রুখসানা কাজলের গল্প: করাল দুপুর  

জয়ঢাক পেট নিয়ে রোজ আসে নাজলি। এসে বসে থাকে পুড়ে ধ্বসে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পোশাক কারখানার সামনে।

তেরো দিন আগে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে কারখানা। স্তুপ স্তুপ ইট, কাপড়ের ভস্ম,  মেশিনের দু একটা অংশ পড়ে আছে পোড়ামাটির উপর। সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছে সেনাবাহিনীর লোকজন। কয়েকদিন আগেও কিছু লাশ পাওয়া গেছে। এরপর কিছু বিচ্ছিন্ন মাথা, হাড় গোড়। কদাচিৎ দু একটি আস্তো হাত। মেয়েদের । হাতে চুড়ি। পুরুষদের। নাজলি বোঝে আর কোন আশা নেই। সব শেষ। তবু ওরা আসে। ওর মত অনেকেই এসে বসে থাকে। যদিও কমে যাচ্ছে ওদের সংখ্যা। বাস্তব বুঝতে পেরে অনেকেই বিশেষ করে পুরুষরা কাজ খুঁজে নিচ্ছে।

নাজলি ভরা পোয়াতি। কাজ পেলেও করতে পারবে না। ভারি শরীরটাকে ঢেকেঢুকে একটু আড়াল খুঁজে বসে থাকে। বার বার মনে করার চেষ্টা করে, সামাদ সেদিন কি শার্ট পরে কাজে এসেছিল ? আচ্ছা, শার্ট নাকি গেঞ্জি পরেছিল সামাদ ?

একটা হলুদ চেক্‌ শার্টে কালো বোতাম লাগিয়ে দিয়েছিল নাজলি। মাথায় খাটো ছিল বলে ফুলপ্যান্টের ঝুল কেটে সেলাই করে দিতে হত। শীত গ্রীষ্মে কখনো জুতো পরত  না। নিজেই বলত, ধুর আমার হল গিয়ি চাষার পা। জুতও পরলি মুজো পরতি হয়। কুটকুট করে তালু ! আমার স্যান্ডেলই ভাল।

হাসিখুশি সরল আর স্নেহপ্রবণ মানুষটা এইভাবে জ্বলে পুড়ে মরে গেলো ? আহা রে!

পোড়া কারখানা থেকে আগে ধোঁয়া  বেরুতো। তাতে উগরে উঠত মাংস পোড়ার গন্ধ।  পেট গুলিয়ে বমি আসত ওদের। মুখে কাপড় গুঁজে ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকত সবাই। কার গায়ের গন্ধ ! কার ?

থকথক করে কেঁদে ফেলত কেউ কেউ।

এখন কেবল ঝালা ঝালা পোড়া গন্ধ ভেসে আসে। নাকে কাপড় দিয়ে পোড়া কারখানার দিকে তাকিয়ে অনেকেই সুর তুলে কাঁদে। গালাগাল দেয়। অসহ্য রাগে অভিশাপে অভিশাপে কারখানা মালিক, সরকার,‌ বড়লোকদের ছেলেমেয়ে চৌদ্দ পুরুষের  বংশ লাল করে আবার কাঁদতে বসে। এরমধ্যে কেউ কেউ ফিসফিস করে, সরকারে কি ক্ষতিপূরণ দেবেনে?  কত দেবেনে জানো নাহি ও  ভাইজান ?

কেউ একজন জানায়, টেহাটুহা কিছু নাহি দেবেনে। তয় লাশ লাগবিনে আর —

কি কলে? লাশ হলিও হবিনানে ? তয় ? কি মিলতি হবিনে ? ডিয়ানে ! সে আবার কি গো ?

সেনাবাহিনীর ফাই ফরমাশ খাটা চ্যাপ্টা চেহারার লোকটাকে ওরা পুলিশ ভাইজান বলে ডাকতে শুরু করেছে। লোকটা তার মত করে ডিএনএ বুঝিয়ে দেয়। তা শুনে মুখ শুকিয়ে যায় অনেকের। বদলি লেবারদের আত্মীয়স্বজনদের শঙ্কা আশঙ্কা পেয়ে বসে।  অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানে, কতজন ত খাতায় সই না করেই কাজ করে। বেতন নেয়। ডেইলি লেবারদের কে কবে নাম ঠিকানা দশ পুরুষের ইতিহাস জেনে বুঝে লিখে রাখে ! এখন কি  হবে তাদের?

বাতাসে উড়ো খবরও আসছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ভয়ে আর দেশের দূর্ণাম ঢাকতে লাশ নাকি গুম করে দিচ্ছে !

জটিল কুটিল বাতাস অভাগাদের জটলা ছুঁয়ে যায়। দম আটকে যায় ওদের।  কিছুক্ষণের জন্যে সুনসান হয়ে যায় চারপাশ। খানিক পরেই অবরুদ্ধ দুঃখের ভার ভেঙ্গে কেঁদে ওঠে কেউ। কেঁদে কেঁদে কোন মা হয়ত বুক চাপড়ে বলে ওঠে, আল্লারে তুমি নাই, নাই  নাই,  গরীবির জন্যি তুমি  নাই । ও আমার দরদি আল্লাহ কি করলে তুমি আমাগের ! আমরা এহন কোহানে যাব, কি খাবো—ও সবুর সবুর রে—

সবুরের মার সাথে ডুকরে ওঠে সন্তানহারা স্বামিহারা স্ত্রীহারা ভাইবোন বন্ধুহারা আরও অনেকে।

 

রমযান মন্ডল কাম চোর। রোজ সকালে এদের সাথে এসে বসে থাকে। ট্যাঁকে তেমন  টাকাপয়সা নাই। তবে বকবকানিতে ষোলোআনা। ভাল পোশাকআশাক দেখে প্রথম দিকে ওরা  ভেবেছিল হয়ত ছোট সাংবাদিক। এখন ওদের একজন হয়ে গেছে রমযান। এদের মতই পাউরুটি চা বিস্কুট দিয়ে দুপুরের খাবার খায়। এদের মতই অসহায় মুখ করে চেয়ে থাকে তামা তামা হয়ে যাওয়া ট্যাম্পাকো কারখানার ভুতুড়ে চেহারার দিকে। এখানে  রোজ  আসত সে। বাসের টিকিট না কেটে সকালে রওনা হত। কখনও ধরা খেলে মাথার পেছনে দুই চারটা থাবড়া মেরে নামিয়ে দিত টিকিট চেকার। হেল্পার ছেলেটা মুখতোড় গালি দিত, ওই শালা,  চুতমারানির ছেল্যা ফের যদি  ফাউ উঠিস ত তোর মারে —

রমযান এখনও বাসের টিকিট কাটে না।

অইসব গালিতে রমযানের কিচ্ছু আসে যায় না। সব শালাই অই চুতিয়া পথে  এ পৃথিবীতে এসেছে। তবে এটা সত্যি, সে হলো আসলি চুতিয়া। বাপ পালিয়ে গেছে ইন্ডিয়া। মা   এই নিয়ে পাঁচটা বিয়ে বসেও সুখ পায়নি। সবগুলো বাপই ওকে এরচে খারাপ খারাপ গালি দিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কাজ করতে ওর মন লাগে না। ভাল জামা কাপড় পরে কলেজে যেতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে শাহবাগের মোড়ের ছাত্রনেতাদের মত গলায় চাদর ঝুলিয়ে বক্তৃতা দিতে। কবিতা পাঠের আসরে জমিয়ে কবিতা পড়তে। আর মাত্র একটা ক্লাশ পড়তে পারলেই সে কলেজে যেতে পারত। পড়াশুনায় খারাপ ছিল না ।  কিন্তু মার এই ম্যারাথন বিয়ের জন্যে  সব শেষ হয়ে গেলো !

এই কারখানায় ওর কাজ করার কথা ছিল। মাই ঠিক করে দিয়েছিল। কথা ছিল ঈদের পর বদলি লেবার হিসেবে সে কাজ করবে। আর ওপেন ইশকুলে পড়াশুনা করবে। রমযান পালিয়ে গেছিল কাজের ভয়ে। কিন্তু ওর মা হল সিআইএ বা  মোসাদের এজেন্টদের মত। পালিয়ে যেখানেই থাকুক ঠিক খুঁজে বের করে আনে।  হাতে পায়ে ধরে কাঁদে। বোঝায়, ও বাবা রাজা তুই ছাড়া আমার কে আছে আর !  আমার যে একূল ওকূল কিছুই নাই।

রমযানের অভিমান হয়। ইচ্ছা করে বলতে, তালি তুই এত বিয়ে বসিস ক্যান মা। তোর স্বামিগুলো কেউ ভাল না। সবগুলো চুতিয়াখোর। তোর কামাই কেড়ে নেয়। বাপটা নাই তুই ত আমারে নিয়ি  থাকতি পারতি মা ! আমারে  আরো কয় ক্লাশ পড়ালি কি ক্ষতি হত তোর ?

কিছু না বলে ঘাড় গুঁজে থাকে রমযান। খুব ভালবাসে মাকে। কি সুন্দর দেখতে  মা। হিন্দু বিয়ে করেছিল বলে দুই পরিবারের কোনো পরিবারেই জায়গা হয়নি। বাপের চেহারা খুব ভাল করে মনে আছে ওর। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পড়াতে বসত। অংক পারলে নাকি সব পারা যায়। যারা বাপকে চেনে তারা বলে, ও ভাবি রমযাইনা য্যান এক্কেরে ওর বাপের লাহান হইছে!

দু বছর আগে সে লুকিয়ে  দেখে এসেছে  বাপের ভিটেবাড়ি। তারাও গরীব। খাস জমিতে থাকে। সে বাড়ির বগলে বেগুন ক্ষেতে কাজ করছিল তেরো চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে। হাতে লাল সূতো বাঁধা । রমযান জিগ্যেস করেছিল, তোগের ক্ষেত ?

হ,  বেগুন গাছের শুকনোপাতা ছিঁড়ে ফেলে ছেলেটা বলেছিল।

তোরা বেগুন বেচিস না?

বেচি ত!

আমার কাছে বেচপি ?

এহুনি নেবা? কয় কেজি নিবা ? নাকি ফাউ কথা মারতিছ ?

ছেলেটার চোখে সন্দেহ আর অবিশ্বাস।  রমযান একটু ভাবে। মনে মনে টাকার হিসাব করে জানতে চায়, কত দাম নিবি ?

দাম শুনে পাঁচ কেজি বেগুন দিতে বলে। চকচক করে উঠে ছেলেটার চোখ, দাঁড়াও দেখি। ঠাকুমারে ডাকি !

বেড়া ডিঙ্গিয়ে ডাক দেয়, ঠাকমা ও ঠাকমা বেগুনগুলো নিয়ি ইদিকে আয় ত ! খদ্দের আইছে।

ঠাকুমা আসতে আসতে রমযান জেনে নিয়েছিল ছেলেটার নাম। পরাণ মন্ডল। বাপ নাই। মরে  গেছে। বাপের নাম ছিল লক্ষ্মণ মন্ডল। এক জেঠা ছিল। সে যেন কোথায় চলে গেছে। বচ্ছরের পর বচ্ছর তার খোঁজ ছেলো না—

 

গলায় হরিমালা সাদা মলিন শাড়ি পরা ঠাকুমার কাছ থেকে বেগুন কিনে গায়ের চাদরে পোঁটলা বেঁধে রাখে। এরপরও সে চলে যায় না। বসে থাকে। জীবনে এই প্রথম  মরিচফুল দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় । পরিক্ষার খাতার মত ধপধপে দুধসাদা রঙ । এই যে বুড়িমা কয়েকটা মরিচ ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেল, সে তার বাপের মা। রমযান মার  কাছ থেকে জেনেছে এই গ্রামের  নাম। বাপের বাবার নাম। বাপের একজন মা , দিদি আর ছোট ভাই লক্ষ্মণের গল্প সে শুনেছে।  মুসলমান বিয়ে করেছে শুনে ছোট ভাইটা নাকি বড়দাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছিল।

মরিচফুলের সাদা বুক দেখতে দেখতে সে পরাণকে জিগ্যেস করে, তোর মা নাই? বেড়ার অন্য পাশে  কাজ বন্ধ করে পরাণও বসে পড়েছে। তারচে সামান্য বড় ছেলেটা বেগুন কিনতে ঢাকা থেকে এসেছে ! এই বেগুন দে কি করবানে তুমি ?

রমযান হাসে, এগুলো ঢাকার বাজারে বেচলি তিন ডাবল দাম পাবানি । তোরা ঢাকা  যাস না ক্যান ?

কাস্তে দিয়ে  ঘাসমাটি এলোমেলো কোপায় পরাণ, আমাগের  ঢাকা যাতি নিষেধ আছে।

ক্যান ?  ভয় পাস নাকি ?

পরাণ মাথা ঝাঁকায়, আরে না ! ভয় কিসির !

তয় ?

পরাণ এবার মাথা নাড়ে। রমযান সোৎসাহে উৎসাহ দেয়, ভোরে বাসে উঠি যাবি। দুই ঘন্টায় পৌঁছে যাবি ফার্মগেট। তোরে এই পাঁচ দশ কেজি বেগুন ঘুরি ঘুরি বেচতি হবিনানে। রাস্তার পাশে বসি থাকলিই এক ঘন্টায় সব বিকরি হয়ে যাবেনে। যাবি আমার সাথে ?

পরাণ মাথা নাড়ে, আমরা অন্যখানে চলি যাতিছি—

ঠান্ডা ঘাস আর বুনো গাছপালার সাথে বসে থাকা রমযান আপনজন হারানো ব্যাকুল গলায় বলে ওঠে, কোথায় যাবি তোরা ? ইন্ডিয়া ? কবে যাবি ? আর আসপি না ?

এবার সাবধান হয় পরাণ, তুমি কেডা কও তো !

রমযানও এবার সাবধানে বলে, আমি রাজা মন্ডল। তোগের গ্রামের তিন গ্রাম পরে  থাকি। বাজারে যাবি কহন ?

এ সময় ঠাকুমা বেরিয়ে আসে, ও পরাণ ভাত খায়ি বাজারে যা দাদু। রোদ উঠি যাতিছে ! বেগুনগুলো শুটো হয়ি যাবিনে যে !

পরাণ  উঠে দাঁড়াতে রমযান বলে, ভাবছি তোগের বাজারটা একবার ঘুরিফিরি ঢাকা যাবো। তুই খায়ি  আয় আমি ইখানে বসি ততক্ষণ।

পরাণ একবার  অবাক হয়। তারপর কি ভেবে  ঠাকুমার সাথে কথা  বলতে বলতে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।

এই প্রথম রমযানের দুঃখ হয়। বেড়ার গায়ে লাগানো নরম ঘাসের মত উলুঝুলু দুঃখে ওর বুক ভরে যায়। একবার ভাবে ডাক দেয়, ও ঠাকুমা  আমি  তোমার বড়ছেলে  রামের ছেলে গো। কিন্তু চেপে যায়। পরাণের কাছ থেকে বাপের ঠিকানা নিতে হবে। বুঝতে পেরেছে পরাণরা আর থাকবে না এদেশে।  কার কাছ যাবে ওদেশে? বাপের  কাছে নিশ্চয় । বাপটা কেমন আছে কে জানে। খুব ভালবাসত তাকে। কাঁধে করে পয়লা বৈশাখে মেলা দেখাতে নিয়ে যেত। কতকিছু কিনে দিত। আদর করে রাজা রাজা করে ডাকত। ক্লাশে ফার্স্ট সেকেন্ড হলে বিক্রমপুরের মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনে আনত। সেই বাপটা পালিয়ে  গেল ওদের কাউকে কিছু না বলে ! কেন গেল? বাপের কি মায়া লাগে না রাজার জন্যে ? রাজার যে বুক পুড়ে যায়!

সামান্য টিনের ঘর, কয়েকটি মোরগঝুঁটি  ফুলের গাছ, তারাফুল, তুলসি  আর পাতাবাহারে অতুল হয়ে আছে বাড়িটা। একটি ছাপা শাড়ি দোল খাচ্ছে দড়িতে । দুতিনটে কলাগাছে লাল মোচাসুদ্ধ ঝুলে  আছে কলার কান। আট ন বছরের হলুদ জামা পরা একটি মেয়ে একছুটে রোদ্দুরে  দেওয়া গামছা নিয়ে আবার ভেতরে চলে গেল। পরাণের বোন শান্তা।  চাদরে বাঁধা বেগুনগুলোর পাশে অভিমান  মাখা মনে বসে থাকে রমযান। ভাতের গন্ধের মত অভিমান ঢুকে যায় ওর মনে।  তার বাড়ি  তার রক্তের মানুষদের কাছে সে কিছুই না । ঠাকুমা একবার তার মুখের দিকে তাকিয়েও দেখল না। পরাণ সে তো ছোট মানুষ । চকচকে রোদ ঢালা  সকালে বাঁশের বেড়ায় মুখ ঠেসে  শব্দহীন  ফুঁপিয়ে কাঁদে বাপের আদরের  রাজা ।

অভিমান তাকে পালাতে শিখিয়েছে। আস্তে আস্তে সরে আসে রাজা । চোখ মুছে আবার দেখে বাড়িটাকে । আর কোনদিন এই বাড়িটায় আসা হবে না। চাদরসুদ্ধ বেগুনগুলো ফেলে আসে। সে যতখানি মুসলমান মায়ের ছেলে ততখানি তো হিন্দু  বাপের ছেলে। ভাল থাকিস পরাণ। ভাল থাকিস তোরা । আমি কিন্তু কিছু মিথ্যে বলি নাই রে। আমি সত্যিই  রাজা । রাজা মন্ডল। তোর দাদা হই রে !

 

জমিরণ বেওয়া রমযানকে ডাক দেয়, ও ছোড সাম্বাদিক একটু জানি আস ত বাবা সরকার কি কিছুই দেবে না আমাগের ?

পোড়া কারখানার পুড়ে যাওয়া বর্জ্য সরাচ্ছে শ্রমিকরা। সেনাবাহিনীর লোক তদারক করছে। আন্তরিকভাবেই তারা রমযানকে জানায়, এ ব্যাপারে ওরা কিছুই জানে না।  তাদের চোখে মুখেও বেদনার ছাপ। নিজেদের  ভেতর তারাও কথা বলছে। এই ভাবে আর কত মৃত্যু হবে অসহায় শ্রমিকদের ? কোন আইন নাই। বিচার নাই। আহারে মানুষ ।

রমযান ফিরে এসে জানায়, ও খালা কোন আশা রাইখেন না অন্তরে। মনে কয় পাওয়ার কিছু নাই।

কাঁদতে গিয়েও থেমে যায় সবাই। নারীরা ঘিরে ধরে কিশোর রমযানকে। বার বার জানতে চায় সত্যি কি কিছু পাওয়ার নাই ? কারখানার মালিক যে ধরা পড়েছে। তার ত কোটি কোটি টাকা। বিদেশে বাড়ি। আয়নার মত গাড়ি। কিছুই পাবে না ওরা ?

রমযান ওদের বোঝায়। মালিকের টাকা এবার যারা পাবে তারা মালিককে বাঁচাবে । কদিন জেলেটেলে থেকে মালিক ফের বেরিয়ে আসবে।

জমিরণ বেওয়ারাও জানে, এরমই হয়। তবু আশা করে বসে থাকে।

এই নারীরা আপন করে নিয়েছে রমযানকে। বিড়ি সিগারেট রমযান খায় না। একটু  রুটি ভাজি, কোনদিন  হয়ত কেউ ভাত খেতে ডেকে নেয়। সেও যে কিছু করে না তা   নয়। প্রতিদিনের কাগজ থেকে খবর পড়ে শোনায়। পানি ফুরালে এনে দেয়। ছায়া দেখে সরে বসতে বলে। ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে কান্না থামায়। ধারে কাছের দোকান থেকে ওষুধপত্রও এনে দেয়। সবচে  বড় কাজ হল পোড়া কারখানার বর্জ্য পরিষ্কাররত সেনাবাহিনীর লোকদের কাছ থেকে এটা ওটা শুনে এসে এই দুখী  নারীদের সে খবর পৌঁছে দেয় । তাই  কিছু হলেই সবাই এখন রমযানকে ডাক দেয়।

মাদারীপুরের শিবচর থেকে ছেলের খোঁজে এসেছে জমিরণ বেওয়া। মাঝে মাঝেই দুহাতে বুক   চাপড়ে  কেঁদে উঠছে, ওরে সুবো রে গাঙের মাঝি ছিলি ভাল ছিলি বাপ। ক্যান পুড়তি আসলি গারমেন্টে।

রমযান জমিরণ বেওয়ার কাছে বসে সান্ত্বনা দেয়, আম্মাগো কাইন্দেন না। ভাইজান  ক্যান আইছিল আফনিও জানেন আমিও জানি আম্মা। নদি মরি চড়া পড়ি যাতিছে। চর জাগিছে হেথা হোথা।  জল কোহানে নাও ভাসানোর ! বাঁচতি হলি খাতি পরতি হবি ত! পেটে খিদে রাখি কি বাঁচা যায় ! এই পেটের জন্যি সবাই ঢাকা আসে। নেন আম্মা এড্ডু পানি খান ।

নাজলির তিন বছরের ছেলেটা এই কদিনে জায়গাটা চিনে গেছে। খেলতে খেলতে পোড়া ফ্যাক্টরীর কাছে সেনাবাহিনীর গাড়িচালক ইমদাদের সাথে ভাব হয়ে গেছে। ইমদাদ এটা সেটা কিনে দেয়। প্রথম প্রথম ভয় পেলেও নাজলি বোঝে এভাবেই  তাকে বাঁচতে হবে। গ্রামে ঘর আছে খাবার নাই। ননদের বিয়েতে জমি বন্ধক দিয়ে যৌতুক দিতে হয়েছে। আজ এই ফ্যাক্টিরী কাল অন্য ফ্যাক্টিরিতে বদলি কাজ করে সামাদ টাকা পাঠাত। পাই পাই হিসেবে তিনটে পেট চালিয়ে কিছু বন্ধকী জমি ছাড়াতে পেরেছিল ওরা।

নাজলি জানত জমি ছিল সামাদের প্রাণ। বাধ্য হয়ে জমি বন্ধক দিয়েছিল। অই বন্ধকী জমির জন্যে সব সময় সামাদের মন পুড়ত । স্বামী স্ত্রীর ভেতর কথা ছিল আর কিছু জমি ছাড়াতে পারলেই সামাদ গ্রামে ফিরে আসবে । কৃষি অফিসের সাহায্য নিয়ে চাষবাস করে গ্রামেই থাকবে।

মন খারাপ হয়ে যায় নাজলির। কি পাপে যে তার এতবড় ক্ষতি হল কে জানে !

চকিতে মনে পড়ে যায় কতবার  শাশুড়ি টাকা ধার চেয়েছে ওর কাছে। নাজলি দেয়নি। মুখ খারাপ করে গালি দিয়েছে বুড়ি মানুষটা। তবুও নাজলি একটি বাড়তি  টাকা ধার দেয়নি । তার  শাশুড়ির দরাজ  হাত। খরচের সীমা বোঝে না। মানুষকে দিয়ে থুয়ে থাকতে খুব ভালবাসে । নাজলির মুঠি খুব শক্ত । দরকার ছাড়া আঙ্গুলের ফাঁকে এক পয়সাও গড়ায় না।

কিন্তু  এখন কি হবে ? আজ কতদিন হয় বসে আছে এখানে। বসে থাকলেই কি চলবে ? জমানো টাকা যে  ফুরিয়ে আসছে। এদিকে পেটের শিশুটিও এসে পড়বে এই অঘ্রাণে ! লোকজনের কাছে যা শুনছে আর অই রমযান পেপার পড়ে পড়ে যা শুনাচ্ছে তাতে  নাজলি বুঝতে পারছে ক্ষতিপূরণ যদি দেয়ও তা সে পাবে না। কিন্তু এরপর কি করে চলবে তার সংসার ?

 

এখানে আসা অনেকে কাজ খুঁজে নিচ্ছে। রোজগারের  লোক মরে গেলে পেট ত মরে না। গ্রামে ফিরে গিয়েই বা কি করবে! কিন্তু নাজলির এই অবস্থায় কেউ কাজ দেবে না।  এই ভরপেটে একা বাড়ি ফিরতেও সাহস পাচ্ছে না। অঘ্রান পড়তে আর কদিন বাকি ! তাছাড়া  যাওয়া আসার অনেক খরচ। সে জমিরণ  বেওয়ার কাছে সরে আসে, খালা আমরা কি  কিছু পাবো এখন ? আর তো পারতিছি না। পায়ে পানি আসি জমিছে।

জমিরণ বেওয়া হাহা করে উঠে, মাগো মা তুমি আসিছ ক্যান মা ? একা একা আসিছ ? আহহারে এহানে কেউ নাই তুমার ?

না খালা। এই পোথম আসিছি।  মূহূর্তে বদলে যায় শোকার্ত মানুষের দুখি ভিড়। গুঞ্জন উঠে। সবাই গভীর দুঃখে ফিসফাস করে, না আসি আর করবিটা কি ! খাওয়ান দেওয়ার লোকটাই যে  চলি গেল ! যে যার সন্তান স্বামি ভাই বোন মা বাবা হারাণোর দুঃখ ভুলে নাজলিকে নিয়ে আলোচনায় বসে যায়।

রমযানের মাথায় কিছুই আসে না। সে শুধু নাজলির  নিয়তি বোঝে । হয় ভেসে যাবে নইলে তার মায়ের মত টিকে থাকার জন্যে একের পর এক বিয়ের ফাঁদে জড়িয়ে পড়বে। নাজলির কাঁধের পেছনে কান্না মাখা মুখে উঁকি দিচ্ছে নাজলির ছেলে আজাদ। ওর মনে পড়ে যায় একদিন সেও মাকে জড়িয়ে এভাবে কেঁদেছিল। কিছু করা দরকার। অবশ্যই কিছু করা দরকার । কিন্তু কি করবে সে? কার কাছে যাবে ?

ডানা ভাঙ্গা প্লেনটা আছড়ে ফেলে কেঁদে ওঠে নাজলির ছেলে, বাড়ি যাবু আব্বা যাবু–

নাজলি অসহায় হয়ে তাকায় এদিক ওদিক। চোখে মুখে লেপে আছে হতাশা । জমিরণ বেওয়া আজাদকে কাছে ডাকে, আসো দাদুভাই আমার কাছে আসো। গল্প শুনবা ও দাদুভাই—এই নাও রুটি খাও—

রমযানের চোখে ঝলকে উঠে মার মুখ। বাপ পালিয়ে  যাওয়ার পর এই রকম মুখে বসেছিল মা । ক্লাশ ফাইভের রাজা ছুটে গেছিল বাপের অফিসে। বাপ নাই। সারাদিন গেল আশায় আশায়। রাত কাটল দুঃসহ কান্নায়। সেই প্রথম  রমযানকে কোলের কাছে নিয়ে মা বলেছিল বাপের গ্রামের কথা, বাড়ির কথা। তারপর বছর খানেক মার গলার চেন, আংটি ঘরের জিনিস বেচে চলেছিল সংসার। তার আরো পরে কেবল ঘর  ছাড়ার কাহিনী। মায়ের বদলে যাওয়া। আর বদলে যাওয়া মার উপর অভিমানের উপর অভিমান জমা রেখে রাজার পালিয়ে পালিয়ে থাকা।

পাউরুটির টুকরো ছুঁড়ে ফেলে মাটিতে শুয়ে পড়েছে আজাদ। ঘ্যান ঘ্যান কাঁদন জুড়েছে, দাদুর কাছে যাবু, আব্বুর কাছে যাবু, বাড়ি যাবু বাড়ি যাবু —

জমিরণ বেওয়া আবার কাছে টানে, আসো  দাদু  আসো সোনা, এই নাও তোমার পেলেন —

আজাদ যায় না। নাজলির কাঁধ ধরে আরো জোরে কেঁদে ওঠে, বাড়ি যাবু—আমি বাড়ি যাবু—দাদু  দাদু–

রমযানের নাকে ভেসে আসে বেগুনফুলের সুগন্ধ। কাঁচা মরিচের সবুজ সোনা রঙ । একটি ছোট মেয়ের ছুটে যাওয়ার সাথে হলুদরঙা সেই মিষ্টি সকাল।

আজাদকে কোলে নিয়ে পা ছড়িয়ে বসেছে নাজলি। ফোলা। পানি টুপটুপ দুটি পা। বাসের জানালা থেকে রমযান দেখে দুপুরের রোদ ঘিরে ফেলছে স্বজন হারানো মানুষগুলোকে। ছায়া খুঁজে ওরা একে অন্যকে ডেকে নিচ্ছে।

 

আজ সে টিকিট কেটেছে।

ফার্মগেট ছাড়িয়ে ঘিঞ্জিগলির ভেতর মেঘছাই রঙের একটি ছোট্ট ইশকুল প্লাস কোচিং সেন্টারে ভাতের বলক ফেলছে মধ্য বয়েসি এক আয়া। তার দুগালে মেচেতার গাঢ় ছায়া। রমযানকে দেখে সে চমকে হেসে ফেলবে, ভাগ্যিস তুই এসেছিস।

নিজে না খেয়ে ভাতের থালাটা এগিয়ে দিয়ে বলবে, কেমন যেনো গা গুলোচ্ছে রে রাজা। একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। যা বাপ হাতমুখ ধুয়ে —

মায়ের মুখে এক মুঠি ভাত তুলে দিয়ে মায়ের বলা মিথ্যেটাকে মুছে ফেলবে রমযান।

 

রুখসানা কাজল

ন্ম ২৩ নভেম্বর। জন্ম শহর গোপালগঞ্জ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তনী। একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ।

প্রকাশিত বই: আহা জীবন, তোমার জন্যে মেয়ে, জলের অক্ষর, কিশোরীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ, রুখসানা কাজলের অণুগল্প, নুনফলগল্পগুলি (কলকাতা)।

 

———————-

রুখসানা কাজল, লেকসার্কাস, কলাবাগান।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।