নান্নু মাহবুব: নীলকণ্ঠ এক কবি

একসময় তাঁর বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে বসে থাকাটা অভ্যেস হয়ে দাঁড়াল। আর কারও সঙ্গ তখন ভালো লাগত না। সকাল, দুপুর, যখন-তখন তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হই। তিনিও বোধহয় মনে মনে অপেক্ষা করেন। তখন কয়েক বছর হলো তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। বেজপাড়ার একটি বিল্ডিংয়ের চারতলার একটি ফ্ল্যাটে নির্জনে থাকেন। আমি তখন ২৮।

কলেজে যখন তাঁকে প্রথম আবিষ্কার করি, সেই রাগী, তীব্র, প্রাণময় কবিটি, তখন তিনি আর সেরকম নন। কিছুক্ষণ পরপর ভেতরে গিয়ে দু’হাতে ধোঁয়া-ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে আসেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ ধরে এরিনমোরের একটুখানি তামাক নিয়ে সিগ্রেট বানান। বারবার নিভে যাওয়া সেই সিগ্রেটে বারবার আগুন জ্বালান। সারাক্ষণ কথা বলেন। নীরবতার ভেতর সেই কথা চারদিকটাকে আরও নীরব করে তোলে।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। দূর বাড়ির ছাদের কার্নিশে নানা রঙের কবুতর এসে বসে আর উড়ে যায়। মাঝেমাঝেই জানালায় একটি-দুটি চড়ুই এসে ছটফট করে। এই ঘরেই বড় একটি খাটে তাঁর শয্যা। বালিশের পাশে হুমায়ূন আহমেদের বই ‘অপেক্ষা’ শুয়ে থাকে।

সাক্ষাৎকার নেব বলে তাঁর বইগুলো আবার অনুপুঙ্খ পড়তে শুরু করি। তাঁর কবিতা সহজ, নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ, উচ্চকিত। বিশেষত প্রথম দুটি কবিতাগ্রন্থ এইরকম। নক্ষত্র-অভিলাষী এই মানুষটি যেন একাই সমস্ত পরাধীনতা আর দুঃস্বপ্নের বিরুদ্ধে তাঁর অস্তিত্ব উৎসর্গ করেছেন। ‘ঘুম ও সোনালী ঈগল’-এ তিনি আবার ধীরে ধীরে আত্মমুখী, নিভৃত। শেষের দিকে তিনি নির্জন হলুদ হরিণের একটা সিরিজও লিখেছিলেন। বেদনার সমস্ত ভার নিজ হাতে তুলে নিয়েও আজীজুল হক জানতেন, “অলৌকিক প্রতিধ্বনি ফেরে না চিৎকারে”!

একদিন একটা মিনি রেকর্ডার নিয়ে তাঁর বাসায় হাজির হলাম। দরজা খুলে দিয়ে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ বসে আছি। অদ্ভুত এক দৃশ্য। ছোটখাটো শীর্ণকায় মুখের মানুষটি করজোড়ে একটা জ্বলন্ত প্রদীপ নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। সদ্য স্নান সেরে এসেছেন। পরনে একটা কাচা পাঞ্জাবি। ভেজা বাবরি চুল ব্যাকব্রাশ করা। এই ইতর পৃথিবীতে তিনি বড্ড বেমানান। স্তম্ভিত হয়ে আমি নিজেকে সামলে নিয়ে রেকর্ডার অন করলাম। জানতে চাইলাম কেন তাঁর সমস্ত কবিতাজুড়ে এত এত নীল ? তিনি বললেন, ‘‘দ্যাখো, একটা নারী যখন সন্তান জন্ম দেয়, ব্যথায় তার সমস্ত শরীর নীল হয়ে যায়। সেই নীলের ভেতর থেকে একটা লাল শিশু জন্ম নেয়। নীল হলো বেদনার রং। ঘন অন্ধকার ভোররাত্রির আকাশ গাঢ় বেদনায় নীল হয়ে আসে, আর সেই গভীর নীলের গর্ভ থেকে টকটকে লাল একটা সূর্য বেরিয়ে আসে। পরপর তিন দিন তিনি সাক্ষাৎকার দিলেন।

এর কয়েক বছর পর তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শীর্ণকায় মানুষটি আরও শীর্ণ হয়ে যাচ্ছিলেন। বহু মানুষ, বিশেষত তরুণ-তরুণীরা তাঁকে ভীষণ ভালবাসত। তাঁকে হসপিটালে নেওয়া হয়েছে শুনে হসপিটালে গেলাম। বেদনার্ত হয়ে দড়াটানা হসপিটালের দোতলার লাউঞ্জের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাচ্ছে অনেক মানুষ। স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থাতেই আমাকে দেখে মুহূর্তের জন্যে তাঁর চোখ ঝিক করে উঠল।

তাঁর মৃত্যুর পর আমি এই লেখাটা লিখি। এটা একটা স্বপ্নের হুবহু বর্ণনা।

‘স্বপ্নে দেখলাম স্যারকে─ বেঁচে আছেন এখনো।
একদমই একা নাকি? বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল।
বিছানায় লেপ্টে আছে শরীর, মস্তিষ্ক তবু এক ছটফটে
ইঁদুরের মতো।

আমাকে না দেখেই বললেন, ‘এসেছ?’
অনেক কথা বললেন সাথে সাথে। দু’দুটো নতুন ওষুধের
নাম বললেন। সেগুলো খাবার সময়ের কথা বললেন।
আমি একটা বড়সড় ম্যাচবক্স-সাইজের ডায়েরিতে সেসব
টুকে নিলাম।

ঘরটা আধোআধো অন্ধকার। স্যারের শরীরটা দেখা যাচ্ছিল
হাঁড়-মাংস-শাদা। বিছানায় মিশে-থাকা। সটান।

আমি তখন পাশের ঘরে গেলাম।
বিছানার ওপরে, চেয়ারে, আট-ন’জন রঙিন তরুণ।
কলেজ-পড়ুয়াদের মতো।
তারাই বোধহয় স্যারের দেখাশোনা করে।
ছেলেগুলো সহজ, উজ্জ্বল, আনন্দময়।

শুধু একটা গ্রহকে দেখলাম অস্থির।
কক্ষচ্যূত সেই গ্রহ থেকে কেবলই বিপরীত মহাকর্ষ
ছিটকে বেরুচ্ছিল।

জানা গেল স্যার এখনো বকবক করেন বহুরাত অব্দি।
রাত সাড়ে চারটা অব্দি।

এই ফ্ল্যাটটা পুরোনো। এখানে আমি আগেও এসেছি।
কিন্তু এখন খুঁটিনাটি সবকিছুই লাগছে নতুন আর আলাদা।’

তাঁর কবিতার ভেতর থেকে আমি এখানে তাঁর একটিমাত্র চরণ স্মরণ করতে চাই। ‘ঝিনুক মুহূর্তে সূর্যকে’ কবিতায় আজীজুল হক লিখেছিলেন: “আজন্ম দুহাতে এক অদৃশ্য প্রেতের সাথে যুদ্ধ করে করে/আমিও অদৃশ্য।”

আজ তাঁর সারা বাংলাটাই সেই প্রেতের দখলে।

…………….

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top