তৌহীদা ইয়াকুবের দুটি অণুগল্প

নিউ ইয়ার

নিধা স্মার্ট উচ্চ শিক্ষিত আর ভাল বেতনে বেসরকারি চাকুরীজীবী। উত্তরার ৫ তলা একটি ফ্লাটে থাকে। ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর। শুধু রান্না ঘরের পিছনে একটা এক্সট্রা বারান্দা। সেখানে দাঁড়ালে নোংরা গন্ধ আর বস্তি জীবনের অনেক খানি দেখতে পাওয়া যায়। প্রায়ই খিস্তি শোনা যায়। এ ছাড়া বাকী সব পরিপাটি সুন্দর।

গতকাল রাতে নিধা ওই বারান্দায় রাখা শেলফে কিছু একটা খুঁজতে গিয়ে নিচে চোখ পড়ে যায়। কাল ছিল নতুন বছরের আগের রাত। সবচেয়ে কাছের ঘরটায় যে দম্পতি থাকে, বয়স একেবারেই কম দুজনের। দেখে দেখে মুখ দুটো চেনা হয়ে গেছে নিধির। ছেলেটা রিক্সা চালায় আর বউটা হয়তো কোন বাসায় ছুটা কাজ করে। দু’জনের মাঝে একটা চঞ্চল ভাব আছে। রিক্সা চালিয়ে যখন ছেলেটা ঘরে ফেরে তখন প্রায়ই বেশ রাত হয়ে যায়। রাতের খাওয়া শেষে দুজন গল্প করে। নিধি এদের দেখে। গল্পের টুকরো কথা কানে আসে। বউটা গল্প করছিলো, যে বাসায় সে কাজ করে সে বাসার মেয়ে বউ কি সুন্দর করে সেজেছে, কোন একটা পার্টিতে যাবে সেজন্য। অনেক সুন্দর লাগছিল। মেয়ে তার লম্বা বেণীতে ফুলের মালা পেঁচিয়েছিল দেখতে একেবারে ফিল্মের নায়িকার মত লাগছিল, এসব কথা শুনতে শুনতে নিধি ফিরে এসেছিল নিজের বেড রুমে।

আজ নিউ ইয়ার। অফিস শেষে কোথাও যাওয়ার নেই নিধির। গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলল সোজা চলে যেতে শাহবাগের ফুলের দোকানে। দুটো বেলি ফুলের মালা কিনে। তারপর বসুন্ধরা সিটির শপিং মল থেকে একটা শাড়ী, গরম শাল, পাঞ্জাবি, সোয়েটার আর, ফুড-কোর্ট থেকে কিছু মিষ্টি কিনে নিয়ে বের হলো। ততক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে। নিধি ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিল। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে রওনা হলো বাসার পিছনের ওই বস্তির দিকে।

নিভৃত ঘর

সিক্তা আর অর্ণব বলে কয়ে তাদের শেষ বিদায় নিয়েছিল। সেটা ছিল জানুয়ারির ১৭ তারিখ।
তারপর –
অর্ণব আর দেশে থাকেনি। দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে কানাডায়। এ্যডমন্টন-এর এ্যলবার্টো শহরে। খুব কম দেশে আসে।

একদিন টি এস সি চত্বরে শীতের ভাপা পিঠা খাচ্ছিল ওরা। অর্ণবের গলায় আটকে গেল। তাড়াতাড়ি পানি খেয়ে রক্ষা। অর্ণবের কমপ্লেইন ছিল পিঠাটা খুব ড্রাই। সিক্তা বলেছিলো ভাপা পিঠা এমনই হয়। অল্প করে মুখে নিয়ে বেশী করে চিবিয়ে খেলে দেখবে এটা আর ড্রাই থাকবে না, আর সব খাবারই এভাবে বেশী চিবিয়ে খাবে, বুঝলে?
খাবার খেতে বসে অকারণেই অর্ণবের এসব মনে পড়ে যায়। সেদিনের সেই গলায় আটকানোর স্মৃতিটা ঘুরেফিরে মনে পড়ে। একা একাই ভাবে অর্ণব ।

প্রতিবার রিক্সায় উঠার সময় ওড়না ঠিক মত দেখে নিয়ে, সাবধানে উঠতে বলতো সিক্তাকে। এখন, যখন সিক্তা গাড়ীতে উঠে ওর স্বামী শাড়ির আঁচল ভিতরে এগিয়ে দিয়ে দরোজা লক করতে করতে বলে- আহা সিক্তা আঁচল ঠিক করে বসো। আর ঝট করে অর্ণবকে মনে পড়ে যায় সিক্তার।

এই যে তারা ‘আজ থেকে আমাদের যোগাযোগ শেষ’ বলে বিদায় নিয়েছিল সেটা ছিল আসলে একটা বিচ্ছিন্ন বাড়ি। আর এই যে ওরা একে অপরকে কারণে অকারণে মনে করে তা ওই বাড়ির ভিতরে নিভৃত ঘর। তারা দুজনেই সেখানে যাতায়াত করছে। বসবাস করছে বছরের পর বছর, অজান্তেই।

 

তৌহীদা ইয়াকুব


জন্ম টাঙ্গাইলে। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল কলেজ থেকে পড়াশুনা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ হয়েছে। লেখালেখির শুরু সেই ছোটবেলা থেকেই। স্কুলের দেয়ালিকায়, বার্ষিক সাংস্কিতিক অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ এসব দিয়ে। এরপর প্রায় ১৫ বছর লিখেননি। বারবার শুরু ও ছাড়া। এই ছেড়ে যাওয়া, ফিরে আসার মাঝে কবিতা তাকে কখনই ছেড়ে যায়নি। ২০১৪ থেকে আবারও নিয়মিত লিখছেন। যদিও হারিয়ে ফেলেছেন পুরানো সব লেখাগুলো। কবিতা লেখা ছাড়াও, আবৃত্তি করা, বই পড়া, গান শোনা ও মুভি দেখা পছন্দের বিষয়।

বর্তমানে বসবাস ফ্রান্সের দক্ষিণে পারপিনিয় শহরে। পারপিনিয় শহরের এক পাশ ভূমধ্যসাগর, আর তিন পাশ পাহাড় বেস্টন করে রয়েছে। তাই সমুদ্রের চেয়ে পাহাড় তাকে বেশি টানে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।