের ওপর প্রতিভাত করে। মানচিত্র যাত্রাপথের তিনশ কিলোমিটারের মধ্যকার শহরগুলোর নাম দেখাতে থাকে। তাই এই পথে নানা শহরের নাম আসছে। মজার ব্যাপার, ঢাকা থেকে তুরস্কের পথে এয়ারলাইন্সটি ভারতছাড়া মুসলিমপ্রধান দেশের ওপরকার রুট বেছে নিয়েছে। ভারতের পর পাড়ি দিচ্ছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান।

ইতোমধ্যে দীর্ঘাঙ্গিনী তুর্কিসুন্দরী ডিনারের পাট চুকিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়েছে। চারদিক আসছে নাকডাকার মজার মিহিন শব্দ। চিকন সুগন্ধিচালের বাটার রাইস, চিকেন, সালাদ আর কালোজাম খেয়ে আমি নির্ঘুমচোখে দেখে চলেছি ভূরাজনীতির সংঘাতময় এই উড়োজাহাজের রুট। যেখান থেকে সিরিয়া, বাগদাদ কিংবা ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিন খুব বেশি দূরে নয়।

বিমান এখন উড়ছে ইরানের ওপর। ‘শাহনামা’র কবি ফেরদৌসী, কবি হাফিজ ও কবি রুমির কথা মনে ভেসে ওঠে আমার। মনে ভেসে ওঠে সেই বিখ্যাত শায়ের ‘আগার আঁ তুর্কে শীরাজী বদস্ত আ রাদ দিলে মারা/ বখালে হিন্দওয়াশ বখশাম সমরকন্দ ও বোখারা রা’ (সিরাজ শহরে যে তুর্কিসুন্দরী করেছে হৃদয়হরণ/ ফিরিয়ে তা দিলে তা করবো তাকে সমরকন্দ ও বোখারার উপহারে বরণ)। মনে পড়ে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পারস্য ভ্রমণের কথা। তার পারস্য ভ্রমণগদ্য পড়ে হয়েছি একদা উতলা হয়ে। সে দেশের ওপর দিয়ে এখন উড়ে চলেছি। তেহরান বাঁয়ে, তুর্কমেনিস্তান ডানে দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে জাহাজ উড়তে থাকে আজারবাইজানের বাকু নগরীর দিকে। রাতের অন্ধকারে নিচে তাকিয়ে মানচিত্রের সঙ্গে শহরের আলোকমালা মেলাতে থাকি। চোখে ঘুম নেই। সাগর পাড়ি দেয়ার পর বাকু শহরের আলোকমালা। ডানে জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসি, বামে আর্মেনিয়া ভেসে ওঠে মানচিত্রে। সিভাস শহরের ওপর দিয়ে তার্কিশ এয়ার প্রবেশ করে নিজ জন্মভূমে। দীর্ঘপথ পাড়ির পর উড়োজাহাজ আঙ্কারাকে বাম পাশ কাটিয়ে যেতে থাকে। আঙ্কারায় এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসয়ূদ মান্নান। পেশায় গম্ভীর কূটনীতিক, নেশায় সংগঠনপ্রিয়—সংস্কৃতিপ্রাণ রাষ্ট্রদূত আমাদের বন্ধুজন। তার কথা ভাবতে ভাবতেই তুরস্কের পর্বত ও সাগরময় অনেক শহর পেরিয়ে জাহাজ কৃষ্ণসাগর ও মারামার ওপর থিতু হয়ে চক্কর দিতে থাকে। বসফরাসকে আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরার পর শহর থেকে দূরে বিমানবন্দরে নামে।

আই জি এ লাউঞ্জের গেটমুখ পৌঁছে দেখি একযুগোল যুবক—যুবতী সামলাচ্ছে বড়সড় লাউঞ্জের রিসেপশন। একজনের পর আমার পালা এলে ‘গুনাইদেন’ বা ‘শুভসকাল’ অভ্যর্থনা পেলাম। ভুলভাল উচ্চারণে বিপরীতে বললাম, ‘তেসিকুল্লের এদেরিম। সফরসঙ্গী কনিষ্ঠ পুত্র তুসু তুর্কিশ স্কুলে পড়েছে। কয়েকবছর তুর্কি ভাষাটির কোর্স করতে হয়েছে তাকে। সে সুবাদে আমারও দুয়েকটি তুর্কি শব্দ— বাক্য জানা। তা এস্তেমাল করার মওকা পেয়ে খুশিই হলাম। প্রায়োরিটি লাউঞ্জের এক্সেস ওপেন করে ওয়াইফাই আইডি আর পাসওয়ার্ড হাতে দিয়ে সহাস্যবদন যুবতী লাউঞ্জে স্বাগত জানালো। বোর্ডিং পাসটি স্বয়ংক্রিয় গেটের বারকোড রিডারে ছোঁয়াতেই গেটখুলে গেলো। ভেতরে সুলতান সোলেমান স্টাইলের রাজকীয় আতিথ্যরাজ্যে প্রবেশ হলো আমাদের।

প্রযুক্তিযুগে আধুনিক ভ্রামণিকের ভ্রমণের এই এক মজা। ইবনে বতুতার মতো দিনমান ক্লান্তিকর পদব্রজ পরিভ্রমণই শুধু নেই। এখানে আছে ভ্রমণক্লান্তির পরই ঘরোয়া প্রশান্তি। পকেটের পাস বিশ্বজুড়ে বিমানপোতগুলোতে রেখে দিয়েছে বাঁধা সেবিকার বহুমাত্রিক শুশ্রুষা—যার নাম প্রায়োরিটি লাউঞ্জ। সেখানে খানাপিনা, হোতনা, বসনা, গল্প করনার মতো সব এন্তেজামই খাসা, পাঁচতারকামানের।

আইজিএ’র লম্বা করিডোর পেরিয়ে বাম হাতে প্রথমে ওয়েটিং লাউঞ্জ। অর্ধবৃত্তাকার টানা সোফাসহ সামনে জোড়ায় জোড়ায় সোফা। নিশিজাগা রাত্রিদের অনেকে গা এলিয়ে ঝিমু্চ্ছে। উল্টোদিকে লাগেজ রাখার সেফবক্স। একটু সামনে ডানে বড় হলের একপাশে রেস্টুরেন্ট। জনা ত্রিশেক একসঙ্গে খানাপিনা করতে পারে এমন সংখ্যায় চেয়ার টেবিলসজ্জিত। রেস্তোরাঁর একদিকে ব্যুফে খাবারের লোভনীয় রকমারি আইটেম ক্ষুৎপিপাসাকাতর যাত্রীর জিহবায় আত্মাহুতি দিতে অপেক্ষমান। বিপরীতে দিকের দেয়াল মরিচবাতিসজ্জিত। অন্যপাশে বিশাল টানা বারান্দা থেকে নিচের বিপনীবাজারের বিশাল লাইভ ক্যানভাস। দোকানের বেচাকোনা, ফ্লাইট ধরতে বোচকাবুচকি নিয়ে যাত্রীদের হন্তদন্ত ছোটাছুটি চোখে পড়ে সে ক্যানভাসে দৃশ্যমান। এসব পেরিয়ে যতোই লাউঞ্জের গভীরে যাই, ততোই আবিষ্কার করি নতুন নতুন সুবিধা। ভেতরে ডান পাশে বাথরুম—রেস্টরুম কমপ্লেক্স। নরনারীর আলাদা বাথরুম, গোসলখানা, ওজুখানা। রেস্টুরুম বা বাথরুম নাম শুনলে মনে যে চিত্রকল্পের উদয় হয়, এটি তার উল্টো। পুরো লাউঞ্জের বাথরুমই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। পরিচ্ছন্ন, সুগন্ধিময় ও দৃষ্টিনন্দন বাথরুমে বহুঘন্টা পার করে দেয়া যায়। সবচেয়ে আকর্ষণ এর মাল্টিফেইথ প্রেয়ার রুম। ওজুখানাসহ গোলাকৃতি নামাজঘর যেমন আছে, তেমনি আছে প্রার্থনা ও পড়ার ব্যবস্থা। এই রেস্টরুম পেরিয়ে বাঁয়ে উন্মুক্ত ক্যাফেতে আবেশ ছড়ানোর পানীয়ের ব্যবস্থা। ওয়েটাররা অপেক্ষমান আদেশের অপেক্ষায়।

পছন্দমতো জায়গা বেছে নিতে সব হল ঘুরে দেখি। নিশিজাগা যাত্রীরা বিশ্রামরত। যে যেখানে পেরেছে ঘুমিয়ে আছে স্বপ্নের জগতে। পছন্দমতো চারটি সিঙ্গেল সোফা ও গোলাকার সেন্টার টেবিলে দেখে আমরা হাতের লাগেজপত্র নামাই। হাতমুখ ধুয়ে আসি। থরে থরে সজ্জিত তুর্কিশ ক্যুইজিন থেকে নানারকম খাবার নিয়ে আরাম করে খাই। রাইস স্যুপ, ব্রেড, হানি, জেলি, স্যামন সালাদ এসব।

চারদিকের পরিবেশ ঘুমানোর এন্তার এন্তেজাম। মাত্র চারঘন্টা পরই বোর্ডিংগেটে চলে যেতে হবে বলে ঘুমাতে চাচ্ছি না। সফরসঙ্গী জলি ও তুসুকে ঘুমানোর সুযোগ দিয়ে আমি জেগে বইয়ে মনযোগ দেয়ার চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ পর ঘুমজড়ানো চোখেই জলি উঠে বসে—
‘তুসু থাক, চলো নিচে ঘুরি আসি’।
সে বোধ হয় কিছু কিনতে চায়। ডিউটি ফ্রি’তে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে তেমন কিছুই কেনার পাই না বা কিনি না। ফিরে আসি।

আমেরিকার পশ্চিম উপকূলশহর সানফ্রানসিস্কোর উদ্দেশে আমাদের পরের ফ্লাইট টি কে ২৮৯ ছেড়ে যাবে সকাল আটটা পঁচিশে। ঘণ্টাকাল আগেই আইজিএ লাউঞ্জের ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে বোর্ডিংগেটের নম্বর ভেসে ওঠে—ডি ১১। লাউঞ্জ থেকে এর দূ্রত্ব আধকিলোমিটারের কম নয়। তাই সোলেমানী আতিথ্যের পাট চুকিয়ে আমরা হাতব্যাগ গুছিয়ে সেদিকে রওনা দেই। আমেরিকার ফ্লাইট। আমাদের পাসপোর্টে মাহমুদ আর মাহমুদ, আমরা বিশ্বাসী মুসলিম। নিরাপত্তার তোড়জোড় একটু বেশিই।

তিন.
লাউঞ্জ ফ্লোর থেকে বিপনীতলায় নেমে লিফটে উঠি। নিচের ফ্লোরের ডি—১১তে আমাদের বোর্ডিং গেট। তুসু সমান্তরাল চলন্ত ওয়াকওয়ের ওপর কেবিন ব্যাগ রেখেছে। পিঠে ব্যাকপাক নিয়ে চলেছে আমাদের আগে আগে। সে আমাদের পিছনে ভৃপৃষ্ঠে এলেও এখন অগ্রবর্তী, আশার আলো। জলি আর আমি আস্তে আস্তে গিয়ে উঠি স্বত:শ্চল সে রাস্তায়। যেসব গেটমুখে বিমানের বোর্ডিং শুরু হয়েছে কিংবা বিমান ছাড়ার সময় লাস্ট কল দেয়া হচ্ছে, সেসবের দিকে চলন্ত ওয়াকওয়ে’র ওপর দিয়ে যাত্রীরা দৌড়ে যাচ্ছে। বিমানবন্দরে এই এক সুবিধা। লাগেজপত্র নিয়ে ঘুরে ঘুরে গেটমুখে যেতে যাতে ক্লান্তি না আসে যাত্রীদের, সে জন্য থাকে চলন্ত পথ। নতুন বিমানবন্দর হলে তো কথাই নেই।
মাথার ওপর অর্ধবৃত্তাকার ডোমের নিচে এই চলন্ত ওয়াকওয়ের দু’পাশে যুক্ত অসংখ্য বোর্ডিং গেট। একটি ওয়াকওয়েতে উঠে লোকজন একেক গেট থেকে যাত্রা করছে একেক দেশের দিকে। কেউ পাড়ি দেবে আটলান্টিক, কেউ প্রশান্ত। আবার কেউ ফিরতি পথে আরবসাগর পার, ভারত, চীন, জাপান সাগর বা বঙ্গোপসাগরের দেশের দিকে ছুটবে। জীবন চলার পথে কখনো আমরা একই পথের পথিক, শেষমেষ পথ চলে যায় ভিন্নপথে। এ যেন ‘লাকুম দ্বীনুকুম, ওয়ালিয়া দ্বীন’—তোমার জন্য তোমার ধর্ম, আমার জন্য আমার। কিংবা ওই যে গান ‘আজ দু’জনার দুটি পথ, ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে’ৃ..।
ডি—১১ থেকে ছাড়বে ফ্লাইট ২৮৯, ইস্তাম্বুল—সানফ্রানসিস্কো। গেটমুখে বেশিই কড়াকড়ি। আমেরিকা ঢোকার আগে এখান থেকেই যেন সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হচ্ছে। বিশেষ নিরাপত্তা সংস্থা বোর্ডিং ওয়েটিং এরিয়ায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। কোভিড টেস্টের সনদ, পাসপোর্ট—ভিসা, বোর্ডিং পাস দেখানোর পর আমাদের লাগেজপত্র নিরাপত্তা চেকের যোগ্য হয়। পুঙ্খানুপুঙ্খ চেকের পর প্রবেশাধিকার পাই। কিছুক্ষণ পর ডাক আসে বিমানে ওঠার। আমি এক্সাইটেড। জীবনের শত শত উড়ালের মধ্যে আজ উঠতে যাচ্ছি ব্রান্ড নিউ বোয়িং ড্রিমলাইনার এর ৭৮৭—৯ এয়ারক্রাফটে। গেটমুখে আসার সময় ট্যাক্সিওয়েতে টার্কিশ উড়োজাহাজের যে বিশাল সারি দেখেছি, বোয়িং ড্রিমলাইনার তার মধ্য সবচেয়ে বিলাসবহুল ও আধুনিক। আমাদের আলটিমেট গন্তব্যও বোয়িংরাজ্য সিয়াটলে।
বিমানের ভিতরে ঢুকেই ‘সেইরাম’ শব্দটি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলে আমার। আধুনিক বিমানটিতে তিন সারিতে তিনটি করে আসন। তুসু বিজনেস ক্লাসের পিছনের কম্পার্টমেন্টেই জানালার কাছে আসন পেয়েছে। পেছনেই পাখার ওপরের কম্পার্টমেন্টে আমার আর জলির আসন। তুসুর পাশে বসেছে রাশভারী দুই গদাধরি মধ্যবয়স্ক। জানালার পাশ থেকে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনে দুই গদাধরিকে উঠতে বলা তার কম্ম নয়। তাই তার আসন জুৎসই হয়েছে বলে বলা যায় না। যদি উপকারে না আসে, বহু মূল্যবান জিনিসও ফেলনা হয়ে যায় জীবনে। আমাদের সারিতে তিন আসনের একটি ফাঁকা। ভয় পাচ্ছি কেউ যদি চলে আসে, দীর্ঘযাত্রার আয়েশ আরাম হারাম হবে। তুসুর পাশে দুই গদাধরিকে দেখার পর আল্লাহ আল্লাহ করছি কেউ যেন না আসে পাশে।
ভাবনার মধ্যেই বোর্ডিং চলার শেষপর্যায়ে এক তন্বী তরুণী এগিয়ে এলো ঘাড় ঘুরিয়ে আসন নম্বর খুঁজতে খুঁজতে। মধ্য সারিতে নিজের আসন পাওয়ার পরও সামনের আসনে বসা তরুণের পাশে ‘মে আই’ বলে বসে পড়লো । সদাহাস্য তরুণটি একাই বসেছিল তিন আসনের সারিতে। এখনও দুটি ফাঁকা। আলাপে বুঝেছি, ইউরোপ থেকে সে পাড়ি জমাচ্ছে আমেরিকায়। বোর্ডিং প্রায় শেষ। আমাদের সামনে পেছনে সবাই বসে গেছে। বিমান রানওয়ের দিকে রওয়ানা হবে হবে ভাব। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সামনের দিক থেকে এক চিকন সুন্দরী আসন দেখতে দেখতে এগিয়ে আসছে। আধুনিক পরিধেয়সজ্জিত। পরনে জিন্স, ছোট্ টি শার্ট। লম্বা, স্লিমফিগারের। মন বলে ওঠে: সে যদি বসে বসুক।
জলিকে বললাম,
: আসন বোধ হয় আর ফাঁকা রাখা গেল না। পাশের আসন বোধ হয় এই আগমনীর। সে যদি বসে বসুক।
: এতোক্ষণ তো আল্লাহ আল্লাহ করছিলে, কেউ যাতে না আসে। এখন তোমার আল্লাহ কোথায় গেল?’—জলি বললো।
: তার আসন হলে আর নিষেধ করতে পারবো না।
: হ্যাঁ, বুঝছি’
বলে জলি জানালা আমাকে ছেড়ে দিয়ে মাঝের আসনে বসতে উদ্যত হলো।
চিকনসুন্দরী ধীরপদক্ষেপে এগিয়ে এসে আমাদের সামনেই থামলো। হার্টবিট বাড়ছে, এই বুঝি এক্সিউজ মী বলে বসে পড়ে।
একবার সে ওপরের দিকে তাকালো। নব্য আগন্তুকা তখনও পাশের সদাহাস্য তরুণের সঙ্গে আলাপরতা। দু’চার কথায় কেবল তারা ঘনিষ্ঠমান। এ অঙ্কেই চিকন সুন্দরীর উদয়। আসন নম্বরে চোখ বুলিয়ে অস্থিরকন্ঠে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলো—
‘হোয়াটস ইওর সীট নম্বর”?
আগন্তুকা বিনাবাক্যব্যয়ে আসন ছেড়ে মধ্য সারিতে নিজ আসনে বসলো।
চিকন সুন্দরীর কন্ঠনি:সৃত ‘হোয়াটস ইওর সীট নম্বর’ বাক্যটি আমার কানে শোনালো ‘তুই ক্যাঠা, আমার ভাগ্যে ভাগ বহাতে আইছোস’ এর মতো।
জলি আর আমার চোখ সামনের আসনের দিকেই স্থির। তিন আসনের সারিতে জানালায় তরুণের একাকী বসা, আরেক তন্বীর তার পাশে বসে আলাপ জমানো আর শেষমেষ আরেক এসে তাকে ভাগিয়ে নিজের আসন বুঝে নিয়ে আলাপ জমানোর মধ্য দিয়ে নাট্যাংশের যবনিকা। আমরা চোখাচোখি করি। পাশের আসনের গুঞ্জরণ প্রলম্বিত হওয়া শুরু হয়। জানি না, ফ্লাইটের সঙ্গ আসন কতোজনের ভাগ্যে প্রেম জুটিয়ে দিয়েছে। আজকের গুঞ্জরণে মনে হচ্ছে অন্তত একটি হলেও সঙ্গআসন সঙ্গী জুটাবে। এরই মধ্যে বিমান রানওয়েতে টেকঅফের জন্য দৌড়াচ্ছে।

ইস্তাম্বুল থেকে সোজা পশ্চিমে আটলান্টিক সাগরের দিকে মুখ না করে ড্রিমলাইনার যাত্রা করলো সোজা উত্তরে। হালে আমেরিকা—কানাডার আকাশ রাস্তায় অতলান্ত—প্রশান্তকে এড়িয়ে যাওয়ার চল হয়েছে। পৃথিবী বৃত্তাকার, তাই যে কোন দিক থেকে চক্কর দিতে বাধা নেই। অনেক এয়ারলাইন বেছে নিয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু। আমি নিজে একযুগ আগেই থাই এয়ারওয়েজের ননস্টপ ফ্লাইটে এসেছি নিউইয়র্কে। আটলান্টিক ও প্রশান্ত রুটে পানির ওপরই টানা আটদশঘন্টা উড়তে হয়। উড়োহাজাজগুলো বাতাসের বেগ নিয়ে আকাশে চললেও মৃত্তিকামুখী। মাটির স্পর্শ না পেলেও এর ওপর দিয়েই চলতে চায়। মাটির স্পর্শ আমাদের বড় প্রয়োজন।

বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড ও ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন এর ওপর দিয়ে তা পাড়ি জমালো নরওয়ের আকাশে। গতিবেগ ঘন্টায় নয়শ কিলোমিটারের বেশি। আকাশ পথে পাড়ি দিতে হবে এগারোহাজার কিলোমিটার। নরওয়েজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে পৌছালো গ্রিনল্যান্ডের বরফরাজ্যে। এসব দেখছি যখন বিমানের ত্রিমাত্রিক মানচিত্রে, তখন ভেতরে এক ভিন্ন জগত। বিমানের জানালাগুলোর গ্লাসের স্বাভাবিক রঙ বদল করে রাতের নীবিড়তা আনা হয়েছে। নিচের তুষাররাজ্যের ওপর সূর্যের আলো বড় তীর্যক হয়ে পড়ে। জানালার রঙ বদল করে সূর্যালোকের কড়া তেজ থেকে যাত্রীদের প্রশান্তি দেয়ার আয়োজন। কৃত্রিম আলোয় ভেতরে আয়োজন খানাপিনার।
টার্কিশ এয়ার এ রুটটিতে অনেকখানিই উদার। ঢাকা—ইস্তাম্বুল যে আতিথ্য পেয়েছি, এখানে পাচ্ছি তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। ড্রিমলাইনারের হোস্টেজগণকে ডানাকাটা পরী বললে কম বলা হবে। ফর্সা লম্বালতা দেহে আঁটসাটো খয়েরি ইউনিফর্ম তাদের দিয়েছে আরও কমনীয়তা। তুরস্ক মুসলিম দেশ হলেও ইরেশিয়ার দেশ। ব্যবসা জানে। আজকের আতিথ্যে মেন্যু সার্ভ হয়েছে আগে ভাগে। যাতে খাওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। মেন্যুতে দেখি,পাস্তা ও বিশেষ তুর্কি কেতার বিফ । এ্যাপিটাইজার, চা, কফি, কোমল ও’শক্ত’ পানীয়ও নেয়া যাবে ইচ্ছেমতো। তেরোঘন্টার ফ্লাইটে সারাক্ষণই থাকবে জুস আর স্যান্ডউইচ। পুরো দিন কাটাতে হবে আকাশে বাতাসে। ভারী খাবার চাই। আমরা বিফেই কম্পোর্টেবল। পাতে তাই এলো।

আমার পাশ্ববর্তিনীর অনুযোগ খাওয়ার প্রসঙ্গ এলেই আমি নাকি দুইবার জিহ্বা নাড়িয়ে ঠোঁট লেহন করি। লোভাতুর মুখ চকচক করে ওঠে আমার। সে এখন চল্লিশ হাজার ফুট নিচে দেখার কসরত করে যাচ্ছে কিংবা ফ্লাইট রুটের মানচিত্রে বুঁদ, তাই খাওয়া নিয়ে আমার মুখের অভিব্যক্তি দেখার ফুরসত নেই তার।

আ‌ইসল্যান্ডকে বাঁয়ে রেখে গ্রিনল্যান্ডর সফেদ বরফরাজ্য কেটে উড়ছে বোয়িংয়ের বিস্ময়কর উড়ালপাখি ড্রিমলাইনার। নিচে সাদা ফকফকে। এখানে শ্বেতভল্লুকই কেবল বাঁচতে পারে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে দেখেছি, বাঁচা ও খাবারদাবারের সন্ধানে বরফরাজ্যের বিয়ার কতো না লড়াই করে চলে নিত্যদিন। উত্তরমেরুর ওপর দিয়ে উড়াল নিয়ে যখন নানা ভাবনা ভাবছি, আমাদের ফ্লাইট বাফিন বে পাড়ি দিয়ে কানাডায় ঢুকে পড়েছে। কানাডা বৃটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যের ক্যালগেরি শহরকে ডানে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ও অরেগন রাজ্য পেরিয়ে উড়তে থাকে সানফ্রানসিস্কোর আকাশে। ভাগ্যিস, এখন কোন বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছি না। তখন বন্ধু হয়তো বলতো, আমেরিকা যাবা তো কানাডা গেছো ক্যানে? সে দেশে তো আরও পশ্চিমে! একবার যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথে চীনে একরাতের ট্রানজিটে ছিলাম। একবন্ধুর সঙ্গে ফোনে আলাপ হচ্ছিলো, সে বললো, আমেরিকা যাবা তো পূবের দেশ চীনে ক্যানে?
এখন বন্ধুর নয়, কেবিনক্রুর কন্ঠ শুনি ‘লেডিজ এ্যান্ড জেন্টেলম্যান, উই এ্যরাইভড সানফ্রানসিস্কো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top