মহিউদ্দীন মোহাম্মদ: আজীজুল হকের ‘অদম্য’ সাহিত্যিক মনন

অদম্য শিৎকার গান বাজাতে বাজাতে
সঙ্গম শিল্পতা আর সংগ্রাম শেখাতে শেখাতে
নিদ্রা খেয়ে ফেলে।এইভাবে নীল রাতে নিদ্রা খেতে
খেতে
লাল ঠোঁটে স্পর্শ করে ধূসর মগজ।…”

(ঘুম ও সোনালী ঈগল)

সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহমান ইতিহাসে এমন কিছু অনন্য ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে,যাঁদের সামগ্রিক উপস্থিতি কোনো একটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমানায়, কোনো একটি নির্দিষ্ট পেশাগত পরিচয়ে কিংবা কয়েকটি প্রকাশিত গ্রন্থতালিকার সংকীর্ণ ফ্রেমে আটকে রাখা অসম্ভব। তাঁরা কোনো একক পরিচয় বা খণ্ডিত অবদানের গণ্ডি পেরিয়ে এক একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন। কবি,প্রাবন্ধিক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিসংগঠক আজীজুল হক ছিলেন ঠিক তেমনই এক বহুমাত্রিক ও গভীর সাহিত্যিক আলোর দিশারি। তাঁর জীবন ও কর্মের সুবিশাল পরিসরকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে কেবল তাঁর কবিতার শব্দমালার গভীরে প্রবেশ করলেই চলে না, বরং তার সমান্তরালে পাঠ করতে হয় তাঁর মননশীল প্রবন্ধ; বিবেচনায় নিতে হয় তাঁর তিন দশকের শিক্ষকতাসত্তা এবং সেই সঙ্গে নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করতে হয় তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের সাথে গড়ে ওঠা তাঁর সুদীর্ঘ আত্মিক সম্পর্ক এবং আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা। তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার তাই কোনো একক সংকীর্ণ পরিচয়ের নয়;এটি মূলত কবিতা,মনন,শিক্ষা, নৈতিকতা ও সংস্কৃতিচর্চার এক মহান ও সম্মিলিত উত্তরাধিকার।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও চটজলদি প্রচারসর্বস্ব সময়ে দাঁড়িয়ে কবি আজীজুল হককে স্মরণ করার এবং তাঁর সাহিত্যকর্মের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনটি আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। বর্তমান সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে এখন দৃশ্যমানতা বা লোকদেখানো প্রচার অনেক সময় সাহিত্যিক মূল্যায়নের প্রধান কিংবা একমাত্র মাপকাঠি হয়ে ওঠে। কে কতটা পরিচিত হয়ে উঠলেন, কার লেখা কতবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত বা আলোচিত হচ্ছে, কিংবা কার সরব উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা সাড়া ফেলছে—এসব বাহ্যিক প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্ব পেলেও এগুলো কখনোই কোনো লেখকের প্রকৃত সাহিত্যিক গভীরতা বা গুরুত্বের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। আজীজুল হকের পরিচ্ছন্ন ও সাধনাদীপ্ত জীবন আমাদের সেই বাহ্যিক দৃশ্যমানতা ও ভেতরের প্রকৃত গভীরতার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি নতুন করে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। দেশের মূল রাজধানী বা প্রধান সাহিত্যিক পরিসরের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও একজন একনিষ্ঠ লেখক কীভাবে নিজের গভীর পাঠ, অবিরাম চিন্তা ও নিরলস সৃষ্টির শক্তিতে একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সাহিত্যিক পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর প্রভাব ফেলে যেতে পারেন, আজীজুল হকের জীবন ও সাধনা তার এক অতুলনীয় ও উল্লেখযোগ্য মেছাল বা দৃষ্টান্ত।

২.

আজীজুল হকের জীবন ও তাঁর সামগ্রিক জীবনবোধের একটি প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল মূলত গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। গ্রামের ধূলিকণা, প্রকৃতি আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তাঁর সংবেদনশীল চিত্তে জীবনের যে মৌলিক পাঠ দিয়েছিল, তা তাঁর সৃষ্টির আদি উৎস। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, গ্রামীণ আবহে বেড়ে উঠলেও তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টি বা বৌদ্ধিক চেতনা কখনো কেবল স্থানীয় অভিজ্ঞতার ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি। বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি, কবিতার সুদীর্ঘ ইতিহাস, আধুনিক কবিতার বিচিত্র ও জটিল রূপান্তরসমূহ এবং সেই সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের নানা আধুনিক ভাবধারা ও দর্শনের সঙ্গে তাঁর নিবিড় এবং গভীর পরিচয় তাঁর চিন্তার পরিমণ্ডলকে বহুদূর সম্প্রসারিত ও আধুনিক করেছিল।

এই কারণেই তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে ‘মফস্বলের কবি’ বলে কেবল একটি সংকীর্ণ ভৌগোলিক পরিচয়ে চিহ্নিত করলে কবি আজীজুল হকের প্রকৃত সাহিত্যিক অবস্থান, তাঁর মেধা ও তাঁর গভীরতাকে ধরা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি ভৌগোলিকভাবে মফস্বল বা জেলা শহরে অবস্থান করেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও মনন কখনোই মফস্বলীয় বা কূপমণ্ডূক ছিল না। বরং তিনি জ্ঞান ও চেতনার দিক থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ বৈশ্বিক ও আধুনিক। তিনি যশোরের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শহরকে তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এটি ছিল তাঁর সুনির্দিষ্ট জীবনদর্শন ও তাত্ত্বিক অবস্থানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উজ্জ্বল দিক। তিনি কখনোই ঢাকার মতো বড় রাজধানী বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় নিজের সৃষ্টিশীলতাকে স্থগিত বা অবদমিত করে রাখেননি; বরং নিজের চেনা পরিবেশের মধ্যেই পাঠ, গভীর শিক্ষকতা, অবিরত লেখালেখি ও নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বৌদ্ধিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে ঢাকাকেন্দ্রিকতার সর্বগ্রাসী প্রভাবকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দশকে ঢাকাকে কেন্দ্র করেই এদেশের প্রধান সাহিত্যিক যোগাযোগ, বড় বড় প্রকাশনা, গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা সম্পাদনা এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটেছিল। শামসুর রাহমান,শহীদ কাদরী, আল মাহমুদসহ তৎকালীন বহু শক্তিমান কবি এই রাজধানীর বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু আজীজুল হকের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন গড়ে উঠেছিল এই ঢাকাকেন্দ্রিক কোলাহলময় বলয়ের সম্পূর্ণ বাইরে। ফলে তাঁর পরিচিতির বাহ্যিক বিস্তার কিংবা তাঁর সাহিত্যিক প্রভাবের পরিমাণ নিয়ে যখনই কোনো একাডেমিক আলোচনা বা মূল্যায়ন করতে হবে, তখন এই ভৌগোলিক বাস্তবতার পাশাপাশি তাঁর মননের বৈশ্বিক বিস্তারকেও সমান্তরালে বিবেচনায় রাখা অত্যন্ত সমীচীন ও আবশ্যক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, মননশীলতার চর্চা ও বিশ্বমানের সৃষ্টিশীলতার জন্য রাজধানীমুখী হওয়া আবশ্যিক নয়, বরং নিজের মাটির ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েও বিশ্বসাহিত্যের শিখর স্পর্শ করা সম্ভব।

৩.

আজীজুল হকের পেশাগত জীবন কেবল একটি গতানুগতিক জীবিকার ইতিহাস নয়, বরং তা ছিল নতুন প্রজন্মের মনন গড়ার এক দীর্ঘ ও পবিত্র ব্রত। ১৯৫৭ সালে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের গৌরবময় সূচনা ঘটে। এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে তিনি যশোরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের (এম. এম. কলেজ) বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এই কলেজে তিনি একটানা দীর্ঘ তিন দশক অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন এবং অবশেষে ১৯৮৮ সালে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর কর্মজীবনের এই দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায় কেবল একটি সরকারি চাকুরির কালানুক্রমিক ইতিহাস নয়; বরং এটি ছিল যশোরের বহু শিক্ষার্থী, উদীয়মান লেখক এবং তরুণ সাহিত্যপ্রেমীর সাথে তাঁর এক দীর্ঘ ও নিবিড় বৌদ্ধিক সম্পর্কের মজবুত ভিত্তিভূমি।

এই মহান শিক্ষকসত্তা আজীজুল হকের সাহিত্যিক ও ব্যক্তিক পরিচয়ের সাথে অত্যন্ত গভীরভাবে মিশে ছিল। তিনি সাহিত্যকে কখনোই কেবল পরীক্ষায় পাস করার বা নম্বর পাওয়ার কোনো শুষ্ক পাঠ্যবিষয় হিসেবে দেখতেন না। তিনি মন থেকে বিশ্বাস করতেন যে, সাহিত্য—বিশেষ করে কবিতা পাঠ হলো মানুষের চিন্তা করার, নিজেকে জানার এবং নিজের অস্তিত্বকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করার এক পরম ও পবিত্র ক্ষেত্র। ফলস্বরূপ, তাঁর ক্লাসরুমের লেকচারগুলো অনেক সময়ই নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচির সংকীর্ণ সীমানা ও অ্যাকাডেমিক পরিধি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর সাহিত্যিক ও দার্শনিক আলোচনার উর্বর চারণভূমিতে পরিণত হতো। একজন শিক্ষক হিসেবে তরুণদের প্রতি তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সম্ভবত এখানেই—তিনি শিক্ষার্থীদের কেবল শুষ্ক তথ্য বা নোট দেননি, বরং তাদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন গভীর পাঠের সুঅভ্যাস এবং সাহিত্যকে নিজস্ব যুক্তিবোধ দিয়ে বিচার ও বিশ্লেষণ করার এক নতুন ও আধুনিক দৃষ্টি।

এই অনন্য শিক্ষকসত্তা পরবর্তী সময়ে ক্লাসরুমের বাইরেও তাঁর সঙ্গে তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কার্যকর হয়ে উঠেছিল। আজীজুল হকের সাহিত্যিক শিক্ষাদর্শের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে ধরা পড়ে—তিনি সর্বদা মনে করতেন এবং অত্যন্ত জোর দিয়ে বলতেন যে, একজন ভালো লেখক বা কবি হওয়ার আগে অবশ্যই একজন ভালো ও নিষ্ঠাবান পাঠক হওয়া জরুরি। কেবল কবিতার প্রতি সাময়িক আবেগ বা অন্ধ ভালোবাসা থাকলেই কবি হওয়া যায় না; কবিতার ভেতরের নির্মাণকৌশল, সূক্ষ্ম ভাষাগত শুচিতা, ছন্দপ্রকরণ, ঐতিহ্য এবং সাহিত্যের ঐতিহাসিক বিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ও গভীর ধারণা থাকা অত্যন্ত দরকার। এই পাঠভিত্তিক, নিয়মতান্ত্রিক ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত তাঁর শিক্ষকসত্তা ও তাঁর সাহিত্যিক সত্তাকে এক সুতোয় বেঁধেছিল।

৪.

আশির দশকে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে যে এক অভূতপূর্ব ও শক্তিশালী কাব্যপ্রবাহ বা জোয়ার তৈরি হয়েছিল, সেখানে কবি আজীজুল হক কেবল একজন জ্যেষ্ঠ কবি ছিলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন সেই আন্দোলনের এক স্পষ্ট ও প্রধান পথপ্রদর্শক বা আদর্শিক মন্ত্রণাদাতা (আইডিওলোজি)। তৎকালীন তরুণ কবিরা তাঁর মতো প্রাজ্ঞ, পঠনপাঠনে সমৃদ্ধ ও সৌম্য হওয়ার জন্য এক রকমের অলিখিত প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতেন; অথবা বলা যায়, তাঁর স্নেহময় উদ্দীপনা ও নিবিড় নান্দনিক প্রণোদনাতেই এই অঞ্চলের তরুণ প্রতিভাগুলো পূর্ণ বিকশিত ও প্রস্ফুটিত হতে পেরেছিল। আজীজুল হকের সান্নিধ্যে ও সাহচর্যে থেকে যাঁরা বাংলা সাহিত্যে নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন এবং আজও বীরদর্পে সটান দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন গদ্যকার পাভেল চৌধুরী, কবি আব্দুর রব, দারা মাহমুদ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, কামাল মাহমুদ, কবির হোসেন তাপস, নান্নু মাহবুব, কাজী মাজেদ নওয়াজ । এছাড়াও এই সাহিত্যিক বলয়ের অন্যতম আরেক কীর্তিমান পুরুষ ছিলেন প্রয়াত কবি ফখরে আলম।

কবি আজীজুল হককে কেন্দ্র করে যশোরে সাহিত্যচর্চার যে এক অবিরাম ঘূর্ণাবর্ত বা সৃষ্টিশীল মোহনা গড়ে উঠেছিল, সেখানে এসে যুক্ত হয়েছিলেন এই মাটির বহু কীর্তিমান ও প্রতিভাবান সন্তানরা। তরুণদের এই যৌথ সৃষ্টিশীলতাকে একটি স্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য এবং তাদের উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে কবি আজীজুল হক নিজেও ক্ষণে ক্ষণে তরুণদের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক লেখা লিখেছেন। তাঁর এই অনন্য অভিভাবকত্ব কেবল তাঁর মূল সাহিত্য রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাঁর বহু ছিটেফোঁটা কাব্যিক মুক্তগদ্যেও অত্যন্ত চমৎকারভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। এর একটি অনুপম ও কালোত্তীর্ণ উদাহরণ হলো তাঁর বিখ্যাত গদ্যরচনা ‘যশোর প্রশস্তি’। সেখানে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে কবি অত্যন্ত আবেগময় ও কাব্যিক ভাষায় লিখেছেন:

“এদেশের বিদ্রোহী কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয় মহাকাব্যের সামুদ্রিক গর্জন, সেই কণ্ঠেই অনুরণিত হয়ে ওঠে কপোতাক্ষের কুলুকুলু ধ্বনি। পৃথিবীর মানুষ কান পেতে শোনে এখানকারই এক রবিশঙ্করের তিনতারের সম্মোহনী ঝঙ্কার। এখানেই উচ্চারিত হয়েছে, হজরত গরীব শাহ, হজরত শাহসুফী আবদুল করিম আর মুন্সী মেহেরুল্লার অমৃতময় বাণী।”

তিনি তাঁর এই অসামান্য প্রশস্তিতে আরও যোগ করেন:

“এখানেই জন্ম নিয়েছে বিশ্ববন্দিত উদয়শঙ্কর, যাঁর অপূর্ব তনুমুদ্রায় লীলায়িত হয়ে উঠেছে তাণ্ডব আর লাস্যনৃত্যের ধ্রুপদী ছন্দ। সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এখানেই ফিরে আসে বাঁধন ছেঁড়া ঘরের ছেলে মধুসূদন সাগরদাঁড়িতে, দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে, আর এখানকার এই মধুমতীর কূলে দাঁড়িয়ে ফররুখ আহমদ শুনতে পান সাত সাগরের মাঝি সিন্দাবাদের সপ্তসমুদ্র যাত্রার আহ্বান। আশরাফ আলী খান তার কঙ্কালের করোটিতে বাজান অসহায় মানুষের হাহাশ্বাস এখানে, সুলতান আঁকেন শ্রমশিল্পীর পেশী মুদ্রার প্রত্যয়গূঢ় সৃজনলীলা। বাংলাদেশের কবিতীর্থ যশোর, নৃত্য-সংগীত অভিনয়ের উৎসভূমি যশোর… যশোর কেবল সকলের যশ হরণই করে না,সকলের জন্য আহরণও করে যশ।”

এই অসাধারণ ও উদ্দীপনাময় বয়ানের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, কীভাবে তিনি তরুণদের অবিরত মন্ত্রণার মাধ্যমে এবং নিজেদের মাটির ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধ করে সৃজনশীলতার এক অনন্ত মহোৎসবে মত্ত রাখতেন।

আজীজুল হকের এই মন্ত্রণাদাতা ও অভিভাবক রূপটি আরও নিবিড়ভাবে বুঝতে হলে আমাদের একটু স্মৃতির অতীতে তাকাতে হবে,যশোর সাহিত্য পরিষদের কথা বাদ দিলে যেখানে যশোরের একটি বিশেষ বইয়ের দোকানকে কেন্দ্র করে তাঁর শেষ জীবনের এক অসাধারণ অধ্যায় উন্মোচিত হয়। নব্বইয়ের দশকে যশোরের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে‘কালপত্র বই সমাবেশ’ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও এক ঐতিহাসিক অনানুষ্ঠানিক আড্ডাকেন্দ্র। দড়াটানা ব্রিজের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত এই সাধারণ অথচ বৈচিত্র্যময় বইয়ের দোকানটির মালিক ছিলেন বিভুতোষ রায় এবং এই সমগ্র প্রতিষ্ঠানটির মূল রূপকার ও প্রাণশক্তি ছিলেন কবি ও বিশিষ্ট গদ্যকার সৈকত হাবিব। এই বইয়ের দোকানটি কেবল বই কেনাবেচার কোনো বাণিজ্যিক জায়গা ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল তরুণ কবি, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়মিত সাহিত্য আলোচনা,বিতর্ক ও মতবিনিময়ের এক অবারিত অনানুষ্ঠানিক তীর্থভূমি।

এই কালপত্রের আড্ডায় কবি আজীজুল হকের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। তৎকালীন তরুণ ও প্রথিতযশা লেখক যেমন সেলিম মোরশেদ, মাসুমুল আলম, টিটো জামান, পাবলো শাহি, মাশুক শাহি, মারুফুল আলম, মহিউদ্দীন মোহাম্মদ, কবির মনি, দিলীপ ঘোষ, দুর্বাশা দুর্বার, মোজাই জীবন সফরি, শিকদার খালিদ, মহসিন রেজা, সাদি তাইফ, সাহিদুর রহমান, শেখ সিরাজ উদ্দিন, লিখন মালাকার, শিমুল আজাদ, উইলিয়াম হাসানসহ বহু তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিক তাঁর সঙ্গে নিয়মিত গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ রাখতেন। তাঁদের সঙ্গে কবির এই সম্পর্ক কোনো প্রথাগত বা শুষ্ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল সাহিত্য নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা, দেশ-বিদেশের নতুন বইয়ের পাঠ ও চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক পরামর্শের এক পরম আত্মিক বন্ধন। কালপত্রের আড্ডা শেষ করে কবি প্রায়শই যেতেন যশোরের প্রথিতযশা ও আপসহীন সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবলের পত্রিকা কার্যালয়ে। সেখানে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলে আবার কখনো সেখান থেকে ফিরে এসে গভীর রাত পর্যন্ত তরুণদের সঙ্গে পুনরায় আড্ডায় বসতেন। এই নিরলস বুদ্ধিবৃত্তিক চলাচল ও তরুণদের প্রতি অপার ভালোবাসা তাঁর শেষ জীবনের দিনগুলোর একটি অত্যন্ত পরিচিত ও চিরস্মরণীয় চিত্র হয়ে উঠেছিল। এর থেকেই সুস্পষ্ট হয় যে, প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও সাহিত্যের উন্নয়ন ও তরুণদের বিকাশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল সম্পূর্ণ অবিচ্ছিন্ন ও আজীবন সক্রিয়।

তরুণদের সঠিক সাহিত্যপাঠের দিশা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর যে অসাধারণ ও অভিভাবকসুলভ ভূমিকা ছিল, তার একটি সুন্দর ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ থেকে। একবার এক সন্ধ্যায় কিছু তরুণ কবি ও পাঠক কবির বেজপাড়ার ভাড়া বাসায় গিয়ে আড্ডায় বসেন। আলোচনার এক পর্যায়ে কবি তাঁদের কাছে জানতে চান তাঁদের প্রিয় ও পছন্দের কবিদের নাম। তরুণরা স্বভাবসুলভভাবে তাঁদের পছন্দের তালিকায় মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত,কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবি জীবনানন্দ দাশের নাম উল্লেখ করেন। তৎকালীন সময়ে তরুণদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পাঠের এবং ‘বনলতা সেন’-এর মতো কালজয়ী কবিতার নান্দনিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে এক প্রবল ও সংক্রামক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তরুণদের এই পছন্দের তালিকায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে এক ধরণের চরম উদাসীনতা বা অবহেলা লক্ষ করে কবি আজীজুল হক অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র আপত্তি জানান। তিনি পরম স্নেহে অথচ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নজরুলের বহুমাত্রিক সাহিত্যিক ও তাত্ত্বিক গুরুত্ব তরুণদের সামনে একে একে ব্যাখ্যা করেন।

এই ছোট অথচ গভীর ঘটনাটি কেবল নজরুলের প্রতি আজীজুল হকের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এর মধ্যদিয়ে তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যপাঠের গভীর পদ্ধতিটি আমাদের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি তরুণদের কখনোই কোনো একটি নির্দিষ্ট কবি বা একক সাহিত্যিক প্রবণতার সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকতে দিতে চাননি। তৎকালীন জনপ্রিয় কবিদের পড়ার পাশাপাশি সাহিত্যের মূল ঐতিহ্যের অন্যান্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক ধারাগুলোর সঙ্গেও তরুণদের নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে তিনি সর্বদা তাগিদ দিতেন। নজরুলের প্রতি তাঁর এই গভীর ও তাত্ত্বিক চিন্তার এক অনন্য ফসল ও লিখিত দলিল হলো তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘অস্তিত্বচেতনা ও আমাদের কবিতা’-এ সংকলিত ‘নজরুল ইসলাম: আসন ও নির্বাসন’প্রবন্ধটি।

আজীজুল হক কেবল নিজে কবিতা লিখেই শান্ত হননি, বরং কবিতা কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে তার নান্দনিক রস আস্বাদন করতে হয়—তাও তিনি তরুণদের পরম যত্নে শেখাতেন। কবিতার ছন্দ, মাত্রা ও অলংকারের বিভিন্ন জটিল কৌশল নিয়ে তিনি আড্ডায় তরুণদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতেন। এমনকি আল মাহমুদের মতো প্রথিতযশা কবির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’-এর ছন্দের ভেতরের সূক্ষ্ম ও প্রচ্ছন্ন ছন্দগত ত্রুটিগুলোও তিনি তরুণদের আঙুল দিয়ে পরম পারদর্শিতায় দেখিয়ে দিতেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি তরুণদের কেবল কবিতা পড়েই থেমে না থেকে, কবিতা বিষয়ক জটিল সমালোচনা ও সাহিত্যের তাত্ত্বিক গ্রন্থসমূহ গভীরভাবে পাঠের পরামর্শ দিতেন। তিনি তরুণদের বুদ্ধদেব বসু, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ আলী আহসান এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো তীক্ষ্ণধী সমালোচকদের প্রবন্ধ ও তাত্ত্বিক লেখাসমূহ নিয়মিত পড়ার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দিতেন এবং তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন।

৫.

ভাষার ব্যাকরণগত ও বানানগত বিশুদ্ধতার প্রতি কবি আজীজুল হকের যে অপরিসীম নিষ্ঠা ও প্রচ্ছন্ন কঠোরতা ছিল, তা আজীবন সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে নিজের নামের বানান লেখার ক্ষেত্রে তাঁর এই নান্দনিক ও ভাষাগত সচেতনতা ছিল অত্যন্ত প্রবাদতুল্য ও লক্ষণীয়। তিনি নিজের নামের ‘আজীজুল’বানানটি লেখার সময় বর্গীয় জ-এ দীর্ঘ-ইকার ব্যবহারের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও বিশেষভাবে সতর্ক থাকতেন। এই বানানটির পেছনে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও ছিল। জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বয়ং কবি আজীজুল হকের নামের এই বানানটি ঠিক করে দিয়েছিলেন এবং এই দীর্ঘ-ইকার ব্যবহারের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করেছিলেন বলে কবি অত্যন্ত গর্বের সাথে স্মরণ করতেন।

এই বানান নিষ্ঠা ও ভাষাগত শুদ্ধতার প্রতি তাঁর আপসহীন মনোভাবের একটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও বিখ্যাত ঘটনা ঘটেছিল যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক রানার’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। একবার দৈনিক রানার পত্রিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ সংখ্যায় কবি আজীজুল হকের একটি মূল্যবান লেখা প্রকাশের সময় অসাবধানতাবশত তাঁর নামের বানানটি ভুলভাবে (হ্রস্ব-ইকার দিয়ে) ছাপা হয়। এই সাধারণ বানান বিভ্রাটের কারণে কবি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এই ঘটনাটিকে অনেকের কাছে অত্যন্ত ছোট বা তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি বানানের ভুল নয়, বরং এটি ছিল তাঁর ভাষাগত চরম শুচিতা, ব্যাকরণগত শুদ্ধতা এবং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক গভীর ও অনন্য সচেতনতার পরম বহিঃপ্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শব্দের বানান ও উচ্চারণ কেবল কতগুলো অক্ষরের সমষ্টি নয়, বরং তা হলো একটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও ব্যক্তির আত্মমর্যাদার প্রতীক।

৬.
কবি আজীজুল হকের সামগ্রিক সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই অবস্থান করছে তাঁর অসাধারণ ও গভীর কবিতা। তাঁর কবিতার জগৎ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও বহুমাত্রিক; যেখানে মানুষের চিরন্তন দ্রোহ, গভীর প্রেম, স্মৃতির অতলান্তিক হাহাকার, যৌবনের উদ্দাম শক্তি, তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা এবং মানুষের অস্তিত্বের জটিল সংকট একই সাথে সমান্তরালে এসে উপস্থিত হয়েছে। তবে তাঁর কবিতার ভেতরের দ্রোহকে যদি আমরা কেবল অতি-সাধারণ ও সস্তা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে পাঠ করি, তবে তাঁর কবিতার গভীর নান্দনিক জটিলতা ও শিল্পমানকে স্পর্শ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাঁর দ্রোহের মূল বিশেষত্ব হলো, এই দ্রোহের সাথে বাইরের প্রতিবাদের পাশাপাশি মানুষের নিজের আত্মপরিবর্তন, শ্রম এবং নতুন সৃষ্টির নিবিড় প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

তাঁর সৃষ্টিশীল দ্রোহ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত মেলে তাঁর এই বিখ্যাত পঙ্ক্তিতে:

“শতাব্দীর জ্ঞানের ফসল
বৃক্ষশাখে কিছু ফল আছে।
বললাম, আদি পাপ নে,
মাটিকে বিদীর্ণ কর, রক্ত আর ঘাম
সেইখানে ঢাল, ঢেলে
সুনীল প্রবাহ আন, সবুজ প্লাবন।”

এই অসামান্য পঙ্ক্তিমালায় ব্যবহৃত ‘মাটি’, ‘রক্ত’, ‘ঘাম’ এবং ‘সবুজ প্লাবন’—এই মৌলিক চিত্রকল্পগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষের চিরন্তন সৃষ্টিশীলতা ও গুণগত পরিবর্তনের গভীর আকাঙ্ক্ষাই পরম মমতায় প্রকাশিত হয়েছে। এখানে কবি জরাজীর্ণ ও পুরোনো বাস্তবতাকে কেবল নেতিবাচকভাবে প্রত্যাখ্যান বা ধ্বংস করতেই বলেননি; বরং মানুষের অমানুষিক শ্রম, ঘাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এক নতুন ও সুন্দর পৃথিবী নির্মাণের এক সৃষ্টিশীল ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এর পরবর্তী পঙ্ক্তিতে তাঁর দ্রোহী ও অনমনীয় কণ্ঠস্বর আরও সরাসরি ও আহ্বানমূলক হয়ে ওঠে-

“চারদিকে এত যুদ্ধ
যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা
কোনো এক যুদ্ধ চিনে নে,
চারদিকে টগবগ এত যে মিছিল
কোনো এক সঙ্গ বেছে নে।”

এই গভীর পঙ্ক্তিগুলো আজীজুল হকের কবিতার একটি অনন্য তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করে। তিনি কখনোই কোনো অন্ধ উত্তেজনা, লক্ষ্যহীন বিশৃঙ্খলা কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তার পক্ষে ছিলেন না; বরং তিনি মানুষের সুনির্দিষ্ট নির্বাচন, নৈতিক অবস্থান এবং দৃঢ় অস্তিত্ব গ্রহণের পক্ষে কথা বলেছেন। চারদিকে যখন যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা চলে, তখন ‘কোনো এক যুদ্ধ’ চিনে নেওয়ার এই রাজকীয় আহ্বান আসলে মানুষের নিজের জীবনের প্রকৃত আদর্শিক ও নৈতিক অবস্থানটি বেছে নেওয়ারই এক পরম আহ্বান। ঠিক একইভাবে, লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্দেশ্যহীন মিছিলের ভিড়ে ‘কোনো এক সঙ্গ’ বেছে নেওয়া মানে নিজের গভীরতম বিশ্বাস ও সততার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সঠিক পথটি বেছে নেওয়া।

যৌবনের শক্তি ও নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর কবিতার প্রশ্ন আরও বেশি তীক্ষ্ণ, সরাসরি ও আপসহীন:

“প্রেম থাকে বুকের ভিতর, সেই বুক চাপড়ানো পাপ?
শান্তি থাকে প্রাণের ভিতর, সেই প্রাণে কষ্ট দেওয়া পাপ?
স্বপ্ন থাকে চোখের ভিতর, সেই চোখ ঢেকে রাখা পাপ?
এতো পাপ নিয়ে তোর কিসের যৌবন?”

এই অসামান্য ও কালজয়ী পঙ্ক্তিগুলোতে যৌবনকে তিনি কেবল একটি শারীরিক বয়স বা জৈবিক সময় হিসেবে দেখেননি; বরং যৌবনকে তিনি দেখেছেন মানুষের এক পরম নৈতিক, মানবিক ও সৃজনশীল সম্ভাবনার নাম হিসেবে। নিজের বুকের ভেতরের নিষ্কলুষ প্রেম, প্রাণের গভীরের চিরন্তন শান্তি এবং চোখের ভেতরের সুন্দর স্বপ্নকে দমন করা বা ঢেকে রাখাকে তিনি চরম আত্মবিরোধিতা ও মহাপাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফলে, তাঁর কবিতার যৌবন কোনো লক্ষ্যহীন উচ্ছ্বাস নয়;এটি মানুষের গভীর সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার এক পরম নাম।

একই সাথে, আজীজুল হকের কবিতায় তাঁর ব্যক্তিগত নিবিড় স্মৃতি এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিল অভিজ্ঞতার এক অনন্য ও অসাধারণ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে তাঁর কবিতায় সালেহা ও হেনার মতো রহস্যময় নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত বিচিত্র চিত্রকল্পে মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, তীব্র বিচ্ছেদ এবং আত্মনাশের অবচেতন বোধ একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকারভাবে মিশে একাকার হয়ে গেছে। তিনি লিখেছেন:

“সালেহার মুখ থেকে গাঢ় নীল অন্ধকারটুকু মুছে নে দু’হাতে, নদীর ভিতর-স্রোতে মিশিয়ে দে সেই অন্ধকার, নদী আরো নীলবর্ণ হবে, সেই জলে সিক্ত কর গোলাপের তৃষিত শিকড়, ফুল আরো রক্তবর্ণ হবে।”

এখানে ব্যবহৃত ‘অন্ধকার’, ‘নদী’, ‘জল’, ‘গোলাপ’ ও ‘রক্ত’—এই সমস্ত মৌলিক উপাদানগুলো মিলেমিশে এক অত্যন্ত জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক রূপক পরিসর তৈরি করেছে। মানুষের মনের ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে সমাজ থেকে জোর করে দূরে ঠেলে দেওয়ার বা মুছে ফেলার বদলে তাকে নদীর প্রবহমান স্রোতে মিশিয়ে দেওয়া এবং সেই রূপান্তরকামী জল দিয়ে গোলাপের তৃষিত শিকড়কে সিক্ত করার এই অভিনব চিত্রকল্প আসলে মানুষের জীবনের দুঃখ ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার এক পরম নান্দনিক রূপান্তরের ধারণাকেই নির্দেশ করে। তাঁর কবিতার এই রূপকধর্মী ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভাষা তাঁর অনন্য কাব্যবোধের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল দিক।

ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যকার অবচেতন সম্পর্ক নিয়ে তাঁর আরেকটি বিখ্যাত ও বহুল পঠিত পঙ্ক্তিতে তিনি লিখেছেন:

“ঘুমে গেলেই দেখি স্বপ্নেরা তেড়ে আসে চতুর্দিক থেকে। ঘুম
তাদের প্রধান খাদ্য, যে-কোনো প্রকার ঘুম।”

এখানে ‘স্বপ্ন’ শব্দটিকে কবি কোনো অলস বা সুখের বিশ্রাম হিসেবে দেখেননি; বরং তা যেন এক পরম অস্থির আক্রমণাত্মক সত্তা, যা মানুষের ঘুমকে গ্রাস করতে চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসে। এই অদ্ভুত ও পরাবাস্তব চিত্রকল্পটি মানুষের অবচেতন মনের গভীর অস্থিরতা, অন্তর্গত শূন্যতা ও অস্তিত্বের জটিল সংকটকেই অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে নির্দেশ করে। তাঁর কবিতায় তাই কেবল বাইরের প্রাত্যহিক বাস্তবতাই শেষ কথা নয়, বরং মানুষের অন্তরের গভীরতম রহস্যময় অবচেতন জগতও এক বিশাল ক্যানভাস জুড়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

লেখক: কবি ও গবেষক

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top