আজও আমি তাকে দেখি। হেঁটে যাচ্ছেন তিনি যশোরের পাবলিক লাইব্রেরির মাঠের ভেতর দিয়ে, মুজিব সড়ক ও ভৈরব নদীর সেতুর ওপর দিয়ে। কখনো দুপুরের খরতাপে, কখনো বিকেলের প্রশান্ত রোদ্দুরে। শান্ত তার মুখ, দৃঢ় পদক্ষেপ আর ক্ষিপ্র বাবরির দুলুনি। যেন সদ্যকৈশোর পেরুনো তরুণ, যেন অজস্র স্বপ্ন আর সুন্দর খেলা করছে চৈতন্যের ভেতর। মানুষটি ছিলেন হ্রস্বকায়, ছিমছাম; সফেদ দেহবর্ণ আর সুন্দরভাবে ছাঁটা চুল। যখন প্রথম দেখি, বয়স ছিল ষাট ছুঁই ছুঁই। তবু তার দৃপ্ত পদভঙ্গিমা, পরিচ্ছন্নতা, ক্ষিপ্র বাকভঙ্গি আর বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি সচেতনতায় তাকে মনে হতো প্রাণচঞ্চল তরুণ। তার সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার পরও বেশ ক বছর পেরিয়ে গেছে, তবু তার সেই হেঁটে যাওয়া আজও কী সজীব! কেবলই মনে হচ্ছে এখনো কবি আজীজুল হক হেঁটে যাচ্ছেন শহর যশোরের সড়ক থেকে সড়কে…। কিন্তু তিনি আজ নেই। মৃত্যু এসে দেহবিচ্যুত করেছে আমাদের এক মহীয়ান, ব্যক্তিত্ববান, নিঃসঙ্গ কবি-পিতার। তিনি ছিলেন আমাদের পিতার মতোই, যারা ছিলাম তার স্নেহধন্য, অনুরাগী কিংবা স্বপ্নের উত্তরাধিকার। তার মৃত্যু কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, আয়ুর ধর্মে যথেষ্ট বয়স হয়েছিল তার (জন্ম ২ মার্চ, ১৯৩০; মৃত্যু ২৭ আগস্ট, ২০০১)। তবু যখন আজ জানলাম, কবি আজীজুল হক মারা গেছেন, যেন এক তীর এসে বিদ্ধ করল; স্মৃতি আর শোক আর ক্ষোভ এক ক্ষত সৃষ্টি করল। কারণ, কবি আজীজুল হক আমাদের চেতনায় অন্য এক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আছেন।
আজকের খ্যাতিলোভ আর আত্মপ্রচারের দিনে আমরা তাকে খুব সহজেই এক ‘মফস্বল’ শহরের ‘মফস্বলি’ হয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে দেখেছি। অথচ প্রতিভায় তিনি আমাদের ‘প্রধান’দের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না কিংবা জীবনভর খুব অল্প লিখলেও সেগুলোও মূল্যমানের দিক থেকে কোনো অংশেই কম ছিল না। সারা জীবনে মাত্র তিনটি কবিতার বই (ঝিনুক মুহূর্তে সূর্যকে; বিনষ্টের চিৎকার; ঘুম ও সোনালী ঈগল) আর কবিতাবিষয়ক একটি মূল্যবান গদ্যগ্রন্থ (অস্তিত্ব চেতনা ও আমাদের কবিতা) এবং বিচ্ছিন্ন কিছু লেখা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এই স্বল্প লেখাই যে কত মূল্যবান আর অসামান্য ছিল, তা হয়তো আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ বলেই উপলব্ধি করতে পারিনি। বাংলা একাডেমী পুরস্কার, স্থানীয় কয়েকটি পুরস্কার এবং অল্প কজন সংবেদনশীল পাঠক ছাড়া তাকে সারাজীবন একজন ‘মফস্বলে কবি’ হয়েই জীবন অতিবাহিত করতে হলো। এর কারণ হয়তো তিনি তার সময়ের ইঁদুরদৌড়ে অংশগ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিংবা খ্যাতিলোভ তার কাব্যশক্তির চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারেনি। নইলে পঞ্চাশের দশকে যিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্র, ছিলেন একুশের মিছিলে, মুক্তির আন্দোলনে, তার শুভার্থী-বন্ধু-অগ্রজ ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর, আহসান হাবীব, হাসান হাফিজুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বরা— তিনি তো আজকের তিলোত্তমা নগরীতে অবলীলায় তথাকথিত নায়ক হয়ে উঠতে পারতেন, মিডিয়ার কাছে পরম পূজনীয় হয়ে উঠতে পারতেন। অথচ সবকিছু ছেড়ে তিনি যশোরের মতো একটি ক্ষুদ্র শহরে কলেজ-শিক্ষক হয়ে জীবন পার করে গেলেন! তবু কোনো ক্ষুদ্রত্বই হয়তো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি, কোনো লোভ তাকে বিভ্রান্ত করেনি। হয়তো তার ক্ষোভ ছিল, ছিল অভিমান কিন্তু তাও কখনো উচ্চকণ্ঠে বলেননি। কেবল একবার, সম্ভবত একবারই নাসির আলী মামুনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে মুদ্রিত) তিনি ঢাকার সাহিত্য সম্পাদকদের ব্রাহ্মণ্যত্য সম্পর্কে বলেছিলেন, কেবল মফস্বলে থাকতেন বলেই তারা তার লেখা ছাপানো বিষয়ে নিরুৎসাহী ছিলেন কিংবা অবহেলা করেছেন। প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের কথিত প্রধান লেখককূল এবং মিডিয়ার কাছ থেকে তিনি অত্যন্ত অন্যায়ভাবে প্রান্তিকীকরণের শিকার হয়েছেন। তবে এসব যে তাকে খুব কাতর করেছে এমন নয়, বরং চিন্তাচেতনায়, জীবনযাপনে, আর ব্যক্তিত্বে তিনি এমন পরিচ্ছন্ন আর দৃঢ় ছিলেন যে, তার সময়ের ভিন্নধারার এক আদর্শ আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছিলেন।
তাকে যতদূর জানি, তাতে মনে হয়, তিনি আমাদের সময়ের এক নিঃসঙ্গ নায়ক, যিনি যথার্থ অর্থেই ছিলেন আপাদমস্তক কবি এবং একজন কবির বৈধ অহঙ্কার নিয়ে একধরনের স্বয়ম্ভু জীবনযাপন করে গেছেন।
কবির শিল্পমূল্য বিচারের জন্য যদি মৃত্যু-পরবর্তীকাল প্রকৃষ্ট সময় হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে হয়তো কবি আজীজুল হক বাংলা কবিতায় একটি পৃথক ধারার প্রতিভূ হিসেবে বিবেচিত হবেন। কেননা, আপাত শান্ত-নির্জনতা আর নির্লিপ্ততার ভেতর দিয়ে তিনি বাংলা কবিতায় ভিন্ন এক জিজ্ঞাসা, মানবীয় জীবনযন্ত্রণা এবং অস্তিত্ব-চেতনার অন্য এক স্বরূপ উন্মোচন করে গেছেন। আর তার কণ্ঠস্বর, সেই পঞ্চাশের দশক থেকে, ছিল একেবারে আলাদা, নতুন। তিনি, অত্যন্ত স্পষ্টভাবে, আমাদের এই খ্যাতিবিত্তলোভী-সুবিধাবাদী-কূপমণ্ডুক সাহিত্যজীবিতার বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি করে গেছেন।
হে কবি, আপনার এক ক্ষুদ্র অনুরাগীর বিনীত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। নিশ্চয়ই অমরালোকের সৌন্দর্যভূমিতে পৃথিবীর অমর কবিদের সভায় আপনিও সসম্ভ্রমে সমাদৃত হয়েছেন।
২৭ আগস্ট, ২০০১, মধ্যাহ্ন
সৈকত হাবিব

১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে তিতাস ও গোমতী নদীর তীরে সহজ-সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা সৈকত হাবিব নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। কবিতা ও গদ্য—উভয় মাধ্যমেই সমান শক্তিমান এই ব্যক্তিত্ব একাধারে সৃজনশীলতা, সাংগঠনিকতা ও সাংবাদিকতায় অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
৯০-এর দশকে বিশুদ্ধ ছোটকাগজ চর্চায় বিস্তৃত অবদান রাখার পাশাপাশি ১৯৯৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছোটকাগজ ‘প্রতিশিল্প’ দেশের ছোটকাগজ আন্দোলনে এক ব্যতিক্রমী ও সাহসী উদাহরণ সৃষ্টি করে এবং সেসময় অন্যান্য ছোটকাগজের সৃষ্টি ও বিকাশেও তাঁর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
প্রায় দুই যুগ ধরে দেশের প্রধান সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত ও লেখালেখি করলেও তিনি অত্যন্ত প্রচারবিমুখ—লেখেন অল্প, প্রকাশ করেন তার চেয়েও কম। কবিতার বাইরে প্রধানত জীবনানন্দের সৃষ্টিজগৎ ও বিশ শতকের কবিতায় আগ্রহী এই লেখকের বহু কবিতা, প্রবন্ধ, শিল্প-সাহিত্য সমালোচনা, রাজনৈতিক নিবন্ধ ও কলাম দেশ-বিদেশের নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
