সুদেষ্ণা মজুমদার: বিলাস

যেভাবে দেখছিল সে। চাঁদের আয়নায় নিজের মুখটি-বা। বহু দূর গানের কলি ভেসে আসার মতো। আস্তে নিভৃতে হাত বোলানোটুকু। অনেকটা-বা মৃত সন্তানের মুখ। পরমমমতা। ছেড়ে দেবার আগে শেষ চুম্বনটি। বা জীবনের যা কিছু অপ্রয়োজনীয়। ফেলে দেবার আগে। শেষ মুহূর্ত কীভাবে টেনে ধরে। হয়তো-বা তেমনি। কোনো এক নদীর ধার। বিকেল যেখানে শেষ হয়েও হয় না। মরা বাছুরের ভেসে যাওয়া।

আজই হয়তো সেই শেষ দিন। হতে পারে। তেমনটাই বা ভাবার নয় কেন। আমাদের ভাবনায় কত শত। জড়িয়ে জড়িয়ে পাক দিয়ে ওঠে। আয়নায় ছবি করতে চেয়ে। পেছনে ভেসে ওঠা কিছু ধরতে না পারা আনাচ কানাচ।

সেভাবেই হয়তো। ভেবে ওঠার আগে। সরে সরে যাওয়া ধরতে না পারা। ছবি থেকে ছবি। পিচ্‌ রাস্তার বৃষ্টিফোঁটাগুলো। অবিরাম ছায়া তৈরি করে যায়, তাদেরই ছায়াময় কোণে।

খুব হালকা একটা গন্ধ। জড়িয়ে ধরতে চাইল। সে-ও হাত বুলিয়ে ধরতে চাইল গন্ধটাকে। টুকরো টুকরো করেও হয়তো। ধরার আগে হাত বাড়ালো চাঁদের বড়ো খণ্ডটায়। ধারালো ছুরিতে কেটে নেওয়া একফালি চিকচিকে চাঁদ তার খোলা চুলে। আড়াল খোঁজে।

চতুর্দশী কবে আসবে গো? ঝুলনমেলা?

এক চিলতে মেঘ যেন-বা ঘিরে ধরে। তবু তারই ফাঁকে চিকন ফালিগুলি। সে তার আঙুলে জড়িয়ে দেয়। একবার করে আঙুলে পাকায় আবার খুলে ফেলে। বুঝি-বা কিছুর অপেক্ষায় তার অস্থির আঙুলগুলি। হঠাৎ তার এ-হেন রাতে কীসের যেন অপেক্ষায় ঝুলনমেলার অবকাশ হয় কীভাবে?

তার মানে আজই সেই শেষ দিন নয়। এখনো কিছু মায়া রয়ে যেতে চায়। বড়ো মায়া? মৃত সন্তানও যার কাছে তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে? মৃত সন্তানই বা কেন? এমনটাই বা আমি ভাবছি কেন?

এখনো কিছু পিছুটান বড়ো বেয়াড়া হয়ে পড়ে। কিন্তু নিজের ছায়াটুকু ছাড়া আর কীই-বা পেছনে। আর কেই-বা টেনে ধরতে পারে। তাই যখনই ভাবা পিছুটান নেই তখনই যেন টানটা বড়ো বেশি বেজে ওঠে। ওই ছায়াটাই সব।

নিজের একটা নাম দিতে চায়। হয়তো চাওয়াটাই রয়ে যায়। নাম দেওয়া আর হয়ে ওঠে না। তবু এমন একটা রাত যখন সে বেছে নিল।

একটা নামও তার হলই বা। নইলে নিজের সঙ্গে কথা পথ পায় কীভাবে। কীভাবেই বা আরেকজন কথায় আসবে। তার সঙ্গে যেভাবে কথা বলছিল। যেভাবে মিশে যেতে চেয়ে এই রাত তার চাঁদ ছলকায় না বাঁধা চুল থেকে পিছলানো খেলায় মেতে ওঠে আঙুলগুলি আরশি খোঁজার ফাঁকে থেকে থেকে কিছু মুদ্রায় ইশারা বাস্তবিকী তখন রাত খুব গম্ভীর হয়ে ওঠার অবকাশ না পেয়ে কেমন যেন মনমরা।

ওই মুদ্রাগুলি আমার চেনা।

ওগুলিকে বলা হয়ে থাকে অভয়মুদ্রা।

অভয়মুদ্রা এহেন বাক্যে হেসে ফেলার মতো অহেতুক কিছু আহ্লাদ।

সে নিজের নাম দিল বিলাস। কোনো কিছু ভেবে তার সঙ্গে জুড়বার প্রয়াস পেল না। বালা বা সুন্দরী বা ভূষণ।

বিলাস তুমি কী করছ? বিলাস। বিলাস।

বিলাসের ভাবান্তর ঘটল না কেন? যখন নিজের নাম পেছন থেকে ডেকে ওঠে জড়িয়ে ধরে। আবার যখন ‘বিলাস’ ডাক ওঠে, উত্তর দেয়—

‘একটা নদীর ধারে গিয়েছিলাম। একবারই। সেই নদীটার নাম কী ছিল আমি জানি। আমি আরো যে-যে নদীর ধারে ধারে, সবার নাম আমি জানি। কিন্তু কেন এমন আলাদা আলাদা নাম? সব নদীই তো দেখতে এক। সবার মধ্যেই তো জল, একইরকম জল, একইরকম ভেসে যাওয়া। এই যে আমার চুল ভেসে যাচ্ছে। এর নাম নদী।’

চোখ বুজে বিলাস তার চুলের আঘ্রাণে। যেভাবে সে হয়তো-বা কোনো নদীর মুখে মুখ ডুবিয়ে গন্ধ নিয়েছিল। ঠিক সেভাবে মুখ ডুবিয়ে দেয় সে নিজের চুলে। হাত দুটো মগ্ন হয় ভাসানোতে। আমার চোখে বিলাস নদী না হয়ে হয়ে ওঠে নদীর পাড়। হয়তো-বা। আমি জানি না। কেন আমি বিলাসকে এভাবে দেখতে চেয়ে এরকম রাতে দাঁড়িয়ে আছি। আমি যদি বিলাসকে শুধু একটা নদী ভেবে নিয়ে ওকে ভেসে যেতে দিই ক্ষতি কী?

বিলাস তোমার সন্তানের কথা বলো। বলো কেন সে মৃত নাম পেল? তার আর কোনো নাম কি তুমি দাওনি? আমার এমন প্রশ্নে সে মুখ তুলে হাতের মুদ্রায় তুলে নিল তার মৃত সন্তানকে। দোল দিতে লাগল। উঁ-উঁ করে তার গলার গান। সে সন্তানের মুখে চুমু দেয়। কোলে শুইয়ে যেন-বা ক্রন্দনরত শিশুকে দুধ খাওয়াবে এমন মুদ্রাগুলি একটু একটু করে ছড়িয়ে যেতে লাগল চারপাশে। একই অভয়মুদ্রা। বিলাসের উঁ-উঁ গান গাওয়া আরো জোর পেল যেন-বা। তার বাঁ হাঁটু আস্তে আস্তে সেই সুরের তালে নড়তে লাগল। কোলে শুয়ে থাকা সন্তানের মুখের ওপর চুলগুলো পড়ে থাকা বিলাসের পছন্দ হল না। বলে উঠল, ‘আঃ!’ ডান হাত ঘুরিয়ে সেই লম্বা চুলের গোছা সরিয়ে জামার তলা দিয়ে বাঁ স্তন বের করে শোওয়া সন্তানের ঠোঁট ফাঁক করে গুঁজে দিলো। বলে উঠল, ‘আহ্‌! আমার সোনা কেমন চাঁদ হয়ে উঠছে।’

আমি বিলাসের বিভিন্ন মুদ্রাগুলি দেখার ফাঁকে স্তনদান পালা শেষ হয়ে কখন আবার বিলাস তার নিজের মধ্যে কুড়িয়ে নেবে যা-কিছু ফেলে দেওয়া পেছন থেকে যা বারবার জড়িয়ে ধরে কিছু কথা বলে যাওয়া অবকাশ তৈরি করে যা বিলাস তার নদীর মতো চুলের পরিচর্যার কিছু মুদ্রা এবং সঙ্গে অন্য যা-যা আমি দেখব বলে এ-হেন রাত যখন চাঁদ তার বিভিন্ন বিভঙ্গ ভাঙতে চায় নদীর পাড় ভাঙার মতো হঠাৎ আক্রমণে। বিলাস আমাকে অপেক্ষা দেয়।

ইত্যবসরে বিলাস উঠে দাঁড়ায়। কোলের শিশুর কোনো অস্তিত্ব সে ভুলে যায় এ মুহূর্তে। কোল থেকে গড়িয়ে পড়ে দুধের শিশু। আমি অপেক্ষায় থাকা ক্লান্ত কণ্ঠে ডেকে উঠি বিলাস বিলাস। বিলাস বলতে থাকে দুলে দুলে, বারান্দায় জাফরিতে মাঝে মাঝে থুতনি, গাল বদলানোর ফাঁকে ফাঁকে। ‘বল ভালোবাসা, দেখা হবে কোন সে নদীর ধারে।’ অদৃশ্য গামছায় চুলের গোছা ঝাড়তে ঝাড়তে কিছু চুল চিরুনিতে জড়িয়ে থাকা ছাড়িয়ে নিয়ে তিনবার থু থু, বিলাস তার কোমর আঁচল জড়িয়ে গুঁজে নেয় অত্যধিক নিরাসক্তি। পরিদৃশ্যমান চন্দ্রকুঞ্জ বিলাসকে নিভৃতি। সৃজিত হয়, ‘বল ভালোবাসা, দেখা হবে কোন সে নদীর ধারে।’ বারান্দা ছাড়িয়ে বিলাস হাঁটতে শুরু করলে পিছনে তৈরি হওয়া বিলাসের ছায়ায় বড়ো চাতরে পড়ে যাই। বাস্তবিকী তখন রাত চরাচরের মায়ায় আনাচ কানাচ ছায়া তৈরি করা বিস্তৃত। ক্রমশ গভীর। আমি সেই সব ছায়াদের মাঝে আরো কিছু ছায়া তৈরি করে চাঁদের বড়ো খণ্ডটা ধরতে চাই। আর বিলাসকে।

কিছু দ্রুত চলতে থাকায় আমি কিছুটা ছায়ার শেষটান অনুসরণে রত না জেনেই বিলাসের যাওয়ার জায়গা এছাড়া কেন বিলাস এ চন্দ্রালোকে পথ যেখানে অজানা অশ্রুত এমন নয় হলেও এযাবৎ তার আচরণের হেতু বিশেষ দেখা যায়নি এরূপ যা এখন আমার সামনে অনুলম্বে শঙ্কিত, পরস্পরের যে বাধা অন্ধকার তুচ্ছ করে বিশেষরূপে প্রতিভাত। আমি চাঁদের মুখের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বুঝবার আশায় বিলাসের পাশে পৌঁছানোর চেষ্টা পাই। বিলাস, বিলাস। আমার কথা শুনছ?

‘সজনী, কী হেঁরিলু ও মুখশোভা।’ বিলাসের অবয়বে পূর্ণচন্দ্রমা খেলা করার অবকাশ খুঁজে ফেরে, বিলাস পথপার্শ্ব প্রাচীরের মধ্যের দূরত্ব অতিক্রম কালে গেয়ে ওঠে, ‘সজনী, কী হেঁরিলু ও মুখশোভা।’ বিলাস তুমি কোথায় যাও। আমার কৌতূহল নামমাত্র নিরসনের অপপ্রয়াস প্রাচীরের গায়ে বিলাসের চন্দ্রচ্ছায়া পূর্ণ অবয়ব নির্মাণে ব্যাপৃত থাকাকালীন। চেষ্টা পায়। অধীর হয়ে ওঠে আমার সর্বাঙ্গ। বিলাসের সঙ্গ কামনা করি ক্রমশ চন্দ্রচ্ছায়া যা অপসৃয়মান ক্রমণকালে।

এরপর বিলাস পৌঁছে যায় একটা নদীর ধারে। এ শহরের একমাত্র নদী। যার নাম বিলাস জানে প্রিয়নাম। ধূসর হয়ে রাত কাটায়। আমিও বিলাসের সাথে সাথে সেই নদীর ধারে। বিলাস তার খোলা চুল সামলিয়ে কোমরের আঁচল সামলিয়ে আমার হাত ধরে। আমি বিলাসের কানে মুখ রেখে আবার বারবার ডেকে উঠি বিলাস বিলাস। এক পা সে বাড়িয়ে দেয় ধূসরে। ঠান্ডা হয় সেই পায়ের পাতা। আমি সেইরকম এক পা। তারপর আরো এক পা কিনা জানি না। বিলাস আমার হাত ছাড়ে না।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top