দিলারা হাফিজের মুক্তগদ্য: বাংলা ভাষার বানান নিয়ে বারোয়ারি

ভাষা মানুষের প্রাণের সেতু। মনের জানা-অজানা ভাব প্রকাশের অন্যতম বাহন হিসেবে ভাষার কোনো বিকল্প নেই। বলা যায়, ভাষা সৃষ্টির অপূর্ব সোপান টপকে তবেই পূর্ণতা এসেছে মানব সভ্যতায়।

পৃথিবীর ১৪ হাজার ভাষার মধ্যে গত ১০০ বছরে হারিয়ে গেছে হাজার হাজার ভাষা। ভাষাবিদদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট ভাষার সংখ্যা বর্তমানে প্রায় আট হাজার। আবার এর মধ্য থেকে মাত্র ৪ শতাংশ ভাষা অর্থাৎ শ’তিনেক ভাষা দিয়ে পৃথিবীর ৯৬ শতাংশ মানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করছে। বর্তমানে ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।

এই বাংলা ভাষা সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের ঝরনাতলা থেকে প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন নদ নদী হয়ে সাগরসঙ্গমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে সেই কোনকালে। এজন্য ভাষাকে তুলনা করা হয় নদীর সঙ্গে, তার প্রবহমান গতির সঙ্গে। নদীর মতো ভাষাও গ্রহণ-বর্জন এবং এপার-ওপারের শেকল ভাঙার গান গেয়ে নিরন্তর তার যাত্রা আগামীর পথে। এ যেন অগ্রায়ণের বয়ান।

এঁকে-বেঁকে পথে-প্রান্তর থেকে খড়কুটো কুড়িয়ে ভাষা তার আপন সৌধ নির্মাণ করে চলে নিরবধি। চারুশিল্পের এই নির্মাণ কখনো শেষ হওয়ার নয়। এ কারণে ভাষা সতত প্রসবকাতর। মায়াচূর্ণে বিভাসিত তার দেহ-মন আত্মার অগ্নিশিখা। যেন হৃদয়ের একূল-ওকূল দুই কূল ভাসিয়ে নিয়ে দুরন্ত বেগে ছুটে চলে মাতৃভাষার তরঙ্গসংকুল এই নদ-নদী।

লক্ষ করলেই আমরা বুঝতে পারি বাংলাভাষা তার রূপ পাল্টেছে যুগ থেকে যুগে-যুগান্তরে। শতক পেরিয়ে কালের মন্দিরে তার অব্যাহত যাত্রার ধ্বনি সুরে-অসুরে বাজতেই থাকে অক্ষর, বর্ণ ও শব্দসমষ্টির সমবায়ে, নতুন নতুন আবিষ্কারে। কাজেই প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের ভাষা থেকে বর্তমান সময়ের ভাষার মধ্যে পার্থক্য হয়ে ওঠে যোজন-যোজন। তো, বাংলা ভাষার বানানের কথাই বলতে চাই আজ। ১৩০০ বছরের পুরোনো ভাষা নিয়েই যত প্রেম, ভালোবাসা, দেশ ও ভাষাকে জানার গভীর আকুতি আমাদের। সেই ভালোবাসা থেকেই সাহিত্যের যাত্রা। আমরা কে না জানি বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে প্রস্ফুটিত এই বাংলা ভাষার রয়েছে জগতবিখ্যাত ইতিহাস।

মাতৃভাষা বাংলার জন্যে জীবনদানকারী একমাত্র জাতির নাম কেবলই, বাঙালি-বাঙালি-বাঙালি। একক ও অনন্য সাহসী এক জাতি। আমাদের ভাষাশহীদের এই অর্জনের জয়মাল্য আজ আর আমাদের একলার নয়, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশগুলোর মুকুটে তা শোভা পাচ্ছে কোহিনুরের মতো।

২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর পৃথিবীর ১৯৩টি দেশে এবং ২০১০ সাল থেকে জাতিসংঘেও আন্তর্জাতিক ‘মাতৃভাষাদিবস’ হিসেবে পালিত হয় আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি। এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস একমাত্র বাঙালি জাতি সৃষ্টি করতে পেরেছে। এজন্যে গাফফার চৌধুরীর মতো কবি ও গীতিকারের হাত থেকে এমন করুণ রসের সংগীত সৃষ্টি হতে পেরেছে।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি’
অবশ্যই, ভুলতে পারি না। তবে, অনেকেই বলতে চেষ্টা করেন, ইংরেজি ভাষার চেয়ে বাংলা কঠিন। বাংলার বানানে হাজারো হাঙ্গামা।

আমাদের বাংলা বানানে কত নিয়ম, একদিকে তিনটি শ:

১। দন্ত্য স
২। তালব্য-শ এবং
৩।মূর্ধন্য-ষ

অপর দিকে, দুটো ন:

১। দন্ত্য-ন
২। মূর্ধন্য—ণ।

সারাক্ষণ তটস্থ করে রাখে ডাবল, ট্রিপল এই বর্ণগুলো। মনে হয় এই বুঝি ভুল হলো!

‘ত’ এবং ‘ত’এর অর্ধেক যে ‘খণ্ড—ৎ’-এর ঝামেলা কম কিসে? ‘হঠাৎ’ শব্দটিকে সম্পূর্ণ ‘ত’ দিয়ে ‘হঠাত’ লিখলে কেউ ছেড়ে দেবে আমায়? মণ্ডুপাতের একশেষ করে ছাড়বে, তাই না?

একইভাবে যদি ‘উচিত’ না লিখে যদি ‘উচিৎ’ লিখি, তবে তো আমার সনদপত্রই কেড়ে নেবে শিক্ষকেরা, তাই নয় কী?
কাজেই বানানের প্রতি কড়া নজর রাখা ছাড়া উপায় কী?

একইভাবে ‘ঙ’ এবং তার অর্ধেক যে অনুস্বর—সেও কম যায় না। এত ‘রঙের’ বাহার, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, তাই না? ঢঙের কথা বাদ দিয়ে যদি ঢং করি, তবে অনুস্বর লাগবেই।

এবার না হয় ‘বানান’ শব্দটি দিয়েই শুরু করি বানানের নিয়মের কথা। ‘বানান’ শব্দটি লিখতে দুটিই দন্ত্যন দিতে হলো, তবেই না সে ‘বানানে’ পরিশুদ্ধ হলো। কিন্তু লক্ষ করুন, বর্ণ, বর্ণনা, তরুণ বা তরুণী, হরিণ, বারণ, কারণ, অকারণ—লিখতে গিয়ে চলে এলো আবার মূর্ধন্য-ণ।

কোন সূত্র বা শক্তি বলে বলা নেই কওয়া নেই, সে এসে জায়গা দখল করে নিলো, বলুন তো দেখি। কেমনটা লাগে।

তবে, সূত্র বা বানানের নিয়ম তো একটা আছে সে আপনিও জানেন, আমিও জানি। কেবল কায়দা করে একটু মনে রাখা, এই যা। শুধু এতটুকু মনে রাখলেই চলবে যে, ‘র’ পরে সব সময় মূর্ধন্য হবে। রেফ মানে তো ‘র’। বর্ণ (বরণ) বর্ণনা (বরণনা) বাকি শব্দগুলো তো সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে, তাই না।

ত্রিশের দশকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের নিয়ম নির্ধারণ করে দেয়। এই নিয়ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্রসহ অধিকাংশ পণ্ডিত ও লেখক সমর্থন করেন। বাংলা বানানের এই নিয়মাবলি আগে ‘সংসদ অভিধান’-এর পেছনের পৃষ্ঠায় সূত্রবদ্ধ অবস্থায় আমরা পেয়েছিলাম। তখন আলাদা বই আকারে তা ছিল না।

বাংলা একাডেমির প্রয়াত সাবেক সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান সম্পাদিত ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ নামক একটি পুস্তিকা বর্তমানে কিনতে পাওয়া যায় বাংলা অ্যাকাডেমিতেই। দাম মাত্র কুড়ি টাকা। বইটি কিনে কাছে রেখে দিলেই বানান সমস্যার অনেক সমাধান সেখান থেকেই মিলবে আশা করি।

বর্তমানে সমস্যা হলো ফেসবুক। অসম্পাদিত জনপ্রিয় এক অভিনব পত্রিকার নাম ফেসবুক। সেখানে প্রত্যেকে এক বা একাধিক পত্রের মালিক। যার যেমন, যে বিষয়ে লিখতে ইচ্ছে করছে, লিখে তা পোস্ট করে দিচ্ছি। সেখানে সেন্সর করার কেউ নেই, সম্পাদক নেই, নিজের সম্পাদক নিজেই। আমার মতো বেকারের সময় কাটানোর জন্যে তা পড়তেও আপত্তি নেই। কিন্তু এত ভুল বানান দেখলে চোখে জল আসে যে!

লিখতে গেলে ভুল যে আমাদের হয় না, তা বলছি না। কিন্তু এমন সব সিলি ভুল দেখি যে, মনটা বড্ড খারাপ হয়ে যায়। যেমন ‘ধরুন’।

এবার তো আপনারাই আমাকে ধরে ফেলবেন, তাই না। কিছুক্ষণ আগে পণ্ডিতি করে সূত্র শেখালাম ‘র’ পরে মূর্ধন্য হবে। এখন কেন দন্ত্য ন দিয়ে ধরুন লিখলাম। তারও নিয়ম আছে বলেই লিখেছি। আমার কী সাধ্য আছে, নিজে নিজে লিখবো?

কবিতা লেখার ছলে যতই শব্দ নিয়ে খেলাধুলা করি না কেন, আমাকেও ভাষার ব্যাকরণ মেনেই চলতে হয়। মনে রাখবেন দয়া করে, বাংলা ক্রিয়াপদ শব্দে ‘র’ বর্ণের পরে দন্ত্য-ন লিখতে হবে। যেমন, ধরেন, করেন, মারেন ইত্যাদি।

এছাড়া সব ‘র’ পরে মূর্ধন্য হবে, যেমন ব্যাকরণ। মনে থাকবে?

‘ভুল’ বানান দীর্ঘ ঊ>ূ কার দিয়ে এভাবে ‘ভূল’ লিখলে কেমন লাগবে বলুন। যদি আপনার শুদ্ধ বানানটি জানা থাকে।

আরো দুটি বানানে খুব ভুল চোখে পড়ে, যেমন: ১। উচিত ২। ভবিষ্যৎ

এই দুটি শব্দ লিখতে গিয়ে অধিকাংশই তাদের লেখায় শেষ দুটি বর্ণে উল্টো-পাল্টা করে বসে। ‘উচিত’-এ খণ্ড ‘ৎ’ দিয়ে ভারী অনুচিত কাজ করে কেউ কেউ।

আর ভুল করে ‘ভবিষ্যৎ’ বানানে ‘ত’ লিখে নিজের ভবিষ্যৎকে ফকফকা করে তোলে। এই কাজটি ভুলেও যেন আপনারা কেউ করবেন না, কেমন? মনে থাকবে তো?

একটু গোড়ার কথায় যাই। সভ্যতার আদিকাল থেকে কুমারেরা সেই পেশাদার, যারা মাটি ছেনে তৈরি করেছে সভ্যতার তৈজসপত্র। আর কবি বা ভাষা শিল্পীরা একইভাবে অক্ষর বা শব্দ ছুঁয়ে ছেনে সৃষ্টি করেছে একটি জাতির সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।

যেমন কবিতা, সুকুমার বৃত্তির রাজকুমার;
গল্প, হা-পিত্যেস, ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।’
উপন্যাস, সেখানে জীবনের সমগ্রতার অনুসন্ধান
নাটক, তৈরি করে সমাজ শোধনের রঙ্গমঞ্চ
প্রবন্ধ, জ্ঞানের বোধিবৃক্ষের বহিঃপ্রকাশ ছাড়াও আরও কত কী?

হাসির কমেডি, দুঃখ ও বিষাদে ট্র্যাজেডি, ব্যঙ্গ-রঙ্গে প্রহসন, স্বদেশ প্রেমে সনেট, কী নেই বাংলা সাহিত্যে? এই ছোট্ট লেখায় তা বলে শেষ করা যাবে না, বন্ধুরা। কাজেই ভাষার কারবারিদের অক্ষর-কুমার নামেও অভিহিত করা যায়, কী বলেন?

নবীন-প্রবীণ কবি, লেখক, শিল্পী যেই হোন, ভাষা ব্যবহারে তাদের কাঁধে অনেক দায়িত্ব এসে পড়ে। কবি, লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সাইনবোর্ড লেখার বার্ণিক, চিত্রকর, লিপিকর—তাদের বানান কিন্তু অনেকেই অনুসরণ করে থাকে। বিশেষভাবে শিশুরা যখন বানান করে পড়তে শেখে, যাত্রাপথে চলতে ফিরতে সাইনবোর্ডগুলোর বড় বড় রঙিন অক্ষরে লেখা শব্দগুলো খুব মনোযোগসহ পাঠ করে তারা। সেখানে একটি ভুল বানান দেখতে দেখতে স্মৃতির মধ্যে গেঁথে যায় এক সময়, নিজে লেখার সময় ভুল বানানটি বেরিয়ে আসে কলমের মুখে। তখন নিজের শেখা ও জানা শুদ্ধ বানানকে তুড়ি মেরে, সতত দেখা ভুল বানান আগে এসে হাজির হয়, কাজেই লিখতেও ভুল হয়ে যায়।

এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ছে ২০০৯ সালে সারাদেশের সরকারি কলেজের বাংলা ভাষার শিক্ষকেরা মিলে আমরা একটি সংগঠন করেছি। বাংলা ভাষার শৃঙ্খলা ও বহির্বিশ্ব বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিতে ‘বাংলা ভাষা পর্ষদ’ নামে এই সংগঠনটি যাত্রা শুরু করেছে। দুদিন আগেও আন্তর্জালিক একটি আয়োজনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘নয়াচীন’ গ্রন্থ তিনটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিল আমার বন্ধু ড. আয়েশা বেগম।

আমাদের আরেক প্রিয় সহকর্মী ড. সেলিম ছিল প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব। সেই সময়ে ইডেন কলেজের শিক্ষক হিসেবে আমি, সানজিদা আখতার, অধ্যক্ষ তাহমিনা বেগম, বিভাগীয় প্রধান খুরশীদ আরা হাইসহ কয়েকজন ছিলাম সহসভাপতির দায়িত্বে। বর্তমানে আমরা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। মহাসচিব পদে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছে আমাদের আর এক প্রিয় সহকর্মী ফারজানা পারভীন শিল্পী ও সভাপতি ড. রতন সিদ্দিকী।

যাত্রাকালের শুভ সকাল থেকে আজও ভাষার পরিশুদ্ধতা নিয়ে কাজ করছি আমরা। এজন্য চট্টগ্রাম, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে সেমিনার ও পথসভা করেছি। নীলক্ষেতে সাইনবোর্ড লিখিয়েদের সঙ্গে কথা বলেছি, শুদ্ধ বানানে লেখার প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়েছি। এছাড়া, ভাষার দূষণ নিয়ে শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, রম্য বিতর্ক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছি শিক্ষকদের নিয়ে।

বাংলা ভাষা পর্ষদের এক অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় গাফফার চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথির ভাষণে ও তাঁর কলামে ‘বাংলা পর্ষদ’-এর কর্মসূচিকে বাংলা ভাষার তৃতীয় পর্বের আন্দোলন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

ফিরে আসি বানানের প্রসঙ্গে, বাজারের ফর্দসহ বাংলা ভাষায় যা কিছু লিখি না কেন, যদি বাহান্নোর ভাষা শহীদদের রক্ত ঝরার চিত্রকল্পটি মনের কোণে থাকে, মহৎ ভাবনায় থাকে যদি আপনার পৃথিবীতে বাঙালি একমাত্র সেই জাতি, যাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্যে প্রেম, ভালোবাসা ও সর্বোপরি রাজপথে রক্তদানের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। তাহলে কিন্তু বানানের ভুল অনেকাংশে কমে যাবে বলে বিশ্বাস করি। জানি, তারপরও আমাদের বানানে অনেক ভুল থেকে যায়।

এই ভুল-ত্রুটির অনেক কারণের মধ্যে,

১। আমাদের আঞ্চলিক উচ্চারণ ত্রুটি
২। অমনোযোগিতা
৩। শব্দের মূলের প্রতি অনুগত না থাকা, এবং
৪। ভাষার প্রতি অপ্রেমও অন্যতম কারণ বলেই আমি ভাবি।

আপনারা আমার সঙ্গে একমত হতে নাও পারেন। তবে, কথা হলো আমরা আন্তরিকভাবে যা চাই, তা কিন্তু করে ফেলতে পারি, তাই না? আমরা সেই অসম্ভবকে সম্ভব করা জাতি। না হলে বুকের সাহস আর ভালোবাসাকে অস্ত্র বানিয়ে, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে একটা দেশকে স্বাধীন করা কি চাট্টিখানি কথা!

মহান নেতার, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পাওয়া সেই স্বাধীন দেশের নাগরিক আমরা। ভাষার প্রতি আমাদের অনেক দায়িত্ব কিন্তু। শিশুকাল ছাড়িয়ে সন্তানেরা স্কুলে চলাচল শুরু করলেই বিশেষ ভাবে মা এবং বাবাও তাকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে স্বপ্ন দেখায়। শিশুরা নিজেরাও বড় হয়ে অনেক টাকার মালিক হবার কথা ভাবে, কিন্তু কী উপায়ে টাকা হবে তা হয়তো ওই বয়সে ভেবে পায় না। তা, বেশ। পরেই না হয় ভাবুক। কিন্তু বাবা-মায়ের দায়িত্ব যেন আমরা ভুলে না যাই। যখন সন্তানকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ল’ ইয়ার, বর্তমানে রাজনৈতিক নেতা হবার কথা বলি আমরা, সঙ্গে-সঙ্গে যেন নির্ভুলভাবে বাংলা ভাষাটাকে জানতে, শিখতে ও লিখতে যে হবে, এ কথাও যেন বলি, বিশেষভাবে।

ভাবুন তো, এই বাংলা ভাষায় যিনি নোবেল পুরস্কার এনে দিলেন, যে বইটিকে কেন্দ্র করে সেই ‘গীতাঞ্জলি’ বানানটিও কারও কারও লেখায় ভুল দেখি। এক্ষেত্রে সন্ধিবিচ্ছেদ মনে রাখলেই ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। যেমন: গীত+অঞ্জলি= গীতাঞ্জলি। কত সহজ তাই না? শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে ফুলের যে চক্রাকার পুষ্পার্ঘ্য নিয়ে যায় সবাই। তার অধিকাংশ ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’ শব্দটি দীর্ঘ-ঈ-কার দিয়ে ভুল করা হয়। আমরা যদি মনে রাখি, অঞ্জলি বানান যেহেতু হ্রস্ব-ই কার, কাজেই তা অবশ্যই হ্রস্ব–ি-কার হবে। একইভাবে লিখুন, শ্রদ্ধা+অঞ্জলি=শ্রদ্ধাঞ্জলি। ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো সার্থক হবে যদি বানানটি শুদ্ধ করে লিখতে পারি, তাই নয় কি?

একইভাবে সন্ধিবিচ্ছেদ মনে রাখতে সাহায্য করবে আরও কিছু বেয়াড়া বানানের ক্ষেত্রেও। যা বাগে থাকে না। দুঃ+অবস্থা=দুরবস্থা, (সূত্র: বিসর্গের পরে অ থাকলে বিসর্গ স্থানে ‘র’ হবেই, কিন্ত ‘র’ পরে আকার হবে না কিছুতেই)। দীর্ঘ-ঊ/ূ কার দিয়ে ‘দূর’ ছাড়া যত শব্দ আছে ‘দুঃ’ দিয়ে সর্বত্র হ্রস্ব-উ/ ু-কার হবে।

যেমন: দুর্ভিক্ষ, দুশ্চিন্তা, দুর্নীতি, দুঃসময়, দুর্বিনীত, দুর্দিন, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, দুর্বহ ইত্যাদি।
আর একটি কথা বলি মনে রাখার সুবিধার্থে। ‘অদ্ভুত’ ছাড়া সব ভূত দীর্ঘ-ঊ/ূ কার।
কিভাবে, কেমন করে?
‘ভূত-প্রেত’ দেখে কে না ভয় পাই, বলুন।
‘কিম্ভূত’ কিমাকার মানুষও কী কম আপনার আমার চারপাশে।
ভালো কথা শুনলে মনটা এমনিতেই ‘দ্রবীভূত’ হয়ে যায়। যায় না কি?
এত ভালোবাসা পেলে কে না ‘অভিভূত’ হবে!
অন্তর্ভূক্ত, বহির্ভূত ছাড়া আরো কিছু শব্দ না হয় আপনিও খুঁজে বের করুন।

মানুষ মাত্রই দ্বৈত ‘সত্তার’ অধিকারী, তাই না?
‘সত্তা’ লিখতে কখনো ব-ফলার দরকার হয় না। কিন্তু তা ‘সত্ত্বেও’ লিখতে ব-ফলার কথা ভুলে যাবেন না।
দৈন্য লেখা ঠিক আছে কিন্তু যদি ‘দৈন্যতা’ লিখেন ভুল হবে, পরীক্ষার খাতায় নম্বর কাটা যাবে। কাজেই লিখতে হবে ‘দীনতা’।
যেমন দরিদ্রতা, কিন্তু দারিদ্রতা নয় কোনো মতেই।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি যদি আপনার আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করে, করুন না। দেখুন, সেখানে কিভাবে আছে সে।

‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান।’

ওহ্, হ্যাঁ, আর একটা কথা—‘ব্যাখ্যা’র সঙ্গে ‘ব্যথা’ এবং ‘ব্যবসা’কে কখনো ভুলেও মেলাবেন না। এখানে আকার/া-নেই কিন্তু।
নিজের (‘স্ব’ অর্থ নিজের) ধর্মে বিশ্বাস করে যে, সে তো ‘স্বধর্মে’বিশ্বাসী মানুষ। তাকে ভুল বোঝার কোনো কারণ নেই।

আর সব সময় স্ত্রীসহ চলাফেরা করেন যে ভদ্রমহোদয়রা তাদের কখনো একা নয়, ‘সস্ত্রীক’ (স-অর্থসহ) নিমন্ত্রণ করতে ভুলবেন না যেন।

যে বিদ্যা আয়ত্তে নেই, তার আবার স্বায়ত্তশাসন (‘স্ব’ অর্থ নিজের) কী? স্ব+আয়ত্ত=স্বায়ত্ত+শাসন (স্বায়ত্তশাসন) বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান যেমন, বাংলা অ্যাকাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

‘মুহূর্ত’ বানান মূহুর্ত লিখে ভুল করে ‘মুমূর্ষু’ হবেন না, ‘সুষ্ঠু’ভাবে বলুন ও লিখুন।

দন্ত্য-স দিয়ে বিদেশি শব্দ, তালব্য-শ দিয়ে সব দেশি শব্দের উচ্চারণ, মনে রাখুন। কেন বললাম, সালাম, সালমা, স্কুল, স্টেশন—বিদেশি এই শব্দগুলা লিখছি দন্ত্য-স ব্যবহার করে। কিন্তু উচ্চারণ করছি ইংরেজি S-সাউন্ডের মতো করে। কিন্তু ইংরেজি Shirt=‘শার্ট’ লিখছি তালব্য শ দিয়ে। কারণ একটাই, ইংরেজি S স্থানে দন্ত্য-স এর উচ্চারণ হবে। এবং ‘Sh’ থাকলে সেখানে তালব্য-শ লিখতে হবে।

মূর্ধন্য-ষ-কে আপাতত তৎসম’র (তৎসম শব্দের অর্থ তার সমান, অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দের সমান) জন্যে তুলে রাখুন। যেমন, বৃষ, বৃষভ, ষণ্ড বা ষাঁড় একই তো কথা। ষষ্ঠবার যদি বলি, তবু অর্থ একই। ষাঁড় গরু।

‘আষাঢ়’ মাসে খাদ্য ঘাটতি তো হতেই পারে। বাঙালি মাত্রই ‘বর্ষা’কালের এই চিত্র সবার জানা। তাই নয় কী বন্ধুরা! জানেন তো, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুয়াযী, অধিকাংশ দীর্ঘ-এর বিকল্পে ঈ-ঊ কারের জায়গায় হ্রস্ব—ই, উ হয়ে থাকে। বাড়ি, গাড়ি, পাখি, ইংরেজি, জাপানি—সবই হ্রস্ব-ি কার। এমনকী ‘ভারি’, ‘রাজশাহি’ও আপনি হ্রস্ব—কার দিয়ে লিখতে পারেন।

আমি কিন্তু একটু সেকেলে মানুষ, কাজেই অধিকাংশ বানানে হ্রস্ব-ই কার দেই বটে। কিন্তু ভারী-তে দীর্ঘকার না দিলে ততটা ভারবাহী মনে হয় না আমার কাছে।

একইভাবে রাজশাহি হ্রস্ব—ই-কার দিলে তার ‘বাদশাহী’ ভাবটা যেন থাকে না বলে মনে হয় আমার। কাজেই এই দুটি বানানের কাছে আমি আটকে আছি এখনো। আপনারা তরুণেরা কিন্তু হ্রস্ব-কারে চলে যাবেন দ্রুত।

তবে আমাদের মতো চন্দ্রবিন্দু সঙ্গে নিয়ে দৌড়াবেন না যেন। জানেন তো, দৌড়ের চন্দ্রবিন্দু উঠে গেছে কিন্তু। কাজেই সাবধানে দৌড়াবেন। গতি ছাড়া কি উপায় আছে জীবনে?

২২/৯/২০২০
আইসবোট টেরেস, টরন্টো।

 

দিলারা হাফিজ

কবি দিলারা হাফিজ। ১৯৫৫ সালের ২০ নভেম্বর মানিকগন্জের গড়পাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা বখশী হাফিজ উদ্দিনআহমেদ, মা রহিমা হাফিজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি. এ অনার্স ও এম এ করেছেন। ১৯৯৮ সালে ঢাবি থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রিলাভ করেন। ৩৭ বছর শিক্ষকতা জীবনে সরকারি কুমুদিনী কলেজ, ইডেন কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায় ছাড়াও মিরপুরের সরকারি বাঙলাকলেজ ও তিতুমীর কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যানহিসেবে চাকুরি থেকে অবসরে যান।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:

১।ভালোবাসার কবিতা, ২।পিতা কিংবা পুত্র অথবা প্রেমিক ৩। প্রেমের কবিতা ৪। কে নেবে দায় ৫। খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান ৬। অবিনশ্বর আয়না ৭। নির্বাচিত কবিতা
৮। নারী সংহিতা
গবেষণা গ্রন্থ: বাংলাদেশের কবিতায় ব্যক্তি ও সমাজ (১৯৪৭–১৯৭১)
স্মৃতি গদ্য: আনন্দ বেদনাযজ্ঞে রফিক আজাদ
স্মৃতি উপন্যাস: কে প্রথম কাছে এসেছি
শিশুতোষ:সুষমার গল্প
অনুবাদ:মার্কিন কবি ক্যারোলাইন রাইট ও ভারতীয় বহুভাষাবিদ পণ্ডিত শ্যাম সিং শশী নারী অধিকার সম্পর্কিত তাঁর অনেককবিতার অনুবাদ করেছেন।
সম্পাদনা : গদ্যের গহন অরণ্যে
১৯৮৩ সালে কবিতার জন্যে লা ফর্তিনা সম্মাননা ও ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও নেপাল ফ্রেণ্ডশীপ সম্মাননা লাভ করেন। বিটিভির বহুল প্রচারিত ও জননন্দিত গণশিক্ষামূলক অনুষ্ঠান “সবার জন্যে শিক্ষা” গ্রন্থনা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন ২২ বছর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অন্যতম প্রধান কবি রফিক আজাদ (প্রয়াত) এর স্ত্রী। দুই পুত্র সন্তান অভিন্ন ও অব্যয় এর জননী।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।