রেজাউদ্দিন স্টালিন: প্রাণিত কণ্ঠস্বর

১৯৭৬ সাল, বসন্তের দিন। ভর্তি হলাম আমার প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামাঙ্কিত মহাবিদ্যালয়ে। প্রথম বর্ষে লেখাপড়ার চেয়ে আড্ডা আর রাজনীতির চর্চায় বেশী আনন্দিত ছিলাম। কবিতা লিখি একথা কলেজের দু’একজন সহপাঠী আর রাজনৈতিক দলের কেউ-কেউ জানতো। কলেজের সবুজ চত্বর, বৃক্ষ আর ফুলশোভিত পথ, অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর কোলাহলের ভেতর দিয়ে কেটে গেলো প্রায় তিন মাস। আস্তে আস্তে ক্লাসের দিকে মনোযোগী হতে শুরু করেছি। একদিন বাংলা ক্লাসে এলেন অধ্যাপক আবু নঈম। তিনি বক্তৃতার এক পর্যায়ে কবি ও কবিতার প্রসঙ্গে নানা কথা বললেন। সাথে সাথে এও বললেন যে, আমাদের মহাবিদ্যালয়ে জাতীয় পর্যায়ের একজন কবি ব্যক্তিত্ব আছেন তার নাম তোমাদের জানা দরকার, তিনি হলেন কবি আজীজুল হক। এই প্রথম জানলাম। কবি আমাকে কাছে ডেকে নিলেন, খোঁজ খবর নিলেন। বললাম খুব সঙ্কোচে, স্যার আমিও মাঝে মধ্যে লিখতে চেষ্টা করি। তিনি কবিতাগুলো তাকে দেখাবার জন্য বললেন। আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে প্রায় ডজনখানেক কবিতা নিয়ে পরদিন স্যারের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। তখন বিকাল বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল সূর্যের আলো থেকে। আমি পিঠে রোদ নিয়ে স্যারের ২য় তলার ফ্ল্যাটে কড়া নাড়লাম। স্যার আমাকে দেখে সাদরে ভেতরে ড্রইংরুমে নিয়ে গেলেন, চা বানাতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন আমার পারিবারিক জীবন। বললেন কবি হতে চাইলে তোমাকে পড়তে হবে পৃথিবীর নানা বিষয়। যতটা সম্ভব বড় বড় কবির নাম বললেন এবং তাদের বইগুলো একাধিকবার পড়বার জন্যেও উপদেশ দিলেন কিন্তু নিজের সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকলেন। বললেন মাঝে মাঝে এসো। আমি সঙ্কোচবশে আমার কবিতাগুলো স্যারকে দেখাতে পারলাম না। কিছুটা মন খারাপ ভাব নিয়ে যশোর পাবলিক লাইব্রেরীর দিকে রওয়ানা হলাম। সেখানে গিয়ে কবি আজীজুল হকের বই খুঁজলাম, পেলাম কবি শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদের বই। এর আগে পত্রিকায় শামসুর রাহমানের দু একটি লেখা পড়েছিলাম কিন্তু আমার হৃদয়ে তেমন স্পর্শ করতে পারেনি। আল মাহমুদের কবিতা দু একখানা পড়ে অন্যরকম মনে হলো, ভিন্ন এক গন্ধে আমি চমকিত হলাম। এরপর প্রায়ই পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়তে থাকলাম সব চেনা অচেনা কবির বই। এরপর ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরে প্রথম পুরষ্কার হিসাবে পেলাম কবি আজীজুল হকের ‘বিনষ্টের চিৎকার’ আর আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘লেলিহান পাণ্ডুলিপি’। ‘বিনষ্টের চিৎকার’ বইটির প্রচ্ছদ, ছাপা, বাঁধাই সবকিছু আমার কাছে ভাল লেগেছিল। আমি সারাদিন ধরে সবগুলো কবিতা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। এত নিখাদ উচ্চারণ, এত দাঢ্য, এত ঋজু, এত নির্মেদ আর তীক্ষ্ম শব্দশৈলীর কবিতা আমি এর আগে পড়িনি। বুদ্ধি আর আবেগের গভীর সম্মেলন, রাজনীতি আর ইতিহাস চেতনার চিত্রকল্প আর উৎপ্রেক্ষা আর উপমার কবিতাগুলো স্বচ্ছ। পড়লাম—

অবশ্যই আমি সেই ব্যবহৃতা রমণীর সজ্ঞান প্রেমিক।
জীবনকে সুনিপুণ আলিঙ্গনে বেঁধে
চিরকাল বেঁচে থাকে নির্বিঘ্নে যেমন মৃত্যুটা,
তারো চেয়ে অধিক নিকটে আমি তার,
নিমজ্জিত আমি তার সকল বিষয়ে…

আরো অনেক আশ্চর্য গাঁথুনির কবিতা। সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন বিষয়। প্রায় সবগুলো কবিতা মুখস্ত হয়ে গেলো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবি আজীজুল হকের কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলাম। বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে থাকলাম পঞ্চাশের নিভৃতচারী এই কবির। একদিন বলেই ফেললাম স্যার আমার মনে হয় আপনি স্বেচ্ছানির্বাসিত। স্যার মুখ গম্ভীর করে বললেন তুমি জানলে কি করে? বললেন আমি স্বেচ্ছানির্বাসনে বলে তোমাকে তা করতে দেবো না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা চলে যাও। তোমার কবিতাগুলো থেকে বেছে একটা বই করো। আমি স্যারের কথায় উৎসাহিত হলাম। ইতিমধ্যে যশোরে স্যারের নেতৃত্বে বড় বড় দুটো সাহিত্য সম্মেলন করেছি। দেখেছি রাজধানীর সব কবি আজীজুল হককে সম্মানের চোখে দেখেন, কেউ কেউ ঈর্ষার। বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে কবি আজীজুল হকের সাথে আলাপ হতো। দেখতাম প্রায় সব বিষয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান। বলেন স্পষ্ট উচ্চারণে আন্তরিকতার সাথে। সাদামাটা জীবন শিল্পের অহংকারে দৃঢ়, দুঃসাহসী সত্য উচ্চারণে অকপট, লেখায় স্থিতধী। তাঁকে অনুকরণ করাও কঠিন। আমার রয়েছে লোকপ্রিয়তার লোভ, নিজেকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার বাসনা। স্যার আমাকে তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। একদিন বললেন রাতারাতি জনপ্রিয়তা কবিদের পথ নয়, কাজ নয়। যদি তা চাও তবে চলচ্চিত্রে যাও। আমি লজ্জায় অবনত হলাম, বললাম স্যার আপনার কথা মনে থাকবে তবে স্বেচ্ছা-নির্বাসন আমার কাজ নয়। আমি আপনার মতো লুকিয়ে থেকে অন্যের নির্মাণে তৎপর হতে পারবো না। স্যার বললেন অন্যকে নির্মাণ করতে হবে কে বলেছে? নিজেকে আগে নির্মাণ করো। তোমার যে প্রস্তুতি তা অনেকের নেই। তুমি আগামী মাসে ঢাকা যাও। ওখানে আমার পরিচিতদের তোমার কথা বলেছি। লাইব্রেরী, সবুজ মাঠ, সাহিত্য আড্ডা, প্রতিদিন কবি আজীজুল হকের নতুন আর উদ্দীপক আলোচনার মোহ ছিঁড়ে শুধুমাত্র কবি হওয়ার জন্য এক অজানার দিকে পা বাড়ালাম। সাথে থাকলো এক মহান দেবতুল্য মানুষ ও কবির কণ্ঠস্বর—

আশ্চর্য নয় যে কবিতা কখনো কখনো
অনবদ্য থাপ্পড় মারে এ
এবং অনেক বিখ্যাত চোয়াল উনিশ-শো আশি নব্বুই
দু’ হাজার খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রী-রী জ্বলতে থাকে।

 

 

রেজাউদ্দিন স্টালিন

রেজাউদ্দিন স্টালিন (জন্ম ২২শে নভেম্বর, ১৯৬২) কবি, লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি আশির দশকের অগ্রগণ্য ও সফল কবি হিসেবে বিবেচিত। তার রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশটি। কবিতায় অবদানের জন্য তিনি ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: “পূর্ণ্যপ্রাণ যাবে”-১৯৮৩ সাল, “দাঁড়াও পথিকবর”-১৯৮৬ সাল (একটি যৌথ প্রকাশনা), “ফিরিনি অবাধ্য আমি”-১৯৮৫, “ভেঙে আনো ভিতরে অন্তরে”-১৯৮৭, “সেইসব ছদ্মবেশ”-১৯৮৯, “আঙ্গুলের জন্য দ্বৈরথ”-১৯৯২, “আশ্বর্য আয়নাগুলো”-১৯৯২, “ওরা আমাকে খুঁজছিল”-১৯৯৭, “সম্ভাবনার নিচে”-১৯৯৬, “পৃথিবীতে ভোর থেকে দেখিনি কখনো”-১৯৯৭, “আশীর্বাদ করি আমার দুঃসময়কে”-১৯৯৮, “হিংস্র নৈশভোজ”-১৯৯৯, “আমি পৃথিবীর দিকে আসছি”-২০০০, “লোকগুলো সব চেনা”-২০০১, “নিরপেক্ষতার প্রশ্ন”-২০০২, “পদশব্দ শোন আমার কন্ঠস্বর”-২০০৩, “পুনরুত্থান পর্ব”-২০০৪, “অবিশ্রুত বর্তমান”-২০০৫, “মুহুর্তের মহাকাব্য”-২০০৬ সাল, “অনির্দিষ্ট দীর্ঘশ্বাস”-২০০৮, “ভাঙা দালানের স্বরলিপি” ২০০৯, “কেউ আমাকে গ্রহণ করেনি”-২০০৯ সাল। রেজাউদ্দিন স্টালিনের কবিতা ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, উড়িয়া, রুশ, জার্মান, চীনা, জাপানী ও ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

রেজাউদ্দিন স্টালিন  দীর্ঘদিন নজরুল ইনস্টিটিউটের উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক। 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top