তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা

মলিন ধারণাজন্ম-১

এমন বিচূর্ণ আলো রেখে গেছ ছায়াসমাধিতে!

ছায়াটি অনতিদীর্ঘ। স্মৃতিভর্তি নানা সমাহার
রেখেছে নীরব করে, যেন এক অপরাহ্নমায়া,
যেন কোন পথশ্রমে অধীরের বাসনানিমেষে
আমিও ‘হা-অন্ন’ বলে সমস্ত অনলে ফেলে রাখি,
ছুঁয়ে যাই প্রতিবার পাথরের দেবতাপ্রয়াস…

এমন বিষণ্ণমায়া, কীভাবে নীরব হতে পারি?
এত কান্নাপাথরের, এতসব মায়াযুদ্ধখেলা
রেখে গেছ স্মৃতিজুড়ে, রেখে গেছ পাথরযতনে—
আর এই মন্দ্রদেশ, এত স্বজনের জলরাশি
আমাকে রেখেছে দূর, জ্বেলেছে অদীপ-মৃদুআলো…

কেবল অপেক্ষা লিখি, লিখি তার বিরিহপালন।

২০ শ্রাবণ, ১৪২৬

 

মলিন ধারণাজন্ম-২

তোমার কান্নার নীচে আমি আজও উদাসীজটায়
বিবিধের কথামুগ্ধ, নীল হয়ে রয়েছি বিষাদে।
দিয়েছি বেদনাপায়ে অপরাজিতার চেনা-ছোঁয়া।
আর যত উপহার, যদি বলো আত্মপরিচয়,
শ্মশানের দাহগন্ধে ভেসে গেছে অবনীপ্রপাতে…
কেবল রাত্রিই জানে মহাগগনের নীরবতা,
কেমন বুকের নীচে লুকিয়ে রেখেছি আমরণ।
যদি কান পেতে শোনো, অবসরে কখনও সন্ধ্যায়,
তোমার শহর থেকে ভেসে যাওয়া সব ধুলোঝড়ে

শুনিবে, আমিই শুধু বয়ে যাচ্ছি চেনা স্রোত ধরে।

২২ শ্রাবণ, ১৪২৬

 

মলিন ধারণাজন্ম-৩

শ্মশান তো নয়, তবু এ কেমন মায়ানীরবতা?
বধিরের শূন্যালোকে কেন তাকে দিয়েছ ছড়ায়ে?
এসেছ এমন যেন দূরে দূরে স্তব্ধব্যথাধ্বনি…
এসেছ কাতর স্বরে মানুষের ভাষাবোধ নিয়ে
আদিগন্ত মুখরের ক্ষুধা পার হতে হতে যেন
ছায়াসুনিবিড় রোদে একাকার জীবননীরবে…

নীরব তো নয় আজ, তবে কোন শান্তমুখরের
এসব অশ্রুত লিপি, শহরের অসমাপ্ত ছায়া
পেরিয়ে পেরিয়ে দেখি বিবিধের মিলনে কাতর
মন্দিরের আদিশোভা লুকিয়েছে প্রবাহতড়িতে।
আর সেই ধ্বংসপথ, আর সেই ভাঙাঘণ্টাঢিপি

আমি তার ধ্বনি লিখি, তার সুর, তার স্বরলিপি।

১১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬

 

মলিন ধারণাজন্ম-৪

যতটা জ্বালিয়ে রাখো, তত আলো জ্বলেনি আমার।
অযত্নে বেড়েছি আমি মতো, একা।
বেড়েছি মাতালগন্ধে ভাটফুলে, পতঙ্গপ্রদেশে…
আমার ব্যর্থতা নিয়ে সাফলযের স্বপ্নাতীত তুমি
কোন মহাগণিতের অসমাপ্ত সমাধানে এলে—
আমি তো তোমার স্পর্শে ভেবেছি, এ ধ্বংসপ্রলয়ে
অরণ্যের ধারণাকে ঘাসে-ঘাসে কেন দেকে আনি?
তোমার যে চিরচিহ্ন, সাফল্যের যত মন্ত্রলেখা
এই শ্যামহরিতের ভুলে যাওয়া কেন আর রাখি…

যতটা জ্বালিয়ে গেল, তত আলো হল না আমার।
অযত্নে বেড়েছি বলে এই ফুলে পূজাও হবে না —
জেনে তুমি ফিরে গেলে, তোমার বিলীয়মান সুরে
আমার ব্যর্থতাচিহ্ন, আমার সামান্য জন্মখানি
তোমার ধারণা জুড়ে বয়ে যাবে আলোর অদূরে…

৭ ভাদ্র, ১৪২৭

 

স্মৃতিভর্তি করাঘাত

সমস্ত রাত্তির আমি হেঁটেছি অস্থির পথে পথে।
অতীতের গাছ থেকে নামিয়েছি নীরবের দেহ।
সে আমাকে শুনিয়েছে সব দেশ, দেশান্তের কথা,
চিনিয়েছে আমাদের ভুলে থাকা যত লিপিবোধ
নিষ্ফল সম্পর্ক জুড়ে অতিআকুলের নীরবতা…

সমস্ত রাত্তির আমি পথে পথে ঘুরেছি এমন।
ভেবেছি, এবার বলি। ভেবেছি, এবার বলে দিই।
বলি, এই নীরবতা ভেঙেচুরে আমার যা স্মৃতি,
যত অবজ্ঞার কাছে চুপ করে বসে আছি, সব…
শুধু যে পথের শেষে সহজ আলোর দেখা পাব,
এই ভেবে চুপ থাকি। সমস্ত রাত্তির শুনে যাই।

কখন বেতাল বলে, ‘কথা বলো, ও রাজামশাই !’

 

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম, বনগ্রাম মহকুমার চালকি-বারাকপুর গ্রামে, ১৯৮১ সালে। ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। শূন্য দশকের প্রথম দিকে (১৯৯৯ থেকে) লেখালেখির শুরু। কবিতা লেখার পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন বহু গল্প, উপন্যাস ও কবিতা। সম্প্রতি(২০১৯) ‘কবিতা আশ্রম’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণাসমৃদ্ধ ‘গীতা’-র কাব্যঅনুবাদ। লিখেছেন কবিতা-বিষয়ক অজস্র গদ্য ও কয়েকটি নভেলা। ‘কবিতা আশ্রম’-পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাব্যগ্রন্থ দুটি: সমস্ত সন্ধ্যার শেষে (২০০৩), ও ‘অদেখা বিষুবরেখা’ (২০১৫)।
পুরস্কার- ইতিকথা এখন যুব পুরস্কার ( ২০১৫), আদম সম্মাননা ( তরুণ কবি) (২০১৫), একুশ শতক-মনকলম সম্মাননা (২০১৬), কবি অনীল চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ( ২০১৮) ও বিনয় মজুমদার-স্মৃতি একুশে সাহিত্য সম্মান (২০১৯)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।