চরু হক: ক্ষুধা তৃষ্ণার অন্তে বসে থাকা ওই ছোট্ট ধ্রুবতারা

সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কথাগুলো বলেছিলেন জীবনানন্দ দাশ, তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কবিতার কথা’য়। কাব্যের মায়াময় জগতে যারা প্রবেশ করেছেন তারা প্রত্যেকেই জানেন যে, এই ‘কেউ কেউ কবি’ হয়ে ওঠার কাজটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সুলভ এবং সহজ মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তা ততটাই দুর্লভ। সহজ কথায়, কবিতা শুধু দু-চারটা পঙক্তি মিলিয়ে সাজিয়ে লিখে দিলেই হয় না; এর জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ সৌকর্য, সুষমা এবং হৃদয়তন্ত্রীতে ধাক্কা দেওয়ার মতো কিছু সংবেদনশীল মুহূর্তের শাব্দিক রূপায়ণ। কাব্যদেবীর অনির্বচনীয় জগতে যারা প্রবেশ করেছেন তারা নিঃসন্দেহে এক সমৃদ্ধ জগতে প্রবেশ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন, কারণ সাহিত্য হলো সমাজ ও সভ্যতার এক অনন্য চালিকাশক্তি আর কবিতা হলো তার প্রাণভ্রমরা। অথবা কথাটা কি একটু ঘুরিয়ে দিয়ে এভাবে বলা যায় যে, সুরাসুরের সমুদ্রতলদেশ হতে মন্থনকালে গরল ও নানাবিধ প্রাণ ও অপ্রাণ উঠে আসার পর অবশেষে আহরিত হয় যে অমৃত—তেমনিভাবে জগতের মানুষের মধ্যেও সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ভালোবাসা, ঈর্ষা-দ্বেষ-গ্লানি, পাপ-পুণ্যের সমুদ্র মন্থন করে যে সুরভিত ভাণ্ডার উঠে আসে তার মধ্যে কবিতা হলো অন্যতম। জীবনের সমুদ্রে এক মন্থনকৃত অমৃতভাণ্ড। কবি ফেরদৌস নাহার এ পথে হাঁটা আমার দেখা একজন অনন্য মানুষ।

ফেরদৌস নাহার কবিতা ও গদ্যের কারিগর। আমার সাথে তাঁর পরিচয় কবিতার সূত্র ধরেই, সাবেরা তাবাসসুমের বাসভবনে। বছর দুয়েক আগের কথা। কবি ও গুলজারের অনুবাদক সাবেরা তাবাসসুম একদিন আমাকে আমন্ত্রণ জানালো তার বাসায়। আমন্ত্রণের হেতু জিজ্ঞেস করলে জানানো হলো সারপ্রাইজ আছে। সেখানে গিয়ে দেখি সুচিস্মিতা সৌম্যমূর্তির একজন নারী বসে আছেন কোণার সোফাটিতে। বয়স ষাটোর্ধ্ব হবে। শান্ত, ধীর-স্থির আবার একইসাথে বলিষ্ঠতার সুস্পষ্ট ছাপ ব্যক্তিত্বে। সাবেরা আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি কবি ফেরদৌস নাহার আপা। প্রথম পরিচয়েই ভালো লেগে গেলো আপাকে। আপার কবিতা পাঠ হলো, কবি নূরুল হকের এবং সাথে আমাদেরও। কিছুক্ষণের মধ্যেই আড্ডা জমে ঘন হয়ে উঠলো। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় আমরা বিনিময় করলাম জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আমাদের নিজস্ব ভাবনাগুলো, বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে উঠে আসা সাহিত্যের পথ পরিক্রমা ও সাথে আমাদের ব্যক্তিজীবনের নানান ভালোলাগা, মন্দ লাগা বিষয়ের অন্তর্গত সংবেদন। যা হোক, এরপর আপা চলে গেলেন তাঁর নিজ আবাসস্থল কানাডায়, কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেলেন তাঁর সঙ্গে যাপিত কিছুটা সময়ের মধুর স্মৃতি আর তাঁর উষ্ণ ভালোবাসা। এভাবে একইসাথে পরিচয় হয় তাঁর কবিতার সাথে।

ফেরদৌস নাহারের জন্ম বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন কানাডায়। কবিতার পাশাপাশি আঁকছেন ছবি, লিখছেন গদ্য ও গান। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল ‘মাইলস’-এর জন্য সংগীত রচনা করছেন দেদারসে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ষোলোটি কবিতা ও তিনটি প্রবন্ধের বই। প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে অসংখ্য যৌথ কবিতা সংকলন। কবিতার জন্য পেয়েছেন ‘রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার ২০২২’। বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন।

তার কাব্যচর্চার কেন্দ্রভূমিতে বাস করছে মানুষ এবং প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য ও রহস্য। জীবন ও জগতের রহস্যের বেণী খোলার দুর্মর আকাঙ্ক্ষায় বেরিয়ে পড়েছেন জগতের পথে। নিজ দেশে গাঁয়ের পাশের ছোট নদী থেকে যাত্রা শুরু করে চলে যান আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে। সেখানে জীবনযাপনের পাশাপাশি উদযাপন করেন কবিতা। লেখালেখির খরস্রোতা নদীতে বৈঠা ধরেন তিনি, যে নদীতে অভিমানের সবগুলো চাবি ফেলে রেখে আসা যায় অনায়াসেই।

নিচের কবিতাটির দিকে তাকাই—

আমার মনে নেই কবে কখন কেন আমি বুনোফুল তুলতে গিয়েছিলাম বনে, কোন বনে। এ রকম কত কিছুই যে ভুলে যাই, গেছি। মনের সাথে না পেরে ওঠা একটি মানুষ।
হাঁটতে জানে না, ঘুমাতে জানে না, শান্ত হয়ে বসে থাকতেও জানে না। অথচ তারও মনে আছে কিছু যা তার কখনই পাবার কথা ছিল না।
কোনো কোনো লেখা লিখতে গিয়ে কেঁদে ফেলি। কেউ জানে না—যে সিন্দুক কোনোদিনও খোলা হবে না, খুলবো না, তার সবগুলো চাবি এইমাত্র নদীতে ফেলে দিয়ে এসেছি।

সবগুলো চাবি এইমাত্র

আপা লিখেছেন, লিখছেন প্রচুর। কবিতার জন্যই সমর্পিত একজন মানুষ। আগেই বলেছি তাঁর প্রকাশিত হয়েছে ষোলোটি কবিতা ও তিনটি প্রবন্ধের বই। কবিতার বইগুলো হলো ‘ছিঁড়ে যাই বিংশতি বন্ধন’, ‘সময় ভেঙেছে সংশয়’, ‘উলঙ্গ সেনাপতি অক্টোপাস প্রেম’, ‘দেহঘর রক্তপাখি’, ‘সমুদ্রে যাবো অবিচল এলোমেলো’, ‘বর্ষার দুয়েন্দে’, ‘উদ্ধত আয়ু’, ‘বৃষ্টির কোনো বিদেশ নেই’, ‘পান করি জগত তরল’, ‘চারুঘাটের নৌকোগুলো’, ‘নেশার ঘোরে কবিতা ওড়ে’, ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’, ‘নাভি ও নন্দন’, ‘বাজে অন্তহীন দ্রিমি’, ‘পশ্চিমে হেলান দেওয়া গদ্য’। হাঁটতে হাঁটতে যখন যা দেখেছেন, যখন যেখানে থেমেছেন, সেখান থেকেই কুড়িয়ে নিয়েছেন কবিতার বিষয়বস্তু। ষাটের দশকের কবি নূরুল হক বলেছিলেন, ‘জগতের প্রতিটি অণু-পরমাণুতেই কবিতা ছড়িয়ে আছে।’ একই ভাবনায় জারিত কবি ফেরদৌস নাহার, যিনি আক্ষরিক অর্থেও একজন বিশ্ব-পরিব্রাজক, জীবনের মহাযাত্রায় পরিভ্রমণ করতে গিয়ে যা কিছু অবলোকন করেছেন, তার মধ্যে থেকেই তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করে এনেছেন কবিতা।

জীবনকে ভালোবেসেছেন তিনি, জীবনকে উদযাপন করতে চেয়েছেন অনুভবের প্রতিটি রন্ধ্র খুলে দিয়ে। একজন প্রখর সংবেদনশীল মানুষ হয়ে দৃষ্টিকে খুলে রেখেছেন জগতের মহাসমুদ্রে আর পান করেছেন জগতের যত অমৃত এবং হলাহল। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে সেখানেই অন্যায় সেখানেই প্রতিবাদের ভাষা তুলে নিয়েছেন কণ্ঠে। অন্যায়ের সাথে আপস মিলবে না, মিলবে না কিছুতেই। হেঁটেছেন জীবনের সব অলিগলি দিয়ে, মিলেছেন উঁচু-নিচু সব মানুষের সাথে। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে আমরা একজন সংগ্রামী প্রগতিশীল লেখকের অবয়ব দেখতে পাই।

কবি ফেরদৌস নাহারের কবিতায় ঘন সংবদ্ধ আবেগের উপস্থিতি দেখা যায়। ঘন হয়ে থাকা মেঘের মতো সেগুলো জমে থাকে হৃদয়-আকাশে আবার হঠাৎ করেই বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকে জগতের মাটিতে। কবিতা আসলে কী? হৃদয়ের আয়না? নাকি হাহাকার করে খুঁজে বেড়ানো নিজেরই অপর সত্তা যার খোঁজে সারা জীবন আমরা কেবল ছুটে বেড়াই, আর হু হু করে কেঁদে বেড়াই। কবি ফেরদৌস নাহারের কবিতা হলো মানব হৃদয়ের অসমাপ্ত ক্রন্দন, পূর্বজন্মের স্মৃতি বহন করে আনা আমাদের পিতৃপুরুষের ঋণ।
ভালোবাসাকে কী সহজ সুন্দর করে প্রকাশ করেন তিনি—

ভালোবাসতে চেয়েছিলাম তোমাকে, অন্ধকার হানা দিলো সেই যে যেমন অন্ধকার, যার দিকে তাকালে
হাজার বছরের নদীও ছুটে দৌড়ে পালায়। কোনো শব্দ নেই কেবল টুপ টুপ করে ঝরে পড়ে আমাদের যৌথ খেলাঘর কবিতায় এতসব লেখা যায় না বলে এবার
হাতুড়ি শাবল নিয়েছি পাথর কাটবো, দেখো
পাথরের মাঝখানে যে প্রেম বসাবো তাকে কেউ পারবে না চুরি করে নিয়ে যেতে, এমনকি তুমিও না
— যৌথ খেলাঘর

কফিশপে ধোঁয়া আর ঘ্রাণে আড্ডার ঝড় তোলা এই মানুষটির জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত মুক্ত চিন্তা ও উন্মুক্ত বোধের শক্ত গাঁথুনি। নিজেকে পদ্য-গদ্যের শ্রমিক বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি। কিন্তু সবকিছুর উপরে এক বিশ্ব বোহেমিয়ান কবি আর চিরতারুণ্যের নাম ফেরদৌস নাহার আপা। পাখি কিংবা পথ হওয়ার বাসনা নিয়ে পথ হাঁটেন তিনি। তাঁর পরান তো এক পথিকের পরান—

দেখি তো কিছু বাকি আছে কিনা
চলছি তো বেশ, ছিলাম পথিক
কথার পিঠে কথা, জেগে ওঠার আগেই কেমন
ফুরিয়ে আসছে জেগে থাকা লতা

কত দিনের নেশা ছিল, অসুখ ছিল
তারও পরে আরও ছিল ঘণ্টাপেটা দুপুরবেলা
স্বপ্ন শেখার নেশায় ঘুমিয়ে যেতে ইচ্ছে করে
ওই যে ঝনঝন করে শিকল বাজিয়ে
জানিয়ে দিয়ে গেল ঘরের দরজায় কেউ এসে দাঁড়ালো

একটি স্বপ্নের মাঝে দিন-রাত, আসলে কি দুঃস্বপ্ন
একটি মুখোশ একটি যুদ্ধ নানা নামে
দেশে দেশে ছুটে বেড়াচ্ছে
যেমন ছিল তেমন যে নেই তাও যেন ভুলে যাচ্ছি
আমাকে তুমি অন্ধকারে রেখে কিসের সন্ধানে চলে গেছ
যেসব কথা বলার ছিল তার বেশিটাই ভুল
যা তা বলার দিন, জেগে ওঠা ধূলিসাৎ
প্রেম, মচমচ করে ঝরে যাবার আয়োজনে ব্যস্ত
পথিক পরান, আজও কি তুই খুঁজতে যাবি
যে পথ দিয়ে গেছে তোর বিকেলবেলার জুঁই

কবিহৃদয় এক বহমান স্রোতধারা, সৃষ্টির পুরোভাগ থেকে তা সূচিত হয়ে তা বয়ে চলেছে সভ্যতার উঁচু-নিচু ভূমি বেয়ে। এর লক্ষ্য চৈতন্য; আত্মানং বিদ্ধি। কবি ফেরদৌস নাহার পথ হয়ে, শ্রমিক হয়ে, ফুল হয়ে, পাথুরে রাস্তার পাথর হয়ে আর কফির ধোঁয়া-ওঠা কাপের চুমুক হয়ে সেই আত্মানং বিদ্ধির প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা এক শক্তিমান বোধিদ্রুম।

চরু হক

শুন্য দশকের কবি চরু হকের জন্ম ৩ এপ্রিল, নেত্রকোনায়। পিতা ষাটের দশকের কবি নূরুল হক এবং মাতা ফেরদৌসি সুলতানা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করছেন।

২০১৪ সালে ‘দেশ পান্ডুলিপি পুরস্কার‘ বিজয়ী এই কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: পাতা ঝরার শব্দ পাই (২০০৯), ভুল বানানের চিঠি (২০১২), আমার ভেতর হাওয়ার বাসাবাড়ি (২০১৫), সুগন্ধিত দুঃখগুলো (২০১৫) ও শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০২৩)।

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top