সরোজ মোস্তফা: আহত মাটির ক্রোধ ও অন্যান্য কবিতা

(প্রিয় শাখাওয়াত, বিপ্লু, এমদাদ, শফিউলকে)

আহত মাটির ক্রোধ

ভাঙন দেখছি অতিথির মতো
উল্লাস দেখছি অতিথির মতো
দুঃখী দেশ ভেঙে স্তব্ধ হলো আজ
নিচু হয়ে গেলো আয়ত সমাজ।

যে সন্ধ্যা দেখে না সে-একটা রুগ্ন
খোয়ারের শিকে থাকে সংলগ্ন।
না-জানলে বীজ বপনের মন্ত্র
মৃত্তিকা হয় না শস্যবতী নম্র।

এই শালদীঘা, বৃষ্টি, মহালয়া
মাতৃত্বের গ্রামে সবটুকু ছায়া।
ভোরের রহস্য দেখলো না যারা
শূন্যতায় রুগ্ন হাকাকার যারা
অনর্থক বাঁশি বাজিয়ো না তারা
অন্ধত্বের আয়ু বাড়িয়ো না তারা।

 

কথা

আমি চাই কথা হোক। জেগে ওঠো পথ, শিশুর স্থপতি।
নিস্তব্ধ শ্রাবণে খুলে যাক মুখমণ্ডলের নীলকোষ
নির্মম স্তব্ধতা।
আমি চাই গান হোক
মুমূর্ষু সজল পৃথিবীতে
ভেঙে যাক অন্ধ অপরাধ।
এই হতভাগ্য কিংবদন্তির দেশে সবটুকু খুলে
বুকের পাঁজর রক্তের লহর নামুক সদরে।
পাতার সবুজে আবারো জাগুক স্বপ্নমুখী ছাত্রদল।
একা জ্বলে ওঠা কালিকলমের মুমূর্ষু চণ্ডাল
জেনে গেছে আজ মৃত্যুর চেয়েও হীনমন্য এই
খরার মাটিতে স্থির বেঁচে থাকা।
কথা হলে ব্যথা নীল রঙে নাচে বাঁচার বিপ্লবে
পুত্রের লাবণ্যে
কবিতার মতো কথা হোক পূর্ণ ঝোড়ো নজরুল।
আহত মাটির লাল লাল ক্রোধে খুলে যাক কণ্ঠ
তুলসী পাতার মিহির আলোতে
শস্য বুননের তাজা এক স্বরে কথা হোক সলতে মাধুরি।
তোমাদের হাতে হাত রাখলেও নিঃস্ব মঞ্জিলের
উত্তরাধিকারে কথা হোক আজ আমার দহন।

 

বয়সে

বয়স বাড়লে লাল ঘোড়ারাও ভাবে
এ-কোথায় পৌঁছুলাম!
আতা ফলের আমুদে শুধু শুধু দৌড়ুলাম।

শীত প্রহরের ঢালু সর্ষে ক্ষেতে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে।
মেলার হরিণ পৃষ্টায় পৃষ্টায় হাসে।

কোথায় খুঁজবে হাত-পা হারানো মুখ।
সর্বত্র অসুখ।
নদী পেরুলেই অন্ধ গায়কের বাড়ি।
বয়স বাড়লে ক্ষত ও দৃশ্যের ছড়াছড়ি।

 

মাটিও

মাটিও কাঁদছে
তুমি ওর চোখ কীভাবে মুছবে!
তাই, বর্তমান বলে কিছু নেই।
সবকিছু লোকাল নদীর অতীত কিংবা গোধূলি!
ঘড়ির কাঁটায় ধাবমান
ধান-পাট, নীল নক্ষত্রের খোঁজে
অনেকেই ইয়াবা ট্যাবলেটের ঘোরে
আয়নাতে গুম হয়ে গেছে।

প্রতিচ্ছবিতে যে শহরকে দেখ
সেও বর্তমান নয়।
আইসিইউয়ের বিলের টাকা জোগাড় করতে
মালটার বাগানে হাঁটছে।

 

সেই নাম

আমার রয়েছে আশা ও আশ্বাস।
নদীর দু’কূল ঘুরে এই যে কবিতা লিখি
এসব কে দেখে, পড়ে তাও-তো জানি না।
অন্ধ প্রাচুর্যের একেকটা সমাজ ডিঙিয়ে
ঘন শ্রাবণের রঙে এখানে এসেছি
হিজলে-কদমে নুয়ে আছি ভাটির গায়েন।
স্বার্থসেগুন গিটারে
তোমাদের শয়তানি ঠেলে
আত্মার দরজা খুলে দেখি
আমার একটা নাম আছে।
সেই নাম বেঁচে আছে।

 

একা

এখানে এসেছি একা।
বহুকাল ঘুরে বৃষ্টির ভেতরে
কতো কিছু দেখলাম আনন্দে, ভোজসভায়।
পর্যাপ্ত জীবন পেয়ে পঞ্চাশেও
চিনতে পারিনি যে সমাজ
আর কি সুযোগ হবে চেনার-জানার
নদী ঘাস ফুলে পুনরায় তাকাবার।
মরার আগেই মরে যায় মন।
অসংখ্য নদীর নামে মুছে যায় মানুষের নাম।
নদীর অস্তিত্বে বেঁচে থাকি। খাই। বাজারেও যাই।
সেগুন পাতার চেয়ে দুখি এই দেশ
আমার হৃদয়।

 

মেঘ

হাঁক মাঝিদের কন্ঠে-হাওয়ায়
যাপন মাখিয়ে নামছি নামছি
করে ঝুলে আছে গাছের কিনারে।

জাম্বুরার গোলাকারে ধর্মে
যখন সময় হবে
রাষ্ট্র ও রাজার নদীকে ভাসিয়ে
কৃষক পরির গায়েনের
পাগলা দোতারা হয়ে সে নামবে।

সুর শেফালি মাটিতে
কাউকেই কেউ আটকাতে পারবে না।

 

সরোজ মোস্তফা

গারো পাহাড়ের নদী মগরার তীরে ছোট শহর নেত্রকোণায় জন্ম। কর্ম ও পৈত্রিক পরিচয়ে এই ক্ষীণস্রোতার পাশাপাশি স্বচ্ছ বসবাস। পেশায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক।

‘সকাল সন্ধ্যার বীজতলা’, ‘কাগজে সমুদ্র লিখি’, ‘লাল রক্তের ব্রহ্মাংশ’, ‘হলুদ খামের হিমঘর’, ‘সুরমা নদীর দস্তখত’ কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। ‘যতীন সরকারের মাস্টারি’, ‘গৌরাঙ্গ আদিত্যের জীবন ও সাধনা’, ‘বিপ্লব চক্রবর্তী: গায়েনের সংগীতযাপন’, ‘কৃষ্ণলীলার প্রথম নারীকবি সুলা গাইন’ তার প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ। হাওরাঞ্চলের ভাবুকতা, ধ্যান জনসংস্কৃতিকে তিনি যাপন করেন ও লেখেন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top