সাহিত্য সংবাদ: একটি ভিন্নরকম আড্ডার গল্প


শওগাত আলী সাগর

সাদ কামালী লেখেন ভালো। শুধু ‘ভালো’ বললে আসলে তাঁর প্রতি অবিচারই করা হয়। তাঁর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আর ক্ষুরধার লেখনি ইতিমধ্যে বাংলা কথা সাহিত্যে অত্যন্ত শক্তিশালী একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি বলেনও ভালো। না , গদবাধা বক্তৃতাবাজি নয়, বাংলা সাহিত্য আর বিশ্বসাহিত্যের মুনিঋষিদের বক্তব্য আর কর্ম থেকে উদাহরণ টেনে টেনে সারগর্ভ আলোচনায় আসর জমিয়ে রাখার অসাধারণ একটা শক্তি তাঁর রয়েছে। স্রেফ বৈঠকি আড্ডায়ও তাঁর এই ক্ষমতায় একটু্ও ভাটা পড়ে না।

প্রাবন্ধিক কথাসাহিত্যিক সাদ কামালী যখন কবিতার সূত্র ধরে চিত্রকর্ম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন আমি খানিকটা বিস্মিতই বোধ করছিলাম। বলে রাখি, মঞ্চ বানিয়ে, মাইক লাগিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সমাবেশ নয়, আয়োজনটা ছিল নিতান্তই ঘরোয়া, ইনফরমাল আলোচনা। বিষয়বস্তু অবশ্যই সাহিত্য। আমি নিজে সাহিত্যের দুর্বল পাঠক, আমার বিচরণ সংবাদপত্রে, যার নাসারন্ধ্র সর্বদাই ‘নিউজের’ গন্ধ খুঁজে বেড়ায়। সাহিত্যের আড্ডায় সবসময়ই খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করতে হয় আমাকে। কিন্তু সাদ কামালীর সূচনা বক্তব্য আমাকে খানিকটা সাহস জোগায়– একেবারে বেমানান নই আমি এই আসরে।

ভূমিকা শেষ না হতেই ফ্লোরে আসন গেড়ে আয়েশ করে বসা মানুষগুলোর চোখ ছুটে যায় দেয়ালের দিকে। সেখানে ঝুলে আছে বেশ কিছু চিত্রকর্ম। সাদ কামালী জানিয়ে দেন– এই ছবিগুলো ওয়াহিদ আজগরের আঁকা। ওয়াহিদ আজগর সাহিত্যের লোক, তিনি কবিতা লেখেন। কিন্তু এই আড্ডায় তিনি হাজির হয়েছেন নিজের আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে। দৃষ্টিতে , মনে শিল্পীর রঙ তুলির খেলার সৌন্দর্যবোধ নিয়ে আমরা প্রবেশ করি মূল আড্ডায়।

ইকবাল করিম হাসনুকে দিয়েই শুরু হয় আড্ডা। প্রাবন্ধিক ইকবাল করিম হাসনু টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ান। কিন্তু সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতিজগতের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডারে সংরক্ষিত আছে অনেক মূল্যবান সম্পদ। বাংলাদেশের নতুনধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো তারেক মাসুদকে ঘিরে রয়েছে এমনই কিছু অমূল্য স্মৃতি। সেই স্মৃতি ভাণ্ডার থেকেই ছড়িয়ে দেন তিনি তারেক মাসুদের জীবনের অসাধারণ কিছু তথ্য। উঠে আসে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের আরেক অপরিহার্য মানুষ মিশুক মুনীরের প্রসঙ্গও। এক সঙ্গে সিনেমা বানাতে বানাতে জুটি হয়ে যাওয়া দুজন গুণী মানুষ জুটি বেধে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করেন। ইকবাল করিম হাসনুর তথ্যনির্ভর এই স্মৃতিকথা শেষ হতেই শুরু হয় তা নিয়ে আলোচনা। সেই আলোচনা বিস্তৃত হয়ে যায় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস আর কাহিনী বিন্যাসের রূপান্তর, সমস্যা-সম্ভাবনায়। ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদেই কেবল নয়, অসাধারণ মনন আর বোধশক্তির কারণেই ইকবাল করিম হাসনু তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরের স্মৃতি তর্পণ করতে গিয়ে তুলে আনেন বাংলা চলচ্চিত্রকেই। আর সাদ কামালী, ওয়াহিদ আজগর, শিবলি সাদিক, মাসুদ খান নিজেদের বিশ্লেষণ সংযোজন করে সেটিকে করে তোলেন আরো প্রাণবন্ত। বিশেষ করে সাদ কামালীর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা তাকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।

তরুণ কবি আহমেদ মেহমুদের কবিতা নিয়ে মতামত প্রকাশকে ঘিরে তো রীতিমতো একটা কবিতার ক্লাশের চরিত্র পেয়ে যায় আড্ডাটা। আহমেদ মেহমুদ নিভৃতচারী কবি। সাদা কাগজের বুক চিরে ভাবের আল্পনা আঁকলওে তিনি সেগুলোকে আড়ালে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু এই আড্ডায় এসে তাঁর আর আড়ালে থাকার উপায় ছিল না। তিনি তুলে ধরেন তাঁর একগুচ্ছ কবিতা। কবি অবশ্য শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, কথা সাহিত্যিক সাদ কামালীর লেখা ‘লীলাবতী’ উপন্যাসটি পড়েই তিনি ৭টির মতো কবিতা লিখে ফেলেছেন। সেই কবিতাগুলোই তিনি পড়ে শোনাতে চান। নিভৃতচারী কবি কবিতা পাঠেও নিম্নকণ্ঠ। কিন্তু দেশের খ্যাতিমান কবি মাসুদ খান, ‘আমার তাৎক্ষণিক মন্তব্য’ বলেও ‘নিখুঁত অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলোর ধ্বনিগত অনুপ্রাস, ছন্দ অলঙ্কার আর অবাধ অনুসঙ্গের ব্যবহার মুহূর্তেই মনকে ছুঁয়ে দেয়’ বলে উল্লেখ করেন ।’ দীর্ঘ পাঠে ক্লান্তি আসতে পারে বলওে তিনি সতর্ক করে দেন। মাসুদ খানের আলোচনার সূত্র ধরে শুরু হয়ে যায় কবিতার ব্যাকরণ, ধ্বনি আর ছন্দ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা।

সেই আলোচনার রেশ না ফুরোতেই কবিতা নিয়ে হাজির হন কবি নাঈম হাসান। নাঈম হাসান এর বিচরণ কবিতা এবং প্রবন্ধ– এই দুই শাখাতেই। “নিরন্তর’’ নামে এক সময় সাহিত্য পত্রিকা বের করতেন তিনি। পত্রিকার সম্পাদনায় লেখা বাছাইয়ে অতিমাত্রায় পারফেকশনিষ্ট কবি নাঈম হাসান কবিতার  ক্ষেত্রেও পারফেকশনিষ্ট হতে সচেষ্ট। আড্ডার মতানুসারে, ‘সুনির্বাচিত এবং ব্যাকারণঋদ্ধ শব্দের ব্যবহার, রুচিশীলতা আর শব্দের মধ্য দিয়ে বহুমাত্রিকতা হাজির করার প্রচেষ্টা’ রয়েছে তার কবিতায়। আর সেজন্যেই বোধ হয় কবিকণ্ঠে শোনা কবিতাগুলো ‘ইন্দ্রিয়কে ছুঁয়ে যাওয়া’ আনন্দ দিতে পেরেছে সবাইকে।

কবি শিবলী সাদিকের প্রিয় বিষয় প্রকৃতি। সাহিত্যের আড্ডায় তিনি যেন প্রকৃতিকে নিয়েই হাজির হয়ে যান। শুরুতেই তিনি জানিয়ে দেন, বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের মতো সময় তিনি অনেকটা জলাবদ্ধ সময় কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি বন্দী করেছেন তাঁর কবিতায়।

কবিতা নিয়ে ছেদ-ব্যবচ্ছেদ আর তুমুল পর্যালোচনাকে ভিন্নদিকে নিয়ে যেতে গদ্য নিয়ে হাজির হন কথাশিল্পী সালমা বাণী। তিনি পড়ে শোনান তাঁর প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা ‘ক্ষণ জাতক’ উপন্যাসের অংশ বিশেষ। মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্ম নেওয়া এক যুদ্ধশিশু যে কিনা তার জন্মদাত্রী মাকে খুঁজে বের করতে কানাডা থেকে দেশে ফিরে যায়– তার কাহিনী নিয়ে আবর্তিত হয়েছে এই উপন্যাসের শরীর। ইতিমধ্যে সালমা বাণীর বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখাটিও প্রকাশিত হয়েছে ঢাকার একটি ঈদ সংখ্যায়। গল্পের চরিত্রের সঙ্গে অনেকটা একাত্ম হয়ে গল্প থেকে পাঠ করে সালমা বাণী আড্ডার পুরো মনোযোগটাই আকড়ে ধরতে সমর্থ হন। কিন্তু পাঠপরবর্তী আলোচনায় প্রশংসার পাশাপাশি কাহিনী বিনির্মাণের ত্রুটি বা দুর্বলতাগুলো নিষ্ঠুরভাবে তুলে ধরতওে দ্বিধা করেন নি আড্ডার মানুষগুলো।

সবশেষে কবিতা নিয়ে হাজির হন কবি মাসুদ খান। “বাংলা ভাষার এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন মাসুদ খান। নিজের ও তাঁর অনুসারীদের জন্য মৃদু ও বুদ্ধিদীপ্ত একটি কবিতার ধারা নির্মাণ করে নিয়েছেন তিনি। বাংলা কবিতায় এখন কিছু শব্দ ও শব্দবন্ধের ব্যবহার একান্তই মাসুদ খানের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে গেছে।”– এভাবেই মাসুদ খানকে উপস্থাপন করা হয় ঢাকার মূলধারার মিডিয়ায়। মাসুদ খান যখন কবিতা পড়তে শুরু করেন, তখন মনে হতে থাকে যেন কবিতার প্রতিটি পঙক্তিমালার বিন্দু বিন্দু আবেগ তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছে।

সাদ কামালী জানিয়েছিলেন এই ধরনের সাহিত্য আড্ডা তারা মাঝে মধ্যেই করে থাকেন। আমার অবশ্য এই প্রথম তাদের কোনো আয়োজনে অংশ নেওয়া। টরন্টোতে বসবাস করলেও বাংলাদেশের মূল সাহিত্যজগতে যথেষ্ট শক্ত অবস্থান করে নেওয়া লেখক কবি আর তরুণ কবির সংমিশ্রিত পাঠ আর তা নিয়ে আলোচনা– আড্ডার এই বৈশিষ্ট্যটাই আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। কেবল পিঠ চাপড়ে দেওয়া নয়, অপারেশন থিয়েটারে শুইয়ে দিয়ে একটু একটু করে ব্যবচ্ছেদ করা আর সেই ব্যবচ্ছেদকে সহাস্যে মেনে নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই লেখক কবিরা আড্ডাটিকে প্রাণবন্ত করে তোলেন।

বিকেলকে পেছনে ফেলে সন্ধ্যা ক্রমশ পূর্ণযৌবনা রাত্রিতে পরিণত হলেও  আড্ডায় ছেদ পড়ে না। বরং ঘরোয়া আড্ডাটি আর নিতান্ত ঘরোয়া না থেকে একটি সাহিত্য আয়োজনে চরিত্র পেয়ে যায়। আর বাবলু’র দরাজ গলার গান সেই আয়োজনকে দেয় ভিন্নমাত্রা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *