শান্তিময় মুখোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা

খারিফজন্ম

ভাটিয়ালি আকাশের পাশে চুপ করে বসে আছে
পর্যটনপ্রিয় দোতারাটি

দু-তারের ভেতর ঢেউ বিনিময় শুধু হাসিটুকু জেনেছে

আমাদের সর্ষে বীজ বোনা মাঠে ভূগোলস্যারের প্রতিবেদন এটুকুই
লাঙল ফলার রোদে শুকানো দেহাতি টোটেম

কিছুটা হলেও তার ওম পুড়িয়ে দিচ্ছে বীজতলা
খারিফজন্মের দিনগুলো মনে রেখে

 

রোমন্থন

শেষপর্যন্ত আয়ুরেখাগুলো মিশিয়ে দিলাম বৃষ্টিফোঁটায়
করতলিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই
রাশিচক্রের পুরোনো ঘরানা আর কৃষ্ণমূর্তির অমোঘ রসায়ন
ওষ্ঠরেখায় আর কোনো ভেসেলিন প্রলেপ জড়ালো না
তুমিও ততোধিক বল্কল ধোয়া জলে সাবানের উষ্ণতা খুঁজে নাও
নতুন ব্রণর ক্ষতে এঁটে রাখো না-মনস্ক আঙুলের সেলোফিন

অপটু বিনোদনের রাত্রি চিবোতে চিবোতে

 

অস্তমিতা

দিন বাঁধাইয়ের আঙুলগুলো মলাট ছেড়ে যাচ্ছে
গা এলিয়ে এখন কেবল সহজ চেয়ারানো
আজ বৃষ্টি এলো খুব সকাল সকাল
মেঘেদের ওড়াউড়ি ঈষৎ আড়চোখে তা দেখলো
কলমির ডাঁটা থেকে খসে পড়া নয়ানজুলিও
আকাশের খুনসুটি ঢেকে রাখার চেষ্টা করলো খুব
জলভাঙা করিডোর আর নিশ্চিহ্ণ দুপুরগুলো
তবু তুমি লিখে রাখছো ঘাসফড়িঙের রোজনামচায়

 

আবাদি

বলিরেখা থেকে বলাগুলো হয়তো সরিয়ে নিচ্ছে নিজেদের
খোলামকুচিরা তাহলেই গেয়ে উঠবে কিসিমতুলির মনগান
ওমলেট ডানায় ভর করে কিছুটা শীত উড়ে এলো
তাদের গায়ে পেঁয়াজের মৃদু বাস্তবতা আর কুসুমচরিতে
গমগম পার হয়ে যাওয়া রেলব্রিজ
সাম্ভব্য যৌনতার মেনুতে লিখে রাখছে
অপেক্ষার হাতলে ঝুলে থাকা ঈঙ্গিতগুলো

অনুর্বর বৈষম্যের কথা মাথায় রেখেই

 

না-ফেরা

দুপুরের লিবিডোগুলো কিছুটা বর্ষণ মুখর কিছুটা জর্জদার বেজে ওঠা
পারদের ওঠানামায় ফারেনাইট মেপে নিচ্ছে সম্পর্ক
কতোটা উষ্ণতা তাতে মেশালে রিনরিনিয়ে উঠবে
নূপুরের শীৎকার আজও তার পরিমাপ জানলো না
একটা কর্কশ হারমোনিয়ামের রিডে বাজতে বাজতে তুমি ফুরিয়ে যাচ্ছো
খুঁজে নিতে চাইছো সী-হকের ডানায় রেখে আসা অন্যমনস্কতা

ডিঙোতে ডিঙোতে আমিও অগস্ত্যযাত্রার একবারে শেষে এসে দাঁড়ালাম

 

উদ্বাস্তু

অ থেকে অজগর সাপটির বেরিয়ে আসা সময়ের অপেক্ষামাত্র
দীর্ঘ বিরতির পর মোরামের রং একথা জেনেছে
বর্ণপরিচয়ের পাতাগুলো এবার অন্তত একটু নাশকতামূলক হয়ে উঠুক
কাঁঠালের গন্ধ গায়ে মেখে ভোরগুলো স্বয়ংক্রিয় অভিযানের দিকে দু-পা বাড়াক
অপরিণত পেনড্রাইভে তুমি যে শরণার্থী শিবিরের খসড়া লুকিয়ে রেখেছো
হঠাৎ হয়ে যাওয়া অনাগরিকরা তাতে কিছু ভাইরাস
ঢুকিয়ে দেবার কথা ভাবছে

 

বনবিবি

বেপরোয়া সাবান ফেনাগুলো যখন আরও মন্ত্রমুগ্ধ
আবহবার্তা থেকে ক্যালেন্ডারের লাল ছোপ মুছে যায়
ছুটির কাড়া-নাকাড়া নিভিয়ে দিয়েছি এভাবেই ফুঁ দিয়ে
রোমন্থন বলতে এখন হেতালকুচির মুখে নুনজল মেলে ধরা
আর শাড়ির রোদ থেকে উদাসটুকু তুলে নিয়ে
ভাতঘুমে মিশিয়ে দিচ্ছি কন্ডিশনারের নীরবতা

বৃন্দাবনী সারঙের ঝোপ আজ সেখানে দুলছে
পাগল বুকের ওঠানামায়

 

মিডনাইটস ব্লু

কুইক-হিল থেকে বুটিকের নিরাপত্তা মুছে দিলাম
রঙের থাবায় বসে থাকা কাকটাও
আজ প্রথম তার একা হয়ে যাবার গল্প শোনালো

এই দুঃখবেলায় কোনো চোরাচালানের গল্প নেই
নিষেধ না-মেনে চলে যাওয়া এপিসোডও

নাইটিপর্বের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে হাতেনাতে

অসফল ডিভানের শৃঙ্গারনাচ
আর পিয়ানোবাদনের নিশিগুলো আপলোড করে

 

শান্তিময় মুখোপাধ্যায়

জন্ম : ১৯৫৬, মুর্শিদাবাদ

আটের দশকের অন্যতম কবি শান্তিময় মুখোপাধ্যায় বাংলা কবিতায় এক নতুন টেক্সচারের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর কবিতা আসলে জীবনের মধ্যে খুঁজে চলা এক অনাবিষ্কৃত বিমূর্তলোক। যেখানে শব্দরা ধ্বনি আর ধ্বনি সুরের মূর্ছনায় পুলকিত।আর মগ্নতার শরীর বেয়ে স্বেদ গড়িয়ে নামে পায়ের পাতায়। বহরমপুর থেকে একদা প্রকাশিত ‘রৌরব’ পত্রিকার থিঙ্কট্যাঙ্ক এই কবি মনে করেন কবিতা আসলে এক না শেষ হওয়া জার্নি। ভালোবাসার রিবন সেখানে খুলে রাখে বিস্ময়-কোলাজ। মূহুর্তের প্রতিচ্ছবি দরবারি কানাড়ার সুরে সম্মোহিত করে পাঠককে। কবি লেখেন “ক্ষতচিহ্ন বুকে যে পাশবালিশ তোমার পাশে শুয়ে আছে/ তারও কোনো রাত্রি ছিলো একদিন”। লেখালিখি শুরু সেই স্কুল জীবন থেকেই। সত্তরের উত্তাল দামামা যখন শিকল ভাঙার নির্ঘোষ দিচ্ছিল। পরতে পরতে কবি জড়িয়ে যাচ্ছিলেন উন্মাদনার চক্রব্যুহে। তখন থেকেই তাঁর তথ্য ও পরিসংখ্যান ভিত্তিক প্রবন্ধগুলি বহুজনের নজর কেড়েছিলো। বহু পত্র-পত্রিকা সম্পাদনের সাথে যুক্ত থেকেছেন নানা সময়, নিজেকে আড়ালে রেখেই। তন্ত্রশাস্ত্রের রহস্যময় পরাবাস্তবের সাথে বাংলা কবিতার সমন্বয় নিয়ে তাঁর ভাবনাও বেশ উল্লেখযোগ্য। কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতক কবি দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। খুব কাছ থেকে দেখা মৃত্যুমিছিলের মধ্যেও সংগ্রহ করেছেন অপুষ্টিজনিত জীবনের অঙ্কুরোদ্গমগুলো — ” খানিক বাদেই মেডিকেল কলেজের কার্ণিশ ঘেঁষে ফুটে উঠবে/ অনিতার মেয়ের চেয়েও ফুটফুটে আন্ডারওয়েটের চাঁদ ” আবার কখনো জিরো ওয়াটের স্বপ্ন জ্বলে উঠতে দেখেছেন ৪২ নং কেবিনে।এই কবিতাযাত্রার সূত্রপাত আমরা দেখেছি আশির দশকের একবারে গোড়া থেকেই।

প্রকাশিত কবিতার বই:

শীতের মাতৃসদন
অনুশীলনপর্ব
খোসাকাল
অসমাপ্ত রিহার্সালরুম
অপঠিত জলপাইলিপি
স্মৃতিশহরে রোমিং

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।