রুখসানা কাজলের গল্প: বায়োস্কোপ

গুস্তাভকে কোলে করেই বসে ছিল পূরবী ।

অট্টালিকাসম এই ফ্ল্যাটের পশ্চিমে বিশাল বারান্দা। সেখানে দুপুরের পর ঝাঁ-চকচকে রোদ আসে। জুতার আলনা, ব্যায়ামের মেশিন, বেতের সোফা, একটা ঢাউস পুরনো জিইসি টেবিল ফ্যানের আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে থাকা গুচ্ছ গুচ্ছ ছায়ারা তখন কলকল করে ঝাঁপিয়ে পড়ে বারান্দায়। যেন ছুটির ঘণ্টা শেষে বাংলা মিডিয়াম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কুচোকাচা বন্ধুদের হৈ-হট্টগোল। গোসল করে প্রতিদিন এখানে ওই বেতের সোফায় চুল শুকাতে বসে পূরবী। কিছু বইপত্রিকা রাখা থাকে। ইচ্ছে হলে পড়ে নইলে এমনিতেই বসে থাকে। কখনও ঘুমিয়ে পড়ে।

এখানে বসে থাকা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে পূরবীর। বারান্দার দূর কোণে তীব্র গতিতে ফ্যান চলে। সেই বাতাসে পুরনো বেতের সোফায় বসা পূরবীর দীর্ঘ ভেজা চুল শুকিয়ে লকলক করে ওড়ে। কখনও কখনও সেই ছুটন্ত উড়ন্ত চুল নিয়ে খেলা করে গুস্তাভ। ও তখন পত্রিকা দ্যাখে কিম্বা কোন নতুন পত্রিকার খাম খুলে চেনা পরিচিত কারও লেখা পড়ে চিকন হাসি দিয়ে রেখে দেয়। তারপর তাকিয়ে থাকে সামনের প্রাইভেট বাড়িটির ফ্যাটফেটে সাদা দেওয়ালের দিকে। দেওয়ালটা ক্রমশ স্ক্রিন হয়ে ওঠে। মনে মনে নিজের জীবনের ছবি নামায় সে স্ক্রিনে। সেন্সর করে। বিব্রত ডায়ালগ আর কিছু কিছু অ্যাকশন পালটে দেয়। শেষ পর্যন্ত যখন আর কিছুতেই মনোমতো হয় না তখন নির্বাক যুগের ফিল্ম করে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে।

ফ্যানের শব্দ, গুস্তাভের খেলাধুলার সাথে পূরবীর এই বসে থাকা আজকাল চিরন্তন রূপ নিয়ে নিয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, চেনা-পরিচিত বা কাছের বন্ধুদের কেউ বেড়াতে এলে সোজা চলে আসে এ বারান্দায়। দু-একজন সাংবাদিক বন্ধুও আসে মাঝে মধ্যে। তারা বারান্দায় বসে চা খেয়ে গল্প করে চলে যায়। সাধারণত মোবাইল সাথে নিয়েই বসে। দু’মেয়ে কথা বলে যখন-তখন। ছোট মেয়েটা প্রবাসী। বড় মেয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। কোন কোন দিন মোবাইল কাছে রাখতে ভুল হয়ে যায়। আর সে সব দিনে বিদেশ থেকে কল করে ওকে না পেয়ে ছোট মেয়ে মিতিল তারস্বরে চেঁচায়, উফ্ মা! কী টেনশনে ছিলাম তা কি জানো। এত ভুলো কেন তুমি? প্লিজ প্লিজ বি অ্যাকটিভ মা। সিক্সটি এইট ইজ মোর পাওয়ারফুল এইজ। এ বয়সে মানুষ দৌঁড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। আর তুমি? তোমার দুটো মেয়ে আর নাতিরা আছে। তোমাকে নিয়ে তারা ভাবে। একটু তো প্রাক্টিক্যাল হও পূরবী আম্মু।

মেয়ের ধমকানির আড়ালে চাপা উদ্বেগ আর আশঙ্কা রয়েছে। বুঝতে পেরে হাসে পূরবী। হঠাৎ টেনশনে মেয়ে ভুলে গেছে ওর পূরবী আম্মুর পা দুটো অচল। অকেজো। নিত্য ব্যথাময়। ভঙ্গুর অস্থি’র যুগল পদকাঠামো মাত্র।

এই মেয়েটা স্বভাবে প্রচণ্ড ভয়ঙ্করী। দু’ধারী খোলা তলোয়ারের মত ধারালো, উন্মুখ। অতি সুস্পষ্ট, চঞ্চল। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এগুলোর পাশাপাশি মেয়েটা প্রখর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যানালিস্ট। আঁতে লাগলে সামান্য দু’দণ্ড ভাবে। তারপর ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলে যে কোন সম্পর্ক বা বাঁধা। কারও মুখাপেক্ষী থেকে সময় নষ্ট করতে একদম রাজি নয়। রাজুর মতই ধারালো, যুক্তিতে টইটুম্বুর তেমনি দুঃসহ পচাগলা মুখ। ওর খিস্তি শুনে প্রথম প্রথম পূরবী শিউরে ওঠত। মহা খিস্তিবাজ বন্ধুরাও এখন পালিয়ে গা বাঁচায়।

পূরবীর শীত-গ্রীষ্মের সবগুলো দিন, মাস, ঋতু এভাবে কেটে যায়। অবশ্য যদি ওর শরীর ভাল থাকে তো তবে! যে ভাঙাচোরা শরীর ওর! সামান্য ভার রাখতেই কনকন করে ব্যথা বেজে ওঠে কোমরের হাড়ে হাড়ে। সে ব্যথা পৌঁছে যায় শরীরের নিম্নাঞ্চলে। টনটন করে ওঠে হাড়, মাংস, ভেইন। শরীর তো নয় যেন হাড়ের তৈরি বাদ্যযন্ত্র। সুরের বদলে সময়-অসময়ে ব্যথাবেদনার রাগরাগিণী বেজে ওঠে মড়মড় শব্দে।

কোল থেকে কখন যে নেমে গেছে গুস্তাভ একদম বুঝতে পারেনি পুরবী। রাজুর চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বুঝতে পারে গুস্তাভ নেমে গেছে। আর খেলতে খেলতে চলে গেছে রাজুর ঘরে। নিশ্চয় বড় মাপের কিছু একটা অকাম করে ফেলেছে! চিৎকার শুনে তাই তো মনে হচ্ছে।

গেল কয়েক দিন লেখা নিয়ে দারুণ ব্যস্ত রয়েছে রাজু। এমনিতে কোন নিয়ম বেঁধে লেখেটেখে না। কিন্তু এ দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মাঝে মাঝে বিশেষ কোন সম্পাদকের অনুরোধে দেশ বা বিদেশের এক্সক্লুসিভ যে কোন পলিটিক্যাল ঘটনার উপর লিখে দেয় রাজু। বিষয়টা যদি আমেরিকা হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই। সম্পাদকের কেল্লা ফতে। কালক্ষেপণ না করে সাথে সাথে পুঁজিরাক্ষস আর যুদ্ধবাজ আমেরিকাকে তছনছ করতে ডাবল খুশিতে লেগে পড়ে লিখতে। রাজুর লেখা ভাল। বক্তব্যে সুতীব্র ধারের সাথে যুক্ত থাকে সাধারণ মানুষের মানসচাহিদা। ফলে বিদগ্ধজনের আগ্রহ তো থাকে। তারচে বেশি এখনও স্বপ্ন-দেখা আদর্শবাদী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আকর্ষণ বাড়ে চুম্বকীয় গতিতে।

যে পাঠক লেখাটি পড়ে তৎক্ষণাৎ তার মন হয়ে যায় শাণিত ছুরির মত। নিজেকে লেনিন, মাও সে-তুং, চে গুভ্যেরা বা চারু মজুমদারের আত্মার কমরেড ভাবতে শুরু করে। রাজুর যুক্তির সাথে একাত্মতা মেনে কুচিকুচি করে সে আমেরিকাকে কেটে ফেলে। লেখাটি আলোচিত হতে থাকে বিভিন্ন মহলে। পাঠকদের লাগাতার মনখোলা আবেগে উপচানো পাঠপ্রতিক্রিয়া পেয়ে স্কচে চুমুক দিয়ে আনন্দে হাসে রাজু। একের পর এক অনুরোধ নিয়ে কল আসে। সে সব রিসিভ করে উদাত্তস্বরে জানায়, নো নো নো ব্রাদার, নট নাউ। আগামী দু’মাসে আর কোন লেখা নয়। কাইন্ডলি ওয়েট। আরে দেবো। দেবো, সিওর, দু’মাস পরে। একেবারে গরমাগরম হাতে পেয়ে যাবে দোস্ত।

এদেশের জ্ঞানীর আসনে এখনো তার অস্তিত্ব অটুট আছে তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে কিছুটা গর্ব আর আত্মতৃপ্তি নিয়ে দু’মাস পরে আবার লিখে দেয় কোন কলাম, নিবন্ধ বা প্রবন্ধ। এ লেখাতেও থাকে যথেষ্ট যত্ন আর রাজনৈতিক জ্ঞানের চরম মুন্সিয়ানা। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষদের ক্ষেপে ওঠার জন্যে থাকে জ্বালাময়ী উপাদান। দেশের ছিন্নবিচ্ছিন্ন বাম আদর্শের পাঠচক্রগুলিতে আশার সলতে হয়ে জ্বলে। দু-একটা পোষ্টার-ফোস্টারও পড়ে বিলুপ্ত সাহসের চমক হয়ে। এবার সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসে। আর সাধারণ পাঠকদের মধ্যে আলোচনায় তুঙ্গে থাকে লেখাটি। মাঝে মাঝে তো এমন হয় যে, পাঠক এবং সরকার দু’পক্ষ হয়ে যায়। পত্রিকার কাটতি বাড়ে হুহু করে। সম্পাদক সাহেবরা আগাম উকিলের সাথে কথা বলে রাখে। কিন্তু এরপরের লেখাতেই আসে সরকারের সফলতার গুণগান। দু’মাসের আগেই আসে। বিভিন্ন খাতে সরকারের কাজকম্মের সুনাম করে পরিপুষ্ট পোষ্যে তব্দা মেরে দেয় নড়চড় খাওয়া সরকারকে। রাতের পার্টিতে তিন-চারটি গ্লাস চিয়ার্স বলে ঠুকে যায় একে অপরকে। বুড়ো গলায় হল্লা ওঠে। কিছুটা কমবয়েসি নেতা, আমলা, সাংবাদিক, সম্পাদকরা পাঠ শিখে নেয় সে হল্লার রেজুলেশন।

আর পত্রিকার সুনাম বিনিময়ে রাজুর জন্যে সাম্মানিক হিসেবে বেশ মোটাতাজা খাম পাঠিয়ে দেয় গুণগ্রাহী সম্পাদক এবং পত্রিকার মালিকানা গ্রুপ। কিন্তু গুস্তাভ কী এমন কাজ করল যে লেখা ফেলে এমন অসহিষ্ণুভাবে চেঁচাচ্ছে রাজু? বিশ্রী বিশ্রী শব্দের আজেবাজে গালি দিয়ে মুখ ছুটাচ্ছে কেন সে?

একেবারে ক্ষ্যাপার মত ক্রুদ্ধ গর্জন করে পুবের ঘর থেকে এবার বারান্দায় উঠে আসে রাজু, কি হচ্ছে কি পূরবী? সামান্য একটা কুকুর তাও সামলাতে পারছ না! নাকি ইচ্ছে করে ছেড়ে দিচ্ছ আমাকে জ্বালাতে! উফ্‌, কী সাঙ্ঘাতিক ষড়যন্ত্রকারী মহিলা। শরীরে তো পারলে না। এখন কুবুদ্ধিতে খেল খেলাচ্ছ! বাহ বাহ ঘষেটি বেগম! এই শালার বাঁটকু কুকুরটা দিয়ে তুমি আমার লেখার দফারফা করে দিলে তো! হিংসুটে খোঁড়া মাগি। দাঁড়া, এবার দেখাচ্ছি মজা!

রাজুর গালাগাল শুনে এক ঝলক রক্ত খেলে যায় পূরবীর বিব্রত বয়স্ক মুখে। কী বলবে ভেবে পায় না। কিছুটা ভয়ও পায়। রাগের তাণ্ডবে একবার হুইল চেয়ার উলটে ওকে ফেলে দিয়েছিল রাজু। সে সময় মেয়েরা ঘরে ছিল বলে বেঁচেছে। কম হুলস্থুল হয়নি তা নিয়ে। বড়মেয়ের ঝোলা ব্যাগে সবসময় একটি স্টীলের চাইনিজ হাতুড়ি থাকে। সেদিন দু’বোন কয়েক ঘা মেরে দিয়েছিল বাবাকে। বাবা বলে কোন রেয়াত করেনি ওরা। সেই থেকে পূরবীকে ছুঁতে আর সাহস পায় না রাজু। তাছাড়া দু’মেয়ের নিয়োজিত দু’জন শক্তিশালী মহিলা আছে যারা পূরবীকে দেখাশুনা করে। সংসার নামের এই লোকদেখানো প্রতিষ্ঠানকে ওরাই পরিচালনা করে। এমনিতে রাজু ক্ষীণ দেহের। তাই সহসা এদের মুখোমুখি হতে চায় না। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করে নিজের ঘরে চলে যায়। চা-নাস্তা পেয়ে যায় নির্দিষ্ট সময়। তাছাড়া ডিজিটালের এ যুগে আজকাল ঘরে লোকজন না থাকলেও কেউ একাকী হয় না। মোবাইল আর ফেসবুক মানুষের মানসিক একাকীত্বকে অনেকটা কমিয়ে দিতে পেরেছে।

আজ কর্মসহায়িকা দুজনের কেউ বাসায় নেই। বড়মেয়ে ডেকেছে। ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ আন্দোলন মিছিলে যোগ দিতে ওরা বেরিয়ে গেছে। টেবিলে রেডি করে রেখে গেছে দুপুরের খাবার। এসব অবশ্য রাজু জানে না। খোঁড়া অচল হলেও এ ফ্ল্যাটের মালিক যে পূরবী সেটা ওদের ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে দু’মেয়ে।

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বারান্দার দরোজায় দাঁড়িয়ে পূরবীকে একগাদা গালাগাল করে রাজু। তারপর গজগজ করতে করতে প্যাসেজ ধরে ভেতরে চলে যায়।

একটু পরেই চব্বিশ শ স্কয়ার ফুটের নিঝুম ফ্ল্যাটের বাতাস কেটে গুস্তাভের আর্তচিৎকার ভেসে আসে। বিস্ময়ে কেঁপে ওঠে পূরবী। কী আশ্চর্য! রাজু মারছে কুকুরটাকে। ওর শরীর বেঁকে যায় অপমান আর উত্তেজনায়। বুঝতে পারে, ক্রোধে উন্মত্ত রাজু ওকে মারতে না পেরে বেচারা গুস্তাভের উপর শোধ তুলছে। চরম নিষ্ঠুরের মত মারছে অবলা জীবটাকে। নির্দয় আক্রোশ ঝরে পড়ছে তাতে। সাথে ছুটছে মুখ খারাপের নোংরা ফোয়ারা। প্রতিটি মার যেনো ওর গায়ে এসে পড়ছে। প্রতিটি গালি ওর মনটাকে কুৎসিত কালো করে দিচ্ছে। অপমানে বোবা হয়ে যায় পূরবী।

এই মুহূর্তে রাজুকে থামতে বলার মত কোন ভাষা খুঁজে পায় না সে। বরং থমকে থাকা আধা জড় শরীরটাকে নাড়িয়ে দু’হাত বাড়িয়ে হুইল চেয়ারটাকে টেনে কাছে আনতে চায়। কিন্তু দ্যাখে হাতের নাগালের বাইরে পুরনো আলনার কাছে চলে গেছে চেয়ার। হয়ত খেলতে খেলতে গুস্তাভ কখন ঠেলে নিয়ে গেছে ওখানে। পূরবী বুঝতে পারে, হাজারবার চেষ্টা কসরৎ করলেও চেয়ারটাকে ও হাতের নাগালে আনতে পারবে না। এবার তাই ইচ্ছে করেই ও ফ্লোরে শুয়ে পড়ে। এ ছাড়া আর উপায় কী! অচল, অশক্ত, খোঁড়া পায়ের জ্যান্ত পূরবী। হুইল চেয়ারের কাছে পৌঁছাতে গেলে ওকে তো গড়িয়েই যেতে হবে। ফ্লোরে শুয়ে পড়ার আগে পূরবী চেঁচিয়ে জানিয়ে দেয়, গুস্তাভ! গুস্তাভ! এই তো এখুনি আসছি বাবা।

খাওয়ার টেবিলের একটি পায়ের সাথে ওড়না দিয়ে বাঁধা গুস্তাভ। পূরবীর ডাক শুনে ছুটে আসতে চেয়েও পারে না প্রাণীটা। লেজের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু বাঁধন খুলতে পারে না। বসে পড়ে। আবার এগোয়। সর্বশক্তি দিয়ে ওড়না ছেঁড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে ছোট্ট কুকুরটা। কিছুতেই পারে না। সামনের পা দুটো এগিয়ে দিয়ে ছোটার চেষ্টা করে। তাও পারে না। শেষ পর্যন্ত টেবিলের পায়া ঘুরে ঘুরে কাঁদে। নিরুদ্ধ অভিমানের অসহায় কান্না। বড় মেয়ে গীতির উপহার দেওয়া মল্টিজ মিক্সড আদুরে ছোট্ট কুকুর গুস্তাভের কান্নায় চুঁইয়ে পড়ে অবোধ অভিমানের অস্পষ্ট ধারা।

পূরবীর দীর্ঘ চুল ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়েছে। গুস্তাভকে ডাকতে ডাকতেই সে গড়ায়। দুটো গড়ান দিয়েই বুঝতে পারে, পেরেছে। হ্যা পেরেছে সে। হুইল চেয়ারের পা ধরে টেনে আনে কাছে। প্রায় অবশ পায়ের নিচে জড়িয়ে যাচ্ছে ম্যাক্সি। কাঁপা কাঁপা রুগ্ন হাত দিয়ে ম্যাক্সি ছাড়িয়ে কোন মতে উঠে ফ্লোরে বসে। কেমন দম আটকে যাচ্ছে। প্রথমে এক হাত এরপর দু’হাতে বুক চেপে ধরে শক্ত করে। সামান্য এটুকু পরিশ্রমে বুকের ভেতর হাঁপ ধরে গেছে। হুইল চেয়ারের সিটের উপর মাথা রেখে ছোট ছোট নিঃশ্বাস নেয় কিছুক্ষণ। ঘেমে নেয়ে গেছে গলা পিঠ বুক। পীড়িত স্তনের নিচে আর বুকের মধ্যভাগ ভিজে সপসপ করছে। পূরবী এবার বড় করে কয়েকবার শ্বাস নেয় নাক-মুখ দিয়ে।

বুকের খনির অস্বচ্ছ খাঁজের ভাঁজে এভাবে কয়েকবার শ্বাস পাঠাতে চেষ্টা করে। এরপর মাথা তুলে কিছুটা স্বাভাবিক নিঃশ্বাস ছেড়ে হাঁপায় পূরবী। ম্যাক্সির নীল রঙের ভেতর শুকনো পদ্মের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ওর রুগ্ন মুখ। ব্যথাও পেয়েছে কম নয়। এবার হুইল চেয়ারের ধাতব পা ধরে আস্তে আস্তে তাতে উঠে বসে। ঘন ঘন শরীর কাঁপছে। ধাতস্থ হতে চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে জিরোয়। তারপর হাতলের বোতাম টিপে ছুটে যায় ডাইনিং রুমের দিকে। অস্ফুট গোঙানির সুরে সস্নেহে ডাক দেয়, গুস্তাভ! গুস্তাভ! এই ত সোনা আমার। এই যে দ্যাখ আমি এসে গেছি বাবা।

বন্দি গুস্তাভকে দেখে রাগ হয় পূরবীর। প্রচণ্ড রাগ। ইচ্ছে করে দলনেত্রীর পুরনো সেই গলায় রাজুকে ডেকে আনে কাঠগড়ায়। সমালোচনার প্রশ্নে বিদ্ধ করে জবাবদিহি চায়, কমরেড রাজু, সংক্ষেপে জবাব দিন, গুস্তাভ কি খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছে? কিম্বা, বলুন তো দেখি, কী এমন গুরুতর কারণ থাকতে পারে যার জন্যে এই এতটুকু একটি ছোট্ট কুকুরকে এরকম নিষ্ঠুর নির্মমভাবে মারধর করতে হবে? আত্মসমীক্ষার পাঠচক্রে আমরা কি ধৈর্য্য এবং সহিষ্ণুতার পাঠ গ্রহণ করিনি কমরেড? হঠাৎ করে ক্ষেপে গিয়ে এমন কিছু করা কি দলীয় নেতা এবং কর্মীদের জন্যে নিষিদ্ধ ছিল না? আপনি কি সে সব পাঠ একেবারেই ভুলে গেছেন!

কিন্তু গলার ভেতর পুরনো সেই কণ্ঠটাকে আর খুঁজে পায় না পূরবী। বহু বছর ধরেই ওর স্বর নেমে গেছে বিড়ম্বিত সুর-তালের লয়ে। তাছাড়া এসব কথা শুনে পজেটিভ রিঅ্যাক্ট করার মতো মন-মানসিকতা অনেক আগেই নিঃশেষ হয়ে গেছে রাজুর। বরং পূরবীকে নিয়ে খানিক সস্তা হাসিতামাশা করে মজাক-মশকরা করবে আবার! একলা ফ্ল্যাটে একা একা পূরবী আর নিতে পারে না রাজুর করা এই শ্লেষ, ঠাট্টা, মশকরাগুলো। সম্পর্কের দায়বদ্ধতারও তো একটা সীমা থাকে।

গুস্তাভকে মুক্ত করে বারান্দায় ফিরে আসে পূরবী। ধীরে ধীরে রাগের রক্ত সরে গিয়ে আপসের রক্তে ছেয়ে যায় ওর মস্তিষ্ক। তাছাড়া রাগ-অভিমান এখন আর তেমন করে হয় না পূরবীর। লাগাতার শরীর খারাপ হতে হতে কেমন করে যেন ওর মনের জোরও কমে গেছে। আর রাগ করেই বা কি হবে! এই যে সাজানো-গুছানো সব পেয়েছির ঘরে থেকে সাময়িকভাবে পাওয়া এটুকু কষ্ট তো কিছুই না তার কাছে। ভাল করেই জানে, এখনও দেশের বিপ্লবী জনসাধারণ এবং কর্মীদের কাছে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে অনুপ্রেরণার অনুকরণীয় আদর্শের প্রতিমূর্তি। এখনও যে কোন রাজনৈতিক দল, সে বিরোধী হোক বা ক্ষমতায় আসীন প্রতিটি সরকারই ওদের সম্মান করে। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে প্রচুর রাষ্ট্রীয় দাওয়াত পেয়ে থাকে ওরা। শারীরিক কারণে পূরবী অনেক অনুষ্ঠানে যেতে পারে না বলে কত কত ফুল, মালা, উপহার উপঢৌকন ওদের বাড়ি বয়ে দিয়ে যায়। বাইরের অনেকেই বুঝতে পারে না ওরা কেমন ভঙ্গুর জীবন যাপন করে চলেছে একই ছাদের নিচে থেকে। আবার কোন অনুষ্ঠানে যখন যায়, পূরবীর হুইল চেয়ারের পেছনে রাজুর দায়িত্বশীল নজরদারি দেখে অনেক স্বামী-স্ত্রী মুগ্ধ হয়ে মিটিয়ে ফেলে নিজেদের ক্ষোভ, রাগ, ঝগড়া। মোটকথা ওরা এখন আইকন। পূরবী এসব মেনে নিয়েছে। বহুদিন আগে থেকেই সে আপসকামীদের খাতায় নাম লিখে ফেলেছে। আপসের নির্ঘণ্ট মেনে রাজুকেও সে মুক্তি দিয়ে দিয়েছে। রাজু থাকলে ভাল। না থাকলে আরও ভাল হত। ইদানীং পূরবীর মনে হয় রাজু চলে গেলেই মঙ্গল। কেন যায় না সে?

বারান্দার বাইরের আধখানা পৃথিবী দেখতে দেখতে ঠাণ্ডা হয়ে আসে পূরবীর মন। কোলের ভেতর নরম কুশনের মত গোল পাকিয়ে শুয়ে আছে গুস্তাভ। ওর পিঠে, পাঁজরে, মাথায় হাত বুলিয়ে রাগ-নিঃস্ব পূরবী ফুঁপিয়ে কাঁদে, বোকা ছেলে! কেন গিয়েছিলি ও ঘরে! তোকে না কতবার বারণ করেছি যাবি না ওখানে! কেন যাস! কী আছে ও ঘরে!

গুস্তাভ কী বোঝে কে জানে। ওর ছোট্ট মাথাটা তুলে পূরবীর মুখের দিকে তাকিয়ে দু-একবার কাইকুই করে কি যেন বলার চেষ্টা করে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা নরম নালিশ মাখানো স্বর। তারপর মাথা নামিয়ে কোলের ভেতর মুখ গুঁজে আবার শুয়ে পড়ে। সামনের পা দুটো দিয়ে খামচে ধরে থাকে পূরবীর হাত।

কেঁপে ওঠে পূরবী। অন্তরাত্মা ঝাঁকিয়ে সে কাঁপন বয়ে যায় সমস্ত শরীর জুড়ে। কী দেখল গুস্তাভ? কী পেল ওর মুখে! ও কি বুঝে গেছে পূরবীর অপার অসহায় নিঃস্ব আত্মাকে? নাকি আপসের তেলজলনুনে-জারানো ওর হলুদ মুখ দেখে লজ্জিত অভিমানে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল অবোধ প্রাণীটি!

 

রুখসানা কাজল

জন্ম ২৩ নভেম্বর। জন্ম শহর গোপালগঞ্জ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তনী। একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ।

প্রকাশিত বই: আহা জীবন, তোমার জন্যে মেয়ে, জলের অক্ষর, কিশোরীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ, রুখসানা কাজলের অণুগল্প, নুনফলগল্পগুলি (কলকাতা)।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।