ছোট গল্প: প্রেম-রসায়ন

গোধূলীর ডিম-কুসুমবর্ণ আকাশ আঁধারকে ছোঁবার চেষ্টা। সন্ধ্যে আড্ডা সবে জমে উঠেছে। গরম চা আর সিগারেটের ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে নিবু নিবু আলোয় মিশে যাচ্ছে। পল্টু দেখতে পেল, কলেজের সাইন্সের মেধাবী ছাত্র দীপু আড্ডার দিকে এগিয়ে আসছে।
পল্টু একটু অবাক হল। এসময় দীপু ফিজিক্স, রসায়নে ডুবে থাকার কথা অথচ সে কিনা সন্ধ্যে আড্ডায়!
বাবাজী রসায়ন, (দীপু রসায়নে ভাল বলে সবার কাছে রসায়ন বাবা নামে খ্যাত) রসায়ন ছেড়ে এদিকে কেন?
গুরুদেব, মন ভালনা। (সমস্যা সমাধানে পটু পল্টু এ দলের সবার গুরুদেব।)
কেনরে, কি হল আবার? বেশ তো চলছে, বাবা।
গুরু, তুই তো জানিস আমি জানালার কাছে টেবিলে বসে পড়ি। ক’দিন হল…
কি পেত্নী ধরেছে?
রাখ তো ফাজলামি। নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে।
তো তোর সমস্যা কিরে বেটা? ওরা কি তোর জানালার সামনে মাইক নিয়ে বসেছে?
আরে না। ওদের মেয়ে আমার জানালার সামনে বসে পড়ে।
নে বাবা, এতো রসায়ন বাবার মহা বিক্রিয়া।
গুরু, আমার পড়াশুনা শিকেয় উঠল বলে।
ওদের পাশে বসে দলের অন্যরা শুনছিল। সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, গুরুর কাছে এসেছ রসায়ন বাবা; এবার সব সমস্যার সমাধান।
গুরু, কিভাবে? পল্টু বলল, এটাও রসায়ন দিয়েই করব বাবা দীপু। এর নাম প্রেম-রসায়ন। যেমন- রসায়নে রাসায়নিক বিক্রিয়া সংগঠনের ৩ টি উপায়: ১)সংস্পর্শ ২)আলো ৩)বিদ্যুৎ। প্রথম বিক্রিয়াই তোর দরকার। সেটা তো তুই জানিস রে পাগল। কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হলে সংস্পর্শ প্রধানতম শর্ত।
যেমন: আয়োডিনের কেলাস ও সাদা ফসফরাস পাশাপাশি একটু ব্যবধানে রাখলে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে না। কিন্তু তাদেরকে পরস্পরের সংস্পর্শে আনা মাত্রই এদের মধ্যে তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং ফসফরাস ট্রাই আয়োডাইড উৎপন্ন করে। 2P + 3I2 = 2PI3
পল্টু বলল, যা বাড়িতে গিয়ে নাকে তেল দিয়ে মন দিয়ে রসায়ন পড়। আর দিনক্ষণ ঠিক করে আমাদের ডাক দিস।
দীপু ফিরে যেতেই পল্টু দলের সবার উদ্দেশ্যে বলল, বৎসগণ, কিপটে ফ্যামেলিতে পেট পুরে খাবার জন্য সবাই তৈরি হও।
কয়েকদিন পর, দীপু জানাল আজ সন্ধ্যের পর মা-বাবা বাইরে যাবে, তাই বাসা ফাঁকা। যা করার রাত ১০ টার ভিতরে করতে হবে। পল্টু ১০ জনের বহর নিয়ে যথারীতি নির্ধারিত সময়ে দীপুর বাসায় পৌঁছে গেল।
দীপু দশজনের বহর দেখে বলল, প্রেম-রসায়নে এত লোক।
বাবা রসায়ন, চুপ্ করে দেখে যা। তবে আগে কিছু খেতে-টেতে দে।
দীপু বলল, বাসায় কিচ্ছু নেই। মা এসে রান্না করবেন।
পল্টু মনে মনে ভাবল, শালার কিপটেমি আর গেলোনা। আবার প্রেম করবে। দাঁড়া শালা, প্রেম করা শিখাচ্ছি। এমন বিক্রিয়া করাব, সারাজীবন পল্টুবাবাজী বলে জপ করবি।
পল্টু বলল, স্পটে নিয়ে চল।
দীপু পাশের রুমে নিয়ে গেল।পড়ার টেবিলের লাগোয়া জানালার পর্দা সরাতেই হিরোইনের জানালা নজরে পড়ল।
বাবা রসায়ন, কাজে লেগে পড়, আমি দরজার পাশে আছি। আমি যা বলব তাই করবি। না বলা পর্যন্ত চেয়ার ছাড়বি না। যা আশীর্বাদ রইল, নেমে পড়।
দীপু পড়ার চেয়ারে বসতেই পল্টু দরজার আড়ালে এসে দাঁড়াল। দেখল ষোড়শী তন্বী যথারীতি তার পড়ার আসনে বসে পড়ল। দীপু মাথা নীচু করে আছে।
পল্টু ফিসফিসিয়ে বলল, চোখে চোখ রাখ, পাগলা। এমন নিস্ক্রিয় গ্যাসের মতো আচরন করিস না। আমি পাশেই আছি। ভয় পাবিনা।
পল্টু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দলের সবাইকে ডেকে বলল কিপটে বাড়িতে ভোজনের আয়োজন করে ফেল। যা পাবি কেটে-কুটে উনুনে হাঁড়ি চড়িয়ে দে। আমি এদিক সামলাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর দলের একজন এসে জানাল, চাল, ডাল, ডিম আর কিছু মশলা ছাড়া কিছুই নেই। পল্টু বলল, চিন্তা কিসের? ভুনাখিচুড়ি আর ডিম ভুনা, এই শীতে জমবে ভাল।
দীপু আর তার হিরোইনের চোখাচোখি প্রেম যখন চরমে অন্যদিকে ওদের শখের গাছের কাঁচা পেপে ভাজি, ভুনা খিচুড়ি, ডিম ভুনার আয়োজন জোরেশোরে চলছে।
কিছুক্ষণ পর দীপু পাশ ফিরে বলল, পল্টু ওপাশে কিসের শব্দ?
আরে, ওরা তাস খেলছে। তুই তোর কাজে মনোযোগ দে, বাবা।
রাত কাঁটায় কাঁটায় ৯ টায় হিরোইন মায়ের ডাকে চলে যেতেই দীপু উঠে পড়ল। এসে বলল –পল্টু, কিচেন থেকে কিসের গন্ধ আসছে।
পল্টু বলল, কিছুনা রে। এত পরিশ্রম করলি। তোর শক্তির দরকার। তারই আয়োজন চলছে।
মানে? মানে কিছুই না, খেতে বসলেই দেখতে পাবি। বলেই, জোরে হাঁক দিল, এই কি খবর তোদের? ডাক দেবার সাথে সাথেই গরম গরম ভুনা খিচুড়ি, ওর মায়ের শখের পেঁপে গাছের পেঁপে ভাজি আর ডিম ভুনা হাজির।
দীপুর তো চক্ষু চড়কগাছ! এসব কি করলি তোরা, পল্টু?
কিছুনা রে, পাগলা। তোদের মরিচা ধরা প্রেমে গ্যালভানাজিং প্রলেপ। নে খেয়ে নে বলেই পল্টু ও তার দল খেতে মন দিল।
দীপু চোখে জল নিয়ে বলল, মা-বাবা আসলে আমি কি জবাব দিব?
পল্টু বলল, বন্ধুরা খেলো, আবার কিসের জবাব রে। বলতেই যদি হয় বলবি, এ কার্বন-ডাই-অক্সাইড ভরা পৃথিবীতে বিশুদ্ধ প্রেমের অক্সিজেন দিতে আমরা এসেছিলাম। এসে তোদের দুজনের হৃদয়ের জারণ বিজারণ ঘটিয়ে দুজনকে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ করে গেলাম। একমাত্র প্রেম দিয়েই পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান সম্ভব রে,পাগলা !
তাইতো, রসায়নের মেধাবী ছাত্রকে রসায়নের অজানা পাঠ প্রেম-রসায়ন শিক্ষা দিয়ে গেলাম।

 

পুলক দত্ত


জন্ম ও বেড়ে ওঠা  শ্রীমঙ্গল শহরে। বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করছেন।কবিতা ও গল্প লেখেন। অনুগল্প রচনায় রয়েছে বিশেষ আগ্রহ।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।