কবি আজীজুল হকের এক অমর সৃষ্টি ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’। ছায়ানাট্য। আমরা এই নাট্যের সাথে যুক্ত হয়েছিলাম মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। সাল হয়তো হবে ৭৮/৭৯। আমাদের আগে যশোরে একবার বা দুইবার নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। যশোরবাসীর ধারাবাহিক চাপ ছিল ভিন্নধারার অপূর্ব এই ছায়ানাট্য নিয়মিত মঞ্চস্থ হোক। নানা কারণে সেটি হয়নি। কবি আজীজুল হক স্বয়ং এই ছায়ানাট্যের বিষয়ে প্রচণ্ড সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি এটির অতিব্যবহার চাইতেন না। আমরা প্রচণ্ড ভাগ্যবান আমাদের অধ্যয়নসময়ে, কলেজ প্রাঙ্গণেই ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’ একবার মঞ্চস্থ হয়েছিল।
যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় (যা এখন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ), যাঁদের কারণে আমার কাছে উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁদের একজন কবি আজীজুল হক আর দ্বিতীয়জন অধ্যক্ষ আব্দুল হাই।
১৯৭৮/৭৯ সাল হবে। একদিন ক্লাসের পরে অধ্যক্ষ আব্দুল হাই স্যার সবাইকে ডাকলেন। সবাই মানে আমরা যারা কলেজের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে বেড়াতাম তাদেরকে। আজীজুল হক স্যার তাঁর সামনে বসা। অধ্যক্ষ স্যার বললেন, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা মঞ্চস্থ হবে।”
আজীজুল হক স্যার বাধা দিলেন, বললেন, “না না, অন্য কিছু করেন। ওটা অনেক কঠিন হবে। পরিশ্রম যেমন হবে, ব্যয়ভারও অনেক হবে।”
অধ্যক্ষ স্যার ওই দিন বোধহয় আদাজল খেয়ে কলেজে এসেছিলেন। তিনি তোয়াক্কা করলেন না। বললেন, “সেসব আমি দেখব, আপনি শুধু ছায়ানাট্য মঞ্চে আনেন। এই, তোরা কী বলিস?”
আমরা সবাই হৈ হৈ করে উঠলাম।
যদিও সে সময় জানতাম না ছায়ানাট্য কী, কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণাই-বা কেমন, আর তার গভীরতা কতটুকু। শুধু এটুকু চেয়েছিলাম যে, কিছু একটা হোক। কদিন মেতে থাকি স্যারের সাথে।
অবশেষে স্যারের সম্মতি সাপেক্ষে ছায়ানাট্যের কর্মকাণ্ড শুরু হলো। আজীজুল হক স্যার ছায়ানাট্যের সারসংক্ষেপ বুঝিয়ে দিলেন। বললেন কার কী কাজ। সেদিন বুঝতে পারলাম এই ছায়ানাট্য স্যারের এক কঠিন তপস্যার ধন। যত্রতত্র বা অনাদরে সে দেবীকে তিনি অবগুণ্ঠনমুক্ত করতে চান না। তাঁর জন্য চাই যোগ্য সিংহাসন, যোগ্য আয়োজন। স্যার যখন পটভূমি ব্যাখ্যা করছিলেন তখন বুঝতে পারলাম কী অসাধারণ এক কনসেপ্ট, যার পুরোটাই উপস্থাপিত হবে ছায়ার ভেতর দিয়ে। দর্শক-শ্রোতা, কুশীলবদের কণ্ঠ শুনবেন, ছায়া দেখবেন। পর্দায় প্রতিফলিত সেসব ছায়াচরিত্র অপূর্ব রহস্যময়তার ভেতর দিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের নিয়ে যাবে এক পরাবাস্তব রাজ্যে।
অভিনয় থেকে এখানে ব্যাকস্টেজের টেকনিক্যাল কর্মকাণ্ডের তাণ্ডব অনেক বেশি। কুশীলব ছাড়া নাটকের সব প্রপস (props) জালি কেটে তৈরি করা, যেন আলোর সামনে ধরলে বস্তুর অবিকল ছায়া পর্দায় উদ্ভাসিত হয়। সে এক এলাহি কর্মকাণ্ড!
কলেজের পর রিহার্সেল হতো। আমি এবং স্টালিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পাঠ পেয়েছিলাম। মফিজুর রহমান রুন্নু ভাই, মুজিবর ভাই—আরও অনেকেই এই ছায়ানাট্যের সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। রুন্নু ভাই এবং মুজিবর ভাই সে সময় খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। রুন্নু ভাই বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং গবেষক।
ছায়ানাট্য করতে গিয়ে পেলাম কবি আজীজুল হক স্যারের অন্য এক পরিচয়। যেন দ্রোণাচার্য তিনি! অর্জুনদের লক্ষ্যভেদী করতে কী নির্মমভাবে নিজেকে নিঃশেষ করেছেন। রিহার্সেলে এসে জামা খুলে ফেলতেন। তখন তাঁর পরনে থাকত ফুলহাতা গেঞ্জি আর তাঁর প্রিয় ব্রাউন রঙের ট্রাউজার। ট্রাউজার হাঁটু অব্দি গুটানো।
স্যারের একটা কবিতার লাইন আছে:
‘বাংলাকে ভালোবাসা বস্তুত বড় কঠিন ব্যাপার’
স্যার সেটা প্রাণ দিয়েই বিশ্বাস করতেন। ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’য় তিনি মূলত দেখিয়েছেন বাংলার জন্য ভালোবাসার সেই কঠিন সংগ্রাম। বর্গী, ইংরেজ, পাকিস্তানি শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে যে রক্তস্নাত স্বাধীনতা, তারই অমর উপাখ্যান এই ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’। বাংলা সাহিত্যে এমন ধারার দ্বিতীয়টি আছে বলে অন্তত আমার জানা নেই।
মঞ্চ তৈরি হয়েছে কলেজ প্রাঙ্গণে, শিক্ষক কমনরুম লাগোয়া কিংশুক ফুলবৃক্ষের পাশে, তিনতলা মেইন বিল্ডিংয়ের দিকে। দর্শকরা বসবেন মাঠে, উত্তর দিকে মুখ করে। তাঁদের সামনে রয়েছে সাদা বড় পর্দা। পর্দার পেছনে স্টেজ। যশোর শহর যেন ভেঙে পড়েছে! সন্ধ্যা ৭টার দিকে শুরু হয়ে গেল ছায়ানাট্য ‘কৃষ্ণচূড়ার তৃষ্ণা’। নাটকের অনুষঙ্গ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। মঞ্চের পেছনে চলছে টেকনিশিয়ান আর কুশীলবদের দক্ষযজ্ঞ। কোনো প্রপস কোনো আলোর সামনে ধরতে হবে, কোনো ভোকাল সাউন্ড কখন প্লে করতে হবে—তার নির্ভুল প্রয়োগ। এ যেন এক নির্মম যুদ্ধক্ষেত্র! সামান্য ভুলেই মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে। আর এসবই এক দক্ষ সেনাপতির মতো কড়া নজরে অবলোকন করছেন স্বয়ং আজীজুল হক স্যার।
নাটক তখন প্রায় ক্লাইমেক্সের দ্বারপ্রান্তে। হঠাৎ চলে গেল বিদ্যুৎ। ব্যস, নেমে এলো অন্ধকার! ভয়ানক অন্ধকার। কোনো জেনারেটর রাখা হয়নি; রাখার কারণও ছিল না। তখন ‘লোডশেডিং’ শব্দ আমাদের অপরিচিত ছিল। এই বিদ্যুৎবিভ্রাট আকস্মিক। স্যার জ্ঞান হারালেন। ধরাধরি করে স্যারকে শিক্ষক কমনরুমে নিয়ে যাওয়া হলো। দর্শক-শ্রোতা ঘটনার আকস্মিকতায় এক রকম বিহ্বল হয়ে পড়লেন। যেন এক স্বপ্নের ঘোর হঠাৎ ভেঙে গেছে! অপেক্ষা করলেন অনেকক্ষণ, কিন্তু বিদ্যুৎ ফিরল না।
স্যার সম্বিত ফিরে পেয়ে একবার জিজ্ঞেস করলেন, “বিদ্যুৎ কি এসেছে?”
ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন বলল, “আপনিই আমাদের বিদ্যুৎ! সুস্থ হয়ে উঠুন স্যার।”
