আলভারো মাতা গিইয়ের কবিতা

[ল্যাতিন আমেরিকান কবি আলভারো মাতা গিইয়ে (Alvaro Mata Guille)-এর জন্ম সেন্ট্রাল আমেরিকার কোস্টা রিকায়, ১৯৬৫-তে। তিনি বর্তমান সময়ে ল্যাটিন সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য একজন কবি ও শিল্পধারক। আলভারো মাতা গিইয়ে একাধারে কবি, নাট্য-নৃত্য পরিচালক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও নাট্যকার। তিনি মূলত স্প্যানিশ ভাষায় লিখে থাকেন। ১৯৯৮ সাল থেকে আলভারো মাতা আন্তর্জাতিক স্বাধীনতা ও কবিতা উৎসব(মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো)-এর সাধারণ পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া আরও অসংখ্য শিল্প প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। বর্তমানে এই কবি মেক্সিকোতে বসবাস করছেন। প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থগুলির কয়েকটি হল: Debajo del viento (বাতাসের নিচে); Sobre los fragmentos (টুকরো টুকরো সম্পর্কে); Un país sin nombre (নামহীন এক দেশ) Más allá de la bruma (কুয়াশা ছাড়িয়ে) ও  Una serpiente sin alas (একটি ডানাবিহীন সাপ) আলোচ্য কবিতাগুলি Un país sin nombre বা নামহীন এক দেশ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।]

 

১.
ছোটবেলায়
মেঘের সাথে নিজেকে গুলিয়ে ফেলে প্রশ্ন করতাম,
নিজেকে ছেড়ে দিতাম ধুলোমাটি জাপটে ধরা অলস ঝিমুনির হাতে,
সে এক সময় ছিল কালহীন সেসময়-

কত দূরের, কত স্মৃতি মেদুরতার,
সুদূর ব্যবধানে নিজেকে জেগে উঠতে দেখতাম, জাগরণ পাহাড়েও
যা মুছে দিত ডাইনিবুড়ির গুহাদের,
জেগেছি ছোট ছোট টিলামুখী গাছেদের ডালপালায়,
যা মিশে যেত কুয়াশায়, শূন্যতায়;

কতগুলো ছোট ছোট রাস্তা ছিল ওখানে
সূর্যের চারপাশ ঘিরে আর ভূতেদের কলনাদ,
ঘরবাড়ি থেকে ভেসে আসা ছায়াদের কণ্ঠ,
আলো আঁধারির কোন অবগাঢ় পূর্বেরও পূর্বকালে,
নিস্তব্ধতায় বিভ্রান্ত,
খুঁজে যেতে যেতে উপলব্ধি হত (ধূলিকণা, বৃষ্টি, ঝড়, এইসব
বিষয়ের স্তূপের ভেতর)
কী ছিল আমার মুখ,
কোনটাই বা কণ্ঠ
এক ছায়া;
নামহীন এক স্থানে জন্ম আমার
অনুপস্থিতদের দেশ এক বলেছিলেন খোর্খে আর্তুরো
এক মফঃস্বল নাম যার এউনিসে ওদিও,
এক স্থান যা ছিল না কোন স্থান বলতাম আমিও
*এউনুসে ওদিও (Eunice Odio) কোস্টা রিকার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবি। হিস্পানিক সাহিত্যের বিশের শতকে নারী স্বাধীনতার পক্ষে যারা লিখে গেছেন তিনি তাদের অন্যতম পুরোধা।

২.
ভাবতাম রাতে বহুদূরের কোন স্থান,
হাঁটাপথ,
অন্ধগলিরা,
ফুটপাথে রয়ে যাওয়া গোড়ালির ঠুকঠুক স্বর,
জঙ্গলে যারা পলাতক,
ছেড়ে চলে যাওয়া দূর থেকে দেখায় ঝলমলে,
স্মৃতি কাতরতা ফিরে ফিরে আসে এক অনুভূতি নিয়ে

কোন এক হারিয়ে ফেলা
পাহাড়ের খাঁজে ভাঁজে চমকানো
আলোকমালা চেয়ে দেখতে দেখতে,
খাঁজ খাদ ঢেকে দেয়া
ডাইনির ঠিক পাশটির বাড়িগুলিতে
গাছেদের মাঝখানে,
নির্বাসন,
দূরত্ব

ইলশেগুঁড়িতে ভিজে ঝুপ্পুস,
কিছু থেকে কোন কিছু খুঁজে যেতে যেতে,
ওখানেই রয়ে যেতে যেতে আছি এইখানে,
সবকিছু ছিল সমগ্রে-
অপরিচিত, স্বপ্ন,
মুহূর্ত বদলে যেত ঘোর অনিশ্চয়তায়,
উত্তরের খোঁজে ধাবমান অতীতে যে নীরবতা,
তবু উত্তরেরাও ততখানি জবাব হয়ে ওঠে নি,
মৃতের আগমনের অপেক্ষা করতে করতে,
উপল খণ্ড যারা নরকে হারিয়ে ফেলে নিজের ঔজ্জ্বল্য,
যেভাবে পাহাড়ের গায়ে মিশে যায় বৃষ্টিধারা,
আমাদের ভেতর যা কিছু বলে ওরা,
ইতিমধ্যে কুয়াশা এসে পৌঁছয়

৩.
প্রায় ভোর হয় হয়
তখনও রয়ে গেছে কিছু তারার দল,
অবরুদ্ধ বাতাস এবং বৃষ্টিকে সাথে করে,
লোকালয় থেকে আমার লোকালয়ে
তখনও পরিভ্রমণ রত,
ছায়া, কুয়াশা,

মরুভূমি পুনরায় দৃশ্যমান হয়,
কিছু ঘুমন্ত পাহাড় চূড়া,
প্রায় আবছা ভেসে আসে সঙ্গীতের মূর্ছনা,
ছন্দ শূন্যের দিকে হেঁটে যেতে থাকে

সুদূর ছিল এখানে
আসা যাওয়া যে করত সেতো অপর কেউ-

ছায়া, কুয়াশা, সবচেয়ে অনুপস্থিত যা,
দূর থেকে ফিরতে থাকা অতীত
সবকিছু ছিল সমগ্রে,
ছায়া, কুয়াশা,
অনুপস্থিত
নীরবতা ডুবে যেত নির্লিপ্ততায়,
পাশ না কাটিয়েও চলে যেত পাশ দিয়ে-

একটি পাখি, একটি মেঘ,
বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া পথেদের মাঝখানে নতুন ওঠা সূর্য,
শেকল আছড়াতে থাকা কুকুর,
এক চিৎকার, একটি পাখি,
এক কুয়াশা

বিকেলের গোধূলি দেখে ফেরে,
খুঁজে ফেরে কোন অশরীরী,
অবাক হওয়া,
ধুলোর মূলেরও মূলটুকু
তবু ওখানে কিছুই ছিল না

 

জয়া চৌধুরী

জয়া চৌধুরী মূলত: অনুবাদক। তিনি কাস্তেইয়ানো বা স্প্যানিশ ভাষা থেকে অনুবাদ করে থাকেন। এতাবৎ প্রকাশিত ৬ টি বই। এছাড়াও ভারত, বাংলাদেশ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশের অসংখ্য পত্রিকা ও ম্যাগাজিন ও ব্লগে নিয়মিত অনুবাদ করে থাকেন। কলকাতায় রামকৃষ্ণ মিশন গোলপার্ক ও শিবপুর বেসু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। একটি মৌলিক কবিতার বই আছে পাঁচ নারী কবির সঙ্গে যৌথ ভাবে।

 

 

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।