জাহানারা পারভীনের একগুচ্ছ কবিতা

হন্টন

কুড়িয়ে আনা পাথরের গা থেকে
আলাদা করি রোদের ছায়া
বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের মায়া..

পাথরের ছায়াও পথ আগলে দাড়ায়
নূপুর থেকে খসে পড়া নাচের মুদ্রা
জড়াই পায়ে।

পা তুই কোথায় যবি যা!

 

কাকতাড়ুয়ার মুখ

উঠোনে উঠোনে শুধুই প্রস্থান;
ছাপ রেখে যাওয়া পায়ের প্রতিভা
চৌকাঠে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি
কথা ছিল কলাপাতায় আঁকব পিকাসোর মুখ;
তাহিতির মেয়েদের হলুদ হাতের নমুনা…

উঠোনে একে রাখি কাকতাড়ুয়ার মুখ
হলুদ ধানক্ষেতে দাড়িয়ে থাকে, একা…

 

অপরাধ

এক চিলতে বারান্দার দোতলা বাড়ি
বাড়িতে আসা-যাওয়া দখিন হাওয়ার
আর আসত চড়ুই।
ছানাপোনাসহ চড়ুই মা শিকার করতেন কখনো কখনো।

বন্ধ দরজা, জানালা, ঘুলঘুলি
পাখিদের ছুটোছুটি, আর্তচিৎকার
এখনো মনে আছে মায়ের নিষ্ঠুরতা।

শিশু সন্তানের পাতে মা তুলে দিতেন পাখি-মাতার মাংস
যার সন্তানেরা তার জন্য অপেক্ষমাণ নিকটবর্তী গাছে

বাড়ির গ্রিলে বসা চড়ুইয়ের কাছে তাই
ক্ষমা চাই আমার মায়ের অপরাধের।

 

প্রতিটি মানুষই ব্যর্থ সহিস

রোলটানা পাটিগণিতের খাতা
তোমার কাছেও আছে কিছু ঋণ

কবে কোন ছুটির দুপুরে কাঁঠাল মুচিকে দেখিয়ে নখের ক্ষমতা,
কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি কুড়ানো লাল দিনে, কোমল কেশরে যুদ্ধ
বাধাতে বাধাতে তোমার বুকে কাটা একটি দুটি আঁচড়।

অন্তমিলে সাজানো কিছু খসড়া আবেগ, প্রাথমিক তুষ,
শব্দের দিয়াশলাই নিজ হাতে ছোড়া পেন্সিলে
আঁকা খড়ের গাদায়, স্বরচিত আগুনে পোহানো
শীতের উত্তাপ। চোখের সঙ্গে জাগিয়ে রাখা তোমাকেও।

তোমার শরীরে জমা ধুলোর প্রলেপ মুছে দিতে দিতে দেখি
নিজের সব চেহারা একসঙ্গে ভেসে ওঠে মলাটের আয়নায়।

তবে কি প্রতিটি মানুষই এক একজন ব্যর্থ সহিস!

 

শহরের অভিধান

অবশেষে জেনে গেছি সেই শহরের নাম,
যেখানে জুতো পায়ে প্রথম হেঁটেছে মানুষ;
মেলেনি জুতো ও পায়ের মাপ..

মৌলভীর পকেটে পাওয়া ট্রেনের টিকেট
সেখানে নেই যাত্রীর নাম, আসন নাম্বার
চেনা ষ্টেশনে চায়ের লিকারের গাঢ় ঘুম
পানের পিকের মতো ছুড়ে দিলে দেয়ালে…

সারল্য ছাড়া তার কোনও অপরাধ নেই
শহরের ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে সেও জেনে যায়
সেদ্ধ ধানের পিঠে জন্মানো গাঢ় তিলের অপরাধ

 

প্রহসন

পাল তোলা জাহাজে ধানের বীজ জড়ো করে
ভেবেছি চলে যাব কোথাও
কৃষকেরা নিশ্চিত নয় এগুলো বীজধান, নাকি চিটেধান….
অথচ ফসল ফসল করে সারা আশ্বিন দাড়িয়ে থেকেছি মাঠে
অপেক্ষা এমনই…
মেঘের মুখোমুখি দাড় করিয়ে রাখে বৈশাখের পর্বত
কখনও কখনও উচ্চতাও অপরাধ এক
গজ ফিতায় মেপে রাখে সব অসুখের দৈর্ঘ্য

চিটেধানসহ জাহাজ ডুবে গেলে নদীতে
আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ে বীজধানের বৃষ্টি…
হুদহুদ পাখির পালক

 

জাহানারা পারভীন

জন্ম, ৩০ মে ১৯৭৫, বাংলাদেশ। পেশা, সাংবাদিকতা। কাজ করেছেন দেশের মূলধারার জনপ্রিয় গণমাধ্যমে। কাজ করেছেন মুক্তকণ্ঠ, ভোরের কাগজ, চ্যানেল ওয়ান, সিএসবি নিউজ, এটিএন নিউজে। এখন বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে আছেন চব্বিশ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট নিউজে।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : নোঙরের গল্প বাঁচাচ্ছি (২০০২), নিদ্রা সমগ্র (২০০৫), মা হাওয়ার সন্তান (২০০৯), জলবৈঠক (২০১০ )। প্রবন্ধ : রিলকে নৈঃশব্দ্যে ও নিঃসঙ্গতায়, এবং এলিয়ট (২০০১৬)।

কবিতার জন্য পেয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃত্তিবাস পুরস্কার ২০১১জাতীয় কবিতা পরিষদের শামসুর রাহমান সস্মাননা (২০০৭ ) শব্দগূচ্ছ পুরস্কার (২০১২)ছোটকাগজ চৈক্রসংক্রান্তি সম্মাননা (২০০৭)।

 

Facebook Comments

One Comment

  1. বোরহানউদ্দীন ইউসুফ

    নান্দনিক কথার গাঁথুনি দিয়ে চিত্রকল্প ও বোধের ভিন্নতা তৈরি কবি জাহানারা পারভীনের সহজাত দক্ষতা। পাঠককে সাবলীলভাবে বিষয়বস্তুর গভীরে নিয়ে যেতে পারে, কোন জবরদস্তী নেই কিন্তু আছে মায়াবি টান। শুভ কামনা প্রিয় কবির জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।