বিজয়ের দিবসের কবিতা

শামীম আজাদ
ব্যাখ্যা

নিতম্ব চেয়ারে গাড়া
বুকে বহুমাত্রিক স্মৃতির স্পন্দন
কুচকুচে কালো ক্যালকুলেটরের নিচের
পঞ্চাশ বছর বয়সী কাঠের টেবিল থেকে
আসছে পুরানো গন্ধ।
সব মিলে কী একটা আবদ্ধ পরিবেশ!

দেশ থেকে বহু দূরে
দুর্দান্ত স্মার্ট পোশাকেও
বেজায় বোকা হয়ে ভাবছি-
না কাটিতে তাল কখনো কি করেছি তাহার সন্ধান!

ধর্মানুভূতির ধোঁয়ায়
মাথার বদলে মগজই তুলে দিয়েছি
হিজাবের হাতা সরবরাহ করেছে ট্রাঙ্কুলাইজার ও ট্যাবলেট
এখন পেপার ক্লিপেও আটকাচ্ছে না সূক্ষ্মতম সেন্টিমেন্ট
এই হল নিউ নর্মাল, এই পেইন্টেইড পেইন-
এই নতুন কম্পোজিশন।

বুঝি এ আমার আলস্য প্রভু
আমারই আত্মপ্রেমের কারণ।

এখন কি করি, আমি কী করি!
রিসাইকেল বিন-এর
বর্জ্য থেকে কোনক্রমে ব্রেক তুলে দেখছি
এ্যানুয়েল রিটার্ন ওয়ার্নিং এ এসেছি বটে
কিন্তু এর মানে তো এ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট না!
আর কাউন্টারের ওপারে আসলে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।

 

শামস আল মমীন
মুক্তিযুদ্ধের গল্প

যে শহরের দেয়ালে দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের গল্প লেখা
ঘুরে ফিরে সেই পথে যাই আসি।
কোন কোন ঘরে নিভে গেছে আলো,
শেষ রাতে সেই গল্পও শেষ হয়ে আসে;
ঝাপসা হয়ে ওঠে নায়কের ছায়া।

যে শহরের দেয়ালে দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের গল্প লেখা,
জুলেখার রক্তাক্ত কামিজ, সালোয়ার,
নির্বাক বালকের সব কথা,
উদ্যত রাইফেল হাতে বীরদের দেখি
ওদের ক্লান্ত চোখ দেখি,
ভোর রাতে পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখি।

আমাকে দেখে পাড়াশুদ্ধ খুশিতে ঝকঝক,
তুই ফিরে এসেছিস!
আয় আয়, চা খেতে খেতে গল্প শুনি তোর; কিন্তু
আমি কার গল্প শোনাবো…
কোন গ্রাম, গঞ্জ, শহরের গল্প করবো মুনশি চাচা
কোত্থেকে শুরু,
শেষমেশ কোথায় থামবো!

পূর্ণিমা চাঁদ পশ্চিমাকাশে হেলে পড়লে কার কি আসে যায়,
তবু আমি ওখানে দাঁড়িয়ে..
কী যে দেখি!

 

রেজাউদ্দিন স্টালিন
তুচ্ছকে যে ভালোবাসে

কোনো কিছু তুচ্ছ নয়
প্রতিটি বস্তু তার বৈশিষ্ট্যে হীরক
উইয়ের সামর্থ্য দেখি অসীম সঞ্চয়ে
ঘাসের ভ্রুর মধ্যে শিশিরের পাখি
ছাই সেও উজ্জ্বল চাঁদের বাসন
আমাদের সামর্থ্যের সীমা অব্যবহৃত
বুঝতে পারি না
দক্ষিণের মৃদু হাওয়া কিভাবে বদলে দেয়
লক্ষ লক্ষ ইলিশের গতি
ছেঁড়া পালে গান বাজে -গুণ টানো মাঝি
তুচ্ছ সব অপেক্ষার ধুলো সোনালি ধানের উৎসব
মায়ের ছোটো চুম্বনের বীজগুলো আজ মহীরুহ
কুনোব্যাঙ সাপ আর হিংস্রদের কথা আজ থাক
মাধ্যাকর্ষণ থেকে জগতের কোনো তুচ্ছ বিযুক্ত নয়
কত বিশাল সভ্যতা তুচ্ছ হয়ে পড়ে আছে
ইতিহাসে – ঘাসে
পাহাড় হঠাৎ কিভাবে পিঁপড়ে হয়ে যায়
মরুভূমি গলে যায় উটের গ্রীবায়
বুঝতে পারি না
শৈশবের অনুস্মৃতি কতটা মহান
তুচ্ছ ভুল বার বার করে তোলে তিক্ত ইউলিসিস
তুচ্ছকে যে ভালবাসে সেইতো সামাজিক

 

দারা মাহমুদ
জন্ম সাপ

এক চিকন কালো সাপ
জলবাগানের মধ্য থেকে
উঠে এসে মাথার ভেতর ঢোকে
ঘোরে ফেরে ছোবল তাক করে
কিন্তু ছোবলায় না— ভোরের আগেই সে
ফিরে যায় বাগানের গভীর আঁধারে
সাপের শীতল সন্তরণ সারাদিন
মাথায় থেকে যায়—
অফিসে লিফটে দৌড় ঝাঁপে
হিংসার লালা পিচ্ছিল ইট বনে
একটা চিকন জন্ম সাপ
এভাবেই ঘোরে ফেরে আসে যায়—

 

কামরুল হাসান
বিজয়ের দিনরাত্রি

আকাশ ঢেকে দিচ্ছিল মিগ আর
আকাশের সুড়ঙ্গ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল
স্যাবর জেট বুড়িগঙ্গায়,
সবাই কাচের ভেতর গুজে দিচ্ছিল
তাজা সংবাদপত্র আর টাটকা খবর
ব্লাক আউটের সেইসব অন্ধকার রাতে
শত্রুদের স্যাবর থেকে আড়াল করো
বাড়িঘর, চারিদিকে যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ
কিন্তু ওরা তো আগেই কুপোকাত;
ওদের বৈমানিক প্রাণভিক্ষা চাইছে ফতুল্লায়,
কৃষকেরা বসিয়েছে বিচারসভা;

এসবের ভেতর এলো সেই দুর্দ্দান্ত সংবাদ…
বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ!

ভোরবেলা ঝুলে পড়া পোশাক আর
মাথা হেট, ঘাড় গোঁজা শরীর নিয়ে
চলেছে সারি সারি পুরাতন বিমানবন্দরের দিকে…
ফিরতি প্লেন পেলে সোজা উড়ে যায়
কিন্তু জেটবিমানগুলো গোত্তা খেয়ে পড়ে আছে
শীতলক্ষ্যায়, বন্দুকের নলগুলো মাটিতে নামানো
আর পরাজয় ওদের কপালে তাক করা,

সেই প্রভাতেই এলো সেই দুরন্ত ঘূর্ণির আনন্দ সংবাদ
বাংলাদেশ জিতে গেছে।

পাশ দিয়ে চলেছে বিবিধ যান, রিকশা ও খোলা জিপ
জয় বাংলা শ্লোগানে মুখরিত পৃথিবী
সেনাদের কানে সীসা ঢেলে দেয় শ্লোগানের শীস
বালকের মুখে যুবকের তাজারঙ, যুবকের রাইফেল উঁচু
মুর্হূমুহু ফুটছে বুলেটের ফুল,

এমনি মুহূর্তে এলো সেই প্রাণউপচানো প্রার্থিত সংবাদ
বিজয় এসেছে বাংলায় হাজার বছর শেষে।

 

ফেরদৌস নাহার
রবি ঠাকুরের বৃষ্টি

ইচ্ছেরা ধাওয়া খেয়ে চলে যায় শতাব্দীর বাঁধা ঘাটে
যেমন নৌকা কাঁপে বাঁধনে বাঁধনে টলটলে জল-আবেগে
জলে জলে ব্যথার আঁচড় কেটে মনে পড়ে ঝরনার নির্জনে
বারেবারে বারতা পাঠিয়েছে প্রাচ্যের প্রেমখোর বাদল হাওয়া
তখন বসেছিলাম দূর উপবনের আঁধারনামা দিনের শেষপ্রান্তে
মনে পড়ে জীবনের সকল গানের মানে, সকল আবহমান ছবি
যখন বাজিল তাহার বীণা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলো না তাহারে
চারপাশে শৌখিন সমান্তরাল আশ্বাস ওই হেঁটে যায় আনমনে
আমি কি তার সাথে কথা কব, বাঁক নিয়ে চলে যাব কাছে?
কিছুই চূড়ান্ত করে বলতে পারছি না বলে খুব দুঃখিত!

চলুন যাওয়া যাক তার কাছে! তা কতদূরে?
নভোরঙ যেখানে লুটায়, ওই তো ওখানে
যেখানে অসীমের পালাবদল অন্তহীন
দিনরাত একাকার করে দিতেছে
কত সব ঘটনার বসতবাড়ি
চারদিকে ঘন হয়ে আসে
কে এসব মনে রাখে?
বৃষ্টি আসছে ধেয়ে
নিশ্চুপ ভিজবে
কুঠিবাড়ি ও
গড়াই নদী
একাকী
এবং
সে

 

তুষার গায়েন
অভয় চোখে এই আম্ফান

কত আর নেবে এই জনঘনত্বের দেশ, এই অল্প ভূমি?
এত আঘাত আছড়ে পড়ে বুকে তার বারংবার
যতটুকু মাটি, তার থেকে বহুগুণে বিবর্ধিত শস্যরাশি
যতটুকু জল তুলে দেয় কৃষকেরা হাতের আঁজলা ভরে
ততোধিক দেহনুন— শতাব্দী সঞ্চিত ক্ষুধা কমে আসে বহুগুণ,
রাষ্ট্রের গুদামে কিছু জমা আছে, কিছু গেছে দূরদেশে
যেখানে বাঙালি ভাত আর মাছ খেতে ভালোবাসে;
আর কিছু মুদ্রা আসে সোনালি উজ্জ্বল রঙে ভেসে—
অল্প বেতনে মেয়েরা কাজ করে ঝলমলে দুনিয়ার
পোশাক বানাতে, জানে আগুন লাগলে কারখানা থেকে
বেরুবার পথ নেই! সমুদ্রে ট্রলারে ভাসে জান বাজি রেখে
অনেক যুবক, ভাবে কোথাও ভাগ্যের রেখা মিলবে নিশ্চয়
অনিশ্চিত ভূগোলের বাঁকে, এভাবে গতি ও গীতি
আঁকাবাঁকা পথে উঁকি মারে এই ছোট জনঘনত্বের দেশে
অবশেষে মহামারী আসে ঘরে ঠেলে দিয়ে মানুষের
ক্ষুধার্ত পেটের গান শুনবার বিকৃত উল্লাসে!

এই জনঘন দেশে দূরে দূরে থাকার অভ্যাস নেই
তবু সেভাবে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা প্রায়শ বিফলে যায়
আর করোনা ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমরা প্রস্তুত যদি
ইম্যুনিটি কড়া করে নিতে— দেবতা অদৃশ্য হাসে
সমুদ্রের গর্ভ হতে ঘুর্ণি দিয়ে ওঠে জলরাশি
আম্ফান আছড়ে পড়ে ভেঙে ফেলে বেড়ি বাঁধ
উড়িয়ে টিনের চাল মটকায় গাছের ঘাড়
মানুষের সাথে জড়াজড়ি করে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
নিরাশ্রয়, করোনার উপহাস!

ভাঙা ঘরের উঠানে একটি কিশোর হাসে
ভয় নেই এসব কিছুতে তার, ভাঙা চাকা জোড়া দিয়ে
পুনর্বার খেলার আনন্দে ডাকে খেলার সাথীকে তার …

 

জুনান নাশিত
অক্ষর কীর্তন

সাদা অচেনা এক বৃত্তের ভেতর পড়ে আছে
সবুজে মোড়ানো দিন
বৃত্তের ভেতরে লাল নীল শোক
আরো আছে ঈগল ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা বহুবর্ণ ঘোর
তাকে মুছে দিতে চূর্ণ ঘাসের ডগায় যতোই ছড়িয়ে দেই
মৌটুসী পাখির ডাক
তবু ধেয়ে আসে ধূ ধূ শূন্য মাঠ..

অনাবৃষ্টির কোল ঘেঁষে তাতানো নদীর ছায়া উড়ে গেলে
যে শঙ্খস্বর ধারালো বর্শায় গেঁথে নেয় জন্মগ্রাম,
নাভিনগ্ন স্মৃতি
জমাট বৃত্তের ভেতর ডুবে যেতে যেতে সে স্বরে
আমিও কাঁপি
আমার ভেতরেও পোড়ে অনুচ্চারিত শিল্পনদী;

গনগনে ছাইয়ের ভেতর দু’পা ডুবিয়ে
আমি অক্ষর কীর্তনে পূর্ণ মনোযোগ ঢালি।

 

কবীর হোসেন তাপস
অক্ষয়

ডিসেম্বরে আড়ম্বরে
সবাই যখন সাজছে
গনি তখন মধ্য শীতে
ভাতের কথা ভাবছে
ডিসেম্বরের ষোল তারিখ
দেশ পেয়েছে জয়
গনির তবে আজো কেন
নিত্য পরাজয়
ধানের ঘামে হারছে গনি
পাটের দামে হারছে
মেয়ের জামা কিনতে গেলে
বউয়ের শাড়ি কাঁদছে
জয় পেয়েছে কারা তবে
জয় হয়েছে কাদের
বাপের জমি আজো বাঁধা
দু:খ আজো ভাতের
জমি গেছে জিরেত গেছে
গেছে বরাভয়
এতো কিছু যাচ্ছে তবু
কস্টটা অক্ষয়

 

বঙ্গবন্ধু
সৈয়দ রানা মুস্তফী

পিতার রক্তস্রোত কীভাবে মিশেছে গিয়ে দেশের মাটিতে
সে ভূমি নিয়েছে টেনে বুকের পাঁজরে তার প্রিয় সন্তান
যীশুর দু’হাতে বেঁধা কী ভীষণ ব্যথাময় তীব্র পেরেক
সিঁড়িতে শায়িত পড়ে স্বাধীন পংক্তির কবি শেখ মুজিবুর

ঘাতক বুলেট তাঁর বিশাল হৃদয় জুড়ে ঝাঁঝরা জমিন
সোনার বাংলা আর আমার মানুষ বলা শেষ নিঃশ্বাস
হায় সে স্বাধীন বাংলা তার প্রিয়তম পুত্র হন্তারক
মুক্তি সেনার মাটি লজ্জায় পীড়িত দেশ মীর জাফরের

মহান জনক তিনি বাজালেন বাঁশি যেন ফের হ্যামিলন
নদীর দেশের সব সাহসী সন্তান বুকে স্রোত বেদনার
জগত পায়না যাঁকে আমরা নিষ্ঠুর তাঁকে পেয়েও হারাই
বাংলাদেশ তুমি কেঁদে কেঁদে মোছো তাঁর রক্তের দাগ

এ দেশ এ মাটি আর বাংলাদেশ জুড়ে তাঁর ছড়ানো দু’হাত
শেখ মুজিবুর নামে আমার পিতার লাশ শায়িত এখানে
সোনার বাংলা ভূমি আর এর মানুষেরা আছে যতদিন
আঁকড়ে আছেন তিনি প্রাণের মূল্যে কেনা প্রিয় বাংলায়

 

নান্নু মাহবুব
ডাকসু নির্বাচন

টিএসসির সামনের রাস্তায় বৃষ্টির জলে একটা
এয়ারমেল খাম পড়ে আছে, ছেঁড়া, ভেজা, দলিত।
কোনো একদিন ঝকঝকে নতুন মেঘের মতো ছিলো।
আজ সেটা রাস্তায় নোংরা পড়ে আছে।

দূরে একটা গলিত চিঠি পড়ে আছে।
চিঠিটা কি ওই এয়ারমেলের ভেতরেই ছিলো কোনো
এককালে? সুগোপন মিহি রুমালের মতো, শাদা?
আজ দূরে পড়ে আছে।
অক্ষরগুলো ভেজা, ততোধিক গলিত।

 

আসমা চৌধুরী
বিজয়

বাদামি রংয়ের ময়লা কাগজে রেখা টেনে, মা বলতেন
হাতের লেখা যেন সুন্দর হয়
এর আগে কালো স্লেটে সাদা করে বসাতাম অক্ষর
আস্তে আস্তে ঘর আঁকি, কলাপাতা, মানুষের মুখ।
কাগজে রেখা টেনে মা আরো বলেছেন ছবি এঁকে
যেন অপচয় না করি। পেন্সিলও যেন যত্ন করে রাখি।

কিছু আঁকতে ইচ্ছে করতো মাকে লুকিয়ে
রবীন্দ্রনাথ সহজ হয়ে এলো, গাছপালা, নদী, নৌকাও।
একদিন যত্ন করে চশমাটা আঁকা শেষ করে তাকিয়ে আছি
মা পেছন থেকে এসে চিৎকার করে বললেন, ফের আঁকাআঁকি!
বলেছি না কাগজ নষ্ট হয়, পয়সা লাগে কিনতে!

হঠাৎ থমকে গিয়ে বলেন, এ তো শেখমুজিব!
এত সুন্দর এঁকেছিস! ওরে তার ছবি এঁকেছিস!

সেদিনই মায়ের কাছ থেকে পেলাম আঁকার খাতা
ভেতরে ভেতরে আজও আঁকি
রক্তপাতের ভেতরে জেগে ওঠা সবুজ একটি ভূমি।

 

সাবেরা তাবাসসুম
অতিশয় উজ্জ্বল মানুষ

অতিশয় উজ্জ্বল মানুষ সন্ধ্যার কাছে ম্রিয়মাণ
সে জানে, মাটি আর জল আর বায়ুর কোলাহল
যখন মৌনতা, যখন দুরূহ মিলন প্রয়োজন
চৌকস বাণিজ্য-যাত্রায় হাজার বাহন জুটিয়েছে সে
এসব জেনে কী করে রাখি তার কাছে
সেরে ওঠার কোনো যথার্থ প্রস্তাব

হাত বাড়িয়ে দিলে একটি টোকায় ঝরে যাচ্ছে জীবন
আলিঙ্গন চেয়ো না, নিরন্তর পাথরবর্ষ পেরোই আগে
কেবল চোখের ভাষা বুঝে নেয় সকল ইশারা
ভুল ঠিক রেখে তবু নৈকট্য না চেয়ে আমরা সরব
হাত বাড়িয়ে দিলে একটি টোকায় ঝরে যাচ্ছে জীবন

অতিশয় উজ্জ্বল মানুষ বাতাসের কাছে ম্রিয়মাণ
হাত বাড়িয়ে প্রত্যাখ্যান আমি দিয়েছি অবিরল
পথ জুড়ে আছে সার সার ফুল ও ফল
ক্ষুধার্ত মুখ ঢেকে অন্নজল পড়ে আছে পথে পথে
কেউ নয়, মৃত্যু তাকে গ্রহণ করেছে
কেউ নয়, লাবণ্য তাকে গ্রহণ করেছে !

 

হাসান মাহমুদ
ইশতেহার

আহা মানুষ!
কালাকাল জুড়ে তোমাদের কত দৈন্য!
পতনোন্মুখ জনমনগণ, তোমরা সাক্ষী-
শ্রমিকের অনাথ জীবন!
ভাসমান আশ্রয়, ঘুমকেন্দ্রও একদিন
বিচূর্ণ করে দেবে দমকা হাওয়া!

মাঠে মাঠে ঘামবাহী কৃষকের আর্তি
শিকস্তি মানুষের অভিশাপ, জলবেষ্টিত এই অসহ জীবন
তোমাদের শোককে স্পর্শ করে না
অথচ মানবিক বাণী, সাম্যের সহজ কথার ধ্বনি
ঘূর্ণির মতোই বিদ্যমান এই সমতলে।

হে মানুষ! মনে রেখো, সমস্ত বৈরিতার বিপরীতে
কিছু প্রাণ জীবন জীবন বলে গাইবে কোরাস
বিপন্নতার বিরুদ্ধে জীবনসদৃশ এই পতাকা উড়বেই…

 

লুবনা ইয়াসমিন
আমার শহর

বিকেলটা দুলছে ব্যাকইয়ার্ডের দোলনায়
সামনে…পিছে…ছন্দময় স্মৃতি হাওয়ায়
গ্যাজেবোর ছায়ায় ঠান্ডা চায়ের কাপ
ষোল হাজার মাইল কত আলোকবর্ষ দূর?
দূর সে শহরের হৃৎস্পন্দন শ্রুতির ওপার!

কিশোরী মেঘ বর্ষায় ভরা যৌবনা
মেঘ করলেই বৃষ্টির ফুল
ছুট ছুট ছাদের ওপর যখন তখন
বাবার সেই শখের বাগান
বৃষ্টি ভেজার শ্যামল ব্যাবিলন!

পশ্চিম প্রান্তে কদমের বিছানো ছায়ায়
ইচ্ছে হয় দৌড়ে যাই আগের মতন!
ইজি চেয়ারে এলানো দুপুর, আমার গোসাঘর
চিলেকোঠায় লুকিয়ে নিষিদ্ধ উপন্যাস
হলদেটে সময়, সেই কবেকার!

প্রিয় ছোট বোন অন্য মহাদেশে
খ্যাপাটে ভাইটা ভিনদেশে ফেরার
নীহারিকায়, ছায়াপথে ফেরার কৈশোর
দোলনাটা দুলে যায়…সামনে…পিছে…
ছুঁয়ে আসে কিংবদন্তীর সেই প্রাণের শহর!

 

মৃন্ময়ী ধর
বিরহী হেমন্তিকা

হেমন্তের বিকেল বিরহে বয়ে যায়
পত্ররাজি বিষাদের হলুদ চাদর গায়,
শুভ্র মেঘে মুখ ঢাকে নীলাকাশ
দুফোঁটা অশ্রু তার ভেজায় দুর্বাঘাস,
স্তব্ধ নীরবতা সুর সাধে বেহালায়;
নিঃসঙ্গ হৃদয় যেন ডুবে মরে সুরায়!
মাতাল হয়ে ঘুরে মরে স্মৃতির খেয়াঘাট
একী! কেন শুধু হাত ধরে যে গেছে তার?
রয়েছে তো দিগন্ত জোড়া ভালোবাসার মাঠ
গেয়ে যাক তবে নির্ঝরের স্বপ্ন গীত
নবান্ন উৎসবে থাকুক না হয় ঋণ
একটি ওম-হীন কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলের শীত।

 

কাজী গিয়াস আহমেদ
বাড়ি

কি ঘনিষ্ঠ মমতায় মানুষ বাড়ির ভিত গড়ে
ইট বালি রড সিমেন্টে মিশিয়ে দেয়
নিংড়ানো ভালবাসা, প্রেম।বিন্দু বিন্দু করে আশা বড় হয়
আকাঙ্ক্ষা মৌচাক বাঁধে।

একদিন বাড়ি হয়; মানুষ নিজেকে রাখে
সেই ভবনের প্রযত্নে,
নিজের বিছানা যেন আর একটা আমি
বালিশটা মায়ের বুক!
রাত আমি আর বিছানা মিলেই স্বপ্নের কারখানা
নিজের বাড়িতে আমি রাষ্ট্রীয় অতিথি।

 

কেয়া ওয়াহিদ
চোরা স্রোত

হেমন্তের এই সূর্যহীন সময়,
কাকভেজা বিষাদের দুরুদুরু মন,
আমাদের সন্ধ্যা ঘাটে বসে থাকা কিশোরী গল্পরা–
নৈঃশব্দ্যে বুনে যায় অভিমানী নীলকাঁথা।
শীতের আহবানে অতিথি পাখিদের বিদায়ী সুর
রোদ্দুরে দুপুর-বিকেল ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা শেষে
নিশ্চল জলের মনে বরফাতঙ্ক
জাফরানি মেঘ-শিশুদের হামাগুড়ি
সীসারাঙা আকাশে-
উৎসবমুখর পালাগানে ঝরা পাতাদের ব্যস্ততা—
বিমনা আমি ফিরে যাই প্রিয় জীবন বাবুর কাছে।

নবান্ন, ঘরভর্তি আনন্দ, প্রকৃতির ঘ্রাণ
সুদূরে ফেলে আসা মা ও মায়া
মায়াদ্বীপে বয়ে যাওয়া চোরা স্রোতে
ডুবে যাই বারবার, বহুবার
পথের শেষ প্রান্তে মূক হয়ে বসে থাকে কবিতা
সর্বহারা পায়রার মতো।

 

আউয়াল আনোয়ার
কফির পেয়ালাটা

জড়িয়ে ধরেছো চঞ্চুলতা সমুদ্র সফেন
টেবিলে একাকী স্থির ধূমায়িত কফির পেয়ালা,
রাত বাড়ছে ক্রমশ আধার
কেটে গেছে গৈরিক সন্ধা

যেতে হবে বহুদূর
যেভাবে ফিরে যায় দুরের পাখিরা
মানুষও ফিরে যায়,
চিরতরে যায় কেনো তবে আসা?
কেনো ভালোবাসা?

সহসা শিকারী চোখে গিলে নেয়
আসমুদ্র পিপাসা।

 

শিউলী জাহান
আলোর জন্য যুদ্ধ

যখন দৃশ্যায়নে দেখি হাইপেশিয়ার মৃত্যু, দেখতে পাই প্রাচীন হাড়ের দহন।
একজন নারীর। একজন কন্যার।
ধূম্রজালে ঘুরপাক খায় দর্শন, গণিতশাস্ত্র, সময় ও বর্তমান!
আমি ভাবতে চাই, বহু আগে সরে গেছে সেই অন্ধকারের কাল।

আলোর জন্য যুদ্ধ হয়নি কবে, বন্ধু? তাই তো আজও
হাইপেশিয়ার দগ্ধ অবয়ব দেখি, পারাবালানিদের উল্লাস দেখি।
রক্তে প্রোথিত বৈষম্যের নৃত্য দেখি। সৃষ্টির আদি থেকেই তো শুরু
ইতিহাসের পালাবদল। তাই
সেলিবেসির রূপান্তর খুঁজি বর্তমানে।
মানচিত্রে দাগ কাটি, হাতের মুঠোতে নেই মৃত্তিকার ঘ্রাণ,
নিজেকে ভেঙে ভেঙে জলে নামি…
আবার হাইপেশিয়ার কাছে এসে নিজেকে পোড়াই।

হাইপেশিয়া তুমিই বলো, আজ কতটা সেজেছে নারী, অলংকার বিহীন,
আপন যাত্রায়, নিজস্ব মাত্রায়!
এখনও নারী কেন পোড়ে? পোড়ানোর এতো কেন আয়োজন
রাজপথে, ইন্দ্রজালে, অন্তরে-অন্তরে।

আলোর জন্য যুদ্ধ হয়নি কবে! তাই পুনর্পাঠ,
জোয়ান অব আর্ক, ইতিহাসের পাতায়!

 

হারুনর রশিদ
জং ধরা জীবন

প্লাবনে ভেসে আসা এক টুকরো জং ধরা জীবনও জানে
বেঁচে থাকার কৌশল। অথচ
কেমন করে উড়ে যায় দূর পাল্লার ভূবন চিল!

আমার চোখ খসে পড়ে বিপন্ন পৃথিবীর বুকে।
অগোছালো জীবনটাকে একবার উড়িয়ে দেই পদ্মার জলে,
আবার তুলে আনি বিউগল সুরে।

কে আবার বাঁচবে বলো-শূন্য চিলেকোঠায়!
অনাহারী জীবনটাকে বেঁধে দেই রূপালী ফিতায়, তবুও
যন্ত্রণা গ্রাস করে উষ্ণ ঠোঁটের কার্নিশে…

যদি ফিরে পাই নদীর গতি, পথ হারা মাঝি
যদি উঠে দাঁড়াই নদী ভাঙনের পর-মধুমতির বুকে,
জোছনায় ডুবে যাবো যন্ত্রণার বিউগল সুরে।

                                      ♦♦♦

Facebook Comments

2 Comments

  1. Pingback: মহান বিজয় দিবস সংখ্যা - সাহিত্য ক্যাফে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।