মে
03

মহানগরে পথচর বদল্যার

মলয় রায়চৌধুরী

কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে
অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম বাস সব ঠিক চলে
তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে
সারারাত গ্যাসলাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো করে জ্বলে ।
কেউ ভুল করেনাকো – ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাদ সব
চুপ হয়ে ঘুমাবার প্রয়োজন বোধ করে আকাশের তলে ।
একা একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব;
তখন অনেক রাত– তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথা
নির্জনে ঘিরেছে এসে; মনে হয় কোনোদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব
আর দেখেছি কি: একরাশ তারা আর মনুমেন্ট ভরা কলকাতা ?
চোখ নিচে নেমে যায়–  চুরুট নীরবে জ্বলে – বাতাসে অনেক ধুলো
খড়;
চোখ বুজে একপাশে সরে যাই – গাছ থেকে অনেক বাদামি জীর্ণ পাতা
উড়ে গেছে; বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর
কেন যেন; আজো আমি জানিনাকো হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর ।
( “পথ হাঁটা”– জীবনানন্দ দাশ )

আমি একজন রেকলুজ, একা থাকতে ভালোবাসি, একা-একা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি। ভারতের এবং পৃথিবীর অন্যান্য যে শহরেই কিছুকাল থেকেছি, কুড়ি বছর হোক বা কুড়ি দিন, রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি, একা-একা টহল দিয়ে চারিদিকে চোখ বোলাতে-বোলাতে ,কান পেতে, গন্ধ নিতে-নিতে, হেঁটেছি, স্রেফ হেঁটেছি, কোথাও বা ফাঁকা ফুটপাত বেয়ে শোকেস দেখতে-দেখতে আর কোথাও বা ভিড়ে গাদাগাদি মানুষ-মানুষীর মাংসময়তার ভেতরে-ভেতরে । শহরবাসীর ভাষায় দখল থাকলে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার থেকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে অজানা ভাষাভাষিদের চলমান জমায়েতে। অফিসের কাজে পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে সমীক্ষা করতে গিয়ে টের পেতুম যে রাজনৈতিক ভয়ে অনেকে সঠিক উত্তর দিচ্ছেন না; তখন আমার হিন্দি-উর্দু প্রয়োগ করে, যেহেতু দাড়ি-গোঁফ ছিল, আর সহকারীরা আমার পরিচয় এম আর চৌধরী বলে  দিত, অবাঙালি রূপে ভেতরের কথা টেনে বের করা সহজ হয়ে যেত। আমার ‘অপ্রকাশিত ছোটগল্প’ বইতে ব্যাপারটা নিয়ে ‘মিহিকার জন্মদিন’ শিরোনামে একটা গল্প লিখেছিলুম। ইনকগনিটো থাকার অভিজ্ঞতা।  যেমন অভিজ্ঞতাই হোক না কেন, তা বেশ আহ্লাদময়।

সম্পূর্ণ…»

মে
03

নিজের মুখোমুখি

কামাল রাহমান

সুদীর্ঘ এক জীবনের তিরাশিটা বছর অতিক্রম করে হামযা আবু তাহের অভাবনীয় এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অতীতের সবকিছুর খেই হারিয়ে ফেলে। এমন একটা বয়সে পৌঁছে বেঁচে থাকার আরো ইচ্ছা থাকলেও কারণ বিশেষ কিছুই থাকে না। অনেকটা প্রথাসিদ্ধ জীবন যাপনের ফলে কিছু কিছু কাজ এমনভাবে অভ্যাসের সঙ্গে মিশে গেছে যে ওসবের জন্য সামান্যতমও ভাবতে হয় না ওকে। যেমন ঘর থেকে বেরোনোর সময় বাম পা আগে ফেলা, ঘরে ফিরে দরজা খোলার জন্য একটু বিরতি দিয়ে দু বার ডাকা, অথবা টোকা দেয়া। দরজা খোলার সময়ও দু বার শোনা, বাইরে বেরিয়ে কারো সঙ্গে হাত মেলালে দু হাত মেলানো, বাম হাত দিয়ে অপরজনের হাতের কনিষ্ঠায় চাপ দেয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব প্রতিটা কাজেরই ব্যাখ্যা আছে, হয়তো এর সবই অর্থহীন।

প্রথমটায় সে বুঝতে পারে নি কোনো ব্যতিক্রম কিছু হয়েছে কিনা, হয়তো কারো অপেক্ষার ঘোরে উৎকণ্ঠ ছিল, এখন অবশ্য মনেও করতে পারে না কার অপেক্ষায় ছিল! দরজায় টোকা পড়তেই লাফিয়ে এসে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে ক মুহূর্ত, সামনে যে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে অবিকল দেখতে একই রকম, হামযার মতো! সরাসরি তাকায় সে ওর চোখের দিকে, এর আগে এভাবে কোনো মানুষের চোখের দিকে কখনো তাকায় নি, তাকানো হয়তো যায়ও না। এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয় ওর ভেতর, যেনো কিছু দেখার চেষ্টা করে ওর চোখের গভীরে, কিন্তু সেখানে কিছুই উদ্ধার করতে পারে না।

‘ভেতরে আসবো?’ জিজ্ঞেস করে সে। একটু ভয় পেয়ে যায় হামযা, বলে
‘বাইরে আসি আমি?’
‘খুব ঠাণ্ডা পড়েছে বাইরে।’

সম্পূর্ণ…»

মার্চ
19

শনিবারের জার্নাল – ৫

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী

তেরই ডিসেম্বর খবরের আর্কাইভ থেকে কী যেন খোঁজার সময়, গিল স্কট হেরনের মৃত্যুসংবাদ দেখলাম। বেশ পুরানো খবর। ২৭শে মে’ ২০১১। ঠিক দুঃখ নয়, একটা শূন্যতাবোধ, জলের ফোঁটার মত অবধারিত ব্যপ্তিতে, ছড়িয়ে পড়ল। কিছু কিছু মানুষ এতখানি মিশে যায় যাপনে, চর্চায়, যে তারা সশরীরে রইল কি রইল না, সেটা একটা সময়ের পর আর প্রভাব ফেলে না। কেননা একজন চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল মানুষ, একজন লড়াকু মানুষ, জীবনের উপান্তে আসার আগেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ লড়াইয়ে সামিল ; কাঁধে কাঁধ ফেলে লড়তে শেখা তার কাছেই। তার কাছেই জেনে নেয়া, চোখ তুলে সোজা তাকালে অনেক দূর অবধি রাস্তা দেখা যায়।
১৯৬১ সাল। আইভি লিগের প্রিপারেটরি স্কুল, ফিল্ডস্টন। ব্রংক্স, নিউ ইয়র্ক।

-সাবওয়ে থেকে চড়াই ধরে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার সময় যদি তোমার কোন বন্ধুকে লিম্যুজিনে চড়ে স্কুলে যেতে দ্যাখো, তোমার কেমন লাগবে ?
- ঠিক আপনার যেমন লাগবে। সবাই তো লিম্যুজিনের খরচ কুলিয়ে উঠতে পারেনা। আপনার কেমন লাগে?

ভর্তির ইন্টারভিউতে, অন্য স্কুল থেকে বদলি নিয়ে আসা ১২ বছর বয়সী ছেলেটির সপাট উত্তর। পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ নিয়ে যে ফিল্ডস্টনে ভর্তি হবে। কৃষ্ণাঙ্গ প্রধান অঞ্চল ব্রংক্সে, তাকে নিয়ে ফিল্ডস্টনে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রের সংখ্যা হল পাঁচ জন। লড়াইটা সহজ ছিল না। কিন্তু লড়তে হবে, সেটা জানা ছিল। তাই আজীবন লড়াই। ভাঙতে চাওয়া সেই সমস্ত ঔদ্ধত্যকে, যা মানুষকে মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না।

সম্পূর্ণ…»

মার্চ
19

গল্প: নানা টুকরো, আপ্তবাক্য

পাবলো শাহি

কথাটা সেই প্রথম স্পষ্ট করেছে, আমাদের মস্তিষ্কে চিন্তাটা মিথ হয়ে উঠবার আগে– সেই বলেছে ‘কনসেপ্ট’ এক ভয়ঙ্কর জটিল শব্দ আর মানুষ এই অভ্যস্থতার মধ্যে ঢুকে শব্দের দাস হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গ ধরে সে আমকে বলে– ধরো আমি নিয়াণ্ডারথাল নারী, আর তুমি পৃথিবীর ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আদি পুরুষ; কবিতার জন্ম দিতে গিয়ে, মাথায় ফুল গুঁজতে গিয়ে, ফুলের বদলে তুমি চাঁদ গুঁজে দিয়েছিলে। এইভাবে ভালোবাসার জন্ম হওয়ার দিন থেকে মানুষের মন এমন ইন্দ্রিয়জটিল হয়ে উঠল যে, যখন ইতিহাস শব্দটি চিন্তার সাথে যুক্ত করলাম আমরা; তখন স্বভাবতই মিথ ও উপখ্যান এই ভাবনার সুড়ঙ্গপথ ধরে তা ঢুকে পড়লো আমাদের ‘মনে’। এইসব হচ্ছে শিল্পচর্চার ইতিহাসের ডানায় শব্দের কাঠামোগত অবস্থান, যা এত ভয়ঙ্কর যে ‘মন’, ‘ভাবনা’, ‘মিথ’– এই শব্দগুলি সৃষ্টিশীল তাত্ত্বিকের মত বিশ্লেষণ করতে থাকি আমরা। করতে থাকি মানে– এই প্রচেষ্টা আমাদের মধ্যে প্রপিতামহের কাল থেকে অব্যাহত আছে।

‘সে বলে– জাভার F-ম্যান বোধকরি এমন মস্তিষ্কের জটিল আবর্তনে পড়েছিলো?’

‘হয়তো বা, তা না হলে মানুষ চিন্তা ও মনের চংক্রমণ শিখলো কোথা থেকে?’

‘তারপর আমি বলি– তোমার বুকটা চম্বুক যা আমাকে টানে।’

‘সে বলে, আমি তো কাজল রেখা, সোনারকাঠি মাথার পাশে রাখলে জেগে উঠি, আর রূপোর কাঠিতে চিরনিদ্রায়।’

‘তা ঠিক; সাতসমূদ্রের তলে– ভ্রমরার পেটে থাকে রাক্ষসের জান? সেই রাক্ষস আমি হলে, তুমি সেই প্রাণ ভ্রমরা।’

সম্পূর্ণ…»

ফেব্রু
07

মর্শিয়া বানুর আরেক সকাল

নাহার মনিকা

এমন সকালে, এমন সকাল বেলায় মর্শিয়া বানুর মনে হয়- জীবনে বিলাসিতা না থাকা ঠিক না। একতলা বাড়ির বারান্দায় বসে থাকার সকাল দশটা, নাশতা, চা শেষ। আধপড়া খবরের কাগজ আলস্য করে তার ইজি চেয়ারের হাতলে। আঙ্গুলের ডগা চুলে মই দেয়, অন্য হাত মনে মনে রোদের আভিজাত্য গায়ে মেখে পরিচ্ছন্ন উঠানে তার পোষা বেড়াল যেভাবে ইতস্তত ফড়িং এর পিছে লাফিয়ে বেড়ায়, তেমন বেড়ায়। এক কোনায় স্বাস্থবতী ডালিম গাছ, অপূর্ব সব ফুলের কোরক নিয়ে এমন সকালে রোদের কাছে নুয়ে থাকে। মর্শিয়া বানু বাৎসল্য স্নেহে তাঁকিয়ে দেখে আর জীবনের সম্ভব- অসম্ভব দুই পক্ষ-টেবিল চেয়ার সাজিয়ে বিতর্ক জুড়ে দিলে তার চোখ লেগে আসে।

নিজের কাছেই নিজের গল্পটা শাদামাটা ঠেকে মর্শিয়া বানুর। অবেলা দুপুরের ছায়াতে হঠাৎ লেগে আসা ঝিমুনি কেটে গেলে শুকিয়ে যাওয়া জলপাইয়ের মত কনুই দিয়ে চোখ ডলতে হয়। পাশের বাসার ছাদে কেউ, বাচ্চা কাচ্চা ঘুড়ি ওড়ায়। তিন কোনা, গাঢ় নিবিড় তিন রঙ্গের ছাট এসে লাগে মর্শিয়া বানুর চোখমুখে।  ঘুড়ি ওড়াতে ইচ্ছে করছে। কি হয় এক লাফে ঐ ছাদে চলে গেলে? এক দুই তিন করে মর্শিয়া সিঁড়ি ভাঙ্গতে থাকে, পিড়িং পিড়িং  ঘাস ফড়িংয়ের মত লাফ এক একটা- ইচিং বিচিং চিচিং চা, প্রজাপতি উড়ে যা!

মর্শিয়া এখনো শরীরের সাথে মনের দূরত্ব রাখতে পারে। সে কারণে এখনো প্রজাপতি উড়ে যাওয়ার মত সিঁড়ি ভাঙ্গতে পারে। স্কুলের দোতলা থেকে সন্ধ্যার দিকে, কেউ না থাকলে হালকা পায়েই নেমে আসে এ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস মর্শিয়া বানু।

আহহা, ঘুড়িটা মুখ থুবড়ে পড়লো, বাতাস ধরে গেল কি? নভেম্বেরের বাতাস কি ধীর লয়ে বিষণ্ণ হচ্ছে! মর্শিয়া বানুর মাথার মধ্যে- “ডালিম ফুলের রংটি লাল, ডালিম ফুলের রংটি লাল”- লাগাতার কাঁথা বুনে যায়। কান্নাকাটির ধাত নাই তার। হাই ব্লাড প্রেশারের সাথে, মৃদুমন্দ মেদের সাথে, ফর্সা বরং জেদ আছে, শিরা দপ দপ করা রাগ আছে। বলতে কি অন্য কোন বিষন্নতা, মন খারাপ করা কথা ভাবার সুযোগ হয়না তার। আজকে কি সব ছাই অবিমৃষ্য ওজর এসে মিন মিন করে, চোখ পুকুরের কিনারা উপচে বানভাসি ঘটার মত দু’একটা কারণ পায়চারী করে।

সম্পূর্ণ…»

জানু
26

ধা রা বা হি ক আ ত্ম জী ব নী: মায়াপারাবার (পর্ব-৮)

পর্ব-১।। পর্ব-২।। পর্ব-৩।। পর্ব-৪।। পর্ব-৫।। পর্ব-৬।। পর্ব-৭

পাপড়ি রহমান

মৎসরূপ ক্যারক্যারি!

আমার আব্বার ছিল নানান খেয়াল। তার সাধ ছিল অনেক কিন্তু সাধ্য ছিল সিমীত। নিজে যেটুকু সৎভাবে আয় করতেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। পরের হাজার বিত্ত বা ধনদৌলতে কখনো তাকে পরশ্রীকাতর হতে দেখিনি। মোটকথা তিনি ছিলেন নির্লোভ। এবং আমাদের খুব কঠিন শাসনে বড় করেছিলেন। প্রায়ই আমাদের ডেকে বলতেন–

‘কখনো পরের জিনিসে লোভ করবা না’
‘সজ্ঞানে মিথ্যাকথা বলবা না’
‘বিনয়ী থাকলে সে তোমাকে এনে দেবে জয়ের মালা’
‘ধৈর্য তোমাকে করবে মহিয়ান’
‘ত্যাগের মাঝেই খুঁজে পাবে সার্থকতা’

শিশুবেলায় এইসব সুশীল বাক্য শিখে বড় হওয়ার খেসারত আমাকে পলে পলে দিতে হয়েছে। বিশেষ করে আমি কাউকে ‘ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে’ দেখলে সে ভাবে আমি দূর্বল! এবং এই ভেবে সে আমার প্রতি ক্রমাগত অন্যায় করে যেতে থাকে। এইভাবে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে যেতে আজ আমার মনে হয়, আব্বার দেয়া সমস্ত শিক্ষাই ভুল ছিল। কি হলো তাঁর যত শিক্ষা মেনে চলে? সত্যবাদিতা, আদর্শ আর ভালোমানুষীর জন্য আমাকে তুমুল খেসারত দিতে হয়েছে। নানান ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। সেসব কথা অন্য কোথাও বলা যাবে। আজ আর এখানে নয়।

তো আব্বার নানান খেয়ালের মাঝে ছিল পোলাপানদের খুশি করা। যখনই ঢাকা থেকে বাড়ি আসতেন, আমাদের জন্য নানা ধরনের চমক নিয়ে আসতেন। হয়তো নিয়ে এলেন দুই টিন ভর্তি ক্রীম বিস্কুট। অথবা দারুণ সুস্বাদু টফি। আমরা এক অদ্ভুত কায়দায় ক্রিম বিস্কুট খেতাম। বিস্কুটটা দুইভাগ করে শুধু ক্রীম চাটতে থাকতাম। ক্রিম চেটেপুটে খেয়ে শেষ করার পর বিস্কুট খেতাম। অবশ্য আমাদের এমন করে খেতে হতো বড়দের চোখের আড়ালে। তারা দেখলে কষে লাগাতেন এক ধমক। রেগেমেগে বলতেন–

সম্পূর্ণ…»

জানু
26

নয়ন মেলে দেখি

ফারহানা মান্নান

 

শিল্পের সৌন্দর্য নারীর সৌন্দর্যের মতন হরণ করবার মতন বিষয় কী? শিল্পকে জোর পূর্বক হাতের মুঠোয় আটকে রেখে নিজেকে শিল্পী তো ভাবা যায় না। শিল্প তাই জোর পূর্বক অর্জন করবার বিষয় নয়। আমরা শিল্পকে হাত দিয়ে ধরে দেখতে পারি, ছুঁতে পারি, অনুভব করতে পারি কিন্তু শিল্পের অধিকার কি পাওয়া যায়? ভূমির মালিক যেমন তার একখণ্ড পরিমিত জায়গাটির একচ্ছত্র আধিপত্য পেয়ে থাকেন, ঠিক তেমনটি করে কি শিল্পের আধিপত্য পাওয়া সম্ভব? আধিপত্য পেতে হলে কোন বুস্তু বা সামগ্রীতে নিজের নামের মহর লাগিয়ে দিতে হয়। কিন্তু শিল্পেরতো কোন নির্দিষ্ট পরিসর নেই! কোন গজ, ফিতা দিয়েতো শিল্পের নাগাল পাওয়া যায় না। মহাকাশের মতন অসীম শিল্পের জগতে আমরা যারা বিচরণ করতে শিখি, করতে পারি তারা নিজেদের শিল্পী বলে পরিচয় দিতে পারি ঠিক কিন্তু একথা কখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না শিল্পের আধিপত্য শিল্পীর নাগালের মধ্যে এল অথবা শিল্পের পরিসরে সকল শিল্প প্রেমীই ‘শিল্পী’ হয়ে উঠেছেন। শিল্পের বিস্তৃত পরিসরে একজন শিল্পীর ভ্রমন তাই আজীবনের। একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য অর্জন তাই সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই সৌন্দর্যের হরন নয়, শিল্প তার সৌন্দর্যকে তাই উপভোগ করবার স্বাধীনতাই দেয়।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীতে বলেছেন, “জীবের মনস্তত্ত্ব যেমন জটিল যেমন অপার, সুন্দরও তেমনি বিচিত্র তেমনি অপরিমেয়”। সুন্দরকে ও অসুন্দরকে বোঝাবার, ব্যক্ত করবার চেষ্টা মানুষের আজীবনের। ছবি এঁকে, কবিতা লিখে, গান গেয়ে নানানভাবে আমাদের শিল্পবোধ প্রকাশের প্রয়াস থাকে। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আমরা শিল্পের একটি চরম মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারি। ছবি আঁকবার ক্ষেত্রে আমাদের আঁকা প্রত্যেকটি ছবিই প্রত্যেকবারে একটি অপরটিকে ছাড়িয়ে যায়। এর মানে হল, ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি ছবি অপরটি থেকে নিজস্বতা তৈরি করে। এইভাবে এক আর্টে আর এক আর্টে, এক সুন্দরে আর এক সুন্দরে পরিচয়ের খেলা চলতেই থাকে। শিল্পী এস এম সুলতান, তাঁর eternal bangla ছবিতে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন পেশাজীবীদের জীবনযাত্রা ফুটে উঠেছে। স্রষ্টার এই সুন্দর পৃথিবীতে তাঁর সৃষ্টিকে এত অপরূপ দৃষ্টিতে দেখে ক্যানভাসে মেলে ধরবার এই যে বিরল যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছিলেন এটা যে কতখানি বড় ক্ষমতা আর কত সাধনার ফল তা বলাই বাহুল্য। শিল্পি এস এম সুলতান আশপাশের সুন্দর আর অসুন্দর উভয়কেই দেখেছিলেন। এই দেখবার ক্ষমতাই তাঁর শূন্য ক্যানভাস এঁকে এঁকে ভরিয়ে তুলেছিল অন্যন্য সব সাধারন জীবনযাত্রার অসাধারন সব সৃষ্টিতে।

সম্পূর্ণ…»

জানু
26

গল্প: আলো ক্রমে নিভিতেছে

সৈকত আরেফিন

আমাদের মফঃস্বল বদলে যায়। ছোট শহরটা দ্রুত তার ভূগোল পাল্টে ফেলে। এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের প্রায় সবটাই হয় আমাদের শৈশব ও কৈশোর জুড়ে, উদ্দাম ও স্বপ্নরঙিন অতীতকালে; প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়িয়ে, সারাদিনমান ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে আমরা দেখি যে, আমাদের আকাশ ঢাকা পড়ে যায়, গোলাছুট খেলার মাঠও তখন বহুতল শপিং সেন্টারের নিচে সমাহিত; নিজেদের ঘরের চারদেয়ালে ক্রমে বন্দি হয়ে পড়ে আমরা বুঝি একটা বর্ধিষ্ণু শহুরে খাঁচা আমাদের ধীরে ঘিরে ফেলছে; কিন্তু খাঁচার এই ঘিরে আসা আমাদের তেমন করে আতঙ্কিত করে না। হয়তো তখন আমরা দ্বিধাহীনভাবেই শহরকে আকাঙা করি; এভাবে আমরা একটা গুবরে পোকা, কয়েকটি জোনাকি, প্রজাপতি, খোলা আকাশে আমাদের কয়েকটি শাদা কালো ঘুড়ির কথা বেমালুম ভুলে যাই। কিন্তু তখনও হয়তো এরকম অনেকে থাকে যারা গ্রামীণ সবুজকে আবার ফিরে পেতে চায়; তখনও কেউ কেউ কাশীনাথপুরকে শহর বলতে দ্বিধা করবে, বা বলবে যে, এটা মূলত গ্রামই; কেননা তখনও অদূরে, আশেপাশে সবুজ হারায় না, সেখানে ফসলের মাঠ, ধানখেত বা সরষে ফুলে প্রান্তর হলুদ হয়ে থাকে। তবু জেলা শহর থেকে অনেক দূরে, দালান কোঠায় ভরে ওঠা এলাকাটিকে আমরা শহর বলতেই ভালোবাসি। এসব হয়তো শ্লাঘা, তবে লজ্জিত বা কুণ্ঠিত হবার ব্যাপারটিও আর থাকে না; এজন্যে যে, তখন পর্যন্ত সত্যি সত্যি শহর সম্পর্কে আমাদের কারোরই ধারণা স্পষ্ট নয় বা আমরা প্রচলিত শহরধারণাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিই, তখন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ভাবি, শহর হিসেবে কাশীনাথপুরের একটা পরিচিতি হোক; এই প্রত্যাশার বিপরীত ভাবনা যে আমরা একেবারে ভাবি না তা নয়; তবুও চারদিক থেকে হাইওয়ে এসে এখানে বিশাল গোলচত্বর সৃষ্টি করলে টেলিভিশনে বা সিনেমায় দেখা ঢাকার বড় বড় রাস্তার কথা আমাদের মনে পড়ে; আরও পরে গোলচত্বরে মোবাইল কোম্পানিগুলো যে বিশাল বিশাল বিলবোর্ডে দিগন্ত অবলেপন করে তাতে শহরের আবহ প্রযোজিত হয়। আমরা সেইসব বিশালাকৃতির বিলবোর্ডের মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে দেখি আর মনে মনে আমাদের শহরের এই বিস্তৃতি উপভোগ করি। তাছাড়া এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বা ভূমির উর্বরতার কারণে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হয়, বিশেষ করে পাট, পেঁয়াজ বা মরিচের মত ফসল তাতে বাণিজ্যিকভাবেও কাশীনাথপুর গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

সম্পূর্ণ…»

জানু
19

ব্লেডলিখিত সত্তাচিহ্নের শেষ ধাপ

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আস্থা বা সহজাত ছিঁড়ে এসেছি
মাকড়সার জালে রোদ ও ভিজে শিউলি
কুড়োতে গিয়ে হাতে লেগে যাওয়া
কয়লার গোলার দাগ কোনওভাবে
ফিরবেনা জেনে নিজেকে ছেড়ে দিচ্ছি
বাক্যে            নির্ভার            দাঁতে দাঁত কল্পনাবিহীন দিন
সামান্য স্টিলের নখ           বেঁধানোর কথা ভেবে দিন যায়
নিজেরই পুরনো রক্ত           সামাজিক মানুষের সাদা টিসু কাগজে

 

প্রাত্যহিক পাথর ও আমার টানটান ছিলা
কুয়াশা বস্তুত নরম কালো শরীর কোঁদা
যোনিতে আমি জিভ নামানোর ছলে লালা দিই
ব্যাকরণই আসলে লেহন
এই করতলহীন হাতে ভিক্ষার সামগ্রীও নেই
সামনে শুধু তীব্র হলুদের মোহে
নিভাঁজ চৌখুপ্পি নির্মাণ হলে তাকে দুপুর বলি
তার গায়ে শুকনো গ্রীষ্মের দিনে
একাকী হিংস্র পশুর চলন বসাই

 

সম্পূর্ণ…»

জানু
19

ছোটগল্প: এক্সকিউজ মি স্যার আমার নাম সাজ্জাদ

আনোয়ার সাদী

এক্সকিউজ মি, আমার নাম সাজ্জাদ স্যার। একটা লেটেষ্ট এডিশন বই এনেছি। এটা ভালো।

ছেলেটি ছিপছিপে, ভেসে থাকা চোয়ালে সামর্থ্যের ছাপ ষ্পস্ট। তার হাসিমাখা মুখে তাকিয়ে বিব্রত রফিক। কেননা তার চোখ চিক চিক করছে অপ্রকাশিত কান্নায়। ভেতরটা কাঁপছে অজানা এক আশঙ্কায় । হাসপাতলের কৃত্রিম আলো তার চোখ থেকে মুছে দিতে পারছে না এই শঙ্কা।

বউ হাসপাতলে ভর্তি এটাই রফিকের শঙ্কার কারণ নয়। যে কোন মুহূর্তে একটা কিছু হতে পারে এটাই তার ভয়ের কারণও নয়। তার ভয়ের উৎস একটি আর্ত চিৎকার। তার রেশ এখনও কানে লেগে আছে রফিকের।

- আল্লাহরে আমারে নিতারে …বাবুটা কেন নিলারে…

না, হাসপাতাল কাঁপেনি এই বাক্যে। কিংবা কোন পরিবর্তন আসেনি সাদা এপ্রনের নার্সদের অভিব্যক্তিতেও। কেবল রফিকের বুকের ভেতরটা খালি করে গেছে এই চিৎকার। চিৎকারে নয়,উচ্চারণের তীব্রতায় হেলে গেছে তার জগত। আর তখন সামনে আসে ছেলেটি। বলে, স্যার আমার নাম সাজ্জাদ। একটা লেটেষ্ট এডিশন বই এনেছি। এটা ভালো। এটা ঘরে থাকলে ইংরেজিতে আর ভুল হবার সুযোগ নেই।

কী জবাব দেয় রফিক?

কেবল মাথা নেড়ে নেতিবাচক মনোভাব জানিয়ে দেয় সে। তাতে কোন বিকার নেই সাজ্জাদের। কোন জবরদস্তি নেই তার। সে যায় আরেকজনের কাছে।

সম্পূর্ণ…»

জানু
06

ছোটগল্প: বীজ

মাহবুব আলী

 

শিহাবের এই কাজ করতে জঘন্য লাগে। সারা শরীর ঘিনঘিন করে উঠে। অথচ আগে এমন অনুভূতি হতো না। হঠাৎ যেদিন রানু বমি করার মতো চোখমুখ উল্টে বলে, -

‘যাও গোসল করে এসো।’

কেন কি হলো আবার?’

‘ই মা! কি জঘন্য কি নোংরা!’

সেই থেকে শুরু। না হলে কাজ নিয়ে ভালোমন্দ ভাবার কিছু ছিল না। সবাই করে। তাছাড়া তেমন ভাবার অবকাশই কোথায়! মাস গেলে নগদ টাকা আসে। সংসার করা নয়, জীবন চালাতে টাকার দরকার সবসময়। কিন্তু রানুর সেই উচ্চারণগুলো তাকেও ধীরে ধীরে সংক্রমিত করে ফেলে। এখন তার নিজেরও কেমন গা ঘিনঘিন করা শুচিবাই ধরেছে। শিহাব বোঝে এ অহেতুক…যুক্তিহীন। তারপরও রোগ মনে বসে গেছে। অনেকসময় মন কোনো যুক্তি বোঝে না। জীবনের প্রয়োজন অপ্রয়োজন আর পরিস্থিতি মেনে নিতে চায় না। তাকে এখন সকালে বাইরে কাজে যাবার সময় এবং ফিরে এসে আর একবার গোসল করতে হয়। সে গ্রীষ্মকাল হোক কিংবা মাঘের শীত।

আজ সন্ধ্যেয় শিহাব গোসল সেরে টিভি অন করে। প্রতিদিন এমন হয়। অফিস থেকে ফিরে মুড়ি আর চা কিংবা অন্যকিছু খেতে খেতে টিভি দেখা। অনেকটা রুটিনওয়ার্ক হয়ে গেছে। রানু আজ চা করবে না। সে মাঝে মাঝে এমন করে। কেন যে, তা শিহাব কোনোদিন ভেবে দেখে নি। সে এক কাপ চায়ের জন্য প্রায় সাধাসাধি করে। আজ করল না। মন বিষণ্ন। সে টিভির দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে। আজকাল বেশিরভাগ প্রোগ্রাম ঝাউলি হয়ে গেছে। একইরকম…টাইপড টক শো। আলু পটল ব্যবসায়ী প্রোডিউসার আর নকলবাজেরা বুদ্ধিজীবি হলে যা হয়! ফাজলামোর মতো আঁতেল সব কথাবার্তা। ‘আরে শালা, সারাদিন পরিশ্রম করে এসে এসব বক্তৃতা বাগাড়ম্বর কে শুনতে চায়। আর আলোচকদের ভাবখানা দেখ, একেকটজন বিদ্যেগজ’ সে মনে মনে খেদোক্তি করে পাশে বসা রানুর দিকে তাকায়। আপন মনে সেলাই করছে। টিভির দিকে তেমন নজর নেই।

সম্পূর্ণ…»

জানু
06

ধা রা বা হি ক আ ত্ম জী ব নী: মায়াপারাবার (পর্ব-৭)

পর্ব-১।। পর্ব-২।। পর্ব-৩।। পর্ব-৪।। পর্ব-৫।। পর্ব-৬

পাপড়ি রহমান

ফচাদিদির মিহির ও খনা!

দাদাজানের আপন চাচাতো বোন ফচা। আমরা ডাকি ফচাদিদি। ফচাদিদির গায়ের রঙ মেমসাহেবদের মতন টুকটুকে লাল। তিনি নিঃসন্তান বিধবা। নিজের অঢেল সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে চলে এসেছেন আমাদের বাড়িতে। মানে উনার বাবার বাড়িতে। ফচাদিদির একবোনের বিয়ে হয়েছিল চাচাতো ভাইয়ের সাথে। সেই বোনের ছেলের হাতে টাকাকড়ি সব তুলে দিয়ে নির্ভার হয়েছেন।

দুর্দান্ত প্রতিভাধর ও কর্মঠ নারী এই ফচাদিদি। তার বয়সী আর অন্য কোনো নারীকে আমি এত প্রতিভাধর ও কর্মী হতে দেখিনি! ফচাদিদি কানে কিছুটা খাটো। ফলে তার সাথে কথা বলতে হয় তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে। খুব ধীরে-সুস্থে। আসলে উনি ঠোঁট নাড়ানো দেখে বুঝে নেন কে কী বলছে। ফচাদিদি বয়সে আমার দাদাজানের চাইতেও বড়। কিছুটা খর্বাকৃতি দেহ । সায়াহীন ছোটপাড় সাদা ধূতি পরেন। আমার দিদির মতোই এক প্যাঁচ দিয়ে। আর পায়ে পরেন পাম্পসু। পাম্পসু পায়ে চষে বেড়ান জলা-জংলা, খাল-পুকুর, ক্ষেত-খামার, জাংলা-মাচাসহ বাড়ির সর্বত্র।

বোশেখ বা জৈষ্ঠ্যে জোরে হাওয়া বইলে একটা পাকনা কি আধা পাকনা আম নিচে পড়লে আর কারো কুড়ানোর উপায় নাই। সেই আম দেখা যাবে ফচাদিদির হাতে! কানে ভালো শুনতে পাননা কিন্তু আম বা বেল পড়ার শব্দ পান কীভাবে? আমাদের কাছে ফচাদিদি জলজ্যান্ত বিস্ময়। মানুষের চাঁদে যাওয়ার ঘটনার মতোই আশ্চর্যজনক। এইভাবে গাছের আম, জাম, বেল, আতা, নোনা, বরই সবই ফচাদিদির হাতে। আমাদের বাড়ির সব চাইতে প্রাচীন মানুষ ফচাদিদি।

সম্পূর্ণ…»

জানু
06

অজিত দাশের কবিতা

চৌকাঠ

প্রকাশ্যে উড়ছে
যাবতীয় ব্যথার অগ্রন্থিত অক্ষর
তোমাকে জানা আর না জানা অকথিত ভঙ্গিমা মাত্র

অথচ কোন গোপন দরজা খুলে গেলে
আশ্চর্য কী সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে দেখি
যারা এঘরে ওঘরে জমিয়ে রাখে অভাবের ছিটেফোঁটা
তারাও আজকাল দিব্যি কিনে নিতে পারে
প্রকাশের শালীনতা

যেদিকে দুর্লভ প্রতিভা মেলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি
বিপন্ন চৌকাঠে লেগে থাকে মৃত্যু আর
মাতৃত্বের যন্ত্রকৌশল থেকে ভেসে আসে দুরত্বের অভিমান
যে দুরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে হিম হয়ে আসে যাবতীয় মনস্তত্ত্ব

 

বুকের সারাংশ

উৎসর্গ: সুমনাকে


ভেঙ্গে যায় ঘর-দোর
জলের মত তবু স্বচ্ছতা
ধরে রাখি নির্বিশেষ
যেন অন্ধকার আলো ছায়ায়
হেমন্তের ক্লান্তি মেখে
তোমাকে ব্যর্থতার কথা বলি–
‘যে যার মত করে উষ্ণতার
সম্পূর্ণ…»

ডিসে
29

শনিবারের জার্নাল-৪

দোলনচাঁপা চক্রবর্তী

পাশের বাড়ির ছাতের কার্নিশে দুটো ঘুঘু। ওই বাড়িটার গায়ে রঙের প্রলেপ নেই – ইট বার করা। তার ওপর ঘুঘুর ছায়া মানায় না। কিন্তু ঘুঘু এত বোঝে না। ওরা উচ্চতা বোঝে। রোদ বাড়ছে – ওরা পিঠ পেতেছে রোদে। দূর থেকে দেখলে লাল পায়রা বলে ভুল হয়ে যায়। আমি অবশ্য দূর থেকে দেখছি না। ঘুঘুরাও আমাকে দেখছে। কিন্তু আমি যে দূর থেকে দেখছি না,বস্তুত তাদের খুবই কাছের মানুষ – এইটা তারা বুঝছে না। তুমি কারুর কাছের মানুষ,এইটা তুমি কাউকে কি ভাবে বুঝাবে ? এই বোঝাটা তো তার নিজস্ব ! সেইখানে তোমার তো অণু-পরমাণুও প্রবেশাধিকার নেই। পাখিদের উচ্চতায় তাকানোও দুর্বহ সময়ে সময়ে,ফলত অধিকারের ভাবনা আরও সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু অধিকার না থাকলেই ভাবনা থাকবেনা, এমন তো নয়। কেননা, স্মৃতি সময়ের সমস্ত পরিচিত ও প্রচলিত ধারণাকে অবজ্ঞা করে। সমস্ত খারাপ মূহুর্ত ভুলে গিয়ে নিজেকে নিরাপদে না রাখার একটি জন্মদায় আছে তার।

কেবলমাত্র, গত এক বছরের শীতকালের খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলো মনে পড়তে থাকলে শীতকালের প্রতি আমার সার্বিক মায়ামোহ কেটে যায়। তন্দ্রার মত যে আবছা নীল আমার আচ্ছন্নতাকে ঘিরে ধরেছিল নভেম্বরের প্রাক্কালে, তা সম্পূর্ণ মুছে গিয়ে খসখসে রুক্ষতা ফিরে আসে। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় টাটকা নতুন রক্তের ধারা। এই সময়টা যেন আমাদের জীবনে পচে যাওয়া ক্ষতের মতন, কেবলই বিষরক্ত ছড়ায়।

১) ৯ই ডিসেম্বর,২০১১: ঢাকুরিয়া, কলকাতার মাল্টিস্পেশালিটি আমরি হাসপাতালে ভোর চারটেয় আগুন। আগুনে পুড়ে ৯৩ জনের মৃত্যু। কর্তৃপক্ষ বাঁচানোর চেষ্টাই করেনি। শেষ মূহুর্তে, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের কিছু রোগীকে উদ্ধার করে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে তাঁরা সেখানেই মারা যান।

সম্পূর্ণ…»

ডিসে
29

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স: কালের নায়ক (পর্ব-৬)

পর্ব-১।। পর্ব-২।। পর্ব-৩।। পর্ব-৪ ।। পর্ব-৫

গাজী তানজিয়া

এগার

মহৎ কর্মযজ্ঞের ভেতরেই মানুষের জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। তবে এই মুহূর্তে জীবন সার্থক কি ব্যর্থ সেই চিন্তা ছফার নেই। তার এখন একটাই ভাবনা সাহিত্যের জন্য কিছু একটা করা দরকার। সেজন্য সাহিত্য-সভা করাটা ভীষণ জরুরী। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশের সাথে আড্ডার একটি অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক আছে। আড্ডার সাথে সম্পর্কহীন যে সাহিত্য সৃষ্টি হয় তাকে সাহিত্য না বলে গ্রন্থপণ্য বলাই ভাল। কাপ্তানবাজারের হোটেল নাইল ভ্যালিতে শুরু হলো সাহিত্য সভা। আবুল হাসান, শশাংক পাল, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল কাশেম, কায়েস আহমেদ, মোহাম্মদ শাহজাহান, সানাউল হক খান এরা নিয়মিত এসে সভা গরম করে তোলেন। কিন্তু কবি সাহিত্যিকদের একটানা চেয়ার টেবিল আটকে আড্ডা দেয়ার কারণে নাইল ভ্যালির ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড় হলো। তাই কিছুদিনের মধ্যে ওখানকার আড্ডা গোটাতে হলো। নতুন ঘাটি বসল ফরাসগঞ্জের লালকুঠিতে। মিউনিসিপ্যালিটির কর্মচারী ছিলেন সদরুদ্দীন মুন্সী। ভদ্রলোক পাগলাভোলা মানুষ। মাসে-ছমাসে একবার উম্মাদ হয়ে যান তখন তার শরীরে বস্ত্রের লেশমাত্র থাকে না। সেই সদরুদ্দীন মুন্সী আবার এইসব লেখকদের খুব সমাদর করেন। লালকুঠিতে একটা ছোট্ট লাইব্রেরীতে তিনি এঁদেরকে বসতে দিলেন। আর মাঝে মাঝে বৃষ্টি বাদলার দিনে, এই তরুণ জ্ঞান ভিক্ষুকদের জন্যে লাইব্রেরিটি উম্মুক্ত করে দিয়ে বই ধার দিতেন। সবই ছিল তার খেয়ালের ওপর।

তবে লালকুঠিতে রোজ নয়, ওখানে সপ্তাহে একদিন একটা আসর বসতে লাগল। লালকুঠির সাহিত্য সভায় বড়দের মধ্যেও অনেকেই আসতে লাগলেন। শামসুর রহমান, শিল্পী হারাধন বর্মন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই লালকুঠির পাটও উঠে গেল।

সম্পূর্ণ…»

ডিসে
28

সৈয়দ তারিকের ৭টি কবিতা

প্রেমিক

যার হৃদয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত
তার হৃদয়ে আর কেউ থাকে না;
আমার হৃদয়ে শুধু তুমি আছ–
তবে কি তুমিই তিনি?
তোমাকে ভালোবাসি বলে
যে কেউ অনায়াসে তাঁর আসনেই বসে পড়ে–
তাঁর বান্দারা এতে খুবই অসন্তুষ্ট।

 

প্রতিপক্ষ

তোমাকে দেখে তাঁর কথা মনে পড়ে
তাঁর কথা ভাবতে ভাবতে তোমাকেই ভেবে যাই;
আমার থেকে আমাকে বাদ দিলে তিনি থাকেন,
তাঁর থেকে তাঁকে বাদ দিলে থাকো শুধু তুমি।

 

কারক

এত বেশি দ্রবীভূত হবো তা ভাবি নি
তুমি পরম দ্রাবক,
এত বেশি আন্দোলিত হবো তা ভাবি নি
তুমি অনন্ত পাবক।

 

সম্পূর্ণ…»

ডিসে
14

আলতাফ হোসেন-এর ১১টি কবিতা

কবিতা ১

 

কী ভেবে

অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেলেছি

দেখা যাচ্ছে

ওই যে পত্রিকা, রাগী কাগজ স্তুপ করে রাখা

ওই যে বইগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে

আমার নাম

ওদের ভেতরের জানালা থেকে উঁকি দিচ্ছে

দেখতে পাচ্ছি

কিন্তু কবিতাদের

কেউ এসে বলছে না,

‘আমাকে চেন?’

 

কবিতা ২

 

শেষে ভেবেছিলাম হোমাইপুরের গাঁয়ে আবার যাই

ওখানকার চিন্তাগুলোকে দেখছি ওখানেই বিশ্রাম

করছে

সম্পূর্ণ…»

ডিসে
14

ধা রা বা হি ক আ ত্ম জী ব নী: মায়াপারাবার (পর্ব-৬)

পর্ব-১।। পর্ব-২।। পর্ব-৩।। পর্ব-৪।। পর্ব-৫

পাপড়ি রহমান

মা মনসার নাতনী-পুতনীদের খবর!

বাড়ির চারপাশে জলা-জংলার অভাব নাই। ফলে মা মনসার নাতনী-পুতনীরা অনায়াসে তাদের রাম-রাজত্ব কায়েম করে আছে। তাদের রাজ্য তো আছেই। নিজরাজ্য ছেড়ে তারা যে লোকালয়ে আসেনা এমন নয়। কাহাতক আর ভালো লাগে জঙ্গলের ভেতর থাকতে? বিশেষ করে গরমকালে। গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে তারা নেমে পড়ে আমাদের পুকুরের জলে। জলকেলি করে ক্লান্ত হলে বিশ্রামের জন্য উঠে আসে আমাদের বাইরবাড়িতে। বাংলাঘরে। ভেতরবাড়িতে। ঘরের পৈঠায়। অনেকে আবার ঘরের ভেতরও ঠাঁই করে নেয়। ঘরে যারা থাকে তাদের বলে ‘ঘরগিন্নী’। মানুষের গিন্নীপনায় হয়না-মনসাদেবীর বংশধর গিন্নীপনা করতে ঢুকে পড়ে আমাদের সংসারে।

আমার বড়চাচীমা বরাবর সৌখিন মানুষ। গরমকালে বিছানায় পেতে শোয়ার জন্য সুদূর সিলেট থেকে আনিয়েছেন শীতলপাটি। একদিন দুপুর বেলায় যাবতীয় আলস্য মেখে শুয়ে আছেন আধো ঘুম, আধো জাগরণে। হঠাৎ করে ঘরের সিলিং থেকে থপ করে কি যেন তার বুকের কাছে পড়লো! তিনি শুয়েছিলেন কাত হয়ে। তেমনিভাবে শুয়েই চোখবুজে ‘পড়া’ বস্তুটাকে হাত দিয়ে খাটের নিচে ফেলে দিলেন। হাতের স্পর্শে টের পেলেন বেশ খসখসে ও ঠাণ্ডা এই ‘পড়া’ বস্তু। ফলে তিনি চোখ মেলে তাকালেন এবং জোরে চিৎকার দিলেন-

‘সাপ! সাপ! সাপ!’

সম্পূর্ণ…»

Older posts «