কবীর হোসেন তাপসের একগুচ্ছ কবিতা

জীবন

জীবন হলো
বাসনা-মাখা সাবান
স্নান করব বলে
যেই নেমেছি জলে
ফসকে গেল
হাতের মুঠি গলে!

 

ফিরে যাওয়া

তুমি ফিরে গেলে মাতাল হাওয়ার দেশে
বাতাসের ফুঁয়ে নবীন পাতার বাঁশী
শুনে শুনে হেঁটে যাবে।
তুমি ফিরে গেলে কবিতাতপ্ত দেশে
ভেতরের শীত শব্দ আগুনে ভেঙে ভেঙে
গলে যাবে।
আমি জেগে আছি রাতজাগা লাল গ্লাসে
অস্ফুট স্বরে অহেতুক কলরবে।
এখানে বন্দি বাতাস ইমারত থরে থরে।
উতল বাতাস হয় না ভুলেও মাতাল।
রাতজাগা চোখ জাগে না সরল ভোরে।
তুমি ফিরে গেছ নদী ও লতার পাশে
নিকানো সবুজ হৃদয়ের ক্যানভাসে।
মাটি ও মানুষ পাললিক মনে ডাকে।
আমি পড়ে আছি ফিরে যাব একদিন।
হয়না ফেরা ঋণের পাথরে
জীবন যে সঙ্গিন।

 

হৃদয়ের ক্ষত

চারিদিকে শুধু মনখারাপের গল্প। খোলা চোখে
যতটা না দেখা যায়, গাঢ় দীর্ঘশ্বাস অপলকে
সেই গল্প বলে যায় তার চেয়ে বেশি। শীতে হিম
হয়ে ঝরে সেই গল্প পাপড়ি পল্লবে। ওই অসীম
শূন্যতার মধ্যে ঘরছাড়া বেদনার গল্পগুলো,
ক্রমে ক্রমে জড়ো হয় খড়ের পালার মতো স্থূল
গম্বুজ, চাষীর ক্ষেতে। শিশির-অশ্রুতে সারারাত
জমে জমে ভারি হয় । ঘরহারা কুলহারা দুখের
কাহিনি বলে চলে ঝাপসা নক্ষত্র আর চাঁদের সাথে।
তারই ফিসফিস শব্দে ঘুমোবার রাতে জাগি আমি।
এতো মনখারাপের নামি-দামি মুক্তোমানিক করে
আমাকেই তার অনুগামী।

সারারাত জাগি। শুনি বেদনার গল্প শত শত,
হারানো নারীর মতো জেগে ওঠে হৃদয়ের ক্ষত।

 

বিভ্রম

কোনটা তোমার মুখের কথা
কোনটা মনের কথা
বুঝতে গিয়ে দিন ফুরলো
রাত্রি যথাতথা।
কোনটা তোমার চোখের পানি
কোনটা হাসির খেলা
কিনতে গিয়ে ফতুর হলাম
ভীষণ অবরবেলা।
কোনটা তোমার সত্য ছিল
কোনটা তোমার মিথ্যে
আয়না ছিল সব ভেঙেছি
অন্ধ চোখে চিনতে।
কোনটা তোমার ভালবাসা
কোনটা অবহেলা
মাপতে গিয়ে নিক্তি উজাড়
শেষ হয়না খেলা।

 

স্বপ্ন

দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন থাকে
স্বপ্নে থাকো তুমি
স্বপ্নগুলো হচ্ছে উজাড়
দৃশ্য মরুভূমি।

স্বপ্নছাড়া দুচোখ যেন
ঝিনুক মুক্তহারা
তখন যে আর যায়না দেখা
চোখের বাইরে কারা।

স্বপ্নগুলো জাপটে রেখ
কাড়তে দিও না
স্বপ্ন গেলে দেখা থাকে
দৃষ্টি থাকেনা ।

 

পরাবাস্তবতা

ঠিক পড়ে যাবার আগে তোমাকে জড়িয়ে
ধরতে চেয়েছিলাম।
জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম তোমার
ছায়াময় শাখাপ্রশাখা। ইটসুরকির
অপার্থিব কোন খাদ কিম্বা দীর্ঘ সম্পর্কের
কোন ফাটল।
কিন্তু হাতে উঠে এলো ছ্যাদলা-পড়া
পিচ্ছিল আশংকা।
অন্ধকারে পড়ে যাবার আগে আমি একবার
হাতটাকে দেখেছিলাম।
জেনেছিলাম এই সেই হাত,
যে হাতে মানুষের ভাগ্য লেখা থাকে।

 

কবীর হোসেন তাপস

কবি ও দেশীয় বিজ্ঞাপন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্ণধর । কবিতা লিখছেন আশির  দশক থেকে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম পূর্ণপ্রাণ যাবো (যৌথ)। এরপর দীর্ঘদিন লেখালেখির বাইরে থাকলেও বর্তমানে প্রচুর লিখছেন। পঞ্চাশের দশকের অন্যতম কবি আজীজুল হক তার কবিতা সম্পর্কে বলেন: “আবেগকে, অভিজ্ঞতাকে পূর্ণ অবয়বে আনার আগেই আকস্মিক ভেঙে দেওয়ার, যুগ ও তারুণ্যের অস্থিরতা প্রকাশকল্পে দ্রুতকথন, আভাসন এবং প্রতীকপ্রিয়তাকে পোষনের প্রবণতা তার কবিতাকে মেজাজ দান করে।” সাহিত্য ক্যাফেতে প্রকাশিত কবিতাগুলোতেও তার এসব প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায়।

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।