নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২৩

একদিন রানু আপার শাড়ি পরে ক্লাসে গেল নিধি। লাল কালোর ব্রাশ ষ্ট্রোকে ছাপা রাজশাহী সিল্ক। নিধির একটাই লাল ব্লাউজ। শাড়ি পরার কায়দা শেখাতে গিয়ে রানু আপা নিধির সরু কোমরে কাপড় গুজে খুশী হয়ে ওঠে,– ‘কি সুন্দর ফিগাররে তোর নিধি। যত্ন করিস’।
-‘কি যত্ন করবো’?
-‘ব্যায়াম করবি, বেছে বেছে খাবি’।
শরীর চর্চায় নিধির আগ্রহ জন্মে না, তবে তাকে পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। সকালে হেঁটে চারুকলা, ক্লাস। এখনো আর্ট হিষ্ট্রি, স্কেচ আর ষ্টীল লাইফ আঁকার মধ্যে আছে তাদের ব্যাচ। নিধি তবু স্কেচ বুক নিয়ে পেছনের পুকুর পাড়ে বসে থাকে। কি আঁকবে কেন আঁকবে এই বিষয়ক ক্লাস লেকচার উলটে পালটে দেখে। ফুপুর বাড়ি ছাড়া তার আর যাওয়ার জায়গা কই? চারুকলা আর হোষ্টেল এই দুইয়ে তার গতায়াত।
ভোমরাদহ থেকে চলে আসার পর আজমত চাচা তাকে কেন একদিনও দেখতে এলো না- এই নিয়ে অভিমান জমে। একটা চিঠিও তো নিদেনপক্ষে লিখতে পারতো? তাদের বংশের ধারা কি এমনই! চোখের আড়াল তো মনের আড়াল? বাবা সম্ভবত সে জন্যে আর মা’র কথা উচ্চারণও করে না। কিন্তু নিধিই কি লিখেছে একটা চিঠি আজমত চাচাকে? অথচ চোখ বন্ধ করলে যে আকাশ তার চোখের সামনে ভাসে, সেখানে যে দু’একটা তারা জ্বল জ্বল করে তার মধ্যে আজমত চাচার মুখ অন্যতম।

শাড়ি পরে হল থেকে বেরিয়ে আর্টস ফ্যাকাল্টির লাইব্রেরীর বারান্দা ঘেষে হাঁটে নিধি, কাঁধে চটের ব্যাগে তার আঁকার সরঞ্জাম, বুকের কাছে জড়িয়ে ধরা স্কেচবুক। পেইন্ট, এঙ্গেল্ড শেইডার আর একটা মপ ব্রাশ কিনতে নিউমার্কেটে যেতে হবে।
একটা মাঝারী আকারের মিছিল হুড়মুড় করে ভার্সিটি মসজিদের পাশের রাস্তা দিয়ে লাইব্রেরীর সামনে এসে পড়লো। নিধি স্থির হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়ে। মিছিলের সামনের সারিতে মানব বন্ধনের হাতগুলো মুষ্ঠিবদ্ধ, থেকে থেকে উর্ধ্বমুখী হচ্ছে। সবগুলো শ্লোগান একযোগে কেবল ‘আমাদের দাবী মানতে হবে’ হয়ে নিধির অবয়ব ঢেকে দিলে সে স্থির হয়ে লাইব্রেরীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।
কেউ একজন বারান্দার ধাপ টপকে কাছে দাঁড়ালে চমকে যায় নিধি। আরে, এই ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা না এইমাত্র মিছিলে ছিলো!
-‘একসঙ্গে পড়ি, চিনতে পারো না?’
ইউসুফ খালেদকে চিনতে বাধ্য হয় নিধি। একসঙ্গে সাবসিডিয়ারী সমাজবিজ্ঞানের ক্লাশ করেছে। ইউসুফ ঐ অনুষদের ছাত্র, অর্থনীতির। একসঙ্গে পড়ে না, এ কথা জোর দিয়ে বলা হয় না। বারান্দায় একটা বাচ্চা বাদামওয়ালা উঠে এলে ইউসুফ নির্দ্বধায় তার ডালা থেকে বুটভাজা উঠিয়ে খায়। উদাস মুখে সিগারেট ধরায়।
– ‘তুমি বিকালে ফ্রি আছো? আমাদের ষ্টাডি সার্কেলে আসো। আজকে ইরফান ভাই জেল থেকে বের হইছে। তার সঙ্গে আলাপ করায়া দিবোনে। এলিয়েনেশন থিওরী খুব ভালো বুঝায়! মার্ক্স আর এঙ্গেলস সিদ্ধির মত গুইলা খাইছে!’ ইউসুফের কোটরাগত চক্ষু জ্বল জ্বল করে।
ষ্টাডি সার্কেলে যাবে কি যাবে না, সেটা পরের কথা। এত অল্প পরিচয়ে রাজনীতি করা ছেলেরা ডাকে সেটা শুনেছে নিধি। জেল ফেরতা ইরফান ভাইকে দেখে আসাই যায়। জেল ফেরত ছাত্রনেতা কখনো দেখেনি সে।
-‘এখন ক্লাস তো নাই, কোথায় যাও তুমি এখন’?
কেনাকাটা করবে শুনে ইউসুফের কোন কাজ না থাকা ভালোই লাগে নিধির। রিক্সা না নিয়ে হেঁটে হেঁটে নিউমার্কেটে যাওয়ার পন্থাটিও। ফুটপাতে লোকজনও মন্থর গতিতে চলে মনে হয়। রেজিষ্টার্ড বিল্ডিং এর মাঠ পেরিয়ে তারা নিউমার্কেটের গেটের মুখে ফেরীওয়ালার বিছিয়ে রাখা বর্তুলাকার পনির খন্ডের পাশ দিয়ে তারা রং তুলির দোকানটিতে এসে ঢোকে।
ব্রাশ আর ওয়াটার কালারের টিউব চেয়ে অপেক্ষা করে নিধি। দোকানের ছেলেটি পেছনের দরজা দিয়ে অন্য ঘর থেকে আনতে গেছে। এই অবসরে ডায়েরী, কলম ইত্যাদি চোখে পড়ে। পাঁচ মিনিট কি দুই¸ বাতাস আটকে ধরে ঝাঁপ খোলা দোকানের পরিসর। নিধি অহেতুক রুলটানা খাতাগুলি উল্টেপাল্টে দেখে।
ইউসুফ একটা লাল রং ডায়েরী হাতে নিয়ে থাকে। ওর হাতের আঙ্গুল খড়খড়ে, নিধির চোখ যায়। নীল সবুজ চেকের শার্ট আর খয়ে যাওয়া জিন্স, ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। এই ছেলেটা গা হাত পা ধোয় না? অলস মায়াময় একটা ভাবনা উড়তে থাকে নিধির।
ডায়েরীর জন্য পকেট হাতড়ে টাকা বের করে ইউসুফ।
নিধি হাসে- ‘তুমি ডায়েরী লেখো’?
-‘চল গাউসিয়ায় গিয়া ঠান্ডা খাই’, ইউসুফও হাসে।
ইউসুফের ঘোরাঘুরির ইচ্ছের সঙ্গে নিধির কারুর কাছে জবাবদিহিতা না থাকা এককাট্টা হলে হঠাৎ করেই এতক্ষণের বুকের ভার উড়ে গিয়ে বেশ ফুরফুরে লাগে।
কেন যাবে না সে? অয়ন, ফুপু, বাবা কেউই তো তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে নেই আর।
সবচে বড় কথা এ শুধু নিদেনপক্ষে বন্ধুত্ব। নির্মল? শব্দটা ভেবে নিধির হাসি পায় নিধির।
-‘হাসো ক্যান?’
-‘ অনেক দিন আগে আমি নিজেকে একটা মাছ ভাবতে শুরু করছিলাম’, নিধি গল্প বানাতে শুরু করে।
-‘ তারপরে এখন কি পাখি ভাবতে শুরু করছো?’
– তা, কিছুটা করলে করতেই পারি, না কি?’
শাড়ি কাপড়ের দোকানগুলির সামনে ফুটপাতি হকার ঠেলে অন্য গেট দিয়ে ওভারব্রীজ পার হয় তারা। গাউসিয়ার কোনার দোকানে উঁচু টুলে বসে নিধি লাস্যিতে স্ট্র দিয়ে চুমুক দেয়। দোকানের বাইরে চাঁদনী চকের সরু দোকানদারদের কাপড়ের গাট্টি ইত্যাদির বাইরে দৃষ্টি মেলা যায় না। মুখ ফেরালে সামনে ইউসুফের জোড়া ভ্রু, ছেলেটা চোখ নুইয়ে কোলের ওপরে রাখা লাল ডায়েরী খুলে কিছু একটা লিখছে। নিধি এত কাছে থেকে কারো চোখের ভ্রু দেখেনি!
কাকে আসলে কাছ থেকে বেশী দেখেছে, এ প্রশ্ন উঠলে মনে হয় এখন আজমত চাচার নাম ছাপিয়ে সামনে চলে আসবে অয়নের নাম। হ্যা, অয়নকে নিধি খেতে দেখেছে, ঘুমোতে দেখেছে, গোসল শেষে খালি গায়ে তেল ডলতে দেখেছে। জ্বরে কাহিল, ক্রোধে উন্মাদ, ইর্ষায় চুপসে যেতে দেখেছে কিন্তু ওর ভ্রু’র দিকে কখনো দেখেনি। তবু কাছ থেকে দেখা ছেলেদের কথা উঠলে নিধির কাছে অয়নই এখন অব্ধি শীর্ষস্থানে আছে।

একটা রিক্সা নিতে নীলক্ষেতের মোড় অব্ধি হেঁটে আসে ওরা। নিধির হাঁটতে অসুবিধে হলেও ভালো লাগছিল, রোদ তেমন চড়া না, তবু তার প্রথম শাড়ি পরার অস্বস্তি লুকিয়ে হাঁটে। রিক্সা দরদামের সময় বরং জড়তা খুঁজে পায় বুকের মধ্যে। এত কম চেনা একজনের সঙ্গে রিক্সায় উঠবে? পরক্ষণে দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। চারুকলার ছাত্রী সে, এই জুবুথুবু ভাব তাকে মানায় না। কুমকুম শুনলে তাকে নিয়ে হাসাহাসিই করবে।
হঠাৎ ধেয়ে আসা জনতা তার সব জড়তা এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে যায়, ভয়ে ইউসুফের শার্টের হাতা খামচে ধরে সে। রিক্সা গাড়ির হট্টগোল পাকানো জটলার উল্টোদিক থেকে শত শত মানুষ ঘূর্ণিপাকের মত ধেয়ে আসে। নীলক্ষেতের লেপ তোষকের দোকানীরা বালিশগুলো ত্রস্তহাতে গুটিয়ে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গোলমাল শুরু হয়েছে। কে জানে হয়তো, ইউসুফ যে মিছিল থেকে চকিতে সরে এসেছিল সেটি ঘিরেই শুরু হয়েছে।
আবার গাউসিয়ার দিকে ঘুরে যায় ওরা। এবার রিক্সা নেয়া যায় কিন্তু মানুষ আর যানবাহনের ডামাডোলের মধ্যে কোন রিক্সা ভাড়া যেতে রাজী হয় না!

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।