জিললুর রহমানের পাঁচটি কবিতা

সামনে সমুদ্র বটে

কতো বর্ষা কেটে যায়
কতো সন্ধ্যা হয়েছে আঁধার,
আমার সময় নেই
ঘরে বসে নিরালায় দুদণ্ড কাঁদার।

বুকের ভেতর কতো জমিয়ে রেখেছি
বারুদের ক্ষোভ তাল তাল,
দেশলাই খুঁজে ফিরি
অনন্ত আঁধারে যতো
ঝোপঝাড় বাড়ির চাতাল।

যতোই এগোই পুবে
অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে
যতো যাই মানুষের কাছে,
ততো বেশি টের পাই
সামনে সমুদ্র বটে
তার সাথে সূর্যোদয় আছে।

 

পেপার ওয়েট

পেপার ওয়েট কাগজের বেদনা বোঝে না
চেপে থাকে ভারী বোঝা পাতলা পৃষ্টার ‘পরে
কাগজের বুকের ভেতরে থাকা শব্দগুলো
কতো কষ্ট পুষে রাখে বুকে
কতো কান্না কুঁকরে কুঁকরে মরে কাগজের পাতার ভেতরে
পেপার ওয়েট খুব প্রস্তর সুলভ
কিছুতেই মমতা বোঝে না

কাগজের ভেতরে রয়েছে
উড়ে উড়ে বেড়াবার সাধ
কাগজ কুঁচকে কেউ কতোবার হাওয়াই জাহাজ বানিয়েছে
কতো কাগজের পৃষ্ঠা মুচড়ে ভেসেছে নৌকা জলে
এসব বোঝে না জগদ্দল
অথর্ব নিরেট এই পেপার ওয়েট
পেপার ওয়েট উড়ে বেড়াবার খেয়াল মানে না
পৃথিবীর সমস্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো
চাপা দিয়ে রাখে পেপার ওয়েট

কাগজ জড়িয়ে যদি ধরে ওই পেপার ওয়েট
কাগজের কান্নাগুলো লেপ্টে যাবে
নির্বোধ পেপার ওয়েটের বুকে
তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বুঝি ঢুকতে পারবে ভাষা
সেদিন তবে পেপার ওয়েটের আর কোনো কাজ নেই
কাগজের বেদনাকে নিরন্তর আগলে রাখা ছাড়া

 

মেলে না উত্তর

প্রথম দিনের সেই সূর্য থেকে রবিঠাকুরের কাল শেষ করে
কতো দূর হেঁটে গেছে শতবর্ষ ধরে
মানুষের সরব মিছিল,
আজ সেই মিছিলের লেজের ডগায়
নড়া চড়া করে যাই
বারবার মনে শুধু
একই প্রশ্ন উসকানি দেয়, কে যে আমি!
কোথা হতে এসে
কোথা চলে যাই
প্রতিদিন,
ভবিষ্যৎ আমাদের ভূতের আবর্তে টেনে লয়ে যায়,
কেন জানি নাই…

কতো গালগল্প
যুগে যুগে সবুজ শ্যামল
স্রোতস্বী নহর আর
সুখাদ্য পানীয় ফল ইত্যাকার প্রলোভন
সাথে অপরূপা হুর
পরীতুল্য রমণীর কথা,
জন্ম জন্মান্তরে বলেছে ছলনাকারী।
তার সাথে নরকনন্দনে কতো
বিচিত্র বিভৎস অগ্নিরূপ
বিদঘুটে প্রাণী কিংবা
লকলকে সর্প আর কিলবিলে বিছাদের গান—
কোথাও আমার নেই যথাযথ স্থান
তবু ঠাঁই খুঁজে খুঁজে ফিরি।

জানি লাল নীল কালো গোলাপেরা
একদিন ছড়াবে না ঘ্রাণ
হয়তো নতুন কোনো পুষ্পদল
কিংবা ফুলহীন পাতার বৃক্ষ,
নতুন নতুন করে জন্ম নেবে যেমনটা যুগে যুগে বদলেছে রং,
আকাশের আসমানী ওজোনের রূপটুকু
একদিন ঝরে যাবে।
জানি,
একদিন নতুন কালের গর্ভে মানুষের চিহ্ন থাকবে না
তবু মন আনচান করে
ধুকপুক করে বুক,
এতো এতো কাল চলে গেল
দিবসের প্রথম কী শেষ সূর্য দেয়নি উত্তর কিছু
বারবার মন শুধু প্রশ্ন করে কে রেখেছে
মানুষের এই মিথ্যা নাম

কোকিলের সাথে বেশ কথা হলো বসন্তের হামের আড়ালে,
কথা হলো পরিযায়ী পাখিদের সাথে,
এমনকি বৃক্ষশাখে বসে
যে দোয়েল নিত্য ডাকে তারও প্রশ্ন
ডেকেছে মানুষ সে কে?
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা হাতিদের দল বলতে পারেনি,
বনের গভীরে ত্রস্ত চলা
হরিণ শাবক বলে, আমরা তো জানি
লেজ হারা কিছু দুষ্টু বানর তোমরা,
কেবল অনিষ্ট করো প্রকৃতির…

কোথা থেকে কিভাবে এমন হলো, একথা যে জানতো সে
চলে গেছে মহাকালে হাজার বছর আগে পূর্ণিমার রূপখানি
একবার কাছ থেকে দেখে নেবে বলে,
তারপর ফেরেনি শরতে;
যারা যায় চিরতরে যায়
রূপকথা ছড়াতে ছড়াতে যায় দূরে,
তারপর কোনোদিন দেখা আর পাবে না তো কেউ এই বনে।
রানার তবুও ছোটে
তবু ভোর হয়ে আসে
তবু সূর্য ওঠে পুবে
ভবিতব্য ভূতের নেপথ্যে চলি
আর ভাবি বসে বসে — মেলে না উত্তর . . .

 

পতন

আমাদের চলছে ভীষণ
পতনের দিন
প্রতিদিন কেউ কেউ পড়ে যায়
হাঁটতে হাঁটতে যায়
জগতের তাবৎ হুজুগে পড়ে
নেমে যায় অতল গহ্বরে

বিছানার ধার ধরে নামতে নামতে
মেঝের মসৃণ পেটে চলতে চলতে কেউ
অথবা হোঁচট খেয়ে
ধাক্কা লেগে বাতাসের গায়ে
কোনো একভাবে
অথবা অভাবে খুব
সকলেই পড়ে যাচ্ছে
নিউটনের মাথার ওপর থেকে লাল লাল
আপেলের মতো টপাটপ

বয়স উপচে যেন
পড়ছে জলের মতো চৌবাচ্চার ধার গলে গলে
কোথাও আর্কিমিডিস ছিলো না বলার জন্যে
ইউরেকা পেয়েছি পেয়েছি

তবুও পতিত সব বুড়োরা-বৃদ্ধরা
কঁকিয়ে ব্যথায় জোরে বলেছে পেয়েছি জোর
পেয়েছি ভীষণ কষ্ট
পতনের যুগ চলে আমাদের জ্বলন্ত চৌদিকে

 

ভাঙা ঘুম

ঘুম আসবো আসবো করে রাত ভোর হয়ে গেলে
ঔষধ সেবনে ডেকে আনি নিদ্রাদেবীটাকে
তারপর গভীর ঘুমের দেশে কতো স্বপ্ন খেলে যায়
কতো প্রিয় মুখ আনবাড়ি বিগত হয়েছে
এমন করুণ কালে কর্কশ এলার্ম
কলজে কাঁপিয়ে বাজে ঘন্টাধ্বনি আনে জাগরণ

জাগরণ — আলস্য জড়ানো এই জাগরণে
কার লাভ কতোটুকু লাভ!
কেন এই দু’ঘন্টার ঘুম থেকে জেগে উঠতে হয়
এতো তড়িঘড়ি
কী এমন রাজকার্য পড়ে থাকে জীবনের মোড়ে মোড়ে
কোমল চাদর শয্যা মাথার নরোম তুলো কোমল বালিশ
বারবার টেনে ধরে রাখে লেপ্টে রাখে বিছানার গায়ে
জিন্দালাশের মতোন অনর্থক বিছানায় শুয়ে পড়ে রই

সারা গায়ে কোষে কোষে অসহ ব্যথার ভোঁতা বোধ
নিরালায় ছড়িয়ে পড়ছে অতি ধীরে ঘুমে—
এমনকি জাগরণে…

 

জিললুর রহমান

কবি। জন্ম ১৬ নভেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম। কবিতার পাশাপাশি নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং কবিতা ও গদ্যের ভাষান্তরেও মগ্ন। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা-১০টি।
সম্পাদনা—যদিও উত্তরমেঘ; সম্পাদনা পরিষদ সদস্য— তরঙ্গ (১৯৯০—১৯৯১), লিরিক(১৯৯২—২০০৫)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।