শকুন্তলা চৌধুরীর গল্প: ভাঙা বেড়ি

ছোটবেলায় বাড়ীতে বাসন মাজতে আসতো মেনকাদি’ — তাকে নাকি তার স্বামী ‘নেয় না’। আমাদের বাড়ীর পুরোনো কাজের লোক অলকাদি যখন হাঁটুর ব্যথায় কাজ ছেড়ে দিল, তখন সে মা’কে এসে বলেছিলো তার জায়গায় মেনকাদি’কে রাখতে — ‘….বড় দুঃখী, স্বামী নেয় না….’।
আমি তো শুনে অবাক! স্বামী আবার নেয় নাকি? স্বামীর সঙ্গে তো বিয়ে হয়!
মা’কে জিগেস করতেই, এক ধমক — “যাও তো এখান থেকে, বড়োদের কথা শুনতে হবে না।….খালি পাকা পাকা কথা আর যত রাজ্যের প্রশ্ন!”
অগত্যা আমি গুটি গুটি পায়ে সেখান থেকে চলে গেলাম, কিন্তু কথাটা মাথায় ঘুরতে লাগলো।
দু’দিন বাদে বাবাকে একা পেয়ে চুপি চুপি জিগেস করলাম — “বাবা, ‘স্বামী নেয় না’ মানে কি? খুব খারাপ কথা? বলতে হয় না?”
বাবা বললেন — “তার মানে? তোমাকে এই কথাটা কে বলেছে?”
আমি বললাম — “অলকাদি’ মা’কে বলছিলো, মেনকাদি’র কথা, কিন্তু মা বললো যে ওগুলো পাকা পাকা কথা।”
বাবা এবারে হেসে ফেললেন, বললেন — “ও কিছু না। ওর স্বামী বোধহয় ওর সঙ্গে ঝগড়া করেছে, তাই।”
সাতদিন বাদে মেনকাদি’ কাজে আসবে। আমি অপেক্ষায় আছি।
রবিবার দিন সকালে মেনকাদি’ এলো, আর মায়ের সঙ্গে কথা বলে কাজে লেগে গেলো।
আমি অনেক খুঁটিয়ে দেখেও, তার মধ্যে দুঃখের কোনো চিহ্ণই খুঁজে পেলাম না! তবে কেন অলকাদি’ ওকে ‘দুঃখী’ বললো?…..
সেই থেকে প্রায় আঠারো বছর ধরে মেনকাদি’ কাজ করেছিলো আমাদের বাড়ীতে।
আমাকে সে ছোট থেকে বড়ো হয়ে উঠতে দেখেছে – রীতিমতো বকুনি দিতো ঘর নোংরা করে রাখলে।
আর এই আঠারো বছর ধরে একটু একটু করে তার গল্প শুনেছি আমি।
ঘর মুছতে মুছতে, কাপড় শুকোতে দিতে দিতে, মেনকাদি’ বলতো – আর আমি কখনো পড়তে পড়তে অন্যমনস্ক ভাবে, কখনো গালে হাত দিয়ে গভীর মনোযোগে, সেই গল্প শুনে যেতাম।
মেনকাদি’কে দেখতে দেখতে, তার গল্প শুনতে শুনতে, আমি বুঝে গেছিলাম যে অলকাদি’ ভুল — আসলে মেনকাদি’ই তার স্বামীকে ‘নেয় না’, আর তার জন্যে মেনকাদি’র কোনো দুঃখই নেই।

মেনকাদি’র বিয়ে হয়েছিলো হুগলি জেলার এক নাম-না-জানা গ্রামে।
বিয়ের পরেরদিন, পাঁচমাইল দূরের আরেক নাম-না-জানা গ্রাম থেকে, আঁচলের খুঁটে স্বামীর চাদর গিঁট বেঁধে, মেনকাদি’ এলো তার শ্বশুরবাড়ী। সেই প্রথম নিজের গ্রামের বাইরে পা দিলো মেনকাদি’। মনে ভারী ফুর্তি। বিয়ে মানেই তো নতুন শাড়ী, নতুন জায়গা, সিঁদুর আর স্বামীর আদর!
অভাবের সংসারে সেটাই তো বিরাট স্বপ্ন – ফুর্তি হবে না?
মেনকাদি’র স্বামী দিনে মজুর খাটতো। আর রাতে, ফেরার পথে, পাঁচুর ঠেকে বসে একটু ‘পান’ করে আসতো। মেনকাদি’র শাশুড়ী ছিলো খুব মুখরা – পান থেকে চুন খসলে চিৎকার করে মেনকাদি’র চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে দিতো। ঘরে এখন বৌ এসেছে – অতএব শাশুড়ী পাড়া বেরিয়ে, গল্পগাছা করে সন্ধ্যের মুখে বাড়ী ফিরতো। তারপর খুঁটিয়ে দেখতো উঠোনে কোনো কুটো পড়ে নেই তো? রান্নায় ঝাল বেশী হয়নি তো? তা এ’সবে মেনকাদি’র কোনো আপত্তি ছিলো না।
তার স্বপ্নের মধ্যে একটা দজ্জাল শাশুড়ী তো সে ছোটবেলা থেকেই ধরে রেখেছিলো। বর একটু ‘পান’ করে আসলেই বা কী! তাতেও দোষ ধরতো না মেনকাদি’। আর ঘরের কাজে তার কোনোদিনই আলিস্যি নেই।
কাজ তো সে ছোটবেলা থেকেই করে আসছে। চার ভাই-বোনের সংসারে এত স্বাচ্ছল্য ছিলো না যে বাবা-মা মেয়েদের পড়াশোনা করতে পাঠাবে। অতএব তিন বোন করতো ঘরের কাজ আর ভাই যেতো গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শিখতে। বড়ো বোন বলে, ঘরের কাজের বেশীটাই পড়তো মেনকাদি’র ওপর। তাই কাজ করাটা মেনকাদি’র কাছে কোনো নতুন ব্যাপার ছিলো না।
সে সবই ঠিক আছে – কিন্তু বর যখন ‘পান’ করে বাড়ী এসে ফুর্তির বদলে গালাগালি দিতে আরম্ভ করতো, তখনই কুড়িবছরের সদ্যযৌবনা মেনকাদি’র স্বপ্নটা একটু হোঁচট খেতো। আর গালাগালিটা মেনকাদি’র বর প্রায়ই দিতো – তরকারিটায় নুন কম মনে হলেও দিতো, আবার শ্বশুরবাড়ীর থেকে আসা প্রথম পূজোর ধুতিটা জ্যালজ্যালে মনে হলেও দিতো।
শাশুড়ী বসে পা নাচাতে নাচাতে ছেলের রাগে তা’ দিতো।…..
এইরকম হোঁচট খেতে খেতেই চলছিলো মেনকাদি’র সংসার। বিয়ের ছ’মাসের মাথায় প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হলো মেনকাদি’।

পাড়াতুতো ননদ সোনা বললো – “এইবারে ক’মাসের জইন্যে বাপের বাড়ী পাইলে যাও বৌদি, নইলে খাইট্যে খাইট্যে হাড়মাস কালি হয়ে যাবেক – যা একখান্ শাউড়ী তোমার!”
কিন্তু বাপের বাড়ী ‘যাবো’ বললেই কি আর যাওয়া যায়?
মা-বাবা তখন পরের বোনটার বিয়ে দিতে ব্যস্ত, গা করলো না। অত খরচ টানবে কে?
শাশুড়ী যদিও তাই নিয়ে দু’বেলা কথা শোনাতে লাগলো, মনে মনে কিন্তু সে বেশ খুশীই হলো। বিনাপয়সার কাজের লোক ছুটি নিলে, তাকে এখন এই বুড়ো বয়সে ছেলের ভাত রাঁধতে হতো না!

মেনকাদি’ আর কি করে? একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলেও, সেই আগের মতোই ঘরের কাজ করে যেতে লাগলো সে। কিন্তু এতোসব টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে, শেষপর্যন্ত গর্ভস্থ সন্তানটিই অভিমানে বিদায় নিলো।

পুকুরপাড়ে কাপড় কাচতে গিয়েছিলো মেনকাদি’, সেখানেই পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলো।
ডাক্তারের নির্দেশে এবারে বাধ্য হয়েই একমাস বিছানায় শুয়ে থাকতে হলো মেনকাদি’কে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে অদেখা, অসম্পূর্ণ সন্তানটির জন্য চোখের জল ফেলতো আর শুনতো শাশুড়ী ভাতে-ভাত রাঁধতে রাঁধতে তার বরকে বলছে — “যেমন অলক্ষ্মী বৌ…..হবে নি? ওর শরীলেই গণ্ডগোল আছে, নইলে এতোবড়ো একটা জোয়ান ধাড়ী মেয়েমানুষ কিনা কাটা কলাগাছের পারা ধপাস্ কইরে পড়ে?”
একমাসের মাথায় জোর করেই উঠে বসলো মেনকাদি’। যদিও শরীর খুব দুর্বল, তবুও শুয়ে শুয়ে শাশুড়ীর কথা শোনার চেয়ে কাজে লেগে পড়া ভালো – তাতে যদি একটু রাগ কমে এদের। শাশুড়ীর রাগ ঘরের কাজ করতে গিয়ে, আর বরের রাগ তার মায়ের রাঁধা সেদ্ধভাত রোজ খেতে গিয়ে।
সুতরাং মেনকাদি’ ক্লান্তহাতে আবার হাল ধরলো সংসারের। সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভালো। আবার আগের নিয়মে সংসার চলতে লাগলো। আর চলতে চলতে, বা হোঁচট খেতে খেতে, একবছর বাদে, আবার অন্তঃসত্ত্বা হলো মেনকাদি। এবার কিন্তু সে নিজেই সাবধান হলো। মনে পড়লো আগেরবার গর্ভপাতের পর মহিলা ডাক্তারবাবু কি বলেছিলেন।
শাশুড়ী যতই চেঁচামেচি করুক না কেন, প্রথম তিনমাস সে খুব রয়ে বসে কাজ করলো।
চানের সময় নিজের শাড়ীটা আর বরের ছেড়ে যাওয়া ধুতিটা সে ধুয়ে আনতো, কিন্তু বালতি ভরা কাপড় নিয়ে পুকুরপাড়ে কাচতে যেতো না।
প্রথমদিন দেখেই তো শাশুড়ীর রাগে মাথা গরম – “বলি ও নবাবের বিটি, এই কাপড়গুলান কাচবেক কে?”
মেনকাদি’ বললো – “তোমার শাড়ীটা তুমি চানের সময় ধুয়ে নেও গে’। মশারী-চাদর আমি এখন কাচতে পারবোনি, ডাগদারের বারণ আছে।”
শাশুড়ী রাগে গরগর করতে করতে বললো – “তবে কি আমি কাচবো নাকি?”
মেনকাদি’ বললো – “পারলে কাচো গে…কেউ না করিছে? আর না পারো তো পাড়ার ছোঁড়াদের দিয়ি দু’বালতি জল এইন্যে রাখো উঠোনে – আমি পরে দেখবোখন।”
শাশুড়ী দেখলো সেটা মন্দের ভালো। তাহলে মশারী-চাদরের সঙ্গে নিজের শাড়ীটাও গুঁজে দেওয়া যাবে। একে তাকে ধরে জলটা আনানোর ব্যবস্থা করলো শাশুড়ী, মেনকাদি’ও রান্নার শেষে উঠোনে বসে সেগুলো কেচে দিলো। এই করতে করতে নয়মাস তো পার করলো মেনকাদি’, কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। সাতঘন্টা অনেক কষ্ট সহ্য করে, মেনকাদি’ শেষে জন্ম দিলো এক মৃত সন্তানের। পুত্রসন্তান, কিন্তু মৃত।
মেনকাদি’র আক্ষেপকে ছাড়িয়ে গেলো তার শাশুড়ীর হা-হুতাশ।
‘বেটার মাথা খাওয়া আবাগী লক্ষ্মীছাড়ী’ ছাড়া, মেনকাদি’র জন্যে আর কোনো সম্বোধন মুখে আসতো না তার শাশুড়ীর।
সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেনকাদি’র স্বামীও শুরু করলো চড়-চাপড়। সংসারের সব গণ্ডগোলের মূলে যে এই ‘অলক্ষ্মী বৌ’, এটা তারও এখন বদ্ধ বিশ্বাস। দিনমজুরি না জুটলেও বৌ-এর দোষ, আর পাঁচুর ঠেকে টাকা শেষ করে আসার পর মা বাজারের টাকা চাইলেও বৌ-এর দোষ। পয়মন্ত একটা বৌ থাকলে এমন হয়
বিয়ে করে ফুর্তি করার সাধ ততদিনে ঘুচে গেছে মেনকাদি’র।
তবে স্বপ্ন দেখার অভ্যাসটা বোধহয় পুরোপুরি যায়নি তখনও। সেই স্বপ্নকে ধরে চলতে চলতে, আর হোঁচট খেতে খেতে, আরও একবছর পার করে দিলো মেনকাদি’।
তারপর আবার সে অন্তঃসত্ত্বা হলো। মেনকাদি’র ভাষায় – “মা ষষ্ঠী দয়া করলেন।”
সন্তানটি নির্বিঘ্নে জন্ম নিলো এবং জন্মেই জোরালো গলায় তার অস্তিত্ব ঘোষণা করলো।
শাশুড়ী মুখ বেঁকালো আর মেনকাদি’র বর রাগের চোটে ঘরের কোণে রাখা কলসীটা ভেঙে দিয়ে হনহন করে হাঁটা দিলো পাঁচুর ঠেকের দিকে। কারণ, এবারেরটি হলো কন্যাসন্তান। আর সেটা যে সম্পূর্ণভাবে মেনকাদি’রই দোষ, এতে তার স্বামী বা শাশুড়ী কারুরই কোন সন্দেহ ছিলো না।
মেনকাদি’ কিন্তু খুশী। হাত-পা-নাক-চোখ সব ঠিক আছে…..সুস্থ আছে….খাচ্ছে…খেলছে — আর কি চাই?
সে মেয়ের নাম দিলো ‘দীপা’। সেই নামে অবশ্য তাকে তার মা ছাড়া আর কেউই ডাকতো না।
মেনকাদি’র বর যতটুকু সময় বাড়ীতে থাকতো, ছোঁওয়া দূরে থাক তাকিয়েও দেখতো না মেয়ের দিকে।
শাশুড়ী রেগে গিয়ে বলতো – “ছেমড়ীকে নে যাও দেখি দাওয়ার থিকে – চেঁচিয়ে মাথা ধইরে দিলো!”
মেনকাদি’ যতদূর সম্ভব আড়াল করে রাখতো মেয়েকে, স্বামী আর শাশুড়ীর থেকে। তাও কি আর পুরো আড়াল হতো?
ইদানীং রাতে মাতাল হয়ে বাড়ী এসে, মেনকাদি’কে পাঁচটা গালাগালি আর দু’টো চড়-চাপড় না মেরে ঘুমোতে যেতো না তার বর। আর সেটার মাত্রা বেশী হয়ে গেলে, চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যেতো দীপার। তার কান্না শুনে আরও রেগে যেতো তার বাপ।
-“দিব গলাটা টিপে হতচ্ছাড়ি!” বলে হাত বাড়ালেই ঝাঁপিয়ে পড়তো মেনকাদি’ – তার শরীর দিয়ে আগলে রাখতো শিশুকন্যাটিকে। বরের সমস্ত রাগের প্রকাশটা হতো মেনকাদি’র পিঠের ওপরে।
শেষে মেনকাদি’ একটা বুদ্ধি বার করলো – সেই বা আর কতো মার খাবে!
বরের বাড়ী আসার সময় হলেই, রান্নাঘরে ভাত চাপা দিয়ে রেখে সে মেয়ে কোলে করে বেরিয়ে যেতো। অন্ধকারে এদিক ওদিক ঘুরে যতক্ষণে বাড়ী ফিরতো, বর ততক্ষণে নেশার ঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
প্রথম দু’দিন ঠিকঠাকই চললো। ছেলের চেঁচামেচিতে শাশুড়ী উঠে এসে ভাতের থালাটা এগিয়ে দিলো।
পরদিন বৌকে জিগেস করতে, সে বললো যে “দীপা ঘুম যায় না তাই মাথায় ঠাণ্ডা বাতাস লাগায়ে দ্যাখতিছিলাম।” তার পরেরদিনও শাশুড়ীকে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে ছেলেকে ভাতের থালা ধরে দিতে হলো। শাশুড়ী এবার রেগে আগুন হয়ে উঠলো – বৌ ঘরে থাকতে রোজ রাতে কিনা তাকে বিছানা থেকে উঠে ছেলেকে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভাতের থালার সামনে বসিয়ে দিতে হবে? আর মেয়ে-সোহাগী নবাবের বেটি মেয়ে কোলে পাড়া ঘুরে বেড়াবে?!
সেই রাতে শাশুড়ী আর কিছু বললো না, বৌ ফিরেছে জেনেও চুপ করে শুয়ে রইলো।
পরদিন রবিবার – ছেলে সকালে বাড়ীতে থাকবে। সময় বুঝে, ছেলে যেই দুটো মুড়ি নিয়ে দাওয়ায় বসেছে, শাশুড়ী চুল ঝাড়তে ঝাড়তে গলা তুললো – “বৌকে এট্টু বাঁধ দে দিকিনি!…..রাতদুবুরে ইদিক উদিক ঘুরি বেড়ায়….তুই তো ছাঁইপাশ গিলে বেহুঁশ মদ্দ ঘরে ঢুকিস্…..সে মাগী যে তখন মেয়ে কোলে উধাও সি হুঁশ আছে তোর?….আমি বুড়ী হদ্দ তোর খাবার দেই আর তিনি দেখো গে কোন্ নাগরের সাথি…..”
শুকনো খড়ে ঐ আগুনটুকুই ফেলার অপেক্ষা ছিলো। মেনকাদি’র বীরপুরুষ বর তার বীরত্ব দেখাতে ঝাঁপিয়ে পড়লো বৌয়ের ওপর। মেনকাদি’ দীপাকে কোলে নিয়ে রান্না করছিলো – চুলে টান লাগায় প্রথমটা থতোমতো খেয়ে গেলো। মুখ তুলে তাকাতে না তাকাতে একটা বেমক্কা ধাক্কা খেয়ে সে উল্টে পড়লো।
মেনকাদি’র হাতের কাঁচের চুড়ি ভেঙে ফুটলো দীপার হাতে, দীপার মাথাটা ঠুকে গেলো পিঁড়ির কোণায় – একবছরের শিশুকন্যা ভয় পেয়ে তারস্বরে কেঁদে উঠলো।
এবারে মেনকাদি’ মেয়েকে কোলে নিয়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো। হাতের লোহার খুন্তিটা শক্ত করে ধরে সজোরে এক ঘা মারলো তার স্বামীর মাথায়।
কপাল দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লো। ‘বাবা গো’ বলে মাটিতে বসে পড়ে মেনকাদি’র বাপান্ত করতে লাগলো তার বর। শব্দ শুনে শাশুড়ী রান্নাঘরে ঢুকে চীৎকার জুড়ে দিলো – “ওগো, তোমরা কে কোথায় আছো….দেখো এসে….আমার ছেলেটারি খুন কইরে দিলে গো এই হতচ্ছাড়ী বৌটা…”
এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিয়ে মেনকাদি’ বেরিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে।
নিজের ঘরে ঢুকে পয়সা জমানোর ভাঁড়টা, মুড়ির টিনটা আর দুটো শাড়ী-জামা-গামছা বেঁধে নিয়ে সে বেরিয়ে এলো পাঁচমিনিটের মধ্যে। শাশুড়ী তখনও আঁচল ভিজিয়ে ছেলের কপাল মুছে দিচ্ছে আর চেঁচিয়ে বাড়ী মাথায় করছে। পাড়া-প্রতিবেশী জমা হওয়ার আগেই দীপাকে কোলে নিয়ে দরজা খুলে রাস্তায় নেমে পড়লো মেনকাদি’।
মাঠের ভেতর দিয়ে পথ কেটে বড়োরাস্তার বাসস্টপে এসে দাঁড়ালো সে, আর প্রথম যে বাসটা এলো তাতেই উঠে পড়লো কাউকে কিছু জিগেস না করে — গ্রাম থেকে কেউ যাতে না এসে তাকে আবার আটকে দ্যায়!
উঠে বসার পর অবশ্য জিজ্ঞেস করে জানলো যে সে ভুল বাসে উঠেছে — এই বাস তার বাপের বাড়ীর গ্রামে যাবে না। কন্ডাকটার ছেলেটি ভালো ছিলো — মেনকাদি’র থেকে পয়সা নিলো না। পরের বাসস্টপে তাকে নামিয়ে, বলে দিলো রাস্তা পার হয়ে উল্টোদিকের বাস ধরতে। তাই করলো মেনকাদি’।
যদিও পরের বাসস্টপটা মেনকাদি’র শ্বশুরবাড়ী থেকে অনেকটা দূরে, তবু ‘যদি কেউ দেখে ফেলে’ এই ভয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে দীপাকে আঁচলের তলায় ঢুকিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মেনকাদি’। রাস্তায় লোকজন বিশেষ নেই, বাসস্টপে শুধু ওরা দু’জন। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, ক্লান্ত হয়ে শেষে রাস্তার ওপরেই বসে পড়লো মেয়ে কোলে মেনকাদি’। দু’জনের কারুরই খাওয়া হয়নি তখনো। মুড়ির টিনটা খুলে দীপার মুখে একটু মুড়ি দিলো, নিজেও একটু নিলো। রাস্তার পাশের টিপকল থেকে নিজে জল খেলো, মেয়েকে জল খাওয়ালো। একটু জল নিয়ে নিজের আর মেয়ের মাথায় মুখে দিলো – প্রথম বৈশাখের রোদে ঘেমে গেছে দু’জনেই। তারপর কি ভেবে, পয়সা জমানোর ভাঁড়টা রাস্তায় ঠুকে ভেঙে ফেললো। গুণে গুণে বাহান্ন টাকা কুড়ি পয়সা নিজের আঁচলে বেঁধে, ভাঁড়ের টুকরোগুলো ফেলে দিলো রাস্তার পাশের নালীতে।
এই প্রথম একা বাড়ীর বাইরে বেরোনো মেনকাদি’, বাসে চেপে পথ খুঁজে খুঁজে যখন তার বাপের বাড়ী এসে পৌঁছলো, বেলা তখন দুটো বেজে গেছে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই একটু শুয়েছিলো, দরজায় খটখট শুনে উঠে এলো। দরজা খুলে দিলো বাবা, আর তারপরেই অবাক – সামনে দাঁড়িয়ে মেয়ে কোলে মেনকাদি’!
“একি রে মেনি, তুই?” বলতে বলতে বাবার পেছনে এসে দাঁড়ালো মা। তার পেছনে ভাই আর ছোটবোন।
মেনকাদি’ ক্লান্ত চোখে একবার তাকিয়ে দেখলো পুরোনো চেনা মুখগুলোকে, তারপর পাশ কাটিয়ে উঠোনে ঢুকতে ঢুকতে বললো – “অতো ভাবতি হবে না, থাকবো বলে আসি নাই – দু’দিন বাদেই চলি যাবো।….একটু জল দে তো, পুঁটি!” ছোট বোন ছুটে গিয়ে জল নিয়ে এলো।
মা পাশে এসে বসলো দাওয়ায়। তারপর বললো – “তোরে কি আমি দু’দিন বাদে চলে যেতি বলিছি?….কতায় কতায় মাতা গরম করিসনি, মেনি। হইয়েছেটা কি এট্টু খুলে বলবি? জামায়ের সাথে ঝগড়াঝাটি হইয়েছে?”
জলের গ্লাসটা দীপার মুখে ধরে মেনকাদি’ বললো – “তোমরা তো বিয়ে দিয়ে খালাস হইছো, আর খবরে কাজ কি? জামাই মারুক, কাটুক তোমাদের তো কোন ক্ষেতি নাই!”
মা বললো – “সে কি কতা! আমাদের খবর দিবি না তো কি পাড়া-পেতিবেশীকে খবর দিবি?….তা’ অমন মার ঝগড়া ইস্তিরির সঙ্গে করেই থাকে পুরুষমানুষ। তা’ বলে কেউ ঘর ছাড়ে? তোর বাবা নয় গে’ বলে কয়ে দে’ আসবে জামাইকে।”
এবার মেনকাদি’ বোমা ফাটালো – “অমন জামাইয়ের মুখে নুড়ো, অমন শ্বশুরবাড়ীর মুখে ঝাঁটা। বাবার কোতাও গিয়ে কাজ নেইকো, আমি আর ওখানে ফিরছিনে।…..তুমি মাসীর হাওড়ার ঠিকানাটা দে’ দাও দিকি আমারে। আমি হাওড়া যাবো। আরবারে মাসী যখন এয়েছিলো, বলেছিলো সেথায় ইঞ্জিরী কলেজে অনেক কাজ – সব মেয়েরা কাজ করতি যায়। আমিও যাবো।”
“শোনো কতা!” মা গালে হাত দিলো। “সোমোথ্থ মেয়ে মানুষ কিনা শ্বশুরবাড়ী ছেড়ে কাজ করতি যাবে…..বলি মেয়েকে মানুষ করতি হবে না তোর? বে’ দিতে হবে না? বাপ ছাড়া বে’ হবে ওর?”
মেনকাদি’ কিন্তু অটল – “না হলি না হবে। বে’ করে যে কতো সুখ সেতো জানি!…দীপা পড়াশোনা করবে।”
মেনকাদি’র মা এবারে ধরে নিলো যে তার মেয়ের মাথাটাই গেছে।
বাবা বললো – “আর বিয়ান লোক পাঠালে? তাদির মেয়ে তারা নে’ যেতে চাইলে? দীপারে ছাড়বে তারা? কাল সি গেরামের লোকজন এসে মারদাঙ্গা করলি…..আমি বুড়োমানুষ….পুঁটিটার বে’ দিতে হবে…”
মেনকাদি’ বললো – “আমি কাল বাদি পরশুই চলি যাবো, হাওড়ার ঠিকানাটা দে দাও। পুঁটির বে’তে আসবো না….টেঁপির বে’তেও তো আসিনিকো….কেউ কিছু শুদিয়েছিলো? পুঁটির শ্বশুরবাড়ীতেও কিছু জানবে নি।”
বাবা তাও নিস্তেজ গলায় বললো – “জামাইয়ের যা রাগ….কাল যদি গেরামের লোক নিয়ে বাড়ী চড়াও হয়…”
এবারে পল্টু কথা বললো – “কিচ্ছু হবে না। আমি এখনই গিয়ে গ্রামের ছেলেদের বলে আসছি – অচেনা লোককে গ্রামে ঢুকতেই দেবে না। বড়দি’র শ্বশুরবাড়ীর লোক এলে, গ্রামের বাইরে থেকেই ভাগিয়ে দেবে – বলে দেবে যে চুপচাপ চলে না গেলে বৌ-নির্যাতনের কেস যাবে থানায়। দেখি কি করে তারা!”

মেনকাদি’ কৃতজ্ঞ চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালো। গ্রামের স্কুল থেকে এবারে হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিয়েছে ভাইটা। বড়দি’র কোলে উঠে ঘুরে বেড়াতো ছোটবেলায়….সেই পল্টু কবে এতো বড়ো হয়ে গেলো!
বড়দি’র পাশে এসে পল্টু বললো – “তুমি যদি সত্যি হাওড়া যেতে চাও, আমি তোমায় ঠিকানা দিয়ে সব বুঝিয়ে দেবো। মেজদি’র বিয়ের নেমন্তন্ন করতে মাসীর বাড়ী গেছিলাম আমি।….এখন ওঠো। হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসো তো দেখি।”
সত্যিই ঠিক দু’দিন বাদে, দীপাকে কোলে নিয়ে, হাওড়াগামী ট্রেনে উঠে বসলো মেনকাদি’। সঙ্গে সেই মুড়ির টিন আর একটা কাপড়ের ব্যাগে তার যথাসর্বস্ব – দুটো শাড়ী-ব্লাউজ, গামছা, দীপার জামা।
পল্টু এসে তাদের ট্রেনে তুলে দিয়ে গেলো। সে সঙ্গেও যেতে চেয়েছিলো, কিন্তু মেনকাদি’ই বারণ করলো। বললো পল্টু ভাড়ার টাকাটা খরচ না করে, তাকে যদি পঞ্চাশ টাকা ধার দেয় তাহলে বেশী সুবিধা হবে – চাকরি পেলেই টাকাটা শোধ করে দেবে মেনকাদি’। তাছাড়া পল্টুর এখন বাড়ীতে থাকলেই ভালো – বলা যায় না….যদি শ্বশুরবাড়ীর গ্রামের লোকজন এসে ঝামেলা করে!
মেনকাদি’র মাসী ছিলো আমাদের সেই পুরোনো কাজের লোক অলকাদি’র প্রতিবেশী। হাওড়ায় গঙ্গার ধারে যে আবাসিক ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ আছে, তার হস্টেলে কাজ করতো তাদের স্বামীরা। আর ক্যাম্পাসের ভেতরের কোয়ার্টার্সে ঠিকে কাজ করতে আসতো স্বামীদের বৌ-মেয়েরা।
ক্যাম্পাসের ঠিক বাইরের বস্তিতে থাকতো অলকাদি’ আর মেনকাদি’র মাসী। দু’ঘরের সেই ছোট্ট আস্তানায় যে বেশীদিন থাকা চলবে না, এটা মেনকাদি’ জানতো। থাকার কথা সে ভেবেও আসেনি। তার দরকার ছিলো একটা কাজ, আর কিছু পয়সা। বাবা আসার সময় পঁচিশটা টাকা হাতে গুঁজে দিয়েছিলো – তখনকার মতো নিয়ে নিয়েছিলো সে টাকা মেনকাদি’। পল্টুর টাকার সঙ্গে ওটাও ফেরত পাঠাবে হাতে একটু টাকা জমলে, কিন্তু আপাতত হাতে কিছু টাকা দরকার। মাসীর বাড়ী পৌঁছে গুণে দেখলো সব মিলে হাতে রয়েছে একশোটি টাকা – তার থেকে জোর করেই মাসীর হাতে কিছু গুঁজে দিয়েছে মেনকাদি’। শুলো নয় বারান্দায় পাটি পেতে, কিন্তু তার নিজের আর দীপার ডালভাতের খরচাও তো আছে!
মেনকাদি’র মাসী এবং তার প্রতিবেশীরা মিলে, ক্যাম্পাসের বাড়ী বাড়ী খোঁজ করে বলে-কয়ে, মেনকাদি’কে দু’বাড়ী কাজ যোগাড় করে দিলো মাসখানেকের মধ্যে। এর পর নিজেই চেষ্টা করে করে, মেনকাদি’ আরো এক বাড়ীর কাজ পেয়ে গেলো – কলেজের রেজিস্ট্রারের বাড়ীর কাজ। সেই কাজটা পেয়ে খুব সুবিধা হলো মেনকাদি’র।
সেখান থেকেই খবরাখবর নিয়ে, মেনকাদি’ ক্যাম্পাসের ভেতরের সার্ভেন্টস্ কোয়ার্টারে থাকার জন্যে আবেদন পত্র জমা দিলো। রেজিস্ট্রার বাবু আবেদনপত্রটি লিখে দিলেন, মেনকাদি’ টিপসই দিয়ে দিলো। মেনকাদি’র আর্থিক এবং সাংসারিক অবস্থা বিবেচনা করে, কর্তৃপক্ষ আবেদনটি মঞ্জুর করে দিলেন। অতএব, তিনমাসের মাথায়, ছোট্ট দীপাকে নিয়ে সাবসিডাইজড সার্ভেন্টস্ কোয়ার্টারের এক ঘরের পাকা বাড়ীতে চলে এলো মেনকাদি’। সেই শুরু হলো মেনকাদি’র নিজের সংসার।
আশেপাশে আরো কয়েকটা ঘর আছে – কলেজের বেয়ারা, মালী এরা সব থাকে পরিবার নিয়ে; তার মতো কাজের লোকও ক’জন আছে। মেনকাদি’ অবশ্য কারুর সঙ্গেই খুব গলাগলি করতে যেতো না। নিজের মতো থাকতো। দীপাকে কোলে নিয়ে সে কাজে যেতো – তাকে পাশে বসিয়ে রেখে বাসন মাজতো, কাপড় কাচতো। দীপাও চুপটি করে বসে থাকতো।
তবে ক্যাম্পাসের ভেতরে এসে মেনকাদি’ একটু নিশ্চিন্ত হলো – বস্তির ছেলেগুলোর নজর ভালো ছিলো না। একা মেয়ে দেখলেই সব ভেবে নেয় বারোয়ারী জিনিস! রাগে গা জ্বলতো মেনকাদি’র, কিন্তু মাসীর জন্য কাউকে কিছু বলতে পারতো না। বুঝতে পারতো মাসীর ওপর চাপ পড়ছে তাদের জন্য।
শুনতে পেতো প্রতিবেশীরা ফিসফিস করে মাসীকে জিগেস করছে – “তা তোমার বোনঝির স্বভাব-চরিত্তির ভালো তো বাপু? বর নেয় না….সেকি এমনি এমনি?”
মাসী তাড়াতাড়ি বলে উঠতো – “না গো, বরটাই পাজি। ধরি মারতো।….আবার বে’ করেছে শুনলুম। ঐ ভোলা, ওদের বাড়ী মেনির শ্বশুরবাড়ীর পাশের গেরামে। গেল মাসে বাড়ী গে’ ভোলা শুনেছে।”
প্রতিবেশীরা মুখ বেঁকিয়ে বলতো – “তা তোমার মেনির যা কটকটে কতা আর চালচলন – বর আবার বে’ করবে নাতো কি? পুরুষমানুষ ইস্ত্রীকে দুটো চড়-চাপড় মেরেছে বলে তেজ দেখিয়ে চলে এলি তুই? বলি হলো তো এখন? সে পুরুষমানুষ, আবার বে’ করে নিলো। তোকে কে নিবে?”
মেনকাদি’র কানে সবই যেতো, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিতো না। সত্যি বলতে কি, বর আবার বিয়ে করেছে শুনে সে নিশ্চিন্তই হয়েছিলো। পিছন থেকে একটা ভার যেন খসে পড়েছিলো।
কলেজ ক্যাম্পাসের ঠিক বাইরে একটা ফ্রি প্রাইমারী স্কুল ছিলো – সরকারী বদান্যতায় চলতো। ছয়বছর বয়সে সেখানে ভর্তি হলো দীপা। তার মা তাকে স্কুলে ছেড়ে এসে, বাড়ী বাড়ী দৌড়ে নিজের কাজ সারতো। তারপর দুপুরে গিয়ে তাকে স্কুল থেকে তুলে আনতো। নিজেদের রান্না-খাওয়া সেরে বিকেলে যখন আরেকবার লোকেদের বাড়ীর বাসন মাজতে বেরোতো মেনকাদি’, দীপা তখন বইখাতা নিয়ে তার সঙ্গে আসতো। দরজার কাছে বসে নিজের মনে পড়তো সে। কিছু না বুঝতে পারলে মেনকাদি’ বাড়ীর দাদা-দিদিদের বলতো সাহায্য করতে – সাহায্য করতোও সবাই। দীপার পড়াশোনায় মন ছিলো, পাশ করতে তার কোনো অসুবিধে হয়নি কখনো।
প্রাইমারী পাশ করে, দীপা একমাইল দূরের একটা স্কুলে পড়তে শুরু করলো। কলেজ ক্যাম্পাসের এক অধ্যাপকের সুপারিশে দীপাকে ‘ফ্রি’ করে নিয়েছে স্কুল – মেনকাদি’ সেই অধ্যাপকের বাড়ীতে কাজ করতো।
দীপা তখন আর মায়ের সঙ্গে আসতো না। সে তখন একটু বড়ো – শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা রোজ দু’মাইল হেঁটে স্কুল করতে যাচ্ছে। তবে পড়াশোনা বোঝার দরকার হলে সে আসতো মাঝে মাঝে।
সেই স্কুল থেকেই শেষ পর্যন্ত হায়ার সেকেণ্ডারী পাশ করলো দীপা, সেকেণ্ড ডিভিশনে।
এরপর হাওড়ার কলেজ, বি.কম.।
মাইনে দিতে না হলেও বাসভাড়া, বই খাতা, খাওয়া-দাওয়া – খরচ কম ছিলো না, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশী ছিলো মেনকাদি’র আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মান।
এক এক করে পাঁচবাড়ী ঠিকে কাজ নিয়েছিলো মেনকাদি’, দীপাকে কলেজে পড়াবে বলে।
অর্থনৈতিক সাহায্য কদাচিৎ নিয়েছে মেনকাদি’ কারুর কাছ থেকে। নিলেও, ধার হিসাবে নিয়ে পরে ফেরত দিয়ে দিয়েছে। শুধু মনের জোরে আর উদয়াস্ত খেটে, কন্যা দীপাকে স্কুল থেকে কলেজের গণ্ডী পার করিয়েছিলো সেই মানুষটা, যার জীবনের প্রায় পঁচিশটা বছর সীমাবদ্ধ ছিলো শুধু তার বাপের বাড়ী আর শ্বশুরবাড়ীর গ্রাম দিয়ে। আর এতোবড়ো বিপ্লবটা সে করেছিলো প্রায় একা, নিঃশব্দে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। না তার পিছনে ছিলো কোনো মহিলা-সমিতি, না ছিলো কোনো রাজনৈতিক দল। না কোনোদিন তার ইন্টারভিউ নিয়েছিলো কোনো সংবাদমাধ্যম।…
মেনকাদি’ আমাকে শিখিয়েছিলো যে বেড়ি ভাঙার জন্য চুড়ি-পরা একটা হাতই যথেষ্ট। সে দেখিয়ে দিয়েছিলো যে তার স্বাধীন স্বপ্ন শুধু তারই – সেই স্বপ্ন কারুর পকেটে থাকে না, তাই তাকে ভিক্ষা করে নেওয়ারও দরকার নেই।
আর তারপর একদিন…..শুনতে রূপকথা মনে হলেও…..যেই কলেজ ক্যাম্পাসের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে মেনকাদি’ থাকতো তার মেয়েকে নিয়ে, সেই ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের অফিসেই লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক হয়ে কাজে যোগ দিলো দীপা। হঠাৎই একটা ভেকেন্সি হয়েছিলো – দীপার অ্যাপ্লিকেশন এ্যাকসেপ্টেড হয়ে গেলো।
দীপা যেদিন হাতে এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেলো, সেইদিন সন্ধ্যেবেলা মেনকাদি’ আবার এলো আমাদের বাড়ী। বাবা-মা কোথাও বেরিয়েছিলেন, কলিংবেলের আওয়াজ শুনে আমি দেখতে গেলাম।
দরজা খুলে তাকে দেখে আমি অবাক – “কি গো মেনকাদি’, তুমি আবার যে? কাজ করে গেলে তো?”
মেনকাদি’ আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো – “আপিশের চাকরিটা হয়ে গেলো গো দিদি!…তুমি চিঠিটা নেকে দিছিলে, তোমারেই তাই পেরথম বলতি এলুম গো।” বলে চোখে আঁচল চেপে
মাটিতে বসে হু-হু করে কেঁদে উঠলো।
সেই প্রথম আমি মেনকাদি’কে কাঁদতে দেখলাম — দুঃখে নয়, আনন্দে।
যুদ্ধ জয়ের আনন্দে, মেয়েকে ধ’রে আকাশে ওড়ার আনন্দে, ‘ভাঙা বেড়িগুলি ফিরায়ে’….মাথা তুলে বাঁচার আনন্দে।
আমি চুপ করে থেকে তাকে কাঁদতে দিলাম।
তারপর, সে যখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে, তখন ফিসফিস করে বললাম – “মেনকাদি’, একদিন তোমার গল্প আমি সবাইকে বলবো – বলবোই বলবো!”

 

শকুন্তলা চৌধুরী

জন্ম কলকাতায়, বড় হয়েছেন বি. ই. কলেজ ক্যাম্পাসের প্রফেসরস্ কোয়ার্টারে। পড়াশোনা কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিয়ে এবং তথ্যবিজ্ঞানে পিএইচডি করার সূত্রে বিদেশগমন। কর্মসূত্রে বর্তমানে মিশিগানের বাসিন্দা।

স্কুলজীবন থেকেই নিয়মিত লেখেন তিনি। বাতায়ন, পরবাস, ঋতবাক এবং আরো বহু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে শকুন্তলার কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস।

শকুন্তলার লেখা গান ভিডিওতে পরিবেশন করেছেন রূপঙ্কর বাগচী, নচিকেতা চক্রবর্তী, কায়া ব্যাণ্ড। প্রকাশিত গ্রন্থ পৃথা (ঋতবাক প্রকাশনী)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।