মানিক বৈরাগীর গল্প: ইঁদুর

সেমি পাকা দেড় কামরার কলোনিতে রোজিনার সংসার। রোজিনা কর্মজীবী। একটি কেজি স্কুলে পড়ায় আর টানাপড়েন সংসারের হাল ধরতে গিয়ে টিউশনিও করতে হয় তাকে। অবসর কি সে জানেনা। ঘরের বদ্ধ হাওয়ার একঘেয়েমি কাটানোর জন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবা তার কাছে বিলাসীতা। রোজিনা নিরলস এক সংসার যোদ্ধার নাম।

রোজিনার স্বামী ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লিখে। অদ্যাবধি চর্চাটা ধরে রেখেছে। প্রবাদ আছে ঢেঁকী স্বর্গে গেলেও ধান ভানে-তার অবস্থা অনেকটা তাই। কিছুটা পরিচিতি-কবি খ্যাতি যে তার নেই, তা কিন্তু নয়। তবে তা দিয়ে তো সংসারের ডাল-ভাত যোগাড় হয়না। এক সময়ের তুখোড় রাজনৈতিক কর্মী আজ অফলা বৃক্ষের মতো হতাশ। ঘুণে ধরা সমাজ বদলের বিপ্লবে যোগ দিয়ে, বদলে গেলো নিজের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। মাথায় হুলিয়া নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ঠাই হলো কারাগারের চার দেয়ালের ভিতর। কি এক দুর্বিষহ জীবন ভাবতেই এখনও সে শিওরে উঠে।জেল থেকে যখন ছাড়া পেল,দেখে কতকিছুই বদলে গেছে; বদলে গেছে রাজনীতি,বদলে গেছে পরিচিত মানুষের মুখ।কেবল বদলায়নি সেই সনাতনী সমাজব্যবস্থা। তখনও তার অন্তরে রাজনীতি এবং আদর্শের জ্বলজ্বলে পোষ্টার আঁকা ছিল। কিন্তু কেন জানি রাজপথ তাকে আর টানল না। অতএব রাজনীতিকে ইস্তফা দিয়ে কবিতায় হলো আরও মনোযোগী।

বর্তমানে কবিতার নামে কবি নামে সমাজে পরিচিত। তার আর কোন কাজ নাই।সারাদিন বাসায় বসে বসে কি সব লিখে, আর স্থানীয় পত্রিকায় তা ছাপে।স্থানীয় পত্রিকায় অত খবর কোথায়,খালি পাতা পূরণ করতেও তো কিছু একটা দরকার। আর বিজ্ঞাপন নাই বললেই চলে। যখন কোন বিজ্ঞাপন ছাপে সেদিন তার লেখা ছাপে না এ রকম।

কবি বিকালের বিলাসী বিশ্রামে কাঁথা মোড়ে আধো ঘুমে আধো জাগরণে বারান্দার মেঝেতে শুয়ে আছে।

গায়ের উপর ভারি ওজনের তুলতুলে কি একটা নড়াচড়া করছে। আর আর শুকনো ছোলা ভাজা চিবানোর মতো কুটকুট শব্দ হচ্ছে।

কবি বিরক্তির চোখে তাকায় এদিক ওদিক কিছুই নজরে আসেনা। তাহলে শব্দটা আসছে কোথা হতে।

কবি ভাবতে থাকে, আলস্যের কারণে শোয়া থেকে উঠছেও না। এমন সময় তার পায়ের সাথে শীতল লোমশ কী একটার স্পর্শ পেলো। কবি ভয়ে শুয়া থেকে উঠে বসতেই বিড়াল সম একটা ইঁদুর বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে আছে কবির দিকে।

যেহেতু এসব তাকানিতে কবির পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে গোপন রাজনীতির। সে কারণে পাত্তা না দিয়ে ইঁদুরটিকে তাড়িয়ে দিলো।কবির অবশ্য অতীত রাজনীতিতে মনুষ্যের প্রতি যেমন ভালোবাসা ছিলো, তেমনি প্রকৃতির অপরাপর সৃষ্টির প্রতি ছিল অগাধ মায়া। কবি ইঁদুরের নিপুণ কাঁথা কাটার শৈল্পিক কর্ম দেখে ইঁদুরের শিল্পমেধার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কবির আবার সেই ফেলে আসা রাজনীতির শুঁয়োপোকা মাথার সুপ্তকোষ থেকে চিরিং বিরিং করে বেরিয়ে এলো। ইঁদুরের কাঁথা কাটার নিপুণ কৌশল দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ভাবতে লাগলো যে কারণে মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজী রেখে অংশ নেয়া দেশ স্বাধীন করা। তারপর রাতারাতি সমাজতন্ত্র কায়েম করতে শ্রেণী শত্রু খতমের গোপন রাজনীতি, কারো কারো দ্বারা রাতারাতি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি, আওয়ামীলীগের নেতাদের লুটপাট, তারপর স্বাধীন বাংলার স্থপতিকে হত্যা, সব এক এক করে ভাবতে লাগলো। অযোগ্য লোভী দুর্নীতিবাজ আমলা ও এমপি নেতার কারণে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতিকেই বেহাত করে দেয়া। তারপর বাংলাস্থান হয়ে যাওয়া এসব ভাবতে ভাবতেই রোজিনা এসে হাজির।

ভাবনার অনন্ত জগতে নিমজ্জিত কবি বুঝতেই পারল না কখন রোজিনা বাসায় ঢুকে পোশাক পরিচ্ছদ পাল্টে ফ্রেস হয়ে এলো। রোজিনার ডাকে কবি সম্বিৎ ফিরে পায়।
রোজিনা -কমরেড কবি কোন জগতে ছিলো এতক্ষণ? এভাবে ধ্যানগ্রস্থ থাকলে চোর তো দেউলিয়া করে ছাড়বে। আহা, যদি তুমি এভাবে দু’মিনিট আমার কথা ভাবতে, তাহলে সারাদিনের ক্লান্তি যেত মুছে।

কবি ফিরে আসে বাস্তবতায়। জানো রোজী আস্ত একটা ইঁদুর আমার ঘুমঘোরে কাঁথার ভেতর ঢুকে পড়ে। ইঁদুরটি এতো সুন্দর করে কাঁথা কেটে কেটে কি করেছে দেখো। এটিও একটা আর্ট।আসলে ইঁদুরের শিল্পবোধ মন্দ না।
রোজিনা –রাখ তোমার শিল্প! টানাটানির সংসারে একটা জিনিস নষ্ট হয়ে গেল,আর তুমি কিনা সেখানে শিল্প খোঁজ?
শোন রোজী, রাষ্ট্রীয় ইঁদুরেরা তোমার পার্টিকে এভাবেই কেটে কেটে রাষ্ট্র ও রাজনীতি দুটোই ধ্বংস করে দিচ্ছে। আজ রাষ্ট্র-সংসদ-মন্ত্রণালয়-রাজনীতি সব অদৃশ্য ইঁদুরের দখলে। আমরা তাদের চিনি, কিন্তু তারা দিনে দিনে এতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, তারা এখন আর বিড়ালকে ভয় করছে না।

কবির কথা শুনে রোজী শব্দ করে হাসলো। বিয়ের পর থেকে রোজীর এরকম হাসি খুব কমই দেখেছে কবি। রোজী বললো, রাষ্ট্র কাটুক, রাজনীতি কাটুক তাতে আমার কি?
শুনো, তোমার যে একদম কিছুই না তা সঠিক নয়। তুমি-আমি তো রাষ্ট্রেরই অংশ।জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র হয়না। একটি রাষ্ট্রের জন্যই তো জনগণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তুমি তো জান আমার বাবাও একজন মুক্তিযুদ্ধা। একটি স্বাধীন দেশের জন্যে কতো ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু পঁচাত্তরের পর পুরো দেশের চিত্রটাই বদলে গেল।মুক্তিযোদ্ধারা হয়ে গেল অপাংতেয়, আর নব উত্থান ঘটল রাজাকারদের। দেশটাকে তারা ইঁদুরের মতো কুটে কুটে খেলো।

রাজাকাররা দেশ কুটে কুটে খেয়ে ফেলুক, ইঁদুর বেডশিট কুটে কুটে শিল্প বানাক তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। তোমার ভালোবাসা না কাটলেই হলো।

রোজিনার কথা শুনে কবি চোখ তোলে তাকালো। তার চোখে যেন শত-শতাব্দীর বিস্ময়।

 

মানিক বৈরাগী

কবি, নব্বুইয়ের নির্যাতিত প্রগতিশীল ছাত্রনেতা
জন্ম: কক্সবাজার, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা– গহীনে দ্রোহ নীল; শুভ্রতার কলঙ্ক মূখস্ত করেছি; নৈনিতালের দিন; শের-এ মানিক বৈরাগী; মৃত্যুর গান গাই।
শিশুতোষ গল্প– বন বিহঙ্গের কথা; ইরাবতী ও কালাদান ও  তড়িৎ বার্তা     
[email protected]

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।