মেঘ অদিতির কবিতা: একটি হননের স্বপ্নদৃশ্যে

আকাশে এখন এই জল ভরা আলো
আর সমস্ত কিছুর মাঝে ভাঙচুর…
এত পাখি ওড়া বিভ্রম… আহ গাইজেস!
কোথা থেকে ভেসে আসে হ্রেষা
কত দূরে বন! বাতাসের অভিলাষী ঘ্রাণ
মনে হয় খুব কাছে ব্রতচারিণীর ঢঙে
ছেয়ে আছে আজ অবিশ্বাসী পিপুলের পাতা…

তবু এ গল্পের শেষ এখানেই নয় —
কেন না শূন্যে এখন
মুঠো খুলছেন নিয়তি ঠাকুর
আজ রাতে মরে যাবে প্রেমিক ক্যান্ডুলেস
ইতিহাসের পাতা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে গাইজেস

মনে পড়ে নক্ষত্রের বন!
কীভাবে এতটা পথ এলে?
ব্যথা খুব?
বলতেই শোকাতুর চোখ দুটো
অন্ধকার হয়, বিবাহ রাতের নামে
আকাশের মরে আসা চাঁদে
আবার গ্রহণ লাগে
বিলুপ্ত মুদ্রার ঢঙে কোথা থেকে
ভেসে ভেসে উত্তর আসে, কত আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হব?

অপেক্ষা এখন সোজা নিচে নেমে স্থির হয়ে আছে
যেখানে গাইজেস তার রক্তমাখা ছুরি
লুকিয়ে ভাবছে কোথাও লোভের চিহ্ন রইলো না আর…


নিবিড় ঘুমেও ছিল সে…
অথচ—
প্রগলভতা এমন এক লোভ
যা রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুন ছড়ালে
তাকে উস্কে দিতে
সফেদ জমিনে বুনে দিই
আরো কিছু চকচকে অবিশ্বাস
ঘাসের কোণে মুখ থুবড়ে পড়ে
রতিক্লান্ত বাতাস…

তবে?
কোথাও কি পৌঁছাতে চাইছি আদৌ?

এ প্রশ্নে তাগড়াই ঘোড়াগুলো কেশর ফোলায়—
জমিন দাপিয়ে তারা নিপুণ নিশানা গড়ে
আর কথার শরীরে বাজে গোধূলি ব্যালাড

শেষ অবধি গাইজেস এখন
আর কারো নাম নয়
স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার শেষে
শেষ অস্থিটিও তার সকলের সাথে
দূরে ভেসে গেছে..

তবু অবিশ্বাস এমন এক
অতিশয়োক্তির নেশা
যেখানে তর্জনী নাচায় রোদ
আর আগুনের আঁচে
হৃৎপিণ্ডের লাল ঘামে
অল্প অল্প ধোঁয়া জমে

এরপর—বাঁক ঘুরে
করতলে বয়ে যাবে ক্রম ভঙ্গুরতা
শ্বাস নেভা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে যেতে
হঠাৎ পরম বিস্ময়ে একে অন্যকে দেখে নেবে

যার কিছুই আমরা আর জানব না…


অথবা
ইতিবৃত্তের পুনর্দহন
পুরাকালে লিডিয়ার সার্বভৌমত্ব ছিলো হিরাকল গোত্রের অধিকারে। হিরাকল গোত্র মোটামুটি পাঁচশো পাঁচ বছর রাজ্য শাসন করে গেছে। এ ক্ষমতা পরবর্তীকালে ক্রীসাস পরিবারের হাতে চলে যায়। হিরাকল গোত্রের শেষতম পুরুষ ছিলেন ক্যান্ডুলেস। এবং তার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুটির মধ্য দিয়ে হিরাকল গোত্রের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় ক্রীসাস পরিবারের হাতে ।

দেহরক্ষীদের মধ্যে ডাস্কাইলাস পুত্র গাইজেস, ক্যান্ডুলেসের অত্যন্ত প্রিয়। নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ছাড়াও নানা সময়ে ক্যান্ডুলেস গাইজেসকে ব্যক্ত করেন তার ব্যক্তিগত অনুভূতি। এমনকি গাইজেসের কাছে ক্যান্ডুলেস তার স্ক্রীর রূপবর্ণনাও করেন। গাইজেসকে তা প্রত্যক্ষ করতে বলেন। রাজার আদেশ অমান্য করার পরিণতি গাইজেসের জানা। গাইজেস এ আদেশ মেনে নেয়। রাজা তাকে রানীর রূপ প্রত্যক্ষ করাতে শয়নকক্ষে এনে লুকিয়ে রাখেন। এবং রানী তা বুঝে ফেলেন।ঘৃণ্য এ অপরাধের শাস্তি হতে পারে কেবল মৃত্যু। রানী গাইজেসকে আদেশ করে হয় নিজে প্রাণ দাও অথবা রাজার প্রাণ নাও। গাইজেস নিজের প্রাণ রক্ষার্থে প্রেমিক রাজা ক্যান্ডুলেসকেই হত্যা করে। তারপর গাইজেস রানীকে ও সিংহাসন দুইই দখল করে।

ইতিহাস মানে যুদ্ধবিগ্রহ, হত্যা আর লুণ্ঠনের গল্প। ইতিহাস মানে নিজ রাজ্য, পররাজ্য আর তাদের অন্দরমহলে ঘটে যাওয়া বীররস, করুণ-রস গাঁথা। তবু ক্ষমতার হাতবদল, হত্যার নৈমিত্তিকতার নিরাভরণ রূপের কাছে আমরা যারা হোঁচট খাই তাদেরও কেউকেউ উদভ্রান্তিতে ভোগে।

কোনো কোনো রাতে যখন রুধিরবর্ণা চাঁদ ওঠে তখন হিরাডোটাস খুলে দেন তার ইতিবৃত্তের কৌটোর মুখ। চাঁদের লালচে আলোয় চরিত্রগুলো তখন হাসে, কাঁদে, কথা বলে। এক জন্মসুতোর টানে, বিস্ময়ে, শোঁশোঁ হাওয়া ওঠে তখন। প্রেমিকের মুগ্ধ চোখ বেয়ে ঝরে পড়ে ঝুরঝুরে অন্ধকার।

আর প্রতি গ্রীষ্মে রাতের আঁধারে ধবধবে তারাটির মত ওই যে ফুল ফোটে তারই নাম ক্যান্ডুলেস।

মেঘ অদিতি

জন্ম: ৪ মে, জামালপুর। জামালপুরের জল হাওয়ায় শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের শুরুর দিনগুলো কাটলেও পরবর্তীতে পড়াশুনোর জন্য ঢাকায় চলে আসা। এবং এখন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে ঢাকাতেই বসবাস। লোকপ্রশাসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর, এরিনা মাল্টিমিডিয়া এন্ড ওয়েব নিয়ে পড়েছেন। প্রকাশ্যে লেখালিখির জগতে আসেন ২০০৭ সালে। মূলত কবিতা লেখেন। পাশাপাশি গদ্য, গল্পও। এসবের পাশাপাশি ছবি আঁকতে ভালোবাসেন। বর্তমানে ঐহিক বাংলাদেশ নামক সংগঠনের সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন। এবং ঐহিক বাংলাদেশ নামক ছোট কাগজের সম্পাদনা করছেন।

প্রকাশিত বই
জলডুমুরের ঘুম (সাম্প্রতিক প্রকাশনী ২০১২, মুক্তগদ্য)
অস্পষ্ট আলোর ঘোড়া (আগুনমুখা ২০১৩, গল্প)
ও অদৃশ্যতা হে অনিশ্চিতি (সাম্প্রতিক প্রকাশনী ২০১৪, কবিতা)
সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ (ঐহিক প্রকাশনী ২০১৫, গদ্য-গল্প)
প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত (অনুপ্রাণন ২০১৬, কবিতা)
পাখি সিম্ফনি ও ক্যালাইডোস্কোপ (ঐহিক প্রকাশনী ২০১৮, কবিতা)
উপসংহারে অন্য সকাল (বৈভাষিক ২০২০, গল্প)

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।