সাদিয়া সুলতানার গল্প: যে দেশে মানুষ নেই

১.
দলটি ক্রমশ কালো মাথায় ভারি হচ্ছে। কালো কালো শরীর এদের। তারচেয়ে বেশি কালো পথ। সময়টা শীতের বিকেল। ছায়াছন্ন বিভীষিকাময় সময়। শীতার্ত আকাশও আলো শূন্য। আকাশে মেঘেরা খোঁপাখোলা চুলের বিন্যাসে পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়েছে। মেঘের নতজানু ভাব দেখে বোঝা যায় জলের ভারে সামান্য স্ফীত হলে এরা আস্তই আকাশ থেকে খসে পড়বে। বাতাস আছে কী নেই, গাছের নিশ্চল পাতা দেখে বোঝা দায়। সেই পাতার আড়াল থেকে একটা কালো তিতির উঁকি দেয়। দ্যাখে মর্ত্যভেদী মায়াজাল। তিতির চমকে ওঠে। ডানা ফড়ফড় করে উড়ে যায় দূরে।

পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলা সর্পিল পথে ঢুকতেই দলের প্রধান পুরুষ বলিষ্ঠ কণ্ঠে হাঁক দেয়, ‘কেউ পিছু হটবে না।’ কেউ পিছু হটে না। কেউ ভুল করেও পিছু তাকায় না। হৈ হৈ করতে করতে তারা দলনেতাকে অনুসরণ করে। উঁচু থেকে মানুষের দলটি দেখে পরিযায়ী পাখিরা পাহাড়ী নদী ভেবে ভুল করে। সেই ভুলের ঢেউয়ে ভেসে চলা মানুষের কোলাহল দেখতে বড় মনোরম লাগে। যেন বিশালাকার কোনো অজগরের খোলস খসে গিয়ে তার সৌন্দর্যের শীতলতা দৃশ্যমান হচ্ছে। হঠাৎ কারো উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা যায়, ‘আরও জোরে…আরও জোরে…আকাশের ভাব ভালো না।’

ধোঁয়াটে বাতাসের আর্দ্রতায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের শরীরের চামড়া শুকিয়ে আসে। তবু সবার পায়ে নতুন ছন্দের আড়মোড়া জেগে ওঠে। থেকে থেকে সেই ছন্দের অন্যতম রূপকার দলের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেয়া পুরুষটির হুংকার শোনা যায়, ‘তাড়াতাড়ি চলো সবাই, পালিয়ে না যায়।’ দলটির শত পায়ের গতি বাড়ে একসঙ্গে। কঠোর নির্দেশনা পেয়েও ভিড়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে কেউ কেউ শক্ত মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারপর তাড়া খাওয়া প্রাণীর মতো উঠে আবার পুরনো গতিতে ছুটতে শুরু করে।

নাগকাঞ্চন পাহাড়ের বাঁকে কৃষ্ণবর্ণের যে কিশোরটি দাঁড়িয়ে আছে সে এদের তাড়া দেখে চমকে যায়। ওর নবীন হাতে পেঁচা আকৃতির একটা ঢাউস ঘুড়ি। বাতাসহীন ঘুড়ি নেতিয়ে পড়ে কিশোরটির পায়ের কাছে আর সেই সঙ্গে ওর হাত ফসকে নাটাই মাটিতে পড়ে যায়। ছুটন্ত মানুষগুলোর দিকে কিশোরটি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে।

 

২.
পথ ফুরায় না। এটা নির্ঘাত ওই পিশাচিনীর কোনো কূটচাল। তন্ত্রমন্ত্রের সাধনা করে তো! সেদিন ভুবনেশ্বরীর বিশ্বস্ত এক লোক মারফত তারা খবর পেয়েছে, সেই কুহকিনী কোচড়ভর্তি কচি বুনো লেবু আর কচকচে সবুজ মরিচ নিয়ে বড় ছড়ার পানিতে পা ডুবিয়ে বসে ছিল। তাকে দেখে কোঁচড় ছেড়ে অবিন্যস্ত উঠে দাঁড়িয়েছিল। যেন তেড়ে আসবে! ভয়ংকর তার রূপ! রক্তঝরা চোখ, মাটিতে লুটানো চুল, চারধারে তার ছাতিম ফুলের তীব্র ঘ্রাণ! অদূরে একটা মরা বিড়াল শকুন খুবলে খাচ্ছিল।

নিজের চোখে না দেখলেও ঘটনার পূর্বাপর ভেবে অন্যরা বারবার শিউরে উঠেছে, তন্ত্রমন্ত্র না জানলে কী আর অমন অশুভ রূপে মানুষকে দেখা যায়! আজ সেই অশুভকে উৎখাতের বাসনায় তাদের এই দলীয় যাত্রা। সপ্তাহখানেক আগে ঐ মায়াবিনীর ঘর পুড়িয়ে দেবার সময় ওরা বুঝতে পারেনি যে, ভেতরে কেউ ছিল না। নতুবা সেদিনই কাজ সমাধা হয়ে যেত। এত দ্রুততার সঙ্গে সে যে পালিয়ে যাবে তা ওরা আন্দাজ করতে পারেনি।

কেউ কেউ অবশ্য ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলেছে, দরজার শেকল তোলার সময় ওরা ঘরের ভেতরে নারী শরীরটি স্পষ্ট দেখেছে। আগুনের হলকা বের হচ্ছিল তার চোখ-মুখ থেকে। তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এ নির্ঘাত মায়া জানে। তাই তো এত মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতারাতি হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। হায়! সে কী মানুষ! নাকি অন্য কিছু! বিচ্ছিন্ন ভাবনা আবার দলটির ভেতরে অস্থিরতা এনে দেয়। হঠাৎ শিশিরবৃষ্টি শুরু হয়। এলোমেলো পায়ে তবু সবাই ছুটতে থাকে। দলের পিছনের কাতারে থাকা সবচেয়ে বর্ষীয়ান মানুষটির শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসে। এবার তিনি সবার পায়ে পা মিলাতে না পেরে রাস্তার ধারের ঝাউগাছ ধরে দাঁড়িয়ে যান। আর ঠিক তক্ষুনি একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

একটা বাদুড় তীরের মতো ছুটে এসে দলনেতার কপালে ঠোকর দিয়ে একটা গাছের আড়ালে মিলিয়ে যায়। দলনেতার কপাল থেকে রক্ত ঝরে। সেই রক্তের রং নীল। দলের অগ্রভাগে থাকা মানুষেরা হৈ হৈ করে ওঠে, ‘নির্ঘাত ওই পাঠিয়েছে!’ বাদুড় তো শুভ কিছু নয়! নিতান্ত অশুভ। তাদের বুঝতে বাকি থাকে না, ঐ কুহকিনী চায় না যে ওরা গন্তব্যে পৌঁছাক। এবার আরো ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটে। কোথা থেকে এক ঝাঁক বাদুড় এসে তাদের মাথার ওপরে চক্কর কাটতে থাকে। দিশেহারা জনস্রোত খেই হারায়। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে যায়। রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে তাদের একাংশ চিৎকার করতে করতে পিছু হটে, ‘পালাও, পালাও।’ উন্মাতাল বোধে একে-অন্যকে ধাক্কা মারতে থাকে। দলনেতার অগ্নিচক্ষু দেখে কারো কারো সম্বিত ফেরে, ‘শক্ত হও। এসবই মায়ার কারসাজি। ঐ তো ঐ তো সে, ঐ দেখা যায়…আমরা লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি। ধৈর্য ধরো। কর্তব্যনিষ্ঠ হও।’

 

৩.
সন্ধ্যার ধূপছায়ায় প্রাচীন অর্জুন গাছের আড়ালে মায়াবনে এক অলীক দৃশ্য দেখা যায়। দৈত্যাকৃতির গাছটির ডালে এক জোড়া বেঙ্গমা আর বেঙ্গমী বসে আছে। তাদের কাছে রাজ্যের খবর। ভূত-ভবিষ্যত, আলো-আঁধার, সৃষ্টি আর ধ্বংসের। এমনকি সম্ভাবনার সব খবরও ওদের জানা।

বেঙ্গমা আর বেঙ্গমীর কণ্ঠ শুনে ভেজা বাতাস কান পাতে। একটা বড় হলদেকুড়ালি গাছের বুকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ছিল। ব্যস্ততা থেকে মুখ ফিরিয়ে সেও শোনে সেই আশ্চর্য কথোপকথন।
‘হলকা গুহার ডাইনির মতো পুড়িয়ে মারবে নাকি?’
‘তার আগে হয়তো বুড়ো অর্জুনের ডালে ঝুলিয়ে নিবে। পেরেক ঠুকবে হাতে-পায়ে।’
‘ঘোর বিপদ আসছে। আমি ওর করপিঠে সবুজ রেখা দেখেছি। অশুভ রেখা।’
‘এবার উপায় কী হবে?’
‘উপায় আছে। খবর পাসনি? মেঘ উড়ে যাবে। পাখিও বিন্দু থেকে সিন্ধুতে মিলাবে।’
‘যাক। তবু এবার বাঁচুক।’
‘বাঁচুক?না বেচুক?’
‘মানুষ নিজের শরীর বেচে।’
‘মন বেচে না। স্বপ্ন বেচে না।’
‘কলিকালে সবই বেচে।’
‘না। মেয়েটা জানে ওর শরীরের প্রতি ছটাক মাংসের মূল্য আছে, ক্রেতাও আছে কিন্তু ওর নিরাকার ক্ষণভঙ্গুর মনের কোনো ক্রেতা নেই।’
‘বড্ড ভারি কথা বেঙ্গমী।’
‘ওর জীবনটাই ভারি।’
‘চল যাই।’
‘কোথায়?’
‘দেখি পথ কত দূর।’
‘সে দেখে কাজ নেই, পথের কোনো শেষ নেই।’
‘চল তবে ওকে দেখি।’
বেঙ্গমা-বেঙ্গমী উড়ে যায়। চঞ্চল ডানায়। সঙ্গে ওড়ে ক্ষয়িষ্ণু মেঘদল।

 

৪.
মেয়েটি দরজার চৌকাঠ ধরে চিত্রাঙ্গদার মতো দাঁড়িয়ে আছে। যেন কোনো ভয় নেই, বিপদের গন্ধ নেই। বেঙ্গমী উড়ে এসে ওর অদূরে নুয়ে থাকা রক্তজবার ডালে বসে। ডালটি ওর ভার না নিতে না পেরে থরথর করে কাঁপে। মেয়েটিও কাঁপে। নিঃস্পৃহতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে মেয়েটি এবার হাতে একটা লাঠি তুলে নেয়। বেঙ্গমা হাসে আর বলে, ‘আরে পালাও…এ খ্যাঙ্গরা লাঠিতে কিচ্ছু হবে না…পালাও।’

কিন্তু পালাবে কোথায়? পাহাড়ের এপাশে এই ভূখণ্ডের শেষ সীমানা আর এই পাহাড় ডিঙোলেই ভিন দেশ। সেখানে পৌঁছাবার আগেই দুর্মর বিপদ ওকে ছিঁড়ে খাবে। যাবার তো পথ নেই। ওর পথ ফুরিয়ে গেছে। যতদূর চোখ যায় নারীর আদলে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের সারি। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ের গায়ে ধূপছায়া মেঘ উড়ালসেতুর মতো সংযোগ করেছে। লোকালয় ছেড়ে পাহাড়ি ঢালের এমন নির্জন এলাকায় বসতি গড়ার ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকে মানুষের। মেয়েটিরও আছে। কারো তা অজানা নেই।

প্রথম প্রথম কানাঘুষা, লুকোচুরি ছিল খানিক। এখন আর কোনো গোপনীয়তা নেই। সকলেরই সব জানা। আর বেঙ্গমা আর বেঙ্গমী তো সেই কোন কালেই সব জানে-কী করে দানবের বিরাট থাবা হয়ে মানুষগুলো মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে!

 

৫.
মানুষের জটলা ভাবতেও পারেনি এমনভাবে তাদের ঘিরে ধরবে কেউ। শত শত বাদুড় কালো ডানার ঝালর পেতে সবার পথ আটকে দিয়েছে। নানান বয়সী মানুষের চিৎকার আর হাহাকার সেই দুর্ভেদ্য দুর্গ ভেদ করে বাইরে যেতে পারছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে সকলেই বুঝে যায়, পালাবার পথ নেই।

ওদিকে এই প্রাচীরের বাইরে মেয়েটি একাই ছুটছে। প্রবল ঝড়ের মতো। বাতাসের প্রাবল্যে ওর খোলা চুলে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। ফেলে আসা জীবনে মেয়েটি এভাবে অসংখ্যবার ছুটেছে। যদিও শেষবার শিকারীর হাতে ধরা পড়ে নালুয়াহাটির জঙ্গলে সাতদিন সাতরাত বন্দি থেকেছে, রাক্ষস-খোক্কস এসে খুবলে খেয়েছে ওর পাখিশরীর। এরপর একদিন ও সত্যি সত্যি পাখি হয়ে উড়েছে। এমনই এক সন্ধ্যায়।

শুনে অদ্ভুত এক হাসিতে মেয়েটির চোখ-মুখ জ্বলে ওঠে।

সাদিয়া সুলতানা

ছাত্রজীবন থেকে লেখক বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামানের সংকলন ও সম্পাদনায় অন্যপ্রকাশ হতে প্রকাশিত আইন অভিধান ‘আইন-শব্দকোষ’ এ তিনি গবেষণা সহকারীরূপে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বিচারক হিসাবে বাংলাদেশ বিচার বিভাগে কর্মরত আছেন। লেখকের গ্রন্থাবলি: চক্র (গল্পগ্রন্থ, ২০১৪), ন আকারে না (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭), আমি আঁধারে থাকি (উপন্যাস, ২০১৮), ঘুমঘরের সুখ-অসুখ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৯), মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ (গল্পগ্রন্থ, ২০২০), আজু মাইয়ের পৈতানের সুখ (প্রকাশিতব্য উপন্যাসিকা, ২০২০)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।