নাহিদা আশরাফীর তিনটি কবিতা

আমাদের মা মূর্খ ছিলেন

আমরা জানতাম আমাদের মা খুব গরীব। আমরা তিন ভাইবোন অবশ্য এসবের ধার ধারতাম না। খিদে পেলেই ইসরাফিলের শিঙ্গার চেয়েও জোর চিৎকারে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতাম।

মা তখন মাটির ভাড়ে রাখা ইতিহাসের আটায় কিছু ভুগোল মিশিয়ে রুটি বেলে দিতেন। তপ্ত তাওয়ায় রুটি এক বিপন্ন মানচিত্র হয়ে উঠতো।
ওইদিনই জানলাম মা আমার কত বড় ইতিহাসবিদ।

আমাদের গলা দিয়ে শুকনো রুটি নামে না। মা বললেন, ‘কিছু মিথ্যে মাখিয়ে নে বাছা। মিথ্যে মাখনের কাজ করে। রুটি গিলতে সুবিধেও বেশ।
ওইদিন টের পেলাম মা আমার কত বড় রাজনীতিবিদ।

চাল- না ছিলো মাথার উপরে, না ছিলো উনুনে, না ছিলো সামাজিকতায়৷ অন্য দুটির থোড়াই কেয়ার করতাম। কিন্তু উনুনমুখী চালের জন্যে জন্যে আমরা নেকড়ের মুখ অথবা শাপের গর্তেও হাত ঢুকিয়ে দিতে পারি। কিন্তু এসবের কোন প্রয়োজনই হত না। ধানক্ষেতে ইদুরের গর্ত কোথায় মা ঠিক জানতেন। সারাদিনের সংগ্রহ তিন মুষ্টি চাল। তাতে কতটা জল মেশালে তিনজনের দুইবেলার ফেনাভাত তৈরি হবে; মা ঠিকঠাক মেপে নিতেন।
সেই থেকেই জানতাম মা কতবড় গণিতবিদ।

একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, একজন প্রজ্ঞাবান ইতিহাসবিদ, একজন অনন্যসাধারণ গণিতবিদকে সারাজীবন মূর্খ ভেবে বড় হওয়া এই আমরা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগুজে সার্টিফিকেট নিয়ে বড়াই ও লড়াই করতে করতে সতত ভুলে যাই, আমরা সত্যিই কতটা মূর্খ!

এ শহর জানে শুধু দুঃখশুমারী

আহারে গেরামের পোলা
নদীতে সাতার কাইটা বড় হওয়া পোলা
দ্যাখো, দ্যাখো তোমরা;
কেমন উইড়া উইড়া শহর ছাড়তাছে
এই শহরে থাকা মানে তো
রোজ রোজ চোখের পানি মজুদ করা
রোজ রোজ দুঃখশুমারী করা
রোজ কষ্টের সাথে কাবিন করা দুঃখের দেনমোহরে।

তা কতদূর উড়লেন বাজান?
এই মৃত্যুপুরী ছাইড়া কতদূর গেলেন?
আদৌ কি যাইতে পারলেন?
এক আজব সার্কাসের সুতায় ঝোলা জীবন
নিচে যার ঠা ঠা হাসে রোজ কেয়ামতের আগুন

তারচেয়ে চলেন, আমরা আগুনের সাথেই সমঝোতা করি
প্রতিদিন রাস্তায় নামি; নিজেই নিজের নিলাম সম্পন্ন করি,
নিজেরে বেইচা দিয়া কিনি যান্ত্রিক বাতাস
বিপদকালে সেই বাতাসে য্যান দিতে পারি অনন্ত উড়াল।

অতঃপর;
নিজেই নিজের জানাজা পড়ি।
নিজেই নিজের লাশ কান্ধে নিয়া হাটি।
নিজেই নিজের চিতায় ধূপধুনা আর ঘি ঢালি।
আগুন লাগবো না।
শ্মশান সাক্ষী আছে;
বাইচা থাকতে কত আগুন নিত্য পোড়াইছে আমাগের।
মাটিও লাগবো না
কাদামাখা জীবনে যাপনের চাপ তো কম সহ্য করি নাই।

এই শহর এক আজব কর্পোরেট ব্যাংক
মৃত্যু, বিষাদ আর পোড়া লাশ জমানোর জইন্যে
এর চাইতে অভিজাত ব্যাংক
আপনে আর কই পাইবেন?

(বানানীতে এসি’র বিস্ফোরনে অগ্নিদগ্ধ প্রাণ যারা বেঁচে থেকেও প্রতিনিয়ত আগুনেই পুড়েছে তাদের প্রতি)

চাঁদ মাতা

এই যে এত কথা বলি, স্বল্পমূল্যের ফুলদানিতে কিছু মিথ্যেফুল সাজানোর বাসনায়; আপন-পিয়াসী মন তো জানে, এক উৎকন্ঠিত শামুকের পীতবর্ণ খোলসের মাঝে এ কেবলই নিজেকে লুকানোর প্রয়াস। লুক্রেতিউস, আমিও তোমার মত। রোমান লুপ্তপ্রায় হরফে নিজের ঠিকানা লিখেছিলাম। পৃথিবীর কোন দেয়ালেই আর লেখা নেই তা। সেই থেকে আমরা কেবলই ঠিকানা বদলে যাই। আমি যখন রবীন্দ্রনাথের লাবণ্যে, তুমি তখন হাসানের উজ্জ্বল পাথর যে কেবলই লাবণ্য ধরে। আমি সিমোনেত্তা হলাম। তুমি সান্দ্রো হয়ে এঁকে দিলে ‘দ্যা বার্থ অব ভেনাস।’ অরণ্য জানে, সবুজ পাতার খামে ভরে কত মৌলিক মৌসুম পাঠিয়েছি। আগ্নেয়গিরি দেখেছে, গলিত লাভার ঝুড়ি ভরে কতটি মহাসমুদ্র উপহার দিয়েছি। আর জানে জোনাক পোকা, যার সাথে উড়ে উড়ে প্রাণায়াম আর প্রার্থনায় বসেছি। আমাদের সফল মিলন শেষে আমারই গর্ভজাত চাঁদ জন্ম নিলো এ পৃথিবীতে। আমরা তার নাম রাখলাম জোছনা।
অবশেষে ঠিকানা হারাবার বা খুঁজে পাবার প্রবল ভয় আর আগ্রহ; দু’টি থেকেই আমরা মুক্ত হলাম অনাদিকালের মত…

 

নাহিদা আশরাফী

একজন সম্পাদক, কবি, গল্পকার ও প্রকাশক। বাংলাদেশে জন্ম, ১মার্চ, ১৯৭৩। সম্পাদক ও গল্প লেখক হিসেবে সম্মানিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন বহুবার- অপরাজিত সাহিত্য পুরস্কার, উদ্ভাস সাহিত্য সম্মাননা, সমতটের কাগজ সাহিত্য সম্মাননা, আলোক সাহিত্য পুরস্কার, সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার, অনুষা সাহিত্য সহযাত্রী সম্মাননা (কলকাতা), বঙ্গবন্ধু স্মারক সম্মাননা (আগরতলা), যুগসাগ্নিক বর্ষসেরা সম্পাদক (কলকাতা), পিস এন্ড ওয়েলফেয়ার সম্মাননা (আসানসোল), পোয়েট্রি ফর পিস সম্মাননা (চেন্নাই) উল্ল্যেখযোগ্য।
প্রকাশিত বই-
গল্প- মায়াবৃক্ষ(একাত্তর প্রকাশনী-২০১৬)
জাদুর ট্রাঙ্ক ও বিবর্ণ বিষাদেরা (পরিবার পাবলিকেশন্স-২০১৮)
কবিতা- শুক্লা দ্বাদশী (বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব-২০১৪); দীপাঞ্জলি(জাগৃতি -২০১৫); এপিটাফ (কুঁড়েঘর-২০১৫); প্রেম নিয়ে পাখিরা যা ভাবে (পরিবার পাবলিকেশন্স- ২০১৮); Tenets of sadness (Bilingual book of poetry, পরানকথা-২০২০)
সম্পাদিত গ্রন্থ- মুক্তির গল্পে ওরা এগারোজন (মুক্তিযুদ্ধের গল্প সংকলন); পরিবার পাবলিকেশন্স (২০১৭); বিজয় পুরাণ (বিজয়ের গল্পসংকলন-২০২০, বাংলাপ্রকাশ)
সম্পাদিত পত্রিকা- জলধি (সাহিত্যের কাগজ)
পেশা- পরিচালক- কবিতাক্যাফে
সম্পাদক/প্রকাশক- জলধি
ইমেইল- [email protected]

Facebook Comments

2 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।