মোনালিসা চট্টোপাধ্যায়ের সিরিজ কবিতা: ঈশ্বরজন্ম

ঈশ্বরজন্ম ১৬

স্বরের নিজস্ব এক দ্যুতি আছে যা আমিই জেনেছি বহু বিলম্বিত গেয়ে গেয়ে আলাপ বিস্তারে ।
কথা যদি বিন্যাসের ভেতর শ্রাবণ জারি করে আজ মনসায় বিয়ে হোক তোমার আমার ।
পাজি শব্দ নিয়ে খুশি আছি, বেশ ভেষজ ব্যাপার।
টুং ফুং ছেড়ে বেরিয়ে পড়েই গাড়ি চড়ে
ঈশ্বর হয়েছি আহা রোগে ভয়ে রাস্তা ফাঁকা !

আমাদের ভয় নেই
আমাদের হাসি নেই কান্না নেই লোভ নেই
আমাদের আছে যত; বই আর বই ।

লিখি আর লিখি– ছাই দিয়ে লিখি
কয়লার গনগনে আঁচে–
নির্দ্বিধায় , নির্ভয়ে ও সংকোচে ।

নিজ গুণে গুণী নই বলে জপ তপ সারি
চলো ফিরে যাই যার যেখানে বাড়িটি ।
ফেলে রাখা পোশাক ও স্বর
তাকে ছুঁই, যে যাকে ঈশ্বর বলে মানি ।

 

ঈশ্বরজন্ম ১৭

ঈশ্বরের বুকে ছুরি বসিয়ে বলেছি প্রণাম ।

কাপুরুষের প্রণয় বাক্যে সন্তান মায়ের যদি,
মা তবে কোন সন্তানের বলো !
সন্তান সারিয়ে নিও; তাকে মেরামত করে
বলো সাইক্লোন দেখবি !
বাবাদের বিয়ে ভাঙে মায়েদের বিয়ে ভাঙে
শিশু তার কাল জন্মে ঈশ্বরকে খোঁজে ।
জীবন সায়াহ্নে এসে ভাবি তুমি বিশ্বলোক ।
মনে মনে দক্ষিণ হস্তের অনামিকা ছিঁড়ে চাষ করি
আনন্দেই, আত্মবোধে শুদ্ধ হই ।
অনেক পাওয়া না পাওয়ার মাঝে প্রজাপতির পুজো করি, পুষ্প ও ছায়া অভিন্ন ।

ছায়াগাছে আলো জ্বলে, এই জ্বলা আর নেভা লেখা নিয়ে বাকবিতন্ডা আমার নয় ।
আত্মা শুদ্ধিকরণের জন্য কেউ না কেউ ঘন্টি বাজায় যা কিছু জন্ম নিল যা কিছু নিভৃতি ।

কৃপা নয়, পৃথিবীকে মহান করে দেবার জন্যই
আজ তার আগমন ।
মা তুমি ঈশ্বর ?
ঈশ্বরের পোষাক পরোনি কেন ?

তোকে কোলে নিতে আমার পেটেই ঈশ্বরের জন্ম হল আজ ।

আমি খুনী জীবনে ও চতুর্দিকে ।
আমি খুন হই, রক্তে রক্তে ভাসে ঈশ্বরেরই মুখ ।

ঈশ্বরজন্ম ১৮

বীজে বীজে ঈশ্বরের কামজন্মে
তুমি তার উৎপত্তি বিহীন পরমব্রহ্ম ইহাগচ্ছ !
বিশ্বে ব্যপ্ত সকল শরীর মায়া ও মোহের ।
আশ্রয় ও অনাশক্তি সৃষ্ট প্রেম আত্মাকে দেহটি দিই নিজে সেজেছি সর্বস্য ভূত ভগবানে ।

জ্ঞান দিয়ে কবিতায় পরলোকগমনের ইচ্ছে নেই
এই মুহূর্তে আমার জন্মগ্রহণ হয়েছে।
এই মাত্র আমি দর্শণ করেছি প্রেম পরমাত্মা।
এই মাত্র অপ্রাপ্তের অভিলাষ।

দেহোৎপত্তির কারণে অতিক্রম করেছি আমার প্রেম, জন্ম, মৃত্যু, জরারূপ,
ঈশ্বর আছে না নেই তর্ক নয়,
আমি আছি বলো কি বলছ তুমি ?
তুমি কি বলছ বলো !

ঈশ্বরজন্ম ১৯

অগ্নির অস্তিত্বরূপে আমি তোমাকেই একমাত্র
বলি, ” ভালবাসো” ।
হেসে যত ভুল স্বীকার করেছ; লিখে নয়।
এই হাসি কর্ম নয় , অনুসরণ হয়ত সমর্পন মাত্র।
শুভ ও অশুভ শক্তি দিয়ে এই জ্ঞান ও বিজ্ঞানে তুমি আছ আমিও তেমন আছি।

উদাসীন যোগী জানে ইহলোক পরলোক মায়া।
দেহতে আশ্রয় চাও ? – সুখ নিদ্রা আলস্য আমার। প্রম নয়, সমস্ত কর্মই জন্মলাভ করে নারীর প্রেরণা। ঈশ্বর তুমিও নও আমিও নই
আমিও ধৈর্য ও ত্যাগে অবিনশ্বর আলো।

প্রেম এসে বলে শুভলোক
প্রেম যেন সর্বভূতে সমদর্শী
প্রেম ভয় ও অভয়ে নিত্য ও নৈমিত্তিক।

ঈশ্বরের বহুরূপে আমি,
তাই তোমার নিওন আলোয় মত্ত প্রেম।
সকল প্রেম তুমি যে প্রকৃতিজাত।

ঈশ্বরজন্ম ২০

সমস্ত বিভেদ আর জড়তা কাটিয়ে আজ ঈশ্বরের জন্ম হল।
এইদিকে রাস্তা নামে পথ অন্যদিকে নদ তবে নদী। আজ শ্রাবণ শেষের দিনে তুমি মহাদেব বেশ পরো নাম লেখা হল বড় বড় অক্ষরের।
দর্প চূর্ণ করে যে জন্মায় তাকে আদর বলেছি।
এই বলা বলার অপেক্ষা নয়,
এই চলা জীবন গতির নামান্তর
এই ছাপা অক্ষরজন্মের দায়।
লেখ্য ভাষা নিয়ে আদিখ্যেতা করার সময় নেই
তাই সরস্বতী সাজি মাঝে মাঝে আমি।
এক জন্ম বহুজন্ম বৃষ্টিপাতে অনড় আমার রবি
সমস্ত দেহের তাপে লীনতাপ জন্ম নিলে
তুমি অঙ্গ ভঙ্গির মিলন।

একেক সময় জল যেমন গড়ায় নিচে
ঈশ্বর তেমন গড়াগড়ি খায় আমার পায়ের নিচে।
আমিও ঈশ্বর বেশ ধরি জাগি নিরলস।

যে আকাশ আমি বিদীর্ণ করেছি তাকে তুমি রূপ বলো, রূপের অরূপে ছিন্নবস্ত্র পরি।
পক্ষীশাবকের ডিমে যে উত্তাপ,
তুমি সেই
উত্তাপের খোঁজ নিও ঈশ্বরীর মনে।

কোনো কোনো চাওয়া পাওয়ার অধিক।
এই প্রাপ্তিতে নিঃস্ব আমি,
জড় ও জীবে বহমান এক অভিন্ন শক্তির উপাসক আমি– জন্মের অধিক আমি,
–মৃত্যুর অধিক আমি ।

 

মোনালিসা চট্টোপাধ্যায়

কবি, প্রাবান্ধিক ও পত্রিকা সম্পাদক। কবিতা ও মননশীল লেখালেখির জন্য পেয়েছেন এডুকেয়ার সাহিত্য সম্মান ২০০৬; শব্দকিরণ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ ও তাহেরপুর কবিতাগুটির আশ্রমিক কলেজ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা বিশ।

কবিতাগ্রন্থ: সবুজ আলোর শব্দ; মোমজন্ম; নির্জন যেখানে শেষ; যদি হও শুভরাত্রি; শূন্য নিয়ে খেলা; না ফেরার দেশে; আলতা রঙের তারা; নৈশব্দ্যের ছায়া; যে নাম আমার নয়; কাঠের পায়রা ও তথাপি মন আমার।

কবিতা গ্রন্থ ছাড়াও রয়েছে ১টি গল্প সংকলন, ৬টি উপন্যাস ও ২টি শিশু কিশোর গল্পগ্রন্থ।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।