স্তেফান মালার্মের দুইটি গদ্যকবিতা


অনুবাদ: আজফার হোসেন

 

প্রতিষঙ্গের প্রেতাত্মা

তোমার ঠোঁটে গেয়েছিল গান নাম-না-জানা শব্দরা? এক অসম্ভব বাকধারার অভিশপ্ত টুকরো?

ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে আসি, কোন এক বাদ্যযন্ত্রের তারের ওপর পিছলে-পড়া পালকের মতো অনুভব সঙ্গে নিয়ে, বিনম্র ও বহতা, যার স্থান করে নেয় একটি কণ্ঠস্বর, ধীরে ধীরে নেমে-যাওয়া ধ্বনিতরঙ্গায়িত শব্দের উচ্চারণে: “লা পেনালতিয়েম এ মখত্” এবং শব্দগুলো উচ্চারিত হয় এমনভাবে যেন পঙ্ক্তির অন্তে ঝুলে আছে ‘লা পেনালতিয়েম’, আর ‘এ মখত্’ সেই অদৃষ্টময় বর্ণমালা, অর্থের নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দ্যে। পরে কয়েক পা ফেলতেই ‘নাল’ ধ্বনিতে অনুভব করি বাদ্যযন্ত্রের একটি টানটান তীর। সে ছিল বিস্মরণে– মহীয়ান স্মৃতি নিশ্চিত তাকে ছুঁয়ে গেছে পালক কিংবা পত্র কিংবা তালু দিয়ে। রহস্যের নকসার ওপর আঙুল আমার, মৃদু হেসে আমি প্রার্থনা করলাম এক ভিন্ন অনুধ্যানের বিষয়ের জন্য, বুদ্ধিবৃত্তিক আকাঙ্খায়। ছিঁড়ে-যাওয়া পালক কিংবা পাতার প্রাক্তন পতন থেকে তখন ফিরে এলো বাকধারা, নিশ্চিত, আগের মতোই। এখন থেকে তাকে শোনা যাবে কণ্ঠস্বরের উচ্চারণে ততোক্ষণ ধরে যতোক্ষণ না সে অবশেষে নিজের উচ্চারণে জানান-দেয়া উপস্থিতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র একটি বোধে আর তৃপ্ত না থেকে আমি তাকে মনে মনে মিত্রাক্ষরের মতো পাঠ করতে থাকি। আর একবার পরখহেতু আমার বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে উচ্চারণ করি উঁচু গলায়। শীঘ্রি তাকে এমনভাবে উচ্চারণ করতে থাকি যে, ‘পেনালতিয়েম’-এর পর একটি যতির নৈঃশব্দ্য থেকে যায় : কী বিষণ্ন আনন্দ! ‘পেনালতিয়েম’ : বাদ্যযন্ত্রের তার, নাল ধ্বনির বিস্মরণে প্রসারিত ও তীব্র, ভেঙে পড়ল নিশ্চিত, আর আমি এক ধরনের প্রার্থনা জুড়ে দিলাম : ‘এ মখত’। আমার প্রিয় সব ভাবনায় ফিরে আসার চেষ্টা না থামিয়েই দাবি জানাই নিজেকে শান্ত করার, এই ভেবে যে, পেনালতিয়েম নিশ্চিতভাবে একটি আভিধানিক শব্দ যার অর্থ: একটি শব্দের অন্তিম অক্ষরের প্রাগাক্ষর। সেই আমার ভাষার কাজ শেষে খুব সাধারণভাবেই শব্দটি দিনের পর দিন আমার মহীয়ান কাব্যগুণের ওপর আছড়ে পড়ে, বাধা পেয়ে সে ফুঁপিয়ে কাঁদে প্রতিদিন। এমনকি থামতে-না-জানা হাঁ-জানান-দেওয়া ভঙ্গির ক্ষিপ্রতায় রূপ-নেয়া ধ্বনির জমাট ভার আর মিথ্যার প্রতিভাস হয়ে উঠেছিল যন্ত্রণার কারণ। দুশ্চিন্তায় আমি বাক্যাংশের ভেতর থেকে বিষণ্ন ধরনের শব্দগুলোকে আমার ঠোঁটের চারদিকে হেঁটে চলার সুযোগ দিলাম। আর আমি হাঁটতে লাগলাম। কণ্ঠে আমার সমবেদনা-জাগানিয়া গুঞ্জন: “উপাধাটি মৃত, সম্পূর্ণ মৃত, রে দুর্ভাগা উপাধা”। আর ভাবতে থাকলাম, আমার অস্তিত্বকে এভাবে আমি সান্ত¡না দিতে পারি, লুকিয়ে-থাকা প্রত্যাশাও ছিল তাকে দাফন করার। সাঙ্গীতিক বিস্তারে যখন কী এক আতঙ্কে, কী এক সহজিয়া কিন্তু অস্বস্তিকর সম্মোহনে অনুভব করলাম যে, দোকানের জানালায় ছায়া-ফেলা আমার হাতখানা কাউকে জড়িয়ে ধরবে বলে নিচে নেমে যাচ্ছে, তখনই অধিকারে এলো সেই কণ্ঠস্বর [যা শুনেছিলাম গোড়াতেই, নিশ্চিতভাবে যা ছিল এক ও একমাত্র।]

কিন্তু যে-মুহূর্তে পরাপ্রাকৃতের প্রতিকারহীন প্রবেশের ভেতর-পথ স্পষ্ট হল এবং যন্ত্রণার কুচকাওয়াজ শুরু হল, যার নিচে কষ্টে মোচড় খেতো আমার এক সময়ের রাজকীয় সংবেদন, সেই সময় চোখ তুলে দেখলাম আমি হাঁটছিলাম প্রাচীন দ্রব্য-ব্যবসায়ীদের রাস্তা ধরে; দাঁড়িয়েছিলাম এক বেহালানির্মাতার দোকানের সামনে। বিক্রির জন্য সেখানে ছিল দেয়ালে ঝুলে-থাকা পুরনো বাদ্যযন্ত্র এবং মেঝেতে পড়ে-থাকা কিছু হলুদ তালপত্র এবং ছায়ার ভেতরে লুকিয়ে-থাকা প্রাচিন পাখিদের পালক। অপ্রকৃতিস্থের মতো আমি পালিয়ে গেলাম। সম্ভবত দুর্জ্ঞেয় ‘পেনালতিয়েম’-এর জন্য আমার এই অদৃষ্টময় বিলাপ।

[“লা পেনালতিয়েম এ মখত্” একটি ফরাসি বাক্য, বাংলায় যার ভাষান্তরিত রূপ হতে পারে এমন: উপধাটি মৃত।]

 

ভবিষ্যের দিকে

বুড়িয়ে যাওয়ায় মরে-যাচ্ছে-যাচ্ছে এমন এক পৃথিবীর ঊর্ধ্বে মেঘেদের সাথে হয়তো বিদায় নেবে ফ্যাকাশে আকাশ এক। সূর্যের কিরণ আর জল দিয়ে ঢেকে-রাখা দিগন্তের ওপর ঘুমিয়ে-পড়া নদীর ভেতর সূর্যাস্তগুলোর ছেঁড়া-ছেঁড়া গোলাপী ক্ষয়ের চিহ্ন সব মিলিয়ে যায়। একঘেঁয়ে সময়ের ভারে গাছগাছালি সব অবসন্ন। আর তাদের শাদা-হয়ে-যাওয়া পাতাগুলোর নিচে পথের নয় বরঞ্চ সময়ের ধুলোবালিতে ক্যাম্বিস তাঁবু নিয়ে জেগে ওঠে অতীত সব চিহ্নের সঙঃ গোধূলির অপেক্ষায় থাকে অনেক গ্যাসবাতি। তারা আবারও  জাগিয়ে তোলে অসুখী ভিড়ের সেই সব মুখ। আর অবিনাশী রুগ্নতা এবং বহু শতকের জমা পাপ তাদের জয় করে নেয়। তাদের কিনারে থাকে ভয়াবহ দুঃসঙ্গী সব, এক অমাঙ্গলিক ফলের ভারে ভারাক্রান্ত। পৃথিবী বিলীন হবে এই ফলের সঙ্গে। সমস্ত চোখের পীড়িত নৈঃশব্দে ডুবে থাকে স্থান, যে নৈঃশব্দ্য সূর্যের কাছে মিনতি জানায়, যে সূর্য একটি ধ্বনির হতাশায় ডুব দেয় জলে। সঙ কথা কয় নিচু স্বরে: ‘ভেতরে প্রদর্শনী দেখাবে বলে তোমাকে আমোদিত করার এমন কোনো চিহ্ন নেই। কারণ এখন এমন কোনো চিত্রকর নেই যে আঁকতে পারে তার ক্ষীণতম প্রতিচ্ছায়া। আমি তোমাদের কাছে নিয়ে আসি সেই কবেকার জীবন্ত এক নারীকে। (যাকে সার্বভৌম বিজ্ঞান বছরগুলোতে সংরক্ষণ করে রেখেছে।)’ কিছু পাগলামি, মৌলিক ও সরল, একটি সোনালি উল্লাস ও উন্মাদনা, আমি জানিনা কী তা! যাকে সে তার চুল বলে, বুননের বৈভবে যেন সে ছড়িয়ে থাকে তার ঠোঁটের রক্ত-লাল নগ্নতায় জ্বলে-ওঠা মুখের চারিদিক। শূন্যতার পোষাক খসে পড়ে। থাকে তার দেহ। অমূল্য হিরন্ময় পাথরের মতো তার চোখ সেই দৃষ্টির সমান নয়, যে দৃষ্টি উঠে আসে তার সুখময় মাংশের স্বরঃচ্ছন্দ থেকে: সেই দৃষ্টি জেগে ওঠে তার স্তনযুগল থেকে যেন তারা অনন্ত দুধের ভরাট ভাণ্ড। তাদের চূড়া নিশানার মতো জেগে থাকে আকাশের দিকে, বিস্মরণময় পা দিয়ে এঁকে-যাওয়া দাগের দিকে, যার দেহে থেকে যায় আদিম সমুদ্রের নুন। তাদের অসহায়, ক্লান্তিকর, রুগ্ন ও আতঙ্কিত স্ত্রীদের কথা স্মরণ করে স্বামীরা একসাথে ভিড় জমায়। তাদের বিষণ্ন স্ত্রীরা দেখে নিতে চায় কৌতূহলে।

কোনো এক পূর্ব-অভিশপ্ত যুগ থেকে ছাড়া-পাওয়া সেই মহীয়ান প্রাণীটির দিকে যখন সকলেই নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে, তারা আবার একে অন্যের দিকেও তাকাবে, কেউ কেউ নিরঞ্জন ঔদাসীন্যে, কেননা কি হচ্ছে তা বোঝার ক্ষমতা নেই তাদের। কিন্তু অন্যরা তাকাবে বিষণ্নভাবে যখন তাদের চোখের পাতা ভিজে থাকবে সমর্পিত জলে; যখন এই সময়ের কবিদের ঘোলা চোখ উঠবে জ্বলে। তারা এগিয়ে যাবে তাদের বাতিগুলোর দিকে। মুহূর্তের জন্য হলেও একটি বিভ্রান্ত মহিমায় তাদের মস্তিষ্ক উত্তেজিত হবে উন্মাদনায়। তারা আক্রান্ত ও আলোকিত হবে ছন্দঃব্রহ্মে। আর তারা ভুলে যাবে যে, তাদের অস্তিত্ব এমন এক যুগে, যে-যুগ সৌন্দর্যের চেয়েও ঢের বয়সী।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *