হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারটি কবিতা

দিগন্তে শুকতারা

মেঘলা দিনের দুঃখ মাথা ছাড়িয়ে
একবারে আকাশ ধরে ফেলে
আর তখনই চোখে পড়ে যায়
মায়ের রেখে যাওয়া সবুজ নদী
গতকাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল
আজ সকালে সে জল সাদা রঙে অন্য ঘরে
সারাজীবন যে জল গুছিয়ে রেখেছে মা
আজও তার সমীকরণ সকলের কাছে অপঠিত ।

উঠোনের ধান ভারতের ম্যাপের মতো
সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে
একটু একটু করে গাছের গা থেকে সরে যাচ্ছে আলো
ভালো করে ধান পড়া যায় না
উপোসী দিনের মতো মেঘলা সকাল
হাত পা ছড়িয়ে সারা বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে আছে

মায়ের রেখে যাওয়া অঙ্ক
রোজ নদীর কাছে নিয়ে যাই
আমি ঘুম থেকে ওঠার আগেই নদী হেঁটে গেছে পাড়া
রোজ মাটিতে গর্ত খুঁড়ি আর বলি— ভুলে যাব ঘুম
কতদিন গাছের দিকে তাকাই নি
মন থেকে কোথায় হারিয়ে গেছে বন্ধুর চোখ
নদীজল এ চোখ তো নেবে না
এ চোখে ঘুম ছাড়া আর কিই বা মানাবে

সকাল মানে নদীর উৎসপথের উল্লাস
দুপুর মানে ক্ষণে ক্ষণে পাহাড় ভেঙে বাঁকে বাঁকে
বিকেল মানে আলপথ ধরে রাখালিয়া বাঁশি
সন্ধে মানে জল ছড়িয়ে চাঁদঘরে খোয়াইয়ের পাড়

মা, তোমার নদীজলে পায়ে পায়ে আসি
দেখি এখনও কত দূরে জল
সব হাঁটা তুলে ধরলে পৌঁছে যেতাম যেকোনো দেশ
তবুও এপথ হয় নাকো শেষ
দিগন্তে তাকিয়ে দেখি শুকতারা— বসে আছে মা ।

 

জানলার পাঠশালা পৃথিবীতে

সূর্যের ভেতর আলোটা জ্বলে উঠতেই
বন্ধ হয়ে গেল অসংখ্য চোখের দরজা
খিড়কি পুকুর থেকে চেনা পথে
অচেনা গলায় কে যেন ডেকে উঠল
গ্রামের হাটবারে কিছু মাটি মুখের সঙ্গে
হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া শান্তির মতো
সেই ডাক কাউকে কিছু না বলে শোবার ঘরে
আমি তাকে জানলা দেখিয়ে দি
শুধুমাত্র জানলা আছে বলেই
লেবুপাতার গন্ধে আমাদের ভাব হল

হ্যারিকেনের আলোয় মাটির দুয়ারে
দুলে দুলে নামতা পড়ার মতো সকাল আসে
সামান্য শুশ্রূষাতেই অক্ষর উঠে এসে দাঁড়ায়
অনেকেরই তখন পাড়হীন সমুদ্র দেখার মতো আতঙ্কে
অক্ষরের আয়নার সামনে দাঁড়াতে পা কাঁপে

ডাকের ভয়ঙ্কর কম্পনে
দরজা জানলা সব খুলে খুলে পড়ে
বেরিয়ে পড়ে অন্ধকারের অগণন গুহা
পৃথিবীর অনেকটাই দেখা হয়ে গেছে বলে যারা
সাতসকালেই তাঁবু গুটিয়ে নিয়েছিল
তারা এখন কসাইয়ের শীতল চোখের চক্রব্যুহে বন্দী

শুধু জানলা দরজার সম্পদে
ভোরের গঙ্গার শীতল হাওয়ার মতো
জলকথা নিয়ে ভেসে আসে ডাক
নাই বা সবাই সরলরেখার দৌড়ে থাকল
তবুও চোখ জানলার পাঠশালা পৃথিবীতে
ছড়ার ছন্দে দুলে দুলে যাক ।

 

একান্নবর্তী পরিবার

আয়নার ভেতর চোখ পড়তেই দেখি
একটা চোখ পুড়ে গেল
আর একটা চোখের সঙ্গে গলা মেলালো
প্রায় এক হাজার মানুষের গলা
গত বর্ষায় যারা ছাদ হারিয়েছে
গাছের নিচে বছর কাটিয়ে তারা হাত তুলতে শিখেছে

সমুদ্রের হাওয়ার মতো ভেসে এলো একটা কোলাহল
কোথাও যেন কেউ ঘা খুঁটছে
ওপরের চামড়ার পর্দা সরে যেতেই
প্রবল বেগে বেরিয়ে এলো রক্ত
আমারই দেহের ভেতর থেকে উঠে আসা হাওয়া
তবুও তাদের উৎসপথ না চেনায় বড় অচেনা

বৃষ্টিফোঁটার মতো একে একে জড়ো হয়
হারানো সবুজ ফিরিয়ে আনা পাতার বন্ধু শাসক
সূর্য এখন প্রাত্যহিক পাঠশালার মাথার ওপর
গরম শুরু হয়ে গেছে শিকড়ে শিকড়ে

বিন্দু বিন্দু চাল সিন্ধুর ফুটন্ত জলে এসে পড়ে
একটু হাত পা নাড়াচাড়া করলেই দেখা যাবে
হাঁড়ির মুখে ভাতের ফ্যানের মিছিল

বটপাতার নিচে খেতে বসবে একান্নবর্তী পরিবার ।

 

সরলরেখা থেকে দূরে

সরলরেখার কাছ থেকে যতবার সরে যাই
ছিটেবেড়ার গা থেকে খসে পড়ে মাটি
বাতাসের গায়ে অনেকক্ষণ উড়েও
উপেক্ষার মতো দেওয়াল ছেড়ে দেয় তার যাবতীয় রঙ
সন্ধ্যের আলোয় কে যেন জল ঢেলে দেয়
দিনের বর্ণমালায় অভ্যস্ত পাখিদল
কালো রঙে ভয় পেয়ে
কক্ষচ্যুত নক্ষত্রের মতো ধরা পায় অন্ধের হাত

বন্ধ ঘরের বৃত্তে চেনা নামতায় দক্ষ
অগণন মুখস্থ মুখ
জানলা খুলে দেখে নেয়
এখনও ঠিক কতদূরে ঘুমিয়ে আছে আলোজাল

ধুলো পথে জেগে আছে কত কত সূর্য
দু’হাত সাজানো আলোচালে
সরলরেখা ধুলোপথে হেঁটে যায় সারাটাদিন
খাতার পাতায় বারবার লিখি শূন্য
তবুও শূন্যের গন্ধে এখনও ডোবেনি নাক
বুকের দিঘিজলে ফোটেনিকো ঢেউফুল

গাছ থেকে ভেঙে গেলে জল
বোঝা হয়ে ওঠে মরুভূমি
খসে খসে পড়ে ঘরবাড়ি
শৃঙ্খলার নদী গতিপথে বাধা পায় বাঁধে
চেয়ে দেখি নির্জন সরলরেখায় ঘুমিয়ে দুপুর
দূর দেশে একা একা শুয়ে থাকি মরুদেশে।

 

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় 

জন্ম ১৯৬৭ সালের ২ জানুয়ারি ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলী জেলার ধনিয়াখালি গ্রামে। লেখালিখির শুরু খুব ছোটবেলা থেকেই। পেশায় গৃহশিক্ষক হলেও সাহিত্যই চব্বিশ ঘণ্টার ধ্যানজ্ঞান।

প্রকাশিত গ্রন্থ- তুমি অনন্ত জলধি (কবিতা), বিমূর্ততার অনন্ত প্রবাহে (কবিতা সংক্রান্ত গদ্য), দু এক পশলা মান্না (ছড়া), চার ছক্কায় শচিন (ছড়া)।

সম্পাদিত পত্রিকা : ছায়াবৃত্ত, কাটুম কুটুম।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।