‘আমার বিরহে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেয়ো না।’
সৈয়দ মুজতবা আলীর শবনম উপন্যাস পড়ার সময় এই লাইনটাতে আমি অনেকক্ষণ আটকে ছিলাম।
মনে পড়ে ঐদিন আর বইটা পড়তে পারিনি । এমন গূঢ় বাক্য সব উপন্যাসে সব সময় থাকে না।দেবদাস পড়বার সময় ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয়’ পড়ে এমনই মনের অবস্থা হয়েছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাচের ইতিকথায় উনি একজায়গায় বলেছেন, সমাজে কিছু মিথ্যা এমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মহত্তর সত্যের রূপ পরিগ্রহ করে সমাজে স্থায়ী হয়ে বসে।’
একটি লাইন অথচ কী ব্যাপক অভীজ্ঞানের ভান্ড খুলে দেয়। শবনম যখন প্রথম পড়ি তখন যৌবন বয়েস। যৌবন বয়সে আগুন ধরাবার মতোই রোমান্টিক উপন্যস এটি। দেবদাস যেমন যৌবনের আরোধ্য পাঠ ছিল ঠিক তেমনি। ‘শবনম’ সৈয়দ মুজতবা আলীর কালজয়ী উপন্যাস শুধু নয় এটি শরৎচন্দ্রের দেবদাসের মতো বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি পঠিত ও আলোচিত উপন্যাস। সেই কবে ১৯৬০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশে মেয়েদের নাম ‘শবনম’ রাখা সেই বইয়ের অনুপ্রেরণা থেকেই। আজ আফগানিস্তানের দিকে তাকালে কী ভাবা যায় এই আফগানিস্তানের কাবুল/ পাগমান শহরে এমন সাহসী, শিক্ষিত, যৌবন সিক্ত, পাগমান পর্বতের মতো শ্বেত- শুভ্র এবং আফগান আপেলের মতোই লালচে মুখের শবনমরা বাস করতো। শবনমের রূপের বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক বলেছেন, প্রথম দেখেছিলুম কপালটি। যেন তৃতীয়ার ক্ষীণচন্দ্র। শুধু, চাঁদ হয় চাপা বর্ণের, এর কপালটি একদম পাগমান পাহাড়ের বরফের মতই ধবধবে সাদা। সেটি আপনি দেখেন নি? অতএব বলব নির্জলা দুধের মত। সেও তো আপনি দেখেন নি। তা হলে বলি বন-মল্লিকার পাপড়ির মত। ওর ভেজাল এখনো হয় নি।
নাকটি যেন ছোট বাঁশী। ওইটুকুন বাঁশীতে কি করে দুটো ফুটো হয় জানি নে। গাল দুটি কাবুলেরই পাকা আপেলের মত লাল টুকটুকে, তবে তাতে এমন একটা শেড রয়েছে যার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় এটা রুজ দিয়ে তৈরী নয়।
প্রেম যে দেশ বা কালের গন্ডি মানে না , শবনম চরিত্র তারই প্রতিভু । শবনম শুধু একটা নাম নয়, এমন একটা চরিত্র যা চিরন্তন প্রেমে বাঁধ-ভাঙা। কবিতা জানে শের- শায়রী জানে, ফার্সী জানে, ফরাসী ভাষা জানে আবার প্রেমের টানে ভাসতে পারে, ভাঙ্গতে পারে কিন্তু প্রেমকে অখন্ড রাখে মহিমান্বিত করে। ১৯২৭-১৯২৯ এই দুই বছর লেখক ভাষা বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসাবে কাবুলে চাকুরীরত ছিলেন। সেই সময়ের ঘটনা নিয়েই শবনম উপন্যস।
রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর মতো এটি সত্যমূলক কিনা জানা যায় না। তবে মজনুন যে চরিত্র তা যে লেখক স্বয়ং সেটা বোঝা যায় প্রতি পাতায় পাতায়। যদিও লেখক কখনো দাবী করেননি মজনূন চরিত্রের মানুষটি লেখক স্বয়ং।
এই শবনম বইয়ের পরতে পরতে বিষ্ময় এবং থমকে যাবার মতো ভাবনার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন লেখক।
একজাগায় বলছেন, শবনম অর্থ শিশির বা হীমকনা। সেই শিশিরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লেখক বলছেন ‘শিশির হলো প্রভাতের বিচ্ছেদ বেদনা।’
লাইনটি পড় মন্ত্রমুগ্ধের মতো কিছুক্ষণ অবশ হয়েছিলাম। সারারাত যে শিশির ঝরে ঝরে শিউলি ফুলকে ফুটিয়ে চলে, প্রভাত এলেই তাদের দুয়ের মরণ। একজন শুকিয়ে যায়, একজন ঝরে পড়ে। মজনূন আর শবনমের প্রেম ও ছিল এই শিশির বিন্দুর মতো । ভোরের মুখ না দেখতেই তা বিচ্ছেদে মিলিয়ে গিয়েছিল। পাগমান শহরে এক বলডান্স কেন্দ্র করে পরিচয় হয়
শবনমের সাথে বাংলার মজনূনের। মজনূন যেহেতু ফার্সী/ ফরাসী ভাষা জানে, ভাষাগত মিলের কারণে দুয়ের সম্পর্ক দ্রুত প্রেমে রূপ নেয়। ইরানী কবিদের কবিতা শবনমের খুব প্রিয় বিষয়। মজনূন ভাষার শিক্ষক ফলে কবিতার ঐক্য থেকে মনের ঐক্য গড়ে উঠতে সময় লাগে না। ভারতবর্ষ সম্পর্কে শবনমের কৌতূহল ছিল খুব, সেখানকার মানুষ যে সেরকমই মহান হবে এটাই তার ধারণা ছিল। ইরানী কবির এক কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে শবনম বলেছিল,
“নীস্ত দর ইরান জমীন সামান-ইতহসীল কামাল
তা নিয়ামদ হিন্দুস্তান হিনা রঙ্গীন ন শুদ।”
পরিপূর্ণতা পাবে তুমি কোথা ইরান দেশের ভুঁয়ে
মেহেদির পাতা কড়া লাল হয় ভারতের মাটি ছুঁয়ে।
আফগানিস্তানের মানুষ এতো আধুনিক ছিলো আজ কী তা ভাবা যায়। আফগানিস্তান সম্পর্কে আমার যা ধারণা ছিল তা রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা ছোট গল্প পড়ে। আমি ভাবতাম আফগানিস্তানের সবাই কাবুলিওয়লা। দেশে দেশে আখরোট, খেঁজুর, কিসমিস সওদা করে বেড়াই। অথচ ১৯২৭ সালে সেখান হোটেলে বলডান্স হচ্ছে। মেয়েরা সগর্বে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হোটেলে খানাপিনা করছে। প্রেম করছে। নারী তার পছন্দের পুরুষ বেছে নেবার অধিকারকে মর্যাদার সাথে ব্যবহার করছে। শব্ নম উপন্যাস না পড়লে তার কতটুকুই বা জানা যেত। ১৯২৭-১৯২৯ এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আফগানিস্তানের জন্য সুখকর ছিলো না। বাদশা আমানউল্লাহ ছিলেন ইউরোপীয় পন্থী। তার আদলেই তিনি আফগানিস্তানকে সাজাতে চেয়েছিলেন । সেখানেই হলো বিপর্যয়। ডাকাত বাচ্চায়ে সাকাও তার ডাকাত দল নিয়ে কাবুল আক্রমন করে বসলো। আমানউল্লাহ কান্দাহার পালিয়ে গেল। ওরকম একটা পরিবেশে নিজের মেয়েকে বাঁচাতে শবনমের বাবা মজনূনের সাথে শবনমের বিয়ে দিয়ে দেন। যদিও শবনম এবং মজনূন দেশের ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা ভেবে গোপনে একবার বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের রাতে মজনূনকে শবনম বলেছিলেন, তুমি আমার মিলনে অভ্যস্ত হয়ে যেয়ো না।
শবনম যেন অদৃশ্য ভবিষ্যতের সবকিছু আগে দেখেছিল। বিয়ের পরদিন সকালে বাচ্চায়ে সাকাও এর লোকজন শবনমকে ধরে নিয়ে যায়। মজনূন তখন ঘরে ছিলো না। যাবার সময় মজনূনের জন্য হাতে লেখা একটা চিরকুট রেখে যায়। তাতে লেখা ‘ছিলো বাড়িতে থেকো। আমি ফিরব।’
তারপর কত মাস যায় কতদিন যায় মজনূন খোঁজে তার শবনমকে। আজো সে বিশ্বাস করে শবনম ফিরবে কারণ সে বলেছে, ‘বাড়িতে থেকো। আমি ফিরবো।’
কবীর হোসেন তাপস

কবি ও দেশীয় বিজ্ঞাপন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্ণধর । কবিতা লিখছেন আশির দশক থেকে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম পূর্ণপ্রাণ যাবো (যৌথ)। এরপর দীর্ঘদিন লেখালেখির বাইরে থাকলেও বর্তমানে প্রচুর লিখছেন। পঞ্চাশের দশকের অন্যতম কবি আজীজুল হক তার কবিতা সম্পর্কে বলেন: “আবেগকে, অভিজ্ঞতাকে পূর্ণ অবয়বে আনার আগেই আকস্মিক ভেঙে দেওয়ার, যুগ ও তারুণ্যের অস্থিরতা প্রকাশকল্পে দ্রুতকথন, আভাসন এবং প্রতীকপ্রিয়তাকে পোষনের প্রবণতা তার কবিতাকে মেজাজ দান করে।” সাহিত্য ক্যাফেতে প্রকাশিত কবিতাগুলোতেও তার এসব প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায়।
