মনিকা আহমেদের গুচ্ছ কবিতা

ন হন্যতে

বললে, তুমি কী রোমান্টিক!
আমি বললাম, রোমাঞ্চকর…
তুমি সশব্দে হাসলে। বললাম, তুমি তেতুঁলগাছের ভুতুড়ে হাওয়া। তুমি বললে, ‘হ্যাঁ, তাই তো আমি বুড়ো বটগাছটার শেকড়ে শেকড়ে স্রোতের ছলছলানি’ কিন্তু
তুমি অন্যরকম, তুমি পারমিতা– ‘ত্বমসি মম জীবং’…
দার্জিলিং এর ঘুম স্টেশনের ট্রয়ট্রেন। ঝমঝম শব্দ তুলে হঠাৎ দূর পাহাড়ে হারিয়ে যাও…
পাহাড়! হ্যাঁ পাহাড়ই আমার জীবন । জীবন এক বহতা নদী । নদীর ঢেউগুলো সময় হয়ে ভেসে যায়..
সময় গুলো দৃশ্যের ভেতর ঢুকে পরে। দৃশ্যগুলো চোখের ভেতর ঘুড়ি হয়ে ওড়ে। নাটাইটা তোমারই হাতে।
তুমি সুঁতো ছেড়ে দাও..
ঘুড়ি উড়ে উড়ে দূরে গিয়ে ছবি হয়ে যায়। ঘুড়িকে আর ঘুড়ির মত মনে হয় না। দূরের তারার মত, মেঘের মত, নক্ষত্রের মত ছোট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যায়।
হঠাৎ একদিন সুঁতোয় টান লাগে।
দূরের ছবিগুলো একটু একটু কাছে আসে। ছবির ভেতরে দৃশ্য ভেসে ওঠে । কত মুহূর্ত ।
তারার মতন জ্বলতে থাকা একেকটা ছবি মনে করিয়ে দেয়, একদিন ছিলাম খুব! একদিন আকাশে উড়েছিলাম । উড়ে গেছিলাম কোন্ সে দূর…
নিবিড় বসেছি পাহাড়ের উঁচু গিরি পাথরে।
দৌঁড়ে নেমেছি খাঁদে,
অন্ধকারে..
জীবন তবুও রোমাঞ্চকর। আজও তুমি ‘বুড়ো বট গাছটার শেকড়ে শেকড়ে স্রোতের ছলছলানি’ আমি ঘুম ষ্টেশনের ট্রয়ট্রেন। ঝম ঝম শব্দ তুলে পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে যাই, নিবিড় গিরি পথে…

 

কৈশোর

ছেলেবেলায় একটা অদ্ভুত শখ ছিল,
চুপচাপ উঁচু কার্নিশে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা
ভিতু চোখে বহুদূরের হলদে বাতিটির নীচে
নিজের ছায়া দেখে ভয়ে বুক কাঁপতো, তবু
ছায়ার সাথে এই চেয়ে থাকাই ছিল প্রিয় খেলা।
এখনও মনে মনে পা ঝোলাই, পা দোলাই, ভয় ফুরিয়ে গেছে
মনের ভেতরেটায় ইট সুরকির বড় দালান গজিয়েছে।
কোণের সেই কার্ণিশে হেলান দিয়ে নগরের মানুষ দেখি, পথ দেখি
নামতে ইচ্ছে করে না এ মহাজগৎ অন্ধকারে
পা ঝুলিয়ে কার্ণিশেই শুয়ে পড়ি । ঘুমোই ইটের পাজরে।
মাঝে মাঝে আমারও বুকে ব্যথা করে
মাঝে মাঝে ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে ।

 

পারিজাত বাবা সারথি মা

বাবা, তুমি জানো তো? বাবা দিবস বলে আমার কাছে কিছু নেই
আমাদের আকাশ বাড়িতে তুমি আলো হয়ে আছো।
কেবল জানি তুমি ছাড়া পৃথিবীর সব পথ অন্ধকার
বড় একা লাগে বাবা, আকাশও দীর্ঘ তিমির রাত।
সেই রাত্রি ভেঙে দৃঢ় পায়ে হাঁটি…
বাবা আজও স্পর্শ পাই
তোমার শক্ত– কঠিন হাতে আমার কোমল হাত।
#
মা, তুমি নেই বলে পৃথিবীর সব নদী শুকনো খট খটে।
পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ মাটি যার নেই,
এক জীবনে নিজের অস্তিত্ব ছাড়া তার আর কি আছে?
এ পোড়া অস্তিত্বের কাছে যদি কেউ ভালোবেসে দাঁড়ায়,
দ্বিধাহীন জানি,
বেঁচে থাকা কত আনন্দের; অসুখেও সুখের ঘুম
জল-মাটি-আকাশ-দুচোখে দেয় আনকোরা বারুদের ওম।

 

ঘুম

ভীষণ অভিমান হলে
পৃথিবীর ওপর ক্ষোভ বাড়ে
অভিমান বাড়তে বাড়তে হিমালয় সমান বিরক্তি;
একটানা বৃষ্টির মত বিরক্ত বেড়ে বড় হলে
বরফ জমাট ক্ষোভ বিদায় ঘন্টা বাজায়
সবুজ বাতিটি নিভে যায় ।
গিরিপথ চিনে বেরুবার উপায় নেই যদিও
পাশাপাশি জেগে থাকে অন্ধ চোখ।
অনেক দূরে একবিন্দু আলো; উত্তাল ঢেউ…
ডেকে যায়– হেঁটে যায়– অথচ,
চোখে কি ভীষণ নিরুত্তাপ ঘুম ।

 

দূরত্ব

তুমি যখন চুপ হয়ে যাও তখন চুপচাপ তোমাতেই কথা জমাতে ভালোলাগে । আমি কথা জমাতেই থাকি । তোমার না বলা কথাও সশব্দ কথা হয়ে আমার কানে পৌঁছায় । তোমার সেই তীব্র অভিমানের প্রতিটি শব্দও আমার ভালো লাগে। কখনও মান ভাঙানোর গান গাইতে পারি না। ওসব ভণিতা আমার ভাল্লাগে না। সব কথা কেন বলতে হবে! কথারা প্রজাপতির মতন আমাদের পাশেপাশেই হাঁটে, আমি টুপটাপ কথার প্রজাপতি জমাই। অনেকদিন কোনো কথা না বলে পাশাপাশি হাঁটতেই আমার ভালোলাগে। আমাদের না বলা কিছু কথা জমুক না। জানি তুমি অভিমানে ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকো, এত অহংকার! কিন্তু মান ভাঙানোর গান সত্যিই আমার ভালোলাগে না। গাইতেও সুর লাগে, আমার যে তাও নেই । বরং অপার হয়ে তাকিয়ে থাকি, তোমায় দেখি। কথা না বলেও তো অনেক কথা বলে যাই আমি। তোমার হাসি, ভ্রুক্ষেপহীন চাহনী, নীরবতার ভাষা, কফি মগের শব্দ, যে কথা আমার তা অন্য কাউকে বলে যাও যখন, কিংবা একা একা আকাশ দেখে, যা বলো মেঘের কাছে, সব সব আমি বুঝি। কিন্তু আমার? আমার নিঃশব্দ কথারা যে তোমার পাশেপাশে অজস্র স্রোতের মতোন, শঙ্খ ধ্বনি হয়ে বাজে, অস্থির অপেক্ষা করে, বোঝো?
বোঝো না। জীবন এভাবেই বোঝা বা না বোঝার গড়মিলে হাঁটে… দূরত্ব বাড়ে। বেড়ে বেড়ে সমুদ্র হয়। স্রোতের তোড়ে সমুদ্রের এক তীরে আমি অন্য তীরে তুমি, আমরা স্রোত জমাই । হুহু শব্দে বৃষ্টি পড়ে। বাতাস, সে কী তীব্র বাতাস। বুকের ভেতর শব্দ বাড়ে। তোলপার বাড়ে। আমাদের না বলা কথারা বাতাসে সশব্দে ভেসে বেড়ায়। আমরা দূরবর্তী সমুদ্র হয়ে তাকিয়েই থাকি। এই চেয়ে থাকা জীবন ভালোলাগে। সব বলতে নেই। সব শুনতে নেই। আমাদের না বলা, না শোনা শব্দ, বুকের ভেতর তোলপাড় করুক না! ক্ষতি কি?

 

মনিকা আহমেদ

জন্ম, খুলনায়। শেকড়, চট্টগ্রামে। বড় হওয়া, ঢাকায়। বই ও সাহিত্যের প্রতিটি শাখা তার প্রিয়। ভালো লাগে মানুষ ও প্রকৃতি । জীবন দর্শন: গৌতম বুদ্ধ। কাছের, দূরের মানুষকে শুদ্ধ সৃজনশীলতা, সুন্দরের হাত ধরে মননশীল চর্চায় অনুপ্রাণিত করার দায়িত্বশীলতাই তার কর্ম দর্শন । আজন্ম ভালোবাসা, কবিতার সাথে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।